demo
Times24.net
আমার ভেতরে বাস করে এক রোকন !
Wednesday, 14 Aug 2019 10:53 am
Times24.net

Times24.net


ইমতিয়াজ আহমেদ: হুজুরঃ ইয়ার পরে  কেরা- মুহাম্মদ রোকউদ্দিন খান; রোকনঃ হুজুর আস্সালামুআলাইকুম ! হুজুরঃ অয়ালাইকুমআস্সালাম , কোন বিষয়ে মনোযোগ নাই । উর্দু লেহার মধ্যে তুমি বাংলাশব্দ ঢুহাইয়া দেও, লেকিন আরবিতো খুব ভালো; রোকনঃ কারন আরবি আমার পছন্দ অয়, উর্দু আমার একদম ভালো লাগে না! 
হুজুরঃ বেততোমিছ ছেমড়া , কোনডা ভালো কোনডা মন্দ হেইডা কওয়ার তুমি কেডা ? এই সব এই হানে চলবে না, মোরদারে খবর আছে বেয়ালে তুমি তালবে এলেমগো লগে খেলো না, মাদ্রাসার বাইওে বাইরে   ঘুইরা বেড়াও - এইসব  বদ আখলাক আংরেজি ইস্কুলের ছাত্রগর লগে মেশার ফল । ফা - হামতা , বোজজো ? রোকনঃ জি, ফাম ! হুজুরঃ ওয়করু ...     
এক সময় বাংলা চলচিত্রে  শুরু হওয়া অশ্লীল ছবির হিরিকের কথা আমাদের সবারি জানা। সেই সুজোককে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের চলচিত্রের সোনালী অতীতকে একদল নামধারী অসাধু পরিচালক, কলাকুশলি মিলে  অধিক মুনাফার আশায় আমাদের  চলচিত্রের অস্তিত্বকে প্রায় বিলিন করে  দিয়েছিলো। তখন সিনেমা মানেই প্রতিটা সিকুয়েন্সের অন্তরালে লুকিয়ে থাকতো রগরগে যৌনতা যা তরুন  প্রজন্মের জন্যেও ছিলো মারাত্বক হুমকি । যার ফলে বাংলাদেশের একটা বড় অংশের ম্রোতা বাংলা  সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় পাশাপাশি  হলগুলো থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিলেন সমানভাবে । যার রেশ আমি বলবো এখনো বিদ্যমান   রয়েছে হলগুলোতে । ঠিক সেই অশ্লীল সময়ের বুকে খামচি কেটে  ২০০২ সালে ফিচারধর্মী আধুনিক পুর্নদৈর্ঘ্য চলচিত্র ‘মাটির ময়না’ নির্মান করেন পরিচালক তারেক মাসুদ । খুব তাড়াতাড়ি তার  এই  চলচিত্রটির জন্য দেশে বিদেশে মানুষের কাছে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি জিতেনেন দেমি বিদেশি পুরষ্কারও । 
আমি বলবো ঠিক তখন থেকেই একটা পরিবর্তনের হওয়া কিংবা চলচিত্র নিয়ে নতুন নতুন খেলা-নতুন কিছু ভাবা যেতে পারে, ভালো কাজ করলেও যে স্বিকৃতী পাওয়া যায় এমন  ভাবনায় অনেক সৃজনশীল নির্মাতারা তখন ভেতরে ভেতরে দারুন ভাবে আন্দোলিত হতে থাকে।   
মাটির ময়না চলচিত্রটি মূলত  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নিকট ইতিহাস তথা সমগ্র পাকিস্তানে  সমসাময়িক সামাজিক -রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে  যে দূর্বার আন্দোলনের দমামা মুক্তিকামী জনতার মধ্যে বিরাজ করছিলো তারই ধারাবাহিকতায় এই চলচিত্রটির জন্ম। ঐতিহাসিক পটভ’মির ওপর এই ছবিটি নির্মানের পেছেনে তারেক মাসুদের ছেলে বেলায় মাদ্রাসা শিক্ষা জীবনের বাস্তবিক নানান অভিজ্ঞতার দিকগুলো এই ছবিতে ফুটে উঠেছে । সোজাকরে  বললে পুরো ঘটনাবলিকে তারেক মাসুদ দুটো কিশোরের মানবিক চাহিদার মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে  তুলেছেন । মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার সময় তার শিক্ষক তার সহপাঠিদের বিরূপ আচরন সর্বোপরি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়। নির্মান কাজ শেষ হবার পর প্রথমদিকে এই চলচিত্রটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় ।পরে  বহিষ্কারাদেশ  বাতিল হবার পর ১৬ এপ্রিল ২০০৫ সালে লেজার ভিষন কতৃক চলচিত্রটির ভিসিডি এবং ডিভিডি সংস্করন মুক্তি পায় । মাটির ময়না চলচিত্রটি প্রথম চলচিত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচিত্র  বিভাগে একাডেমিক পুরষ্কার প্রতিদ্বন্দ্বিতার  জন্য বাংলাদেশের মনোনয়ন লাভ করে  । 
মাটির  ময়না ছবিটিতে আমরা দেখতে পাই  হোমিওপ্যাথি ডাক্তার  কাজী সাহেবের  একটি পরিবার , যিনি ধর্মীয় উগ্রবাদে বিশ্বাস করে। যদিও নৌকার করিম মাঝির ভাষায় তিনি আর দশজনের মতই জীবন জাপন করতেন বিয়ের বেশ কিছুদিন পর আচমাই তিনি সম্প্রদায়িক মনমানসিকতা লালন করতে শুরু করে এখন সে কড়া বদরাগি মানুষ। কাজী সাহেব তার উগ্রবাদীতা চাপিয়ে দেন স্ত্রী আয়শা  ও ছেলে মেয়র উপর যার বাস্তব চিত্র দেখতে পাই ছেলে আনুকে মাদ্রসায় ভর্তীর মাধ্যমে। 
মাটির ময়না চলচিত্রজুড়ে তারেক মাসুদের  সমগ্র নস্টালজিয়া ফুটে ওঠে মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থাপনার চিত্রে ,ইসলামের সাথে মানুষের সম্পর্ক, মাদ্রাসার কঠোর অনুশাসনে মিক্ষক ছাত্রের প্রথাগত আচরন। জারাযায়, তারেক মাসুদের শিক্ষা  জীবন শুরু মাদ্রাসা দিয়ে । মাটির ময়না ছবিটির কেন্দ্রিয় চরিত্র থাকে আনু আর  আনুকে পিছু নিয়েই নির্মাতা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন  চিত্রনাট্য । 
আনু (আনোয়ার) মাদ্রাসার শিক্ষা জীবনের শুরুতেই খুজে পায় একটা ভিন্ন পৃথিবীর সন্ধান  যা তারকাছে ছিলো পুরোপুরি অচেনা । আনু আরো খুজে পায় তার কাছের এক বন্ধু রোকনকে , এক দুপরের খাবার খেতে গিয়ে রোকনের সাথে তার পরিচয় । রোকন তার মাছটা আনুর পাতে তুলে দেয় তখন আনু  তার নাম জিঞ্জাস করেছিলো , রোকন উত্তর দিয়েছিলো , রোকন;  মুহাম্মাদ রোকন উদ্দিন খান । ছবিতে রোকনকে জ্বীনে আছর করে, জ্বীন তার বন্ধু হয় , তার ভাষায় জ্বীন তাকে কুব আদও করে  ।রোকনে তার জ্বীন বন্ধু মিষ্টি দেয় আর সেই মিষ্টি রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় আনুকে নিয়ে রোকন ভাগাভাগি করে খায়। মাঝেমধ্যে এইরূপ আজিব কিসিমের আচরন সবাইকে ঘোরের মধ্যে রাখে ফলে মাদ্রাসার এক মাত্র আনু ছাড়া অন্যকেউ তার সাথে মিশতো না।আমি বলবো তারেক মাসুদ রোকনের চরিত্রটি এক প্রিকুলিয়ার রূপ দিয়ে গেছেন যা সিনেমার শেষঅব্দী অসমাপ্তই থেকে গেছে দর্শকের চোখে । ছবিটিতে আরো আছে টকবগে যুবা মিলনের কথা যেকিনা সে সময়ের সমসাময়িক আন্দোলনের জন্য গ্রামের ছেলেদের সংগঠিত করে।কাজী সাহেবের স্ত্রী আয়শার স্মৃতিচারনে ফুটে ওঠে  মিলনের সাথে তার খেলার দিনগুলো; সবমিলিয়ে পুরো সিনেমাটায় যে ভাবের ভেতর গল্পটি এগিয়ে নিগেছেন নির্মাতা তা সকলকেই মুগ্ধ করে  ছাড়ে । 
মাটির ময়না চলচিত্রের সংগীতে  আমরা খুজে পাই লোকসংগীতের দরদী সুর , শিল্পি মমতাজের গলায় শুনতে পাই অসাধারন দেহতত্ব গান-পখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়;  কিংবা করিম মাঝির গরায়  দোয়াতের আলোতে রাতে পুথি পাঠের আসর যা ছবির পুরো পরিবেশটাই দর্শকে গল্পের  সাথে বেধ ফেলে শক্ত করে । বাংলাদেশের চলচিত্রের ইতিহাসে  ক্ষনজন্মা এক মহান ছবিয়াল তারেক মাসুদের  প্রয়ান দিবসে রইলো গভার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা । গুরু আপনি ভালো থাকুন আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক,  নিশ্চই প্রজন্ম আপনার স্বপ্নকে নিয়ে যাবে বহুদূর ...

উল্লেখ্য, প্রয়াত চলচিত্রকার  তারেক  মাসুদ স্বরনে । চলচিত্রের নাম ‘মাটির ময়না’ ।

আমাদের কেন আদিবাসী বলেন ? আমরাতো বাঙালী !

লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ,সংবাদকর্মী, ঢাকা। 
[email protected]