demo
Times24.net
আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার নবাব পরিবার-৩
Monday, 10 Jun 2019 00:14 am
Times24.net

Times24.net


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: নবাব আব্দুল গণি এবং নবাব পরিবারের উত্থানঃ খাজা আলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র খাজা আব্দুল গণি ঢাকা নওয়াব এস্টেটের মুতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন। তিনি তার সুনিপুণ ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ তত্ত্বাবধানে খাজাদের জমিদারী ঢাকার নবাব এস্টেটকে ব্যাপকভাবে বিস্তার করে একে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে যান। তার সময় ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, ত্রিপুরা, ময়মনসিংহ জেলার অধিকাংশ পরগনায় তার জমিদারীর নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এই সুবিস্তৃত জমিদারী ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি তার জমিদারীকে ২৬টি সার্কেলে(প্রশাসনে)বিভক্ত করেন। যার ১১টি বাকেরগঞ্জে, ৪টি ত্রিপুরায়, ৪টি পশ্চিম ময়মনসিংহ ও পাবনায়, ৩টি পূর্ব ময়মনসিংহ ও সিলেটে এবং ৪টি ঢাকা জেলায় অবস্থিত ছিল। প্রতিটি সার্কেলে ১টি করে কাচারি ছিল, এর প্রধান ছিলেন নায়েব, যার অধীনে কিছু আমলা(কর্মকর্তা) থাকত। এভাবে আব্দুল গণি আহসান মঞ্জিলকে তার নবাব এস্টেটের জমিদারী ব্যবস্থাপনার শীর্ষকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার সময় খাজা পরিবার জমিদারী, অর্থ-বিত্ত, ধন-সম্পদ, খ্যাতি-যশ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য্য-সমৃদ্ধি, শক্তি-ক্ষমতার শীর্ষ শিখরে আরোহণ করে। তিনি অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার দান উল্লেখযোগ্য এবং প্রশংসনীয় ছিল। খাজা আব্দুল গণি ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ বিরোধী সিপাহী বিপ্লবের সময় নিজের ব্যক্তিগত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে, অর্থ, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, লোকবল দিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে সর্বাত্নক সহায়তা প্রদান করেন। এই সময় ঢাকায় সরকারী প্রশাসনের আইন-শৃঙখলার নিয়ন্ত্রণ ভেঙ্গে পড়লে সরকার আব্দুল গণিকে ঢাকা শহরে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেয়। তখন আব্দুল গণি ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লার প্রভাবশালী গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আহসান মঞ্জিলে দাওয়াত দিয়ে তাদের সাথে আলোচনা ও সলাপরামর্শ করে মহল্লাভিত্তিক পঞ্চায়েত কমিটি গঠন এবং সর্দারদের নাম ঘোষনা করেন। আব্দুল গণি এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজ জমিদারীর প্রজাদের এবং ঢাকার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৮৬০ সালে ঢাকা শহরে ভয়াবহ শিয়া-সুন্নি দাঙ্গা দমন করতে ব্রিটিশ সরকারী প্রশাসন ব্যর্থ হলে খাজা আব্দুল গণি নিজ উদ্যেগে তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এই সমস্ত কারণে আব্দুল গণিকে গোষ্ঠীপতি বলে অভিহিত করা হোত এবং যুক্তবাংলার গভর্নর হ্যালিডে তার রিপোর্টে ঢাকার প্রভাবশালী জমিদার খাজা আব্দুল গণির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন।

খাজা আব্দুল গণি নিজস্ব বিচক্ষতায় ঢাকার মুসলমানদের উপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। খাজা পরিবার ও নওয়াব এস্টেটের প্রধান খাজা আব্দুল গণির বিপুল বিত্তবৈভব, বিলাসী জীবনযাত্রা, প্রতিপত্তি, ঢাকার মুসলমানদের উপর তার অপ্রতিহত প্রভাব এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তার একনিষ্ঠ আনুগত্য ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল খাজা আব্দুল গণি ও তার খাজা পরিবারের প্রতি। ১৮৬৭ সালে ভাইসরয় তাকে আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনিত করেন। ১৮৬৮ সালে তাকে কে.সি.এস.আই (কিং কম্পানিজ অব দি অর্ডার অব দি স্টার অব ইন্ডিয়া)উপাধি দিয়েছিল। তিনি ১৮৭৪ সালে কে.সি. এস.আই উপাধি পাবার জন্য এবং প্রিন্স ওয়েলসের সুস্থ হয়ে ওঠা উপলক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেন। তখন সরকারীভাবে একটা কমিটি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ঢাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হবে। আব্দুল গণি আরো দুই লক্ষ টাকা দান করেছিলেন এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। এভাবে তিনি ঢাকাবাসীর জন্য প্রথম বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি নিজ অর্থে সরকার কর্তৃক তৎকালীন ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে গ্যাস বাতির ল্যাম্প পোস্ট লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ঢাকার জমিদার খাজা আব্দুল গণিকে নবাব বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন এবং ১৮৭৭ সালে তাকে বংশানুক্রমিক নবাব উপাধি ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা হয়। ১৮৭৬ সালে তার প্রস্তাবনায় ব্রিটিশ সরকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আইনগত স্বীকৃতি দেয় এবং এরফলে পঞ্চায়েত প্রথা আইনগত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আব্দুল গণি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাব, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, অসুস্থ গরীব, দুস্থ মানুষের উন্নয়ন, মঙ্গলের জন্য বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করেছেন। তার সময়কালে তিনি ছিলেন ঢাকার মুসলমানদের সর্বপ্রধান নেতা। ১৮৯৬ সালে তার মৃত্যুর দিন ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

তাই নবাব আব্দুল গণিকে ঢাকার নবাব পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক নবাব উপাধি পাবার পর থেকে খাজা পরিবারের খানদানী বংশগত পারিবারিক জমিদারী মর্যাদা, প্রতাপ, আভিজাত্য রাজকীয়তায় উন্নিত হয় এবং বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। ঢাকার নবাবদের গৌরবময় উত্থানের যুগে আহসান মঞ্জিলের সিড়ি কক্ষের নিচে সোনার পাতে বাঁধানো একটি ভিজিটর বুক(পরিদর্শন বই)রাখা ছিল। এতে এখানে আগমনকারী গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাদের মন্তব্য লিখত। ব্রিটিশ ভারতে যে সকল ভাইসরয়, গভর্নর, লেফটেনেন্ট গভর্নর ঢাকায় আগমন করেছেন তাদের সকলেই ঢাকার নবাব পরিবারের আহসান মঞ্জিল প্রাসাদে এসেছেন এবং খাজাদের রাজকীয় আতিথেয়তা গ্রহন করেছেন। সে সময় আহসান মঞ্জিলের ভেতর প্রবেশ করার জন্য একটি রাজকীয় সিংহ ফটক ছিল। যা আজকের ধবংসপ্রাপ্ত নবাববাড়ির গেট নামে পরিচিত। এক সময় নবাব বাড়ির এই গেট দিয়েই আহসান মঞ্জিলে আগমনকারী গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সম্মানিত অতিথিদের রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নবাববাড়ির গেটের সম্মুখে নবাবের প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে, ব্যান্ডপার্টির বাজনা বাজিয়ে, তাদের উপর ফুলের পাপড়ি বর্ষণ করে অভ্যর্থনা জানানো হতো এবং অশ্বারোহী বাহিনী দিয়ে এখান থেকে তাদের স্কট করে(প্রহরা দিয়ে)আহসান মঞ্জিলের দিকে নিয়ে যাওয়া হতো। নবাববাড়ির পেছনের এলাকায় একটি গোলাকৃতির পুকুর আছে। স্থানীয়দের কাছে এটি নবাববাড়ির পুকুর নামে পরিচিত এবং স্থানীয়রা ঘাট পরিচর্যাকারীদের কাছে টাকা জমা দিয়ে এই পুকুরে গোসল করে থাকে। নবাববাড়ির পেছনের দিক থেকে নবাববাড়ির গেট পর্যন্ত এলাকাটি নবাববাড়ি নামে পরিচিত। ছবিটি নবাব আব্দুল গনির। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে-(পরবর্তী ৪র্থ পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। 

[email protected]