demo
Times24.net
ঢাকাইয়া এবং কলকাত্তাইয়াদের শ্রেণিগত চরিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা-(১)
Friday, 16 Aug 2019 23:02 pm
Times24.net

Times24.net


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: (ক) অসংগঠিত, দুর্বল, বিচ্ছিন্ন ঢাকাইয়া মুসলমান সমাজঃ উদার রক্ষণশীল ঢাকাইয়া সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধের জন্মদাতা, তার ধারকবাহক হচ্ছে ঢাকার আদিবাসী এবং তাদের বংশধর খাস ঢাকাইয়া মুসলমানরা। মুঘল আমলে ঢাকার মুঘল প্রশাসনের অভিজাত মুসলমান শ্রেণি ছিল মূলত উত্তর ভারতীয় অবাঙালীরা এবং স্থানীয় উত্তর ভারতীয় ও পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত অবাঙালী ও বাঙালী মাড়োয়ারী বর্ণ হিন্দুরা ছিল তাদের সহায়ক শক্তি। আর স্থানীয় বাঙালী মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা দরিদ্র, নিচু, ছোট কাজ, পেশায় নিয়োজিত ছিল। বাংলায় মুঘল ও মুসলিম শাসনের পতন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা, নতুন ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় রাজধানী স্থানান্তর, ক্ষমতাচ্যুত মুসলমান অভিজাতদের নতুন ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী ও তাদের শাসনের বিরোধীতা, আধুনিক ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে ও বিচ্ছিন্ন রাখা, এই অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার মুঘল অভিজাতদের প্রতি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসকগোষ্ঠী ও ইংরেজ অনুগত হিন্দু অভিজাত শ্রেণির প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রে মুঘল যুগের প্রাচীন খান্দানি জমিদার শ্রেণির পতন, লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, বাংলার মসলিন তাতশিল্প ধবংসকরণ, বেনিয়া কুঠিয়াল কর্তৃক পূর্ববাংলার উর্বর ফসলী জমিতে কৃষকদের নীল চাষে বাধ্যকরণ প্রভৃতি কারণে উন্নত মুগল নগরী ঢাকা, মুর্শিদাবাদ এবং এর স্থানীয় ধনী, স্বচ্ছল মুঘল অভিজাতদের অনেকে এইসব নগর ত্যাগ করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন মুসলিম রাজ্যে চলে যায়। আর যারা থেকে গিয়েছিল তারা কয়েক দশকের মধ্যে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, দুর্বল, প্রভাবহীন, দরিদ্র, ধবংস হয়ে যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। 

তাছাড়া রাজধানী কলকাতার ইংরেজ প্রশাসন, বেনিয়া ও পুজিবাদী অর্থনীতি ও ব্যবসা, আধুনিক ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, গবেষনা, চিন্তাচেতনা, সমাজব্যবস্থার প্রভাব ও সুবিধা থেকে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলার সর্ব বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ নগর ঢাকা অনেক দূরে অবস্থিত ও বিচ্ছিন্ন ছিল। তখন উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়ে এবং সেখানে হোস্টেলে থেকে খেয়ে পড়তে হোত। যা অনেক খরচ এবং পরিশ্রমের ব্যাপার ছিল। এত দূরে গিয়ে ছেলে সেখানে কিভাবে থাকবে? কি খাবে? কোন দুর্ঘটনা/বিপদ হলে কে ওকে দেখবে? এসব চিন্তা করে স্বচ্ছল ঢাকাইয়া অভিভাবকরা উচ্চশিক্ষার জন্য তাদের ছেলেদের কলকাতায় পাঠাতে এবং এ সমস্ত কারণে স্বচ্ছল ঢাকাইয়া পরিবারের ছেলেরা উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় পড়তে যেতে খুব বেশি উৎসাহী/আগ্রহী ছিল না। তখন ঢাকাইয়া তরুনরা ব্যবসা করাকে স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং সরকারী চাকরী করাকে গোলামী ভাবত। তারা স্থানীয় স্কুল, মাদ্রাসায় গিয়ে ও বাসায় শিক্ষক রেখে পড়লেখা করত এবং এরপর বাপ-দাদাদের পারিবারিক ব্যবসায় গিয়ে বসত। অপরদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ইংরেজ সরকারের দালালী করে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহন করে সর্বক্ষেত্রে কলকাতার বর্ণ হিন্দুরা অপ্রতিহত গতিতে শিক্ষা-সংস্কৃতি, চাকরী, পেশা, গবেষনা, আধুনিক চিন্তাচেতনা, প্রশাসন ও রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠা, শক্তি, মর্যাদা লাভ করে। 

যা দেখে ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ ১০০ বছর পর দুর্বল, শক্তি, মর্যাদা, নেতৃত্বহীন, হতাশাগ্রস্থ ঢাকা ও পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য পোষনের সুবিধা, পৃষ্ঠপোষকতা লাভের প্রয়োজনীয়তা, ইংরেজি শিক্ষাকে জীবন, জীবীকা, সরকারী চাকরী পাওয়ার জন্য একান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে গভীরভাবে উপলব্দি করতে সক্ষম হয়। এই সময় থেকে তারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহনে উৎসাহী হয়ে উঠে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৪১ সালে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং তা ঢাকাসহ সারা পূর্ববাংলায় ইংরেজি শিক্ষা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে অনেক দেরিতে হলেও ঢাকাভিত্তিক একটি ক্ষুদ্র ইংরেজি শিক্ষিত এলিট/অভিজাত শ্রেণি গড়ে উঠে। যারা ছিল নবাব, জমিদার, উকিল, ডাক্তার, প্রকাশক, লেখক শ্রেণি ভুক্ত। তখন ঢাকার অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বাংলা স্কুল, মাদ্রাসা থেকে, বাসায় শিক্ষক রেখে পড়ালেখা করত। ফলে ঢাকায় শিক্ষা-জ্ঞান পিপাসু, একটি উচ্চশিক্ষিত, আধুনিক চিন্তাচেতনা সম্পন্ন, সাহিত্য -সংস্কৃতমনা, সরকারী চাকরীজীবী এবং পেশাজীবী ভিত্তিক শক্তিশালী রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক সচেতন ও সংঘবদ্ধ মধ্যম আকারের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটেনি উনবিংশ শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্ত। তবে বংশগত আভিজাত্যধারী, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থ-রাজনৈতিকভাবে ধনাঢ্য, শক্তিশালী, প্রভাবশালী, সংস্কৃতমনা ঢাকার আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবার, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েত সালিশীর সর্দারগণ এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী, বরিশালের প্রখ্যাত আইনজীবী এ.কে.ফজলুল হক, হেকিম হাবিবুর রহমানের মত প্রভাবশালী মুসলিম নেতারা এই অভাব অনেকটা পূরণ করেছিলেন। তাদের সুযোগ্য শক্তিশালী নেতৃত্বে ঢাকাইয়া মুসলমানরা একদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়েছিল। অপরদিকে পূর্ববাংলার হিন্দু জমিদার শ্রেণি, কলকাতার বর্ণ হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং কংগ্রেসের আধিপত্য, অন্যায়, অনাচার, বৈষম্য, শোষন, লুন্ঠন, মুসলিম স্বার্থ বিরোধী চিন্তাচেতনা ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সচেতন ও প্রতিবাদ মুখর হয়েছিল। তার ফলেই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন এবং ঢাকাকে এই নতুন মুসলিম প্রদেশের রাজধানী ঘোষনা করতে উৎসাহিত হয়েছিল।
ব্রিটিশ আমলে রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, বিকশিত, শক্তিশালী, সংঘবদ্ধ ঢাকা ভিত্তিক মুসলিম অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি না থাকায় ঢাকা ও পূর্ববাংলার মুসলমানরা কখনো কংগ্রেস সমর্থিত কলকাতার অভিজাত জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আন্দোলন, বিপ্লব, ষড়যন্ত্র, কূটবুদ্ধি, শক্তি এবং একতার সাথে পেড়ে উঠেনি। এরফলেই বঙ্গভঙ্গ, পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারেনি। কলকাতার বর্ণ হিন্দু বুদ্ধিজীবী সমাজ ও ঢাকার হিন্দু আইনজীবী সমাজের প্রবল ও অব্যাহত বিরোধীতার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে দীর্ঘ এক দশক বিলম্বিত হয়েছে। স্বরাজ দলের চিত্তরঞ্জণ দাস-মুসলিমলীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পাদিত হিন্দু-মুসলিম মিলনের বেঙ্গল প্যাক্ট/বাংলা চুক্তি কখনো বাস্তবায়িত হতে পারেনি এবং মিঃদাসের মৃত্যুর পর তার দলই উক্ত চুক্তিটি বাতিল করেছিল। উনবিংশ শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্ত ঢাকাসহ পূর্ববাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য, গবেষনা, সরকারী চাকরী, পেশাগত, ভূ-সম্পত্তি ক্ষেত্রে বর্ণ হিন্দুদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পাকিস্তান হাসিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঢাকাইয়াদের সামনে উচ্চশিক্ষার স্বর্ণ দুয়ার খুলে দিলেও তারা পূর্বের ন্যায় সরকারী চাকরী পদ, উচ্চশিক্ষার প্রতি তেমন আগ্রহী ছিল না। তারা ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে ব্যবসা করাকেই অধিক পছন্দ করত ও গুরুত্ব দিত। চল্লিশ দশকের দিক থেকে ঢাকার বাঙালী-অবাঙালী মুসলিম অভিজাত, মধ্যবিত্তরা প্রায় সবাই জমি, বাড়ি, আড়ত, দোকানের মালিক এবং পাইকারী ব্যবসায়ী, সর্দার, সরকারী চাকরীজীবী, পেশাজীবী হতে থাকে। এজন্য ঢাকার ভাড়াটিয়ারা জমি, বাড়ি, আড়ত, দোকান মালিকদের সম্মান সূচক জমিদার, মহাজন নামে অভিহিত করে।

অপরদিকে সকল বাধাকে উপেক্ষা করে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দেড় দশকের ভেতর এবং ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে সময় থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতা মুসলমান ও মুসলিম লীগের হাতে আসার পর থেকে ঢাকায় শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির পত্তন ঘটে এবং তারা দ্রুত বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল জমিদার বিরোধী কৃষক-প্রজা আন্দোলন, লাহোর প্রস্তাব, পাকিস্তান আন্দোলন এবং যুক্তপাকিস্তান হাসিল। সারা ব্রিটিশ ভারতে জমিদার বিরোধী কৃষক-প্রজা আন্দোলন এবং পাকিস্তান আন্দোলন সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল ঢাকায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বাস্তব কারণে কলকাতার প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী বর্ণ হিন্দু বাবু সমাজ মুসলিমলীগ সমর্থিত ঢাকার বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের স্বতন্ত্র মুসলিম আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পাকিস্তান আন্দোলনকে প্রতিরোধ করার মত নৈতিক মনোবল ও রাজনৈতিক শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। এজন্য তারা কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার সমর্থনে যুক্তবাংলার সংখ্যালঘু হিন্দুদের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের দাবী তুলে যুক্তবাংলার হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবীতে আন্দোলন শুরু করে এবং কলকাতায় মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারকে গণভোট দিতে বাধ্য করে। এতে যুক্তবাংলা দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ ভারত ইউনিয়নে এবং পূর্ববাংলা যুক্তপাকিস্তানে যোগ দেয়। ঢাকাইয়া মুসলমানরা পূর্ববাংলার হিন্দু জমিদার শ্রেণি, কলকাত্তাইয়া বর্ণ হিন্দু শ্রেণি, তাদের মদদদাতা কংগ্রেস দল, হিন্দু ধর্মাশ্রিত/ভাবাদর্শ পুষ্ট ভারতীয় জাতীয়তাবাদ দর্শন, তাদের স্বদেশী আন্দোলন, অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বর্ণ হিন্দুদের সমর্থিত কমিউনিস্ট পার্টি, মাক্স-লেলিনের নাস্তিক কমিউনিস্ট দর্শন ও বিপ্লবের বিরোধী ছিল। তারা ঢাকার আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবার, আঞ্জুমান ইসলামীয়া, মুসলিমলীগ, ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ছিল এবং প্যান ইসলামী ভাবাদর্শপুষ্ট, বাঙালী মুসলিম জাতীয়তাবাদী, স্বতন্ত্র নিজস্ব বাঙালী  জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র, বৃহত্তর মুসলিম আবাসভূমি পাকিস্তানের আন্দোলনের সমর্থক ছিল ।
যুক্তপাকিস্তান যুগের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকার মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত বিকাশ লাভ করে এবং তাদের মধ্য থেকে ঢাকাভিত্তিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। যুক্ত পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে সকল ছাত্র, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক আন্দোলনের পেছনে ছিল ঢাকার বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা। নব্বই দশকের সময় থেকে ঢাকায় আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাচেতনায় অগ্রসর, প্রতিষ্ঠিত, শক্তিশালী বিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নিত হতে শুরু করে। এখন শিক্ষিত, সচেতন, স্বচ্ছল ঢাকাইয়া অভিভাবকরা সন্তানদের উন্নত ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তাদের অধিক হারে দেশ এবং বিদেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে পড়াচ্ছে। এরফলে নতুন প্রজন্মের ঢাকাইয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটি ইংরেজি শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এরা পশ্চিমা চিন্তাচেতনা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, জীবনযাত্রা দ্বারা প্রভাবিত। এরা কথাবার্তায় স্মার্ট, ফ্যাশন, ফাস্টফুড, টেকনোলজি প্রিয়। ঢাকাইয়া অভিভাবকদের কাছে নিজেদের পারিবারিক, ইসলামী মূল্যবোধ, দেশজ/লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সাথে সন্তানদের পশ্চিমা শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভিরুচি ও মূল্যবোধকে সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে সমন্বয় করে দেয়া প্রধান চ্যালেঞ্জ/গুরু দায়িত্ব। প্রথমত ব্রিটিশ যুক্তবাংলা ও যুক্তপাকিস্তান যুগ থেকে ঢাকাইয়া ছেলেদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও সরকারী চাকরীর প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলই না। এরফলে তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার, সরকারী চাকরী পদে তাদের সুযোগ লাভ ও চাকরী করার সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। দ্বিতীয়ত একই কারণে তারা বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রেও খুব বেশি অগ্রসর হতে, অভিজ্ঞতা এবং কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারেনি। তৃতীয়ত ঢাকার আদি অভিজাত ঢনাঢ্য ঢাকাইয়াদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্থায়ী অভিবাসী হয়ে গেছে। চতুর্থত একথা সত্য যে, ঢাকাইয়া সমাজে উচ্চ শিক্ষিত জনশক্তি, সরকারী চাকরী(সামরিক ও বেসামরিক) এবং পেশাগত ক্ষেত্রে ঢাকাইয়ারা আছেন তবে তাদের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এই সমস্ত কারণে ঢাকাইয়ারা আজ অঢাকাইয়াদের কাছে কোনঠাসা ও জিম্মি হয়ে পড়েছে। 

কয়েক দশকের সময়কালে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা শহর ও গ্রামের উচ্চশিক্ষিত তরুন ও জনগোষ্ঠী সরকারী চাকরী পদগুলোতে অনায়াসে ঢুকার এবং চাকরী করার সুযোগ লাভ করে। সেই উনিশ শতকের চল্লিশের দশক থেকে এখন পর্যন্ত সুদীর্ঘ আট/নয় দশকে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাপ-চাচা-মামা-খালুর খুটির জোড়, সরকারী চাকরী পাবার সংযোগ ক্ষেত্রটি মাকড়ার জাল এবং অভেদ্য দুর্গের ন্যায় শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলেছে। একই সাথে তারা প্রতিটি পেশাগত ক্ষেত্রেও অপ্রতিহত গতিতে অগ্রগতি, উন্নতি, সমৃদ্ধি লাভ করেছে। নিজেদের প্রশাসনিক পদ, মর্যাদা, সুবিধা, প্রভাব, প্রশাসনিক গণসংযোগ এবং আর্থ-সামাজিক শক্তিকে ভিত্তি করে এই অঢাকাইয়ারা ঢাকায় নতুন মধ্যবিত্ত সমাজের পত্তন করে। এই নানাবিধ ঐতিহাসিক, বাস্তব এবং সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার বিকাশমান মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজ  আজো সুশিক্ষিত, সুনাগরিক সমাজ, নিজেদের অধিকার, স্বার্থ সুরক্ষায় সংঘবদ্ধ, শ্রেণি সচেতন গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারেনি। শ্রেণিগতভাবে ঢাকাইয়া মুসলমান সমাজ আজো অনেক দুর্বল, বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত, অসচেতন জনসমাজ।(ছবিটি ১৯৪০ সালে লাহোর সম্মেলনে যুক্তবাংলা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক কর্তৃক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ঘোষনার।) চলবে-(পরবর্তী ২য় পর্বের খ-অধ্যায় পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন।

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র সাংবাদিক, ঢাকা।
[email protected]