demo
Times24.net
কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্সকে ধর্ষণ করে হত্যা
Tuesday, 07 May 2019 21:23 pm
Times24.net

Times24.net


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে শাহিনুর আক্তার উরুফে তানিয়া (২৪) নামে এক নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্ষণকারীরা তাকে হত্যার পর কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ড্রাইভার নূরুজ্জামান (৩৯) ও হেলপার লালন মিয়াকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়েছে বলে কটিয়াদীতে থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 
গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টায় ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলী নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শাহিনুর কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে নার্স পদে চাকরি করেন।
জানা গেছে, শাহিনুর আক্তার উরুফে তানিয়া গত সোমবার বিকেলে তিনি এয়ারপোর্ট কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে স্বর্ণলতা পরিবহনে উঠেন। বাসটি মহাখালী-থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলাচল করে। শাহিনুর বিকেলে বাসে উঠার পর থেকে তার পিতা এবং ভাইদের সাথে মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়। রাত ৮টার দিকে তিনি মঠখোলা বাজার অতিক্রম করার সময় আবারও তার বাবার সাথে কথা হয়। তখন তিনি জানান, আধা ঘন্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছতে পারবেন।
সাড়ে আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে তখনো তার ভাইয়ের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হয়, বলেন আর মাত্র পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে পিরিজপুর পৌঁছতে। কিন্তু কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে বাসের সমস্ত যাত্রী নেমে যায়। এ সময় গাড়ির ড্রাইভার এবং হেলপার কৌশলে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড থেকে তার সাথের চার-পাঁচজনকে যাত্রীবেশে গাড়িতে তোলেন।
কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভৈবর-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলীর নিরব একটি জায়গায় পৌঁছলে এসময় শাহিনুরকে জোরপূর্বক চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ করে এবং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে বলে স্বজনরা ধারণা করছেন। তার মৃত্যুর পর ধর্ষণকারীরা রাত পৌঁনে এগারটার দিকে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে দুর্ঘটনা কথা বলে লাশ ফেলে রেখে যায়।
হাসপাতাল রেজিস্ট্রার সূত্রে লাশ আনয়নকারীর নাম পাওয়া যায় আল আমিন, পিতা ওয়াহিদুজ্জামান, গ্রাম ভেঙ্গারদি, কাপাসিয়া, গাজীপুর। এদিকে পাঁচ মিনিটের কথা বলে দীর্ঘ সময় সে পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে স্বর্ণলতা বাসটি না পৌঁছলে তার ভাই মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে গভীর রাতে সংবাদ পায় শাহিনুরের লাশ কটিয়াদী হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে রাখা হয়েছে।
নিহত তানিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, শাহিনুর ঢাকায় কাজ করেন। গত সোমবার বিকেল তিনটায় তিনি ঢাকার মহাখালী থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসে ওঠেন। বাসটি মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যায়। রাত আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়। কটিয়াদী পৌঁছানোর পর বাসের সব যাত্রী নেমে পড়েন। কিন্তু শাহিনুর না নেমে বসে ছিলেন। শাহিনুরের বাড়ি কটিয়াদীর বাহেরচর হলেও বাসস্ট্যান্ড থেকে বাহেরচরের দূরত্ব অনেক। রিকশায় করে যেতে এক ঘণ্টার ওপর সময় লাগে। কিন্তু পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাহেরচরের রিকশায় ১০ মিনিটের পথ। সে কারণে শাহিনুর কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে না নেমে পিরিজপুর যেতে আগ্রহী হন।
কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পর শাহিনুর তার ভাই সুজন মিয়াকে ফোনে করে বলেন, তিনি পিরিজপুর হয়ে আসবেন। তবে বাসে তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী নেই। এর পর থেকে পরিবারের সদস্যরা শাহিনুরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এক ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি বাড়িতে না আসায় পরিবার থেকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তখন ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফোন বন্ধ পাওয়ায় পরিবারের দুশ্চিন্তা বাড়ে। বেশ কয়েকজন পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখেন, স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস পিরিজপুর আসেনি। রাত ১১টার দিকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোনে বলা হয় যে শাহিনুর মারা গেছেন এবং মরদেহ হাসপাতালে আছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাত পৌনে ১১টার দিকে দুই ব্যক্তি শাহিনুরকে হাসপাতালে নিয়ে যান। দুজনের মধ্যে একজন জরুরি বিভাগের তথ্য বইয়ে নিজের নাম আল আমিন লিপিবদ্ধ করান। বাড়ির ঠিকানা দেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার।
তখন কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিলেন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তাজনিনা তৈয়ব। তিনি শাহিনুরকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই শাহিনুরের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা লক্ষ করেছি শাহিনুরের ঠোঁটের ডান পাশে এবং বাম চোখের নিচে চামড়া উঠে আছে। দুই হাতে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। শরীরের আরও কিছু অংশে ফোলা পাওয়া যায়।
এদিকে ধর্ষণের পর বাসের কর্মীরা শাহিনুরকে হত্যা করেছে গ্রামে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে আজ মঙ্গলবার সকালে বাহেরচর থেকে গ্রামবাসী পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস ভাঙচুর করেন। পরে পিরিজপুর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ আছে।
স্বর্ণলতা পরিবহনের তত্ত্বাবধায়ক মো. পাভেল বলেন, গত সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার রফিক মিয়া ফোন করে সমস্যার কথা জানান। এরপর তিনি বাসের চালক নুরুল ইসলাম ও চালকের সহযোগী লালনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। চালক ও চালকের সহযোগী স্বর্ণলতা পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে ওই নারীকে কিছু করার কথা অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, ওই নারী বাস থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড থেকে পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড ১০ মিনিটের পথ। এই সামন্য পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মেয়েটি কেন বাস থেকে লাফ দেবেন, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর মো. পাভেল দিতে পারেননি। তবে তিনি দাবি করেন, বাস কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চালক ও চালকের সহযোগী কটিয়াদী থানা-পুলিশের কাছে গিয়ে ধরা দেন।
কটিয়াদীতে থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় ড্রাইভার নূরুজ্জামান (৩৯), হেলপার লালন মিয়াকে (৩৩) গ্রেফতার করা হয়েছে। শাহিনুরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ব্যাগ, কাপড় চোপড় পাওয়া গেছে। ময়না তদন্তের জন্য লাশ কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়। ময়না তদন্তের রিপোর্টে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হবে। তবে তার হাত, মুখ ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।