বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Saturday, 25 May, 2019 11:12:13 am
No icon No icon No icon

আত্মগোপনে রাজউকের সেই অভিযুক্তরা

//

আত্মগোপনে রাজউকের সেই অভিযুক্তরা


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: এফ আর টাওয়ারের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম পূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তারা শুধু এফ আর টাওয়ারের ক্ষেত্রেই নয়, রাজউকে কর্মরত থাকার সময় এ রকম নানা অনিয়ম করে সুবিধাভোগী হয়েছেন। অনেকে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি-গাড়ি রয়েছে তাদের। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মারাও গেছেন। কেউ অবসর নিয়েছেন। কেউ বদলি হয়ে গেছেন। এখন তাদের সন্ধান পাওয়াটাই দুঃসাধ্য। আর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও রাজউকে কর্মরত আছেন। গত বুধবার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পরই তারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজউকে গিয়ে কাউকেই তাদের দপ্তরে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করলে দেখা যায় ফোন বন্ধ অথবা ফোন বাজলেও ধরেন না। 
রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা থাকে অথরাইজড অফিসার, সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শকের। তদন্ত রিপোর্টে এফ আর টাওয়ারের অতিরিক্ত তলার অনুমোদনে মূল ভূমিকা ছিল তৎকালীন অথরাইজড অফিসার সৈয়দ নাজমুল হুদা, সহকারী অথরাইজড অফিসার বশির আহমেদ, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শক আওরঙ্গজেব সিদ্দিকী নান্নুর। ভবনটির তলা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ছিল আওরঙ্গজেব সিদ্দিকী নান্নুর। বর্তমানে তিনি রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার ও রাজউক শ্রমিক-কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে রাজউকে অভিযোগের অন্ত নেই। রাজউকের কর্মচারীদের সমবায় সমিতির কোটি কোটি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। তার নেতৃত্বে রাজউকের একটি বিশাল চক্র রয়েছে। ওই চক্র ক্ষতিগ্রস্ত প্লটের ফাইল গায়েব করে দেয়। কর্মকর্তাদের নামে এন্ট্রি করে ফাইল নিজের কাছে রাখেন। নকশা জালিয়াতির সঙ্গেও তিনি জড়িত। উত্তরার হোসেন নামের একজন ক্ষতিগ্রস্তের ফাইল গায়েব করে সেই প্লট চারজনের কাছে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ছয় বছর গুলশান এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে অনেক ভবনের তলার সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এই নান্নু। এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গত বেশ কয়েক বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাজউকে এসব অপকর্ম করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো, হ্যারিয়ারের মতো একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে তার। ইব্রাহিমপুরে বাড়িসহ উত্তরা ও চাঁদনী চকে তার অনেকগুলো দোকান রয়েছে। গতকাল রাজউকে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। দুটি ফোন নম্বরে ফোন করলে বন্ধ পাওয়া যায়। 
এফ আর টাওয়ারের তলা বৃদ্ধির অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত থাকা তৎকালীন অথরাইজড অফিসার নাজমুল হুদা পূর্ত বিভাগ থেকে রাজউকে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেছেন। এফ আর টাওয়ারের তলা বৃদ্ধির পরপরই পূর্ত বিভাগে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। তিনি মহাখালী জোনের দায়িত্ব পালনকালে এফ আর টাওয়ারের মতো আরও অনেক ভবনের তলার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুমতি দিয়েছেন। এ ছাড়া যেসব ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়েছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় জমি না ছাড়াসহ অনেক অনিয়ম করেছেন। এভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। 
তৎকালীন প্রধান ইমারত পরিদর্শক মাহবুব হোসেন সরকার বর্তমানে অথরাইজড অফিসার পদে আছেন। তার বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ আছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তার চাকরির সনদ জাল। 
এফ আর টাওয়ারের নির্মাণ তদারকির ক্ষেত্রে গাফিলতি থাকা ইমারত পরিদর্শক নজরুল ইসলামও নানা অপকর্ম করেছেন। এক সময় তদন্তে ধরা পড়ে তার শিক্ষাগত সনদও জাল। পরে রাজউক তাকে চাকরিচ্যুত করে। আরেকজন ইমারত পরিদর্শক ইলিয়াস মিয়াও এই চক্রের অংশ। এভাবে নকশা জালজালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। কিন্তু খুবই সাধারণভাবে চলাফেরা করেন তিনি। মিরপুরে দুটি, দক্ষিণখানে একটি ও উত্তরায় একটি বাড়ি রয়েছে। 
তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসা বর্তমানে সহকারী অথরাইজড অফিসার সুরোত আলী রাসেলও ওই চক্রের সদস্য। উপ-ইমারত পরিদর্শকের চাকরিতে ঢুকে দুই বছরে দুটি পদোন্নতি পেয়েছেন বড় অঙ্কের উপঢৌকন দিয়ে। উত্তরায় তার সাততলা বাড়ি রয়েছে। অবশ্য সুরোত আলী ফোনে সমকালকে বলেন, অনেকের নামই তো এসেছে। দেখি না কী হয়। 
এফ আর টাওয়ারের অবৈধ তলাগুলোর বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সহযোগিতা করা রাজউকের তৎকালীন সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) রেজাউল করিম তরফদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, ২০০৩-০৪ সালে বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্প এলাকায় ২৬৮টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। যার প্রায় অর্ধেক প্লটই বরাদ্দ হয় বাড্ডা এলাকার তৎকালীন কমিশনার এমএ কাইয়ুমের কথা মতো। এ কাজে বাড্ডার মনির, সিরাজসহ আরও কয়েকজনের নামে বেশ কয়েকটি প্লটের আমমোক্তারনামা করে দেন তিনি। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই তৎকালীন কমিশনার মির্জা খোকনের সঙ্গে যোগসাজশ করে তখন ব্যাপক ফায়দা লুটে নেন তিনি। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। ঋণ নিতে অপর সহায়তাকারী রাজউকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মুহাম্মদ শওকত আলীও বাড্ডার প্লট বরাদ্দের অনিয়মের সুবিধাভোগী। নোয়াখালী বাড়ি বলে তখন বিশেষ সুবিধা নিতেন। বর্তমানে তিনি এ মন্ত্রণালয়ের অধীন কোথাও আছেন বলে রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান। 
ঋণ-বন্ধক অনুমতির ক্ষেত্রে জড়িত থাকা আরেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মজিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, বিভিন্ন সময় রাজউক থেকে নথি গায়েব করার মূল হোতা ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে বিষয়টি ধরা পড়ার পর বর্তমানে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। এফ আর টাওয়ারের নথি সরানোর ক্ষেত্রে তদন্তে নাম আসা উচ্চমান সহকারী মুহাম্মদ আব্দুর রহমান রেকর্ড কিপারের দায়িত্ব পালন করেন। যে কোনো ফাইল সরানোর মূল সহযোগী হিসেবে রাজউকে তিনি পরিচিত। 
এফ আর টাওয়ারের ১৬ থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত অতিরিক্ত নকশা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত সাবেক সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ উল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, প্লট বরাদ্দ ও প্লট পরিবর্তনের দালালি করে তিনি এখন কোটিপতি। উত্তরায় তার বিলাসবহুল নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া কোটি কোটি টাকার মালিক তিনি। ১৯ থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত থাকা উচ্চমান সহকারী মো. সফিউল্লাহ এক সময় নিজেই জাল নকশার অনুমোদন দিতেন। বিষয়টি ধরা পড়ার পর রাজউক থেকে চাকরিচ্যুত হন। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলে দু'মাস আগে আদালত তার ১১ বছর কারাদণ্ড দেন। তৎকালীন বিষয় পরিদর্শক মো. মেহেদুজ্জামান বর্তমানে পূর্বাচলের সহকারী পরিচালক। স্টেট ইন্সপেক্টরের দায়িত্বও পালন করেন। এটা করতে গিয়ে ভবনের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরে মালিকদের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করেন। একই কাজ করেন পূর্বাচলের সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে থাকা শাহ মো. সদরুল আলম। গুলশান-বনানীর সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে নানা অজুহাতে ভবন মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক মোফাজ্জেল হোসেন প্লটের দলিল করে দেওয়ার ঠিকাদারির কাজ করেন। বরাদ্দপ্রাপ্তকে প্লটের দলিল করিয়ে দেওয়ার ঠিকাদারি নিয়ে প্লটপ্রতি পাঁচ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করেন। 
১৬ থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত বিদ্যমান আইনের পরিবর্তে পুরনো আইনে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির মত হলো, তৎকালীন চেয়ারম্যান হুমায়ুন খাদেম, অথরাইজড অফিসার সৈয়দ মকবুল আহম্মেদ ও সহকারী অথরাজইড অফিসার বদরুজ্জামান মিয়া দায় এড়াতে পারেন না। হুমায়ুন খাদেম কোথায় আছেন রাজউকে খোঁজ নিয়েও জানা যায়নি। মকবুল আহমেদ ও বদরুজ্জামান মিয়াও অনেক আগে অবসরে গেছেন। এ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে কম-বেশি নানা অভিযোগ রয়েছে। 
সূত্র: সমকাল।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK