শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Saturday, 12 Oct, 2019 12:02:50 am
No icon No icon No icon

ইথিওপিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পেলেন আবি আহমেদ আলী

//

ইথিওপিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পেলেন আবি আহমেদ আলী


জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম) বিশেষ প্রতিনিধি টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : আবি আহমেদের নাম আগে মানুষ না জানলেও এখন সারা বিশ্বে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে।মানুষের মাঝে কৌতূহল দেখা দিয়েছে আবি আহমেদকে নিয়ে।মানুষের মনে প্রশ্ন কে এই আবি আহমেদ?কী কারণে তাকে নোবেল পুরুস্কার দেয়া হলো? চলতি বছরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলী। শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

শুক্রবার নরওয়ের স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) রাজধানী অসলো থেকে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এবারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে।

চলতি বছর শান্তিতে নোবেলের জন্য বেশ জোরেশোরেই উচ্চারণ হয় আবি আহমেদের নাম। সম্প্রতি তার প্রচেষ্টাতেই ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার পুরনো বৈরিতার অবসান ঘটেছে।দুটি দেশ ও জাতিকে এক সুতোয় গাঁথার জন্যই তিনি নোবেল জয় করলেন। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া সীমান্ত যুদ্ধে দু’দেশের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হন। ২০০০ সালে শান্তিচুক্তি হলেও উত্তেজনা বহাল ছিল।

গত বছরের ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এ সরকারপ্রধান খুব দ্রুততার সঙ্গে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেগুলো দেশে-বিদেশে ইথিওপীয়দের মনে আশা সঞ্চার করেছে। ক্ষমতায় এসেই তিনি হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিয়েছেন,সেন্সরশিপের নামে বন্ধ থাকা শত শত ওয়েবসাইট চালু করেছেন, ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের ইতি টেনেছেন,রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা তুলে নিয়েছেন।

রাজধানী আদ্দিস আবাবার চিত্রটাই যেন পাল্টে গেছে। আগের সরকারের চাপে পিষ্ট থাকা মানুষগুলো এখন যেন একটু বুক উঁচিয়ে হাঁটতে পারছে, মন খুলে হাসার একটা উপলক্ষ এখন তাদের সামনে আছে,কয়েক দশক ধরে যেটি তাদের জীবনে ছিল না।

ইথিওপিয়ায় ৯০টিরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। দশকের পর দশক দেশটির রাজনীতি যে ঘূর্ণাবর্তে ছিল, তাতে এ বিভেদ আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাম ‘ওরোমো’। দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষই এ সম্প্রদায়ের। প্রধানমন্ত্রী আবিও এ সম্প্রদায়ের। ইথিওপিয়ার অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, ওরোমো থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রী না হলে গৃহযুদ্ধ নিশ্চিত। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এখন শান্তির বার্তা ইথিওপিয়ার সর্বত্র।

আবি বিস্ময়করভাবে সব নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সমান জনপ্রিয়।তার নিজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ও এর পেছনে অনেকাংশে দায়ী।ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বেশাসায় এক মুসলমান বাবা ও খ্রিষ্টান মায়ের ঘরে জন্ম আবি আহমেদের। বিদ্যুৎ ও পানির স্বল্পতা ছিল তাদের বাড়িতে।এমনকি তাকে ফ্লোরে ঘুমিয়ে বড় হতে হয়েছে।

গত মাসে একটি রেডিওতে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নদী থেকে আমাদের পানি বয়ে নিয়ে আসতে হতো। সপ্তম গ্রেডে পড়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যুৎ কিংবা অ্যাসফল্ট আস্তীর্ণ রাস্তা দেখেননি তিনি।

 

ক্ষমতাসীন জোট ইথিওপিয়ান পিপল’স রেভালুশনারি ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইপিআরডিএফ) গঠনের মধ্যে দিয়ে আবি আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। প্রযুক্তির প্রতি তার আলাদা মুগ্ধতা রয়েছে।কিশোর বয়েসে তিনি সামরিক বাহিনীর একজন রেডিও অপারেটর হিসেবে যোগ দেন।

সরকারে ঢোকার আগে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবি পেয়েছিলেন। ইথিওপিয়ার সাইবার গোয়েন্দা সংস্থা ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন তিনি।

তিনি ওরোমো, আমরাহা, টাইগারি ও ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী।মিনেসোটার ওই জনসভার ভাষণে তিনি ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় তিনটি ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন।এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সোমালিয়ার মানুষদের সম্মানে তিনি সোমালি ভাষায়ও কথা বলেছিলেন।

টুইটারে ছবি দেখুন

বিতর্কিত বিজয়ীরা যারা পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের পলিটব্যুরোর সদস্য লি ডুক থো ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন৷যুদ্ধ বন্ধের জন্যই এ চুক্তি করা হলেও ডুক থো পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান, কেননা চুক্তি হলেও যুদ্ধ তখনো থামেনি৷চুক্তি সম্পাদনের দু’ বছর পরেও ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়াতে সংঘাত চলেছে৷

১৯৯৪ সালের পুরস্কার নিয়ে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়৷ সে বছর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন প্রধান ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেসকে যৌথভাবে শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়৷ আরাফাতকে ‘অযোগ্য বিজয়ী’ আখ্যায়িত করে এর প্রতিবাদে নোবেল কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন নরওয়ের এক রাজনীতিবিদ৷

শরণার্থী ক্যাম্পে বেশ অমানবিক অবস্থার জন্য বহু বছর ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বাস্তু নীতির সমালোচনা করে আসছেন মানবাধিকার কর্মীরা৷ তারপরও ‘শান্তি, মীমাংসা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকার জন্য’ ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও দেয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার৷

মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্টকে কখনোই খুব শান্তিকামী হিসেবে দেখা যায়নি৷ তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আহ্বান করেছিলেন৷ এরপর উপনিবেশবাদ থেকে কিউবাবাসীদের মুক্ত হতে সাহায্য করেন৷ তবে মার্কিন সেনাবাহিনী গিয়েই প্রথমে নিশ্চিত করেন যে, ওই ভূখণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে৷তবে রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় শান্তির উদ্যোগের জন্য রুজভেল্ট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান৷

মিশর-ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমত হয়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত (বামে) ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন (ডানে)৷ ১৯৭৮ সালে এ কারণে শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় তাঁদের৷ সাদাতের এই পুরস্কার সে সময় বেশ আলোড়ন তোলে৷ কারণ, ১৯৫২ সালে বাদশাহ ফারুককে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন আনোয়ার সাদাত৷

‘আরো ভালো এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার জন্য ২০০১ সালে জাতিসংঘ ও এর মহাসচিব কোফি আনানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয৷ তবে অনেকগুলো চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে তাদের ব্যাপক সমালোচনা তাতে থামেনি

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে এফ.ডব্লিউ ডি ক্লার্ক এক সময় সে দেশে সরাসরি বর্ণবাদের পক্ষে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে৷ পরে বর্ণবিদ্বেষ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন৷নেলসন ম্যান্ডেলাসহ ন্যাশনাল কংগ্রেসের অনেক নেতাকে মুক্তি দেন তিনি৷ তা সত্ত্বেও ১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলার সঙ্গে তাঁকেও শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকে৷

হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতনের হাজার হাজার মামলাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলর৷ তার সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হওয়া এলেন জনসন সিরলেফের বিরুদ্ধেও টেইলরকে ওইসব কর্মকাণ্ডের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে৷২০১১ সালে ‘নারীদের নিরাপত্তার জন্য অহিংস সংগ্রাম’ এর কারণে সিরলেফকেও দেয়া হয় শান্তি পুরস্কার৷

‘দ্য ব্লু হেলমেট’ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী৷ ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তাঁদের৷ তবে নোবেল জয়ের পরই তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় নারী ও শিশুদের যৌন নির্যাতন ও তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে৷ রুয়ান্ডায় গণহত্যা এবং স্রেব্রেনিকায় ব্যাপক হত্যাকান্ডের সময় নির্লিপ্ত থাকার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে৷

‘আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং জনগণের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে অসাধারণ ভূমিকার জন্য’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার নয় মাসের মাথায় পুরস্কার পান ওবামা৷ সমালোচকরা মনে করেন, বড্ড তড়িঘড়িই এসেছিল পুরস্কারটি৷ পরে তিনি আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করতে সামরিক হস্তক্ষেপ অনুমোদন করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী হওয়ায় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়৷

টুইটারে ছবি দেখুন

নোবেল বিজয়ে মুসলিমরা:
প্রথম মুসলিম রসায়নবিদ হিসেবে নোবেল পান মিশরের আহমেদ জেওইল, ১৯৯৯
ডিএনএ সংশোধন নিয়ে কাজ করায় থমাস লিন্ডাল ও পল মডরিচের সঙ্গে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পান তুরস্কের সানজার৷ ২০১৫

দরিদ্র জনগণের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখায় শান্তিতে নোবেল পান বাংলাদেশের ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক৷ ২০০৬ তাওয়াক্কুল কারমান, ২০১১ নারীর নিরাপত্তা ও নারীর অধিকারের জন্য অসহিংস আন্দোলন করায় আরও দুই নারীর সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন ইয়েমেনের কারমান৷নোবেল পাওয়া প্রথম আরব নারী ও একমাত্র ইয়েমেনি নাগরিক তিনি৷ ]
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য শান্তিতে নোবেল পান ইরানের শিরিন এবাদি৷ ২০০৩ সামরিক কাজে পরমাণু শক্তির ব্যবহার প্রতিরোধ এবং পরমাণু শক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে ভূমিকা রাখায় মিশরের কূটনীতিক মোহামেদ এল বারাদেই ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ-কে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়৷ ২০০৫ সবচেয়ে কম বয়সি নোবেলজয়ী হচ্ছেন পাকিস্তানের ইউসুফজাই৷মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে ভূমিকা রাখায় এই খেতাব পান তিনি৷ ২০১৪  ‘মাই নেম ইজ রেড’ ও ‘স্নো’র মতো উপন্যাসের লেখক তুরস্কের পামুক৷ নোবেল পাওয়া প্রথম তুর্কি নাগরিক তিনি।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK