demo
Times24.net
ধূপ-ধুনোর গন্ধ
Tuesday, 10 Sep 2019 19:06 pm
Times24.net

Times24.net


প্রবীর বিকাশ সরকার: ভেতর ঘর থেকে খয়েরিরঙা ভারী পর্দা সরিয়ে মিহির রায় চৌধুরী চেম্বারে প্রবেশ করেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। কে লোকটা চেয়ারে বসে আছে! কয়েক মুহূর্ত তার মুখে কোনো শব্দই এলো না।

তবে দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন, জামাইবাবু, আপনি! মানে মি.শোভনলাল রায় এত বছর পর হঠাৎ কী মনে করে চৌধুরী বাড়িতে পা রাখলেন?

চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন মিহির রায়। তার বয়স অর্ধ শতাব্দি অতিক্রম করেছে, মাথার চুল প্রায় সব সাদা। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো পাওয়ারফুল চশমা। শহরের জজ কোর্টের আইনজীবী।

তার কথায় কোনো বিকার না প্রদর্শন করে আগন্তুক শোভনলাল রায় গম্ভীর কিন্তু কিছুটা নাকিসুরে বললেন, আমাকে তাহলে চিনতে পেরেছ!

‘হাঃ’ শব্দ করে হাসলেন মিহির, প্রায় বিশ-বাইশ বছর পর দেখা। তবে না-চেনার কোনো কারণ নেই। আপনি আমার চেয়ে সাত বছরের বড় আর বড়দির চেয়ে চার বছরের বড়। খুব একটা বদলেছেন মনে হচ্ছে না, চুলের রং তো কালোই দেখছি, মুখের কোথাও ভাঁজ নেই। তরুণ বলাই সঙ্গত।

চিকিন হাসি দিলেন শোভনলাল রায়। একদা এই প্রাদেশিক শহরের ডাকাবুকো, অভিজাত রাজনৈতিক নেতা কাম ব্যারিস্টার। বনেদি রায় পরিবারের সন্তান। তার দাদাঠাকুর ছিলেন অবিভক্ত ভারতের জাঁদলের মন্ত্রী। মায়ের বাবা মানে দাদু ছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তি, পাটের ব্যবসায়ী। বর্তমানে শোভনলাল রাজধানীর সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত। মাঝে মাঝে সংবাদপত্রের শিরোনাম হন রাজনীতি বিষয়ে বিতর্কমূলক মন্তব্য বা ভাষ্যের জন্য। বললেন, যা বললে আর কি!

ড্রয়ার থেকে পাইপটি বের করে তামাক পুরে আগুন জ্বেলে ছোট্ট একটি টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, তা মি.রায়, কী মনে করে এই সন্ধ্যাবেলা, এই দীনের আস্তানায় আগমন, জানলে উপকৃত হতাম। কী সেবা করতে পারি আপনার?

কোনো প্রকার ভূমিকা না করেই চকচকে নীল কালো রঙের কোট-শুট-লাল টাইপরা শোভনলাল বললেন, আমি সেবা নিতে আসিনি। অনেক ধন্যবাদ। এসেছি মহুয়াকে, আই মিন মাই ওয়াইফ মহুয়াকে নিয়ে যেতে এসেছি। আর..........

আবারও পাইপে ছোট্ট টান দিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে মিহির রায় বললেন, তা বেশ তো। সে তো আনন্দের কথা। কিন্তু আপনি কি জানেন বড়দি কোথায় আছে? বা আদৌ বেঁচে আছে কি না? এত বছর হয়ে গেল একবারও তো খোঁজ নেবার সামান্য প্রয়োজনটুকু মনে করেননি! আর নেবার প্রয়োজনই বা কী! অসতী, বেশ্যা, বারমেশে মাগী বলে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন! মিথ্যে অপবাদ আর আসমুদ্র অপমান নিয়ে কি কোনো নারী বেঁেচ থাকতে এতগুলো বছর? আচ্ছা, আর কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেলেন! সেটা কী?

--‘আর বলতে চাই, আমি মহুয়াকেই শুধু নয়, তোমাদের সবাইকে অযথা অপমান করেছি। আমি পাপ করেছি! মহাপাপ! আমি পাপী! আমাকে তোমরা ক্ষমা করো!’ বলেই মাথা নত করে রাখলেন শোভনলাল।

কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে গেল। মিহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কিন্তু বড়দি তো এখানো থাকে না। হাসপাতালে। আজ বছর পাঁচ ধরে। খুবই দূরারোগ্য অসুখে ভুগছে। সমস্ত খরচ আমাকেই চালিয়ে নিতে হচ্ছে। তাও যদি সুস্থতার লক্ষণ দেখা দিত তাহলে কোনো দুঃখ থাকত না।

মিহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে শোভনলাল অশ্রুসজল চোখে বললেন, আমি জানি। সব জানতে পেরেছি। মহুয়া দূরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগছে। বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমি তাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

ভীষণ চমকে উঠলেন শোভনলালের কথা শুনে মিহির, বলেন কী! আপনি জানেন! আপনি সব জানেন! অথচ এতগুলো বছর পর এলেন? অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। তাহলে কি হাসপাতালের ঠিকানা জানতে চান?

মিহিরকে আবারও চমকে দিয়ে শোভনলাল বললেন, না। ঠিকানা আমার জানা আছে। গতকাল আমি গিয়েছিলাম হাসপাতালে, দেখে এসেছি। ঘুমিয়েছিল। জাগাইনি। কথাও বলিনি। আমি, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। গত দিন পাঁচেক আগে আমি গাড়ি চালাতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ি। যদিও শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়নি গাড়িতে এয়ার ব্যাগ থাকার কারণে, কিন্তু কেন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম জানি না! জ্ঞান ফিরতেই আমি সবকিছু বুঝতে পারলাম। সব ভুল। সব মিথ্যে। আমার, আমার বন্ধু আশীষ মিত্র আমাকে ভুল তথ্য দিয়েছিল মহুয়া সম্পর্কে। মহুয়ার সঙ্গে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষক লেকচারার বিকিরণ বিশ্বাসের কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না, মানে দৈহিক সম্পর্ক ছিল না। তারা পরস্পর খুব ভালো বন্ধু। আশীষ ব্ল্যাক মেইল করেছে আমাকে, প্রচুর টাকা নিয়েছে।

মিহির অবাক দৃষ্টিতে শোভনলালের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কণ্ঠ নরম করে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু বড়দি কি আপনার সঙ্গে যেতে রাজি হবে এত বছর পরে?.....বড়দি শৈশব থেকে শিশুদের খুব ভালোবাসে। মেজদি এবং আমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। একটি সন্তানের জন্য বড়দির আকূল হাহাকার বাবা-মাসহ আমাদের সবাইকে কী যে কষ্ট দিয়েছে তা ব্যাখ্যা করার শক্তি আমার নেই! ক্যান্সার ধরা পড়া পর্যন্ত আমার ছোট ছেলে মৃন্ময়কে নিজের ছেলে বলে ডাকত। বুকে নিয়ে ঘুমুতো। বৃক্ষের যেমন ফল, তেমনি নারীর গর্ভজাত সন্তান--সেখানেই তাদের সমস্ত তৃপ্তি। ক্ষণজন্মা মানুষের শেষজীবনে সন্তানই হয়ে ওঠে সকল আরাধনা, আনন্দ আর পরম সুখের বাহন। বড়দি সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে--বঞ্চিত করেছেন অহেতুক আপনি! আমি একজন আইনজীবী, আপনি আরও বড় আইনজীবী--আপনিই বলুন এই অপরাধের শাস্তি কী হওয়া উচিত? বাবা-মা বড়দির চিন্তা করে করে বড় অসময়ে চলে গেল আমাদের সামনেই।

কথাগুলো একনাগারে বলে থামলেন মিহির। কিছুক্ষণ নীরবতায় ঝুম ধরে রইল ঘরের আবহ। শোভনলাল মাথা নিচু করে বসে রইলেন। মিহির শব্দ করে আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। পাইপের আগুন নিভে গিয়েছে কখন। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, বেশ। তাই হোক। আমাদের কোনো আপত্তি নেই, যদি বড়দি যেতে চায়।

এবার মুখ তুললেন শোভনলাল। চোখ দুটো ইতিমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে। কাঁদছিলেন তিনি নিঃশব্দে। ভেজা নাকিসুরে বললেন, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। আমি জানি, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের জন্য, পাপের জন্য আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। মহুয়া বড় কষ্ট পাচ্ছে। আমার সঙ্গে নিয়ে যাব তাকে। আচ্ছা, এক গ্লাস জল দিতে পার? গলাটা শুকিয়ে গেছে। কেন যেন সারা শরীরে আগুন জ্বলছে মনে হচ্ছে! ভীষণ তপ্ত হয়ে উঠছে শরীরটা!

মিহির অপরাধ হয়ে গেছে এমন কণ্ঠে বললেন, ও হো হো সরি। চায়ের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি এক্ষুণি ভেতর থেকে আসছি। আপনি বসুন। যদিও শীতকাল তিনি ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন।

রান্নাঘরেই ছিল সাবিত্রী রায় চৌধুরী, মিহিরের স্ত্রী। বললেন, ওগো শুনছ! সাংঘাতিক ব্যাপার!
চমকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, কী সাংঘাতিক ব্যাপার? মন্দিরে গিয়েছিলে নাকি! কিছু হয়েছে বুঝি?
মিহির অবাক হয়ে বললেন, মন্দিরে! কেন? মন্দিরে যাইনি তো!
সাবিত্রী রায় বললেন, না গেলে তোমার শরীরে ধূপ-ধুনোর মিষ্টি গন্ধ কেন?
আকাশ থেকে পড়লেন মিহির, কোথায় ধূপ-ধুনোর গন্ধ পেলে? আমি তো পাচ্ছি না!
--‘আচ্ছা। আচ্ছা হলো! বলো এবার কী সাংঘাতিক ব্যাপার?
--‘আরে জামাইবাবু এসেছেন! ওই তো চেম্বারে বসে আছেন।
সাবিত্রী রায়ও এবার আবাশ থেকে পড়লেন! বললেন, তাই নাকি! বলো কী! এত বছর পরে! কই কই চলো দেখি!

মিহির রায় ও তার স্ত্রী দুজনে ত্রস্ত পায়ে চেম্বারে এসে দেখেন, কেউ নেই। জামাইবাবু তথা শোভনলাল রায় চলে গেছেন। দুজনেই বিস্মিত হয়ে নিঃশব্দে একে-অপরের মুখ দেখতে লাগলেন।

তাদের জন্য আরও বিস্ময়কর সংবাদ অপেক্ষা করছিল। এই ঘটনার ঘণ্টাখানেক পরেই হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। প্রবীণ ডাক্তার রতন কুমার সাহা বললেন, মিহির, ভেরি সেড। মহুয়া ইজ নো মোর। শি হেড লেফট আস জাস্ট ফিউ মিনিটস এগো ইন স্লিপিং। আমি অ্যাম সো সরি মাই ডিয়ার।

মিহির কোনো কথা বলতে পারলেন না, স্তব্ধ হয়ে গেলেন। শুধু অস্পষ্ট স্বরে বললেন, দ্যাটস ওকে ডাক্তার কাকা। উই আর গোয়িং সুন। স্ত্রীকে বললেন, জামাইবাবু কি হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছেছেন? বড়দির সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে কি? বুঝতে পারছি না। চলো চলো তাড়াতাড়ি। পদ্মা, মৃন্ময়কে ডাকো। মেজদিকে একটা ফোন করে দাও। তৈরি হও তাড়াতাড়ি!

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন মিহির।

চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই হাসপাতালে এসে পৌঁছলেন মিহির তার পরিবার নিয়ে। ধীরে পায়ে ডাক্তার সাহা তাদেরকে কেবিনে নিয়ে গেলেন। সাবিত্রী, তার দুই ছেলেমেয়ে নীরবে কেঁদেই চলেছে দুঃসংবাদ পাওয়ার পরপরই। মিহির দেখলেন, প্রাণপ্রিয় বড়দির ফর্সা মুখ যেন আরও ফর্সা হয়ে গেছে। বয়স কমে গেছে! কী কমনীয় সুন্দরই না লাগছে! মাথার চুল তো নেইই--মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। মুখে নেই কোনো ব্যথাবেদনা বা যন্ত্রণার কালো ছাপ! তার বুকের উপর একটি ফুলের তোড়া কিন্তু ফুলগুলো মলিন। ডানপাশে মাথার কাছে গোলাপ ফুলের বড় একটি মালা। ফুলের তোড়া আর মালার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একজন মধ্যবয়সী নার্স এগিয়ে এসে বললেন, মি.রায়, গতকাল মহুয়াদি খুব হাসিখুশি ছিলেন। একটা গোলাপ ফুলের মালা এনে দিতে অনুরোধ করলেন। তাই ওটা আনা হয়েছে। আর গতকালকেই সন্ধেবেলা একজন ভদ্রলোক এসেছিলেন মহুয়াদিকে দেখতে। এই ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ ছিলেন এবং কথা বলেছেন।

মরদেহ নিয়ে যখন গাড়ি হাসপাতাল থেকে বের হবে এমন সময় বারান্দায় রাখা বড় টিভিতে বিশেষ সংবাদে একজন পুরুষের ছবিসহ সংবাদ পাঠিকা বলতে লাগলেন, আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, প্রাক্তন রাজনীতিবিদ ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার শোভনলাল রায় কিছুক্ষণ আগে রাজধানীর এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত দিন পাঁচেক আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

ছবিটি দেখেই মিহিরের মাথা ঘুরে উঠল সহসা। মনে হল পৃথিবীটা দুলছে।