demo
Times24.net
আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৪
Thursday, 13 Jun 2019 00:24 am
Times24.net

Times24.net


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: নবাব আহসানুল্লাহর ব্যাপক জনহিতকর কার্যাবলী এবং সংস্কৃতমনা নবাব পরিবারঃ নবাব আব্দুল গণির মৃত্যুর পর নতুন নবাব হন তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ। তিনি ১৮৬৪ সাল থেকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির অনারারী(অবৈতনিক) কমিশনার ছিলেন দীর্ঘকাল। এ সময় তিনি ঢাকা পৌরসভায় মুসলমানদের জন্য গোরস্তান নির্মাণ ও উন্নয়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নবাব আহসানুল্লাহ আমৃত্যু পর্যন্ত অসংখ্য সামাজিক জনকল্যাণমূলক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কার্যে পর্যায়ক্রমে পঞ্চাশ লক্ষেরও অধিক টাকা খরচ করেছেন। বিশেষ করে তিনি হোসনী দালান পুনঃর্নিমাণ, ঢাকায় প্লেগ নিবারণ, কুমিল্লা শহরের উন্নয়ন, বড়লাটের দুর্ভিক্ষ তহবিলে সহায়তা, মক্কা নগরীর জুবায়দা সংস্কার, মিডফোর্ড হাসপাতালের উন্নয়ন, লেডি ডাফরিন হাসপাতাল নির্মাণ, ঢাকার সার্ভে স্কুলটিকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীতকরণ, পটুয়াখালী বেগমবাজার হাসপাতাল, মাদারীপুরে মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের মত অসংখ্য বৃহৎ জনকল্যাণমূলক কাজে করেছেন। এছাড়াও তিনি পূর্ববাংলার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার সংস্কার করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের শিয়াদের সর্বপ্রাচীন এবং প্রধান ইমামবাড়া ঢাকার চাংখারপুল সংলঘ্ন হোসনী দালান রোডে অবস্থিত হোসনী দালানের বয়স প্রায় ৪০০ বছর। কথিত আছে, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার নির্দেশে সৈয়দ মীর মুরাদের তত্ত্বাবধানে ১৬৪২ সালে ঢাকার শিয়াদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য এই হোসনী দালান ইমামবাড়া নির্মিত হয়। ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে মূল আদি হোসনী দালান সম্পূর্ণরূপে বিধবস্ত হলে ঢাকার নবাব আহসানুল্লাহ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে বর্তমান ঈমামবাড়াটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে একে অবিকৃত রেখে কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে মাত্র। আব্দুল গণি, আহসানুল্লাহ তাদের সময় জমিদারীর বিভিন্ন স্থানে প্রমোদ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। যেমন ঢাকায় শাহবাগে ফিরোজ মঞ্জিল, মতিঝিলে দিলখুশা ভবন, নারায়ণগঞ্জে হাফিজ মঞ্জিল নির্মাণ করেন। সেগুলোতে বাগান এবং পানির ফোয়ারা ছিল।

নবাব আহসানুল্লাহ অত্যন্ত সংস্কৃতমনা ছিলেন। তিনি ১৮৯৯ সালে ঢাকা মোহামেডান ইউনিয়ন স্পোর্টিং ক্লাব প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নবাব পরিবার এবং পরিজনদের বিনোদনের নিমিত্তে আহসান মঞ্জিলে মঞ্চ নাটকের আয়োজন করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের সাথে মিলে ঢাকায় রেসকোর্স ময়দান স্থাপন এবং এখানে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া তিনি নিজ উদ্যেগে সাড়ে চার লক্ষ টাকা খরচ করে ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার সড়কে প্রথম বৈদ্যুতিক লাইট পোস্ট লাগানোর ব্যবস্থা করে বিজলী বাতির প্রবর্তন করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ উপাধি লাভ করেছিলেন এবং দু'বার আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনিত হয়েছিলেন। অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী চরমপন্থী, মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং জমিদার শ্রেণির সমর্থকগোষ্ঠীর নেতৃত্বের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী অন্যায়কর, আধিপত্যবাদী কার্যকলাপ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নবাব আহসানুল্লাহর সভাপতিত্বে আহসান মঞ্জিলের দরবার কক্ষে বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার তিন কণ্যার মধ্যে নবাবজাদী মেহেরবানু ছিলেন ঢাকার প্রথম নারী চিত্রকর এবং তার স্বামী ছিলেন ‘দি পঞ্চায়েত সিস্টেম অব ঢাকা’ গ্রন্থের রচয়িতা খান বাহাদুর খাজা মুহম্মদ আযম। মেহেরবানু নিজ ইচ্ছাশক্তি বলে এবং স্বামীর সহযোগীতায় রক্ষণশীল পরিবারের কণ্যা ও স্ত্রী হয়েও ক্যানভাস রাঙিয়েছেন। পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাবে তার ছবিতে প্রকৃতি ও আবহমান বাংলা প্রাধান্য পেয়েছে। ১৯২০ সালে কলকাতায় 'দ্য মোসলেম ভারত' পত্রিকায় প্রকাশিত তার দুটি পেন্টিংয়ের মধ্যে একটি তিন রঙে আঁকা নদীতে পাল তোলা ভাসমান একটি নৌকা এবং অপরটি বিক্রমপুরের তালতলা ঘাটের ছিল। মেহেরবানুর নৌকার পেন্টিংটি দেখে বিমুগ্ধ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর উপর ভিত্তি করে তার বিখ্যাত 'খেয়াপারের তরণী' কবিতাটি রচনা করেছিলেন। মেহেরবানু তার অপর দুই বোনকে নিয়ে ঢাকায় নিজের মায়ের নামে কামরুননেসা গার্লস হাইস্কুল নির্মাণ করেন এবং ঢাকার উর্দূ সাহিত্য পত্রিকা যাদু প্রকাশে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার দুই ছেলে খাজা আদিল এবং খাজা আজমল ঢাকার প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র 'সুকুমারী' ও 'দ্য লাস্ট কিস' নির্মাণ করেন।

নবাব খাজা আহসানুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র খাজা সলিমুল্লাহ ঢাকার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকার মুসলমানদের সামাজিকভাবে সংঘবদ্ধ করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে ঢাকার দ্বি-খণ্ডিত উর্দূভাষী সর্দারদের বাইশ পঞ্চায়েত এবং বাংলাভাষী সর্দারদের বারা পঞ্চায়েতকে একীভূত করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে একটি সুসংহত সাংগঠনিক রূপ দেন। এরফলে সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর, প্রতিষ্ঠিত, শক্তিশালী হিন্দুদের হাতে নানাক্ষেত্রে মুসলমানদের বিড়ম্বনা অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং ঢাকার মুসলমানদের উপর নবাব সলিমুল্লাহর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রশক্তি ছিল আহসান মঞ্জিলের দরবার এবং পঞ্চায়েত সর্বপ্রধান হিসেবে নবাবগণ প্রায় প্রতিদিন এখানে সালিসী দরবার বসাতেন। নবাব আব্দুল গণির পরবর্তী উত্তরসূরী নবাবগণ তথা তার পুত্র আহসানুল্লাহ, পৌত্র সলিমুল্লাহ, প্রপৌত্র হাবিবুল্লাহ তাদের সময়কালে সমসাময়িক পরিস্থিতির আলোকে ঢাকার মহল্লাভিত্তিক প্রভাবশালী, ঢনাঢ্য, গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে তাদের নিজ নিজ মহল্লার সর্দার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত করতেন। পঞ্চায়েত সর্দারগণ নিজ নিজ এলাকার মানুষকে পুলিশ-থানা, জেল-হাজত, আইন-আদালতের হয়রানি, ঝামেলা থেকে রক্ষা করার জন্য এলাকার মানুষের মধ্যকার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, গোষ্ঠীগত বিরোধ, সংঘাত পঞ্চায়েত আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করত। এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্দারগণ নিজ নিজ মহল্লাবাসীকে, আহসান মঞ্জিলের নবাবগণ নিজ জমিদারীর প্রজা এবং ঢাকার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। নবাব সলিমুল্লাহর নির্দেশে ভগ্নিপতি মেহেরবানুর স্বামী খাজা মুহম্মদ আযম ১৯০৭ সালে কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত সমিতির দায়েরা-এ মুতীউল ইসলাম অর্থাৎ সুপারিন্টেনডেন্ট নিযুক্ত হন। এই পদে তিনি প্রায় এক যুগ বহাল ছিলেন। সে সময় পঞ্চায়েত সমিতিতে নবনির্বাচিত সর্দারকে সম্মানপূর্বক পাগড়ি পড়ান হত এবং ঢাকায় মুসলমানদের বেশির ভাগ মোকদ্দমা এই পঞ্চায়েত আদালতেই নিষ্পত্তি হত। তিনি ঢাকার পঞ্চায়েত প্রথার ওপর ‘দি পঞ্চায়েত সিস্টেম অব ঢাকা’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীতে তিনিই গ্রন্থটির উর্দু অনুবাদ করে এর নাম দেন ‘ইসলামি পঞ্চায়েত ঢাকা’। মূল ইংরেজি গ্রন্থ ও উর্দূতে অনুবাদ গ্রন্থ দুটাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর সভাপতিত্বে ১১ এপ্রিল ১৯২০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘ঢাকা জেলা মুসলিম সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ছবিটি নবাব আহসানুল্লাহর। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট,শেয়ার করুন। চলবে-(পরবর্তী ৫ম পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। 

[email protected]