demo
Times24.net
থমথমে কাশ্মীর
Wednesday, 07 Aug 2019 19:39 pm
Times24.net

Times24.net

টাইমস ২৪ ডটনেট, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা কেড়ে নেয়ার পর ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এখন ভয় ও আতঙ্ক চেপে বসেছে। সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় ও বিক্ষোভ চলছে। সোমবার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটির সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার ঘোষণা দেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর পর বিক্ষোভে এক কাশ্মীরি নিহত ও আরও ছয় ব্যক্তি আহত হয়েছেন। কাশ্মীরের একটি হাসপাতাল বলছে, বন্দুকের গুলিতে আহত ছয় ব্যক্তিকে তারা চিকিৎসা দিয়েছে। দেশের বাকি অংশের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলটির সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার সোমবার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘোষণা দেয়াকে সামনে রেখে কাশ্মীরের ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
এছাড়া জনসমাবেশ ও বিক্ষোভও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন এই সম্প্রদায় ও শ্রীনগর থেকে বিমানে আসা যাত্রীরা কাশ্মীরের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কথাই বলেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রী বলেন, সোমবার থেকেই তিনি থেমে থেমে বন্দুক ও অন্যান্য অস্ত্রের আওয়াজ শুনছেন। প্রতি পাঁচ কদম পরপর সরকারি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এএফপিকে তিনি বলেন, বিমানবন্দরে আসার আগে অন্তত ২৫ বার আমার গাড়ি তল্লাশি করা হয়েছে। এতে ত্রিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে আমার চার ঘণ্টা সময় লেগেছে।মঙ্গলবার শ্রীনগর থেকে নয়াদিল্লিতে আসা মুবিন মাসুদি বলেন, রোববার তিনি বিয়ের উৎসবে ছিলেন। তখন হঠাৎ করে উপস্থিত লোকজন বুঝতে পারেন, ফোন কোন কাজ করছে না।তিনি বলেন, মাঝরাতে যখন খাবার খাচ্ছিলাম, তখন একের পর এক ফোন অকার্যকর হয়ে যায়। সবাই বুঝতে পারে, কিছু একটা কিছু ঘটছে এবং বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।ফারুক শেখ নামের আরেক যাত্রী বলেন, তার কাছে মনে হয়েছে, শহরের ভেতর তিনি যেন খাঁচায় আটকা পড়েছেন।‘আমাদের মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেয়া হয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি টেলিভিশনের লাইন ও ল্যান্ডফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে।’
কাশ্মীরের কবি সান্না ওয়ানি নিজের টুইটার পোস্টে শ্রীনগরজুড়ে ভয় ও আতঙ্কের কথা লিখেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কাশ্মীর থেকে বিমানে চলে আসেন। এই নারী কবি বলেন, জরুরি চিকিৎসার কথা বলা হলেও তল্লাশি চৌকি থেকে রেহাই মেলে না।কাশ্মীরের অধিবাসীরা যেন একটি বন্দিশিবিরে রয়েছে। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল্লি বলেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও নিরাপত্তা ধরপাকড় গভীর উদ্বেগের।
মঙ্গলবার জেনেভায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা সেখানে ব্যাপক টেলিযোগাযোগ বিধিনিষেধ দেখতে পাচ্ছি। সম্ভবত এর আগে কখনো এমনটা ছিল না। রাজনৈতিক নেতাদের স্বেচ্ছাচারী আটক এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিধিনিষেধের খবরও পাচ্ছি বলে জানান রুপার্ট।
১৯৮৯ সাল থেকে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে বিদ্রোহ চলছে। ভারতীয় টেলিভিশনে রাজ্য পুলিশ প্রধান বলছেন, লোকজন খুবই সহযোগিতা করছেন। একটি সহিংসতার ঘটনাও এখানে ঘটেনি।
ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীর কার্যত বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের আগে রোববার সন্ধ্যা থেকেই কাশ্মীরে টেলিফোন, মোবাইল এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ভারতশাসিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর এখন ক্রোধে ফেটে পড়েছে।
শ্রীনগর এবং কাশ্মীরের উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। রাস্তায় সর্বত্র হাজার হাজার সেনা, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী টহল দিচ্ছে। সব রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সর্বত্র কারফিউ জারি করা হয়েছে। কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। ল্যান্ড ফোন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট ব্লক করে দেয়া হয়েছে।
এখন কাশ্মীরে ভেতরেও কেউ কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তারা একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। সব কিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি চরম সংকট তৈরি করেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।সেখানে বিপুল সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং তারা সবকিছু চেক করছে। পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে কে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে - সবকিছু চেক করা হচ্ছে।সব জায়গায় উত্তেজনা বিরাজ করছে, লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছ। কারণ তারা এখনো বুঝতে পারছে না যে, কী ঘটছে বা তাদের ভাগ্যে কী আছে।
আর কয়েকদিন পরেই ঈদ। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত সরকার তখন সাময়িকভাবে কারফিউ তুলে নেবে যেন লোকজন উৎসবের আগে কেনাকাটা করতে পারে। তবে ঈদের সময় বাড়ির বাইরে তাদের নামাজ পড়ার অনুমতি দেয়া হবে কি-না। তারা এখনও তা জানেন না।
আগামী দিনগুলোতে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাশ্মীরের যোগাযোগ এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যে, সেখানকার অনেক লোকই এখনো ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের খবর জানেন না। তবে যারা জানতে পেরেছেন তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই বলছেন যে, তারা আরো খবরের অপেক্ষায় আছেন। কারণ সবার কথা তারা বিশ্বাস করছেন না।৫০ বছর বয়সী এক কাশ্মীরি নাগরিক বলেন, আগে তারা নিজেদের স্বাধীন ভাবতেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই স্বাধীনতাও তারা হারিয়ে ফেলেছেন। তারা ভারতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন এবং তারা ভারতের গোলামে পরিণত হয়েছেন।
কাশ্মীরের লোকজনের এটাই সাধারণ অনুভূতি।এখানকার মূলধারার রাজনৈতিক নেতারা গৃহবন্দি। তাদেরকে বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। তারা প্রতিবাদ করেছেন। ভারতের সরকারের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছেন যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা উচিত হবে না, এতে হাত দেয়া ঠিক হবে না। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ভারতের সরকার ও কাশ্মীরের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ছিল। কাশ্মীরের নেতাদের গৃহবন্দি হবার কথা এখনো অনেকেই জানেন না। এ ব্যাপারে সেখানে কোন সরকারি ঘোষণাও দেয়া হয়নি।