demo
Times24.net
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, তবে রায় দেখে যেতে চাই
Wednesday, 21 Aug 2019 10:55 am
Times24.net

Times24.net

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: ‘এ জীবনে আর কিছু চাই না। একটাই চাওয়া- খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি। শরীরে বিদ্ধ হওয়া ১৫শ’র বেশি স্পি­ন্টারের যন্ত্রণা যে কী ভয়াবহ তা বলে বোঝানো যাবে না।তবে স্পি­ন্টারের যন্ত্রণার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে বিচার সম্পন্ন না হওয়া। মৃত্যুর আগে অন্তত বিচারটা দেখে যেতে চাই। রায় কার্যকর হওয়ার খবর শুনে মরতে পারলে অন্তত আত্মাটা শান্তি পেত’- কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত নাসিমা ফেরদৌসী। নাসিমার মতো অনেকেই এখন পঙ্গু জীবন-যাপন করছেন। তারা বলেছেন, সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্পি­ন্টারের জায়গাগুলোতে চুলকায়, সুঁইয়ের মতো হুল ফোটায়। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে ব্যথাটা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। ব্যথার যন্ত্রণা বেশি হলে হাসপাতালে ছুটতে হয়। এই যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা সেই মানুষগুলোর অনেকের শরীরে এরই মধ্যে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার।
মৃত্যু যন্ত্রণার মধ্যেও আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মীরা সবাই বিচার শেষে রায় কার্যকরের প্রতিক্ষায়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে ২১ আগস্টের সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আহতদের জবানিতে ওঠে আসা সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি কথন যুগান্তর পাঠকের জন্য তুলে ধরা হল-
নাসিমা ফেরদৌসী : স্পি­ন্টারের যন্ত্রণা নিয়েই কথা বলেন সাবেক এমপি নাসিমা ফেরদৌসী। যুগান্তরকে তিনি বলছেন, ঘুমোতে গেলেই দম আটকে আসে। শরীরজুড়েই অসহ্য যন্ত্রণা। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ দেখি তখন ক্ষণিকের জন্য সব যন্ত্রণা ভুলে যাই। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের যারা হত্যা করেছে তাদের দিয়েই খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক জিয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে মারতে চেয়েছিল। বর্বর সেই হত্যাকাণ্ডের রায় হলেও তা কার্যকর হয়নি আজও। তিনি তারেক জিয়ার ফাঁসি এবং খালেদা জিয়াকে এ মামলায় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।

মাহবুবা পারভীন : হামলার পর মাহবুবা পারভীনকে মৃত ভেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অন্য লাশের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। সোমবার কথা হয় তার সঙ্গে। কুশল জানতে চাইলে বলেন, এখনও বেঁচে আছি। তবে একে বেঁচে থাকা বলে না। শরীরে প্রায় ২ হাজার স্পি­ন্টার রয়ে গেছে। শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে মনের যন্ত্রণা বেশি কাঁদাচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে বলেন, এখনও বিচার কাজ শেষ হয়নি। খুনিদের ফাঁসি হয়েছে এমনটা দেখে মরতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা ছাড়া এতদিন বেঁচে থাকতাম না স্বীকার করে বলেন, আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বললেন, সম্প্রতি আমাকে একটি ফ্ল্যাট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর কিছুই চাই না, চাই শুধু বিচার। শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে জানিয়ে বললেন, খুনিদের ফাঁসি হয়েছে তা দেখে মরতে চাই।

রাশেদা আক্তার রুমা : শরীরে ১৬-১৭শ’ স্পি­ন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন রুমা। তার শরীরেও ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা যে ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ওই ট্রাকের পেছনেই ছিলাম আমি। সারা শরীরে স্পি­ন্টার বিদ্ধ হওয়া ছাড়াও আমার ১৮টি দাঁত পড়ে যায় হামলায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্থিক সহযোগিতায় চিকিৎসা করছি। ওই বর্বর হত্যাকাণ্ডের খুনিরা আজও বেঁচে আছে, এমনটা ভাবতেই যন্ত্রণা বেড়ে যায়। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ খুনিরা তাকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। তারেক জিয়াকে দেশে এনে সাজা কার্যকরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, রায় দ্রুত কার্যকর করা না হলে তারা দেশবিরোধী চক্রান্ত করেই যাবে।

আসমা জেরিন ঝুমু : কোমর আর পায়ের ব্যথায় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন ঝুমু। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে সেদিনের সেই ভয়াল দৃশ্য। বললেন, খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের নির্দেশেই ওই বর্বর গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। তারেক রহমানের ফাঁসি দাবি করে তিনি বলেন, তারা চেয়েছিল শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের শেষ করে দিতে। ওই দিন সমাবেশস্থলে আইভী রহমানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যখন একের পর গ্রেনেড পড়ছিল তখন বিকট শব্দে চার পাশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সারা শরীরে অসংখ্য স্পি­ন্টার বিদ্ধ হয়। আইভী রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হলেও আমরা বেঁচে আছি যন্ত্রণা নিয়ে। রায় যত দ্রুত কার্যকর হবে ততোই ভালো। খুনিরা বেঁচে থাকলে আমাদের বেঁচে থাকার মূল্য নেই।

ডা. লুৎফুননেছা সোনালী : সারা শরীরে স্পি­ন্টার বিদ্ধ ডা. সোনালীর শরীরেও বাসা বেঁধেছে ক্যান্সার। বলেন, মাথায় শতাধিক স্পি­ন্টার নিয়ে বেঁচে আছি। স্পি­ন্টারের যন্ত্রণায় প্রায়ই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় চিকিৎসা চলছে। হামলার পর ২৭ দিন জ্ঞান ছিল না। প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য আমাকে ভারতের পিয়ারলেস হাসপাতালে পাঠান। দেড় মাস চিকিৎসা শেষে ডাক্তারা বলছিলেন ডান হাত ও পা কেটে ফেলতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরোধিতায় আমার হাত ও পা রক্ষা পায়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনালী। বললেন, শেখ হাসিনা আছেন বলেই বেঁচে আছি। তবে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

অঞ্জলী সরকার : আওয়ামী লীগের মিছিল সমাবেশ হলেই হাজির হতাম- উল্লেখ করে বলেন, ওই ভয়াল হামলার পর এখনও শরীরে অসংখ্য স্পি­ন্টার রয়ে গেছে। গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে, এতেই খুশি হতে পারছি না। রায় কার্যকর দেখতে চাই। দ্রুত তারেক জিয়াকে দেশে এনে রায় কার্যকর করা হোক।

সাহিদা তারেক দীপ্তি : গ্রেনেড হামলায় শরীরে বিদ্ধ অসংখ্য স্পি­ন্টারের যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে দীপ্তি বলেন, স্বস্তি পাচ্ছি না কিছুতেই। স্পি­ন্টার নিয়েই দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাচ্ছি। তবে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত হলে শান্তি পাব, অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারব। সেই বর্বরতার কথা ভুলে থাকা যায় না। আগুন, ধোঁয়া দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠি। মাথায় স্পি­ন্টার থাকায় প্রচণ্ড ব্যথা হয় এখনও। চিকিৎসা চলছে। বিএনপি খুনির দল উল্লেখ করে বলেন, এ দলটি দেশের উন্নয়ন চায় না, তারা ধ্বংস চায়। সস্ত্রাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে আমি বিএনপিকে নিষিদ্ধ করার দাবি করছি।

সোমবার সকালে রফিকুল ইসলাম ওরফে ‘আদা চাচার’ বাসায় গিয়ে কথা হয় তারই ছেলে মাজাহারুল ইসলাম ওরফে ‘আদা মামুনের’ সঙ্গে। ‘আদা চাচা’ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি ছিলেন ‘পাগল’। প্রতি মাসে ৫-৭ কেজি আদা কিনে বিশেষ পদ্ধতিতে ঝাঁঝ কমিয়ে টুকরো বানিয়ে দলের সভা সমাবেশে বিলি করতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাকর্মীরা তাকে ‘আদা চাচা’ বলেই ডাকতেন।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো আদা নিয়ে জনসভাস্থলে মঞ্চের পাশেই ছিলেন বাবা। বাবা কোনো দিন দলের নেতাকর্মীদের কাছে কিছু চাননি, আমরাও না। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই আমাদের সহযোগিতা করছেন। গত বছরের ৬ মার্চ আমাদের ভাই-বোনদের ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি আমাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন, আর্থিক সহযোগিতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই আমরা আমাদের খিলগাঁওয়ের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি।