বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
Wednesday, 16 Oct, 2019 11:41:28 pm
No icon No icon No icon

একজন বঙ্গসন্তান অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি

//

একজন বঙ্গসন্তান অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি

জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম) বিশেষ প্রতিনিধি টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : অমর্ত্য সেনের নোবেল জয়ের ২১ বছর পর পুনরায় আলোড়ন তৈরি করল বাংলা।বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূরীকরণে পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতির সফল উপস্থাপনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি ।অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে পুরস্কার পেলেও নোবেল জয়ী সমগ্র বাঙালির তালিকায় তিনি চতুর্থ ব্যক্তি। ২০১৯ সালে তার সঙ্গে যৌথভাবে এ পুরস্কার পেয়েছেন আরও দু’জন:এসটার ডুফলো এবং মাইকেল ক্রেমার।এর আগে বাঙালি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন অভিজিৎ ব্যানার্জির শিক্ষক অমর্ত্য সেন।নোবেল পাওয়া অন্য বাঙালিরা হলেন:সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিতে ড.মোহাম্মদ ইউনূস।কিন্তু কে এই নোবেলজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জি? 
নোবেল বিজয়ী বাঙালি অভিজিৎ ব্যানার্জি ১৯৬১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন এই অর্থনীতিবিদের মা নির্মলাদেবী ছিলেন সেন্টার ফর সোশ্যাল সায়েন্সের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। তার বাবা দীপক ব্যানার্জি ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক।
অভিজিৎ ব্যানার্জির ছাত্রজীবন শুরু হয়েছিল কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে। পরে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতকে পড়াশোনা করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ১৯৮১ সালে স্নাতক হওয়ার পরে ১৯৮৩ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অভিজিৎ ব্যানার্জি। ছবি: সংগৃহীত

এরপর ১৯৮৮ সালে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। এছাড়া ২০১৫ পরবর্তী ডেভলপমেন্ট অ্যাজেন্ডা কর্মসূচিতে জাতিসংঘের সচিবের বিশিষ্ট প্রতিনিধি প্যানেলে ছিলেন তিনি।

অর্থনীতি বিষয়ে তার লেখা চারটি বই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার মধ্যে ‘পুওর ইকোনোমি’ বইটি গোল্ডম্যান স্যাকস বিজনেস বুক সম্মানে ভূষিত হয়।

অভিজিৎ ব্যানার্জি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির ফুর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি বিভাগের একজন আন্তর্জাতিক অধ্যাপক। এছাড়াও অর্থনীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ এর সাবেক প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ, কিইল ইনস্টিটিউট, আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স এবং ইকোনমিক সোসাইটির সম্মানিত ফেলো।এছাড়াও তিনি পুর ইকোনমিকসের একজন সহকারী লেখকও।

২০১৯ সালে অভিজিৎ ব্যানার্জির সাথে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন তার স্ত্রী এসটার ডুফলো।স্ত্রী এসটারের জন্ম ১৯৭২ সালে প্যারিসে।অভিজিতের স্ত্রী এসটার ডুফলোর গবেষণাও যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে।এসটারের গবেষণার বিষয় ছিল,‘দারিদ্র দূরীকরণে সামাজিক নীতি নির্ধারণ’।

দীর্ঘদিন সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন অভিজিৎ-এসটার দম্পতি।

এর আগে বিশ্বের দারিদ্র নিয়ে গবেষণার জন্যে ২০১৩ সালে অভিজিৎ এবং স্ত্রী এসটার যুগ্মভাবে গড়ে তোলেন ‘আব্দুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশান ল্যাব’।

২০১৫ সালে তাদের বিয়ে হয়, যদিও দু’জনের সম্পর্ক অনেক আগের। ২০১২ সালে এই দম্পতির এক সন্তান জন্মলাভ করে। এর আগে কলকাতার বাসিন্দা এবং বাল্যবান্ধবী ডাঃ অরুন্ধুতি তুলিকে বিয়ে করেছিলেন অভিজিৎ।

এসটার অর্থনীতিতে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী।বিশ্বের দ্বিতীয় নারী হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন তিনি।

অর্থনীতিতে এবারের নোবেল পাওয়া এই তিন অর্থনীতিবিদের পরিচালিত গবেষণা বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনের লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার রাখছে। তাদের পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতি প্রয়োগ করে মাত্র দুই দশকে উন্নয়ন অর্থনীতি রূপান্তরিত হয়ে গেছে। বর্তমানে এই উন্নয়ন অর্থনীতিই হয়ে গেছে গবেষণার এক সমৃদ্ধ ক্ষেত্র।

বিশ্বের ৭০ কোটিরও বেশি মানুষ এখনো অত্যন্ত নিম্ন আয়ের জীবন ধারণ করছে। এখনো প্রতি বছর পঞ্চম জন্মদিন আসার আগেই মৃত্যু হয় অর্ধকোটি শিশুর। এদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু এমন রোগে যার চিকিৎসা বা প্রতিরোধ সম্ভব ছিল, চিকিৎসার খরচ আর কিছুটা কম হলেই।

এ বছরের নোবেল বিজয়ীরা তাদের গবেষণার মধ্য দিয়ে তথ্য সংগ্রহের নতুন এক ধরনের পদ্ধতি বের করেছেন, যার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ার সবচেয়ে ভালো উপায় কী হতে পারে তার নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া সম্ভব।

এ পদ্ধতিতে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের মতো বড় ইস্যুটিকে ছোট ছোট গোছানো সম্ভব এমন প্রশ্নে বিভক্ত করা হয়। যেমন, শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়নে সবচেয়ে কার্যকর প্রক্রিয়া কী।

১৯৯০’র দশকে মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার ও তার সহকর্মীরা গবেষণার মধ্য দিয়ে দেখালেন পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতি ঠিক কতটা শক্তিশালী হতে পারে।তারা কেনিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো করতে মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু প্রক্রিয়ার পরীক্ষা চালিয়ে এর সত্যতা প্রমাণ করেন।

ভারতীয় বাঙালি অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং তার স্ত্রী ফ্রান্সের এসটার ডুফলো মিলে অন্য বিভিন্ন দেশে অন্যান্য বিষয়ের ওপরও এমনই কিছু মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষানির্ভর গবেষণা করে সফল হন।এসব গবেষণার অনেকগুলোই তারা করেছেন ক্রেমারের সঙ্গে মিলে।

বাঙালি অর্থনীতিবিদের বিশ্বজয়ে অত্যন্ত আনন্দিত বাংলার তারকারাও। টলিউড থেকে বলিউড অনেকেই ইতিমধ্যে সোশাল মিডিয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদকে।

রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ”এটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। একজন বাঙালি হিসেবে গৌরবের তো বটেই। আনন্দ প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।”

বাংলা ছবি ও বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ”নিঃসন্দেহে এটা গৌরবের বিষয়। স্কুল ও কলেজ জীবন উনি কলকাতায় কাটিয়েছেন, তাতে আরও বেশি করে গর্ব হচ্ছে।তবে ‘এতদ্বারা প্রমাণিত হইল বাঙালির মেধা শ্রেষ্ঠ’- এ জাতীয় কোনও মনোভাব আমার নেই।এই সংকীর্ণ সময়ে নতুন করে আর বিভাজনের দরকার নেই।দিনের শেষে এটাই বড় কথা যে যোগ্য মানুষ সম্মানটা পেয়েছেন।”

রিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় জানালেন, ”সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে আজ গর্বের দিন।আমিও একজন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে ভীষণ আনন্দিত।অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।”

পরিচালক সৃজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ও অর্থনীতির ছাত্র এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর একটি অসাধারণ যোগসূত্র রয়েছে।দুজনেই পড়াশোনা করেছেন কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে।এর পর দুজনেই প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ১৯৮৩ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতিকে বরখাস্ত করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাড়ি ঘেরাও করেন। তার জেরে অভিজিতসহ অনেকেকে গ্রেফতার করা হয়।

দারিদ্র্য কোনও সমস্যা নয়: নোবেলজয়ী অভিজিৎ

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রদ্রোহ বিতর্ক নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল ঠিক তেমনই একটি আন্দোলন হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। অভিজিৎ ব্যানার্জি তখন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র। উপাচার্যের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ১০ দিন তিহার জেলে ছিলেন তিনি।

হিন্দুস্তান টাইমসে ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ ব্যানার্জি তিহারের জেলে থাকার সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তাকে ও তার বন্ধুদের জেলে নানাভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল। পেটানো হয়েছিল লাঠি দিয়ে। হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছিল। অবশ্য পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।

১৯৮৩ সালের ওই দিন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘেরাও করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতিকে অনৈতিকভাবে অপসারণ করা হয়েছে।

অভিজিৎ সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গ্রেপ্তার করার পর তিহার জেলে নিয়ে পুলিশ আমাদের মারধর শুরু করে। আমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ না আনা হলেও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। পরে অবশ্য সেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। তবে জেলে ১০ দিন বন্দি ছিলাম আমরা।’

সেই ঘটনা প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের জেএনইউ-এর আন্দোলন সম্পর্কে অভিজিৎ বলেছিলেন, ‘ফের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নাক গলানোর চেষ্টা করছে সরকার।’ অভিজিতের কথায়, গ্রেপ্তার করার পর তখন পুলিশ তাদের বলেছিল, ‘আমরা বস। তোমরা চুপ থাকো, ভদ্রভাবে থাকো।’

২০১৬ সালে জেএনইউতে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ, অনির্বাণ ভট্টাচার্যদের ক্যাম্পাসকে দেশদ্রোহীদের আখড়া বানানোর অভিযোগে জেলে পাঠানো হয়েছিল। তখন এক জাতীয় সংবাদপত্র অভিজিৎ ব্যানার্জি এই সাক্ষাৎকার দেন।

ছেলে নোবেল পাওয়ায় খুশি অভিজিতের মা

সক্ষাৎকারে অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘ভর্তি প্রক্রিয়া বদলানোর দাবিতে আন্দোলন হচ্ছিল। ফি এত বাড়িয়ে দেয়া হয় যে তা অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছাত্র সংসদ এর প্রতিবাদ করায় তৎকালীন ছাত্র সংসদের সভাপতিকে বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।’

অভিজিতের নোবেল জয়ে গর্বিত কলকাতার বাঙালিরা

তারপরই ছাত্র আন্দোলন আরও তীব্র হয় জানিয়ে অভিজিৎ বলেন, ‘সেই আন্দোলন দমন করতেই পুলিশ ঢোকে ক্যাম্পাসে। আমাদের মারতে মারতে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্দেহ নেই এতে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদত ছিল। তারা আমাদের বলেছিল, ‘আমরা বস। আমাদের কথার ওপর কথা বলা যাবে না।’

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK