demo
Times24.net
অরিত্রির আত্মহনন : ক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল ভিকারুননিসা
Wednesday, 05 Dec 2018 19:44 pm
Times24.net

Times24.net

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : অরিত্রি অধিকারীর আত্মহননের ঘটনায় চলমান ক্ষোভে বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিন গতকাল বুধবার উত্তাল হয়ে উঠেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আক্তার ও শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে দোষী সাব্যস্ত করে বরখাস্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অরিত্রি অধিকারী আত্মহত্যা মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যবস্থা নিতে র‌্যাব-পুলিশকে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, শিক্ষার্থীর আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনের মধ্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড শাখার ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক ও গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি মুশতারি সুলতানা এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনায় মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে না, আমরাও সমব্যথিত। এ কারণেই আমাদের এ সিদ্ধান্ত। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
মুশতারি সুলতানা বলেন, প্রয়োজন বন্ধের দিন অথবা শুক্রবার ক্লাস নেয়া হবে। এছাড়া যখন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে তখন এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে। মেয়েদের স্বার্থেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মিডিয়ার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানাবেন না। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দুই-একজনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকতে পারে, কিন্তু সবার বিরুদ্ধে নয়। যাদের বিরুদ্ধে এমন অভেযোগ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
এর আগে সহপাঠী শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ দিয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করার প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। সহপাঠীর আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে বেইলি রোড শাখার গেটের বাইরে বসে পড়ে তারা। এসময় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ৬ দফা দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা প্রিন্সিপালসহ বাকি অভিযুক্ত শিক্ষকদের পদত্যাগের লিখিত আদেশ দেওয়াসহ ৬ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-অভিযুক্ত শিক্ষকদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, স্কুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, কথায় কথায় টিসি দেওয়ার ভয় দেখানো যাবে না, মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে কাউন্সিলিং করাতে হবে, ভিকারুননিসার গভর্নিংবডির সব সদস্যকে অপসারণ করতে হবে।
এদিকে, অরিত্রির আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে ‘প্রমাণিত’হওয়ায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে র‌্যাব ও পুলিশকে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বুধবার র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে এ চিঠি পাঠানো হয়।
এছাড়াও অরিত্রি অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আক্তার ও প্রভাতী শাখার শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে দোষী সাব্যস্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। দুপুরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপাশির ও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ তুলে ধরেন। র‌্যাব ও পুলিশের কাছে পাঠানোর চিঠির সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন যুক্ত করে দোষী সাব্যস্ত তিন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
সূত্র জানায়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় কারও কোনো প্ররোচনা ছিল কি-না তা তদন্ত করবে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বুধবার দুপুরে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় এখনও কেউ আটক কিংবা গ্রেফতার হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, ভিকারুননিসার শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিন জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে জন্য ৯ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার মামলার এজহারটি গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বহুদিন ধরে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নেই। একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দেয়া হয়েছে। আমরা বারবার তাগিদ দেয়া সত্তে¡ও নিয়ম অনুসরণ করে তারা অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়নি। এটাও একটা বড় ধরনের অনিয়ম। তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করে। স্কুলের জন্য একটা সংখ্যা নির্ধারিত আছে। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর খবর নিয়ে জেনেছি যে, এখানে শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে ১০ লাখ টাকা লাগে। সেটা বন্ধ করার জন্য লটারি সিস্টেম চালু করি। দেখা গেছে, ভর্তির যে অনুমতি আছে, এর চেয়ে অনেক শিক্ষার্থী বেশি ভর্তি করে ফেলে। এটা আরও বড় অনিয়ম। আমরা শাখার অনুমোদন দেই না, দেখা যায় তারা (ভিকারুননিসা) শাখা খুলে ফেলেছে। এই তথ্যগুলো কেউ বলে না। কোনো অভিভাবক এসব বিষয়ে অভিযোগ করতে চান না।
নুরুল ইসলাম নাহিদ আরও বলেন, নানা কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। আমার সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি-আমাদের পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত ছিল, আমাদের কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা যাবে না। এটা অপরাধ। এটা করে যারা শাস্তি পেয়েছেন, তো পেয়েছেন। আর যারা করবেন আরও বেশি করে শাস্তি পাবেন, আমরা এখন থেকে আরও বেশি অ্যালার্ট হব, আরও নজরদারি করব। তিনি বলেন, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে চেহারা মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়েছে, তা মানুষের দৃষ্টি খুলে দেবে। ইচ্ছা মতো যা খুশি করার যে প্রবণতা সেটা রুখে দেয়া সম্ভব হবে।
অরিত্রির আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে তারা বাবা দিলীপ অধিকারী বলেন, অরিত্রির স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। গত রোববার সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় তার কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এ জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের ডেকে পাঠায়। সোমবার স্কুলে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়, অরিত্রি মোবাইল ফোনে নকল করছিল, তাই তাকে বহিষ্কারের (টিসি) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমার মেয়ের সামনে আমাকে অনেক অপমান করে। এ অপমান এবং পরীক্ষা আর দিতে না পারার মানসিক আঘাত সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রি।