সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯
Thursday, 01 Aug, 2019 04:41:57 pm
No icon No icon No icon

সাম্মানিক পিএইচডি পেলেন মনোরঞ্জন ঘোষাল

//

সাম্মানিক পিএইচডি পেলেন মনোরঞ্জন ঘোষাল


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নন্দিত কণ্ঠশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির উন্নয়নে ব্যতিক্রমধর্মী অবদান রাখার জন্য সম্প্রতি সাম্মানিক পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ওরিয়েন্টাল হেরিটেজ কর্তৃক প্রদত্ত এই সম্মাননা সনদ গত ১১ মার্চ ২০১৯ নয়াদিল্লীর আদ্যা কাত্যায়নী শক্তিপীঠ অডিটেরিয়ামে সমাবর্তন অধিবেশনে প্রদান করা হয়। এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভারতের প্রায় তিরিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শতাধিক অধ্যাপক ও বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, মনোরঞ্জন ঘোষাল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সংগঠন ইন্টার রিলিজিয়ন হারমোনি সোসাইটি'র মহাসচিব। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার ইউনাইটেড রিলিজিয়নস ইনিশিয়েটিভ ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়থ পীস গ্রুপসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে অধিভুক্ত। ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্প্রসারণে উল্লেখিত সংগঠনের মহাসচিব হিসেবে তিনি আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশে এ বিষয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বক্তব্য রেখে চলেছেন। 
অপর একটি সূত্র জানায়, তেত্রিশটি লাশের ভেতর থেকে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে নিজের শরীরে কয়েকবার চিমটি কেটে মনোরঞ্জন টের পেয়েছিলেন, তিনি বেঁচে আছেন। গত ৪৭ বছর তিনি বেঁচে আছেন হাতে, পায়ে, মুখে, চুলে মৃত্যুর নিবিড় স্পর্শ নিয়ে। আজও যখন জগন্নাথ কলেজ, জজকোর্ট ভবনের সামনে দিয়ে যান, শিহরিত হন। বারবার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চের সেই রাত, যে রাতে অবিশ্বাস্যভাবে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, 'ছোটবেলায় একবার গ্রামে গিয়ে বাদুড়ের গায়ের গন্ধে শরীর গুলিয়ে উঠেছিল। একাত্তরের ৩১ মার্চের সেই রাতে যখন লাশের স্তূপের মাঝখান দিয়ে বের হয়েছিলাম, তখনও নাকে লাগে সেই বাদুড়ের গায়ের গন্ধ। এখনও বাদুড়ের গায়ের গন্ধ মাঝেমধ্যেই শরীর গুলিয়ে দেয়।'
মনোরঞ্জন ঘোষাল ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের দুঃশাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় যোগ দিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ শিল্পীগোষ্ঠীতে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গুলিতে বড় ভাই রতন ঘোষাল শহীদ হন। ৩১ মার্চ সকালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তরুণ মনোরঞ্জন। তারপর ব্রাশফায়ারের ভেতরে ৩৩ জনের মধ্যে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মনোরঞ্জন। পরে ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে মনোরঞ্জন পরিচিতি পান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে। এখনও সেই পরিচিতি নিয়েই বেঁচে আছেন ৭১ বছর বয়সী মনোরঞ্জন ঘোষাল।
মনোরঞ্জন ঘোষাল ২৫ মার্চ রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেই রাতে তিনি ছিলেন ৪৫ নম্বর  পাটুয়াটুলীতে তার বাবার প্রকাশনা সংস্থা ইস্ট পাকিস্তান পাবলিশার্সের দোতলায়। সেখানে বসেই তিনি শুনতে পান গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দ। পরে রাতে সেখান থেকে কয়েক দফা বের হওয়ার চেষ্টা করেও অন্যদের আপত্তির মুখে বের হতে পারেননি। পরদিন ২৬ মার্চ সকালে উঠেই তিনি চলে যান ৫১ নম্বর শাঁখারীবাজারে তাদের ভাড়া বাসায়। সেখানে বড় ভাই রতন ঘোষালের মুখে শোনেন, আগের রাতে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা, রাজারবাগে অসংখ্য বাঙালি পুলিশ হত্যা করেছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের অভিযান চলছে। এ অবস্থায় তাকে বাসায় না থাকার পরামর্শ দেন তার বাবা যামিনী ঘোষাল। বাবা তাকে বলেন, 'মনোরঞ্জন, তুমি বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংস্থার সঙ্গে আছো। আওয়ামী লীগের মিটিংয়ে যাও; তোমার বিপদ বেশি। খুঁজে দেখো, কয়েক দিন নিরাপদ কোথাও থাকতে পারো কি-না।' দুপুরে খেয়ে বাবার কথামতো তিনি বাসা থেকে বের হন। চলে যান আরও কিছুটা গলিপথের ভেতরে ১১ নম্বর গোবিন্দলাল দত্ত লেনে তার বন্ধু কালীদাসের বাসায়। সেখান থেকে কালীদাসের ভাই শান্তিদাসসহ যান মতিঝিলে কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিল ও নিশাত জুট মিলের অফিসে। তখন সেটা পরিচিত ছিল গোলক চেম্বার হিসেবে। তারা এ স্থানটিই সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে বেছে নেন। এখানে চাকরি করত কালীদাস। সন্ধ্যার আগে সেখানে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই কালীদাসের পরিচিত ভবনের একজন নিরাপত্তারক্ষী জানান, পুরো শহরে কারফিউ জারি হয়েছে। পরের দিন ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল হলো। তখন তিনি আবারও শাঁখারীবাজারে তার বাসায় যান। বাসায় ঢোকার মুহূর্তেই তাদের প্রতিবেশী কলেজশিক্ষক নলিনী রঞ্জন রায় তাকে জানান, ২৬ মার্চ রাতে তার বড় ভাই রতন ঘোষালকে বাসার দরজার সামনেই পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। বাসায় ঢুকতেই দেখলেন, বাবা-মা-বৌদি বিলাপ করে কাঁদছেন। এ অবস্থার মধ্যেও তার বাবা হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, 'এখন ভাইয়ের জন্য শোক প্রকাশের সময় নেই। এই টাকা নিয়ে তুমি দ্রুত ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাও। তোমাকেও ওরা মেরে ফেলবে।' মনোরঞ্জন পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারও পথে নামলেন। 
এরপর মতিঝিলের গোলক চেম্বার, লক্ষ্মীবাজারে তার পরিচিত এডমন্ড রোজরিওর বাড়িতে এবং সর্বশেষ ৩১ মার্চ সকালে আশ্রয় নেন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। এখানে তার বন্ধু কালীদাস এবং তার পরিবারের সদস্যসহ সব মিলিয়ে ৩৩ জন আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুপুরের আগেই এখানে অভিযান চালায় পাকিস্তানি সেনারা। ৩৩ জনকে আটক করে হাত বেঁধে ফেলে। এখানে সেন্ট গ্রেগরির ফাদার পাকিস্তানিদের বলেন, এ জায়গাটি পবিত্র। এখানে গুলি বা হত্যা চালানো হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে নালিশ জানাবেন।
ফাদারের বক্তব্যের পর পাকিস্তানিরা ৩৩ জনকে নিয়ে আসে জগন্নাথ কলেজের ভেতরে। সারাদিন কিছুই খাননি কেউ। নারী-পুরুষ ভাগ করে দুটি কক্ষে, মাটিতে ফেলে রাখা হয় তাদের। এখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাখা হয় তাদের। সন্ধ্যার পর দুই কক্ষ থেকে বের করে তদের কিছুদূর হেঁটে নিয়ে এসে লাইনে দাঁড় করানো হয়। চোখ বেঁধে ফেলা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় গুলি। এরপর আর কিছুই মনে নেই মনোরঞ্জনের। 
স্মৃতি হাতড়ে সেই রাতের কথা মনে করেন। 'যখন প্রথম চেতনা ফিরে পেলাম, বুঝতে পারলাম শরীরের ওপর ভীষণ চাপ। পায়ের দিকে একটা গরম অনুভব। অন্ধকারেও বেশ বুঝতে পারি, আমার শরীরের ওপর আসলে পড়ে আছে একাধিক নিথর মানবদেহ। লাশের স্তূপের মধ্যে পড়ে আছি আমি। কোনোরকমে উঠে বসার চেষ্টা করি। দীর্ঘ চেষ্টা করে দাঁত দিয়ে হাতের দড়ি কাটলাম। এরপর চেখের বাঁধনও খুলে ফেলি। জমাট অন্ধকারে নিজের গায়ে চিমটি কেটে বুঝতে পারি, সত্যিই বেঁচে আছি। পায়ের কাছে রক্ত। সে মুহূর্তেই প্রথম বুঝলাম, রক্তের ছোঁয়া গরম লাগে।'
কিছুক্ষণ চুপ হয়ে যান মনোরঞ্জন। চোখ মোছেন। আবার শোনান তার জীবনের অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের গল্প। চোখ খোলার পর তিনি বুঝতে পারেন, বড় একটা গর্তের মধ্যে অন্য লাশের সঙ্গে তাকেও মৃত ভেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শুরু হয় গর্ত থেকে ওপরে ওঠার যুদ্ধ। গর্তের দেয়ালে হাত রেখে মাটিতে ভর দিয়ে বারবার উঠতে চেষ্টা করেন, আবার নিচে পড়ে যান। অবশেষে যখন ওপরে ওঠেন, তখন পাশের গির্জা থেকে ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসার শব্দ পান। রাতের জমাট আঁধার কিছুটা ধূসর হতে শুরু করেছে। কিছুতেই চোখ মেলতে পারছিলেন না, তারপরও যতটা চোখ মেলা যায় তাকিয়ে তিনি বুঝলেন, জগন্নাথ কলেজ থেকে সামনে কোর্ট বিল্ডিংয়ের বাগানের ভেতরে (বর্তমানে জজকোর্ট ভবন) রয়েছেন তিনি। সেই রাতে পাকিস্তানিদের ব্রাশফায়ারের ভেতর তিনি কীভাবে, কেমন করে বেঁচে গিয়েছিলেন- এখনও জানেন না মনোরঞ্জন। এখনও মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করেন, সেই রাতে বেঁচে থাকার রহস্য কী ছিল? অলৌকিক কিছু বাঁচিয়ে ছিল তাকে; কেন? 
সে রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার পর প্রথমে নরসিংদী পালিয়ে যান মনোরঞ্জন ঘোষাল। সেখান থেকে ময়মনসিংহের কলমাকান্দা, জামালপুর, নেত্রকোনা হয়ে ভারতের মেঘালয়ে প্রবেশ করেন। তার পর মেঘালয়ের স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কলকাতায় পৌঁছেন। এখানে প্রথমে কিছুদিন আকাশবাণীতে গান করার সুযোগ পান পরিচিতদের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ২৫ মে সম্প্রচারের শুরুর দিন থেকেই মনোরঞ্জন ঘোষাল সম্পৃক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে। 
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ের পর দেশে ফিরেই মনোরঞ্জনকে আরও একবার বেদনায় নীল হতে হয়। স্বাধীন মাতৃভূমিতে পা রেখেই খবর পান, প্রিয় ছোট ভাই মদন ঘোষালকেও হত্যা করেছে পাকিস্তানিরা। তিনি যশোরে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। সেখানেই তাকে হত্যা করে কপোতাক্ষ নদে ফেলে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। সেই মরদেহ আর পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে দুই ভাইকে হারানোর বেদনা নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন মৃত্যুঞ্জয়ী শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল। 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK