demo
Times24.net
ঢাকাইয়া এবং কলকাত্তাইয়াদের শ্রেণিগত চরিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা-(২)
Thursday, 22 Aug 2019 00:28 am
Times24.net

Times24.net


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: (খ) শ্রেণি সচেতন সংঘবদ্ধ কলকাত্তাইয়া বর্ণ হিন্দু সমাজঃ কলকাতা মহানগরীর কলকাত্তাইয়াদের মূল অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে এবং ঐতিহাসিকভাবে বর্ণ হিন্দু, উচ্চশিক্ষিত, চাকরীজীবী এবং পেশাজীবী শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। তারা শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি অনুরাগী। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিক থেকে কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়ায়, কলকাতাস্থ দক্ষিণবঙ্গের বর্ণ হিন্দুরা  ইংরেজি ভাষা ও শিক্ষা গ্রহন করায়, ব্রিটিশ প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতাতে প্রথম স্থাপিত হওয়ায় স্থানীয় বর্ণ হিন্দুরা আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও জ্ঞান নেবার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছে। এতে তাদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ইংরেজি শিক্ষিত বর্ণ হিন্দুরা একচ্ছত্রভাবে নিম্ন পদস্থ সরকারী চাকরী পদগুলোতে ঢুকার অবাধ সুযোগ লাভ করে। ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযোগী, কেরাণী, বেনিয়া ব্যবসায়ীদের দালাল, জমিদারী, মহাজনী ব্যবসার মাধ্যমে তারা নব্য ধনীক শ্রেণিতে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে কলকাতার এই শিক্ষিত ঢনাঢ্য পুজিপতি অভিজাত বর্ণ হিন্দুরা দলে দলে পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নিলামী জমিদারী কিনে নতুন জমিদার শ্রেণিতে পরিণত হয় এবং তাদের  হাত ধরেই বণেদী বাড়ীর পূজা হিসাবে দূর্গাপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটে কলকাতা নগরীতে। এই দূর্গাপূজাকে উপলক্ষ্য করে তারা নিজেদের বিলাসীতা, আভিজাত্য প্রদর্শন করার এবং ব্রিটিশ রাজকীয় কর্মকর্তাদের দাওয়াত, আপ্যায়ন করে তাদের সাথে সুসম্পর্ক করার ব্যবস্থা করেন। 

কলকাতার পুজিপতি জমিদার, মহাজন, শিক্ষিত চাকরীজীবীরা মহাজনী ব্যবসা, জমিদারী চাকরী, বিভিন্ন সরকারী চাকরী পদ, পোস্টিং সূত্রে পূর্ববাংলায় গমন করে এখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলে এবং বংশ পরস্পরায় বসবাস করতে শুরু করে। এভাবে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে আগত বহিরাগত এই শিক্ষিত, ঢনাঢ্য অভিজাত ও চাকরীজীবী বর্ণ হিন্দুরা পূর্ববাংলার সমাজজীবনে প্রথম শিক্ষিত নগরভিত্তিক অভিজাত এবং মধ্যবিত্ত সমাজের পত্তন ঘটায়। আর ব্রিটিশদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হবার, প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায়, আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, কাব্য-সংগীত, গবেষনা, চিন্তাচেতনায় অগ্রসর থাকায়, জমিদার ও মহাজনী ব্যবসা, সরকারী চাকরী, পেশাগত প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রসর, প্রতিষ্ঠিত থাকার ফলে, আর্থ-সামাজিকভাবে ঢনাঢ্য ও প্রভাবশালী হওয়ায় কলকাতার বর্ণ হিন্দুরা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সিপাহী বিপ্লবকালে তৎকালীণ ব্রিটিশ প্রশাসনের সমান্তরাল/সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয় এবং একই সাথে কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করে। 

জমিদার, তালুকদার, মহাজন, সমাজ সংস্কারক, পার্লামেন্ট মেম্বার অভিজাতরা ছাড়া সরকারী চাকরীজীবী কেরাণী, দাড়োগা, কালেক্টর, ম্যাজিস্টেট, জেলার, ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, উকিল, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, কবি/ছড়াকার, লেখক/গল্পকার, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশক, নাট্যকার, গায়ক, অভিনয় শিল্পী, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী, পুরোহিত, দোকানদার, ক্ষুদ্র দোকানদার ও ব্যবসায়ী সবাই ছিল এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্গত। তারা নিজেদের বাবু/ভদ্রলোক বলে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করত এবং তাদের মাধ্যমেই কলকাতায় বাবু কালচারের জন্ম-বিকাশ ঘটে। তারা ছিলেন ইংরেজি শিক্ষিত, সংবাদপত্রের পাঠক, সাহিত্য-সংগীত-নাটক-সংস্কৃতি অনুরাগী। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার প্রতিটি পাড়া/মহল্লায় নিজস্ব ক্লাব, খেলার মাঠ ও পাঠাগার গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে এই বাবু মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেই কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে ভাষা ও শিক্ষা, ধর্ম ও সমাজ সংস্কার, শিল্প, কাব্য-সাহিত্য, বিজ্ঞান, গবেষনা, নাটক, সংগীত, নৃত্যকলা, জমিদারী ও মহাজনী ব্যবসা, রাজনীতি, বিভিন্ন সরকারী পদে চাকরি এবং আইনজীবী, ডাক্তারী, সাংবাদিকতা, শিক্ষাকতা, বিপ্লবী, পেশাগত প্রতিটি ক্ষেত্রে কলকাতার বর্ণ হিন্দু শ্রেণির অভূতপূর্ব অগ্রগতি, উন্নতি, প্রতিষ্ঠার সময়কালকে কলকাতাকেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবীরা বাংলার রেনেসা/নবজাগড়ণ বলে অভিহিত করেছে। রেনেসার প্রথম শর্ত রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, দ্বিতীয় শর্ত দেশাত্নবোধ, তৃতীয় শর্ত জাতীয় ঐক্য। অথচ এর একটিও তাদের কথিত রেনেসার মধ্যে উপস্থিত ছিল না। কারণ প্রথমত তখন অখন্ড ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্য নামে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীদের ঔপনিবেশিক শৃংখলে পরাধীন ছিল। দ্বিতীয়ত এই রেনেসার প্রবক্তা ও সুবিধাবাদীরা ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর সেবাদাস ও অনুগত। তৃতীয়ত পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা, কৃষক, চাষীদের নির্যাতন ও শোষন করেই পূর্ববাংলার হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং কলকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের ভাগ্য গড়ে তুলেছিল। তাই ১৮ শতকের শেষভাগ এবং ১৯ শতকের প্রথমভাগে কলকাতা অঞ্চলের এই অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বর্ণ হিন্দুদের কথিত রেনেসার সাথে অনগ্রসর পূর্ববাংলা ও ঢাকার অভিজাত ও সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানদের কোনপ্রকার সংযোগ ছিল না। 

কলকাতার বর্ণ হিন্দুরা চরিত্র‍গতভাবে শ্রেণি স্বার্থ সচেতন, সংঘবদ্ধ, পূর্ববাংলা ও মুসলিম স্বার্থ বিরোধী ছিল। কংগ্রেস, অনুশীলনী সমিতি, স্বরাজ দল, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভার নেতা-কর্মী, সমর্থক ছিল। ঢাকাসহ পূর্ববাংলার মানুষ তাদের গুরুত্বপূর্ণ সব ধরনের সরকারী ও জমিদারী প্রশাসনিক কাজ, চাকরী, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, মামলা-মোকদ্দমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প পণ্য, পেশাভিত্তিক কাজের জন্য রাজধানী কলকাতা এবং কলকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর কার্যত নির্ভরশীল ছিল। শিল্পোন্নত কলকাতার শিল্প-কারখানার উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামালের যোগানভূমি, যোগানদাতা ছিল সর্বক্ষেত্রে অনগ্রসর, অনুন্নত, স্বস্তা শ্রমবাজার পূর্ববাংলা এবং তার রায়ত প্রজা কৃষক, বর্গাচাষী, শ্রমিক, মজুররা। এজন্য কলকাতার বর্ণ হিন্দু সরকারী কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি পূর্ববাংলাকে সর্বক্ষেত্রে উন্নত অগ্রসরমান কলকাতা অঞ্চলের হিন্টারল্যান্ড/পশ্চাৎভূমি এবং কাঁচামালের যোগানভূমি হিসাবে বিবেচনা করত/বলত। তারা ব্যঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মক্কা ও ফক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলত। কলকাতার বাবুরা অনুন্নত, অনগ্রসর পূর্ববাংলার মানুষকে বাঙাল বলত মূলত অশিক্ষিত গেয়ো/চাষা অর্থে বোঝাতে। এজন্য তারা পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গ করে বলত, তোমাদের আবার কালচার কি? তোমাদের তো একটাই কালচার আর তা হল এগ্রিকালচার। এরফলে ঢাকাইয়ারাও পাল্টা কলকাতার বাবুদের উদ্দেশ্য করে ঘটি বলে ব্যঙ্গ করত(কারণ তারা বর্ণবাদ, জাতভেদ, সূচি বায়ূতার কারণে বিভিন্ন প্রকার মাটির ঘটিতে জল, চা, দুধ পান করত)। 

কলকাতার বর্ণ হিন্দুরা আগে ভারতীয় তারপর বাঙালী। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের অবদান ও আত্নত্যাগ সর্বাধিক। তারা যতটা না ধার্মিক তার চেয়ে বেশি নিজ শ্রেণি স্বার্থ সংরক্ষক। ব্রিটিশ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তি ও দাবীতে কলকাতার বর্ণ হিন্দু অভিজাত, বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবীরা হিন্দু ধর্মের নামে ধর্মাশ্রিত দেশাত্নবোধ, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং অখন্ড হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথা প্রচার করেছিল। একইভাবে ধর্মানুভূতির ছত্রছায়ায় নিজেদের জমিদারী, ব্যবসায়ী, পেশাগত শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার জন্যই পূর্ববাংলার কলকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী বিপ্লব গড়ে তুলেছিল। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববাংলার অনগ্রসর ও দরিদ্র মুসলমানরা কার্যত লাভবান হবে এই যুক্তিতেই কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে না দিতে ব্যাপক তদবির, প্রচারণা চালিয়েছিল। অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি, উচ্চশিক্ষা এবং সরকারী চাকরীক্ষেত্রে কলকাতার বাবুদের একচ্ছত্র আধিপত্য অক্ষুন্ন রাখতেই তারা কখনো স্বরাজ দলের নেতা চিত্তরঞ্জন দাস-মুসলমানদের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বেঙ্গল প্যাক্ট/বাংলা চুক্তিকে কার্যকর করতে দেয়নি এবং মি.দাসের মৃত্যুর পর তা বাতিল করেছে।
একইভাবে তারা ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসুর নেতৃত্বাধীন উদারপন্থী বাঙালী জাতীয়তাবাদী হিন্দু-মুসলিম নেতাদের স্বাধীন যুক্তবাংলা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যেগ ও পরিকল্পনাকে প্রত্যাখান করেছে। জিন্নাহ-সোহরাওয়ার্দীর চক্রান্ত এবং মুসলিমলীগের ডাকা ডাইরেক্ট একশান ডে/প্রত্যক্ষ দিবসকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভার সমর্থনে বর্ণ হিন্দু-শিখরা কলকাতায় ব্যাপক মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত করে। এরফলে ভারত-পাকিস্তানের বাইরে তৃতীয় রাষ্ট্র হিসাবে বাঙালী জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে স্বাধীন যুক্তবাংলা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পথ ও সুযোগ নস্যাৎ হয়ে যায়, যুক্তবাংলা প্রদেশ বিভাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত যুক্তবাংলা প্রদেশ বিভাগ প্রশ্নে গণভোট দেয়। বাঙালী হিন্দু নেতারা যুক্তবাংলা প্রদেশ বিভাগ ও ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে এবং মুসলিম নেতারা যুক্তবাংলা প্রদেশ অক্ষুন্ন রাখার ও যুক্তপাকিস্তান প্রজাতন্ত্রে যোগদানের পক্ষে ভোট দেয়। এরফলে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল থেকে গঠিত যুক্তবাংলা অঞ্চলটি সুদীর্ঘ প্রায় আটশত বছর পর দ্বিখন্ডিত হয়ে পূশ্চিমাঞ্চলে হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং পূর্বাঞ্চলে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা প্রদেশ গঠিত হয়। যা যথাক্রমে সংযুক্ত ভারত ও পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রে যোগদান করে।

ঢাকাসহ পূর্ববাংলার বর্ণ হিন্দুরা ছিল কার্যত কলকাতার বর্ণ হিন্দুদের সম্প্রসারিত বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়। তাই ঐতিহাসিকভাবে কলকাতা মহানগরী এবং সেখানকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাথে পূর্ববাংলার বর্ণ হিন্দুদের অভিন্ন আঞ্চলিক বর্ণগত বন্ধন, পরিচয় ও শ্রেণি স্বার্থের কারণে গভীর আত্নিক, ধর্মীয়, বৈবাহিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক স্বার্থ, চিন্তাচেতনা, আদর্শগত সম্পর্ক ছিল। ব্রিটিশ যুগে পূর্ববাংলার অধিকাংশ হিন্দু জমিদার ছিল কলকাতা প্রবাসী। তারা নায়েব-গোমস্তাদের মাধ্যমে পূর্ববাংলায় জমিদারী কারবার চালালেও উন্নত নাগরিক জীবন, সুযোগ-সুবিধা, আনন্দ-বিনোদনের জন্য রাজধানী কলকাতায় নিজস্ব প্রাসাদ/বাড়িতে পরিবার সমেত থাকত। কলকাতার বর্ণ হিন্দুদের মত পূর্ববাংলার বর্ণ হিন্দুরাও কংগ্রেস, অনুশীলনী সমিতি, যুগান্তর, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি দলের নেতাকর্মী এবং অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা, ভারতীয় ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিল। কলকাতার বর্ণ হিন্দুদের সাথে তারাও বঙ্গভঙ্গ, পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন যুক্তবাংলা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যেগের বিরোধীতা করেছিল, যুক্তবাংলা বিভাগ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল এবং তারা স্বেচ্ছায় জন্মভূমি পূর্ববাংলা ত্যাগ করে কলকাতা-পশ্চিমবঙ্গ, আগরতলা-ত্রিপুরা, গোহাট্টি-আসামে গমন করেছিল। 

শ্রেণি সচেতনতার জন্য কলকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সারা ভারত ও উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সংঘবদ্ধ শ্রেণি স্বার্থ সচেতন সমাজ বলা হয়। কলকাতাকে ভারতের বুদ্ধিজীবীদের রাজধানী এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে অভিহিত করা হয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই কলকাত্তাইয়া বর্ণ হিন্দুরা সরকারী চাকরীজীবী, পেশাজীবী নগরজীবী সম্প্রদায় হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত, বিদ্যা উৎসাহী, সাহিত্য-সংগীত-নাট্য-সংস্কৃতিমনা, উদার আধুনিক ছিলেন।  স্বাভাবিকভাবে তারা নিজেদের সন্তানদেরও ইংরেজি শিক্ষিত করার জন্য, সরকারী চাকরীতে  ঢুকাবার জন্য, পেশাগত ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য, ক্যারিয়ার গড়ে দিবার জন্য, সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা, আধুনিক সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের এইসব সচেতনতা, উৎসাহের জন্য তাদের সন্তানরাও ছোট থেকে বড়/প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে/শিক্ষার্থী সবাই নিজ নিজ পড়ালেখা, ক্যারিয়ার/জীবনে সাফল্য, উন্নতি এবং প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে উন্নতি, উৎকর্ষতা অর্জন করেছে।(ছবিটি হেমেন্দ্র মোহনের তোলা ১৯০৫-৬ সালের দিকে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময়কার এক জনসভার।) ২য় পর্বে সমাপ্ত। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। 

[email protected]