বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯
Monday, 10 Jun, 2019 09:33:11 am
No icon No icon No icon
এটিএম বুথে জালিয়াতি

৯ বুথ থেকে ১৪ লাখ টাকা নিয়েছে চক্র

//

৯ বুথ থেকে ১৪ লাখ টাকা নিয়েছে চক্র


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অটোমেটেড টেলার মেশিনে (এটিএম) জালিয়াতি করে বুথ থেকে টাকা  হাতিয়ে নেওয়া চক্রের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা এখনো বের করতে পারেননি তদন্তকারীরা। জালিয়াতির ঘটনায় ইউক্রেনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হলেও ভিতালি ক্লিমচাক নামের আরেকজন পালিয়ে যায় অভিযানের সময়। গতকাল রবিবার পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তার ইউক্রেনের পাসপোর্টসহ (নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) বিস্তারিত তথ্য বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে সরবরাহ করেছেন তদন্তকারীরা। গতকাল পর্যন্ত ভিতালির দেশ ছাড়ার তথ্য ছিল না ইমিগ্রেশনে। এ কারণে তদন্তকারীদের ধারণা, স্থানীয় সহযোগীদের আশ্রয়ে লুকিয়ে আছে সে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুটি বুথে জালিয়াতি ধরা পড়লেও পরে নিশ্চিত হওয়া গেছে জালিয়াতচক্র ৯টি বুথ থেকে ১৪ লাখেরও বেশি টাকা তুলে নিয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ছয় ইউক্রেনীয়র কাছে থেকে কোনো টাকা উদ্ধার না হওয়ায় তদন্তকারীরা অনেকটাই নিশ্চিত, ওই জালিয়াতিতে সাত ইউক্রেনীয় ছাড়াও আরেকটি দল আছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র্রে এটিএম বুথে ‘জেক পর্টিন সিস্টেম’ নামে নতুন ধরনের এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এর সূত্র ধরে তদন্ত করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ‘হিডেন কোবরা’ জড়িত বলে শনাক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তদন্ত সংস্থা। ‘ফাস্টক্যাশ ক্যাম্পেইন’ নামে চালানো ওই জালিয়াতির আগাম তথ্য বাংলাদেশের পুলিশকেও জানায় মার্কিন সংস্থাটি। গত ৩০ মে বাংলাদেশে আসা সাত ইউক্রেনীয়র ঈদের ছুটিতে বুথে রাখা বেশি পরিমাণে টাকা হাতিয়ে ৬ জুন ভারতে চলে যাওয়ার কথা ছিল।
দেশীয় সহযোগীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি হিডেন কোবরার নেটওয়ার্কও বের করার চেষ্টা করছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তকারীরা। এ জন্য তাঁরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিচ্ছেন। বিশ্বের ৮০ শতাংশ এটিএম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনসিআরের সহায়তাও নিচ্ছেন তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিষ্ঠানের মেশিনই দেশীয় পরিবেশকের মাধ্যমে নিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
এদিকে ইউক্রেনের নাগরিকরা রুশ ভাষা জানে। ফলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দোভাষীও সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ৩ জুন ছয়জনের তিন দিনের রিমান্ড (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) মঞ্জুর হলেও প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় গতকাল পর্যন্ত তাদের রিমান্ডে নেয়নি ডিবি।
ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, ‘চতুর আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খোলেনি। তাই আমরা তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছি। দেশীয় লিংকও যাচাই করছি। প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো তদন্ত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও কম্পিউটার কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আসামিরা রুশ ভাষা জানে। এ জন্য দোভাষীও জোগাড় করা হয়েছে। প্রস্তুতি নিয়ে তাদের রিমান্ডে নিয়ে আসব।’ তিনি আরো বলেন, ‘পলাতক ভিতালিকে ধরতেও অভিযান চলছে। তার ব্যাপারে বন্দরগুলোতে এবং বিভিন্ন ইউনিটে মেসেজ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বুথ থেকে কোনো প্রকার তথ্য ছাড়াই টাকা তুলে নেওয়ার জালিয়াতি ধরা পড়ে। একে বলা হয়, ‘জেক পর্টিন সিস্টেম’। পরে আরো কয়েকটি দেশে ঘটে এমন ঘটনা। বাংলাদেশে ধরা পড়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তদন্ত সংস্থা বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশকে তথ্য দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, উত্তর কোরীয় হ্যাকার গ্রুপ হিডেন কোবরা অভিনব ব্যাংক জালিয়াতির পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশে বেশি এটিএম বুথ আছে—এমন ব্যাংক এদের টার্গেটে। বিশ্বের শতাধিক দেশে এই জালিয়াতির পরিকল্পনা করছে হ্যাকাররা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফাস্টক্যাশ ক্যাম্পেইন’। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গত ২৯ মে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক করে। প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে গত ৩০ মে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও করে সিআইডি। এরপর সতর্কতা বাড়ায় ব্যাংকটি। ফলে বড় ধরনের জালিয়াতির আগেই ধরা পড়ে চক্রটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিচার্ভ চুরির ঘটনায়ও হিডেন কোবরার নাম এসেছিল। এ কারণে তদন্তকারীরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
সিআইডির বিশেষ সুপার (এসএস) মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিবির পাশাপাশি আমরাও এই জালিয়াতির ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছি। শিগগিরই মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে আর্থিক জালিয়াতির বিষয়ে তদন্ত শুরু করব।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, জালিয়াতির জন্য ৩০ মে টু্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসে সাত ইউক্রেনীয়। ঈদের ছুটির সময় ঢাকায় জালিয়াতি করে ৬ জুন ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। সতর্ক থাকায় বাড্ডার বুথে জালিয়াতি টের পেয়ে যায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে একটি বুথ থেকে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য ছিল তাদের কাছে। তদন্ত চলাকালে দেখা গেছে, জালিয়াতচক্র খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, র‌্যাডিসন হোটেল, বারিধারাসহ ৯টি এলাকার বুথে হানা দেয়।
এসব বুথ থেকে ১৪ লাখ টাকারও বেশি তুলে নিয়েছে তারা। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনের কাছে কোনো টাকা বা বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়নি। জালিয়াতি করার সময় তারা নিজেদের মোবাইল ফোনে রোমিংয়ের মাধ্যমে কারো সঙ্গে কথা বলে। ধারণা করা হচ্ছে, চক্রের অন্য সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে জালিয়াতির জন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা। এ জন্য চক্রের সব সদস্যকে শনাক্ত করতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
সূত্র মতে, আগে এটিএম কার্ড ক্লোন করে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। তবে এই হ্যাকার গ্রুপ বিশেষ কার্ডটি ম্যালওয়ারে প্রবেশের মাধ্যমে মেশিনটি হ্যাক করেছে। এর ফলে মূল সার্ভার থেকে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মেশিন থেকে তখন ইচ্ছামতো টাকা তোলা যায়। অথচ এর কোনো তথ্য মূল সার্ভারে যায় না। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ ৩১টি ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের এনসিআর কম্পানির এটিএম ‘টেকনো মিডিয়া’ নামের একটি পরিবেশকের মাধ্যমে কিনেছে। দেশে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান এর পরিবেশক। তদন্তকারীরা এনসিআরকে বাংলাদেশে নতুন জালিয়াতির খবর জানিয়েছে। আগামী ১৮ বা ১৯ জুন ওই মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল তদন্তে সহায়তা করতে আসবে বলে জানিয়েছে। গতকাল ডিবি, সিআইডি ও কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য জালিয়াতি হওয়া কয়েকটি মেশিন থেকে আলামত সংগ্রহ করেছেন।
গত ৩১ মে রাতে বাড্ডার ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে মুখোশ ও টুপি পরে ঢুকে দুই বিদেশি কোনো রেকর্ড ছাড়াই তিন লাখ টাকা তুলে নেয়। ১ জুন রাতে একইভাবে খিলগাঁওয়ের তালতলায় বুথে টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে দুজন। নিরাপত্তাকর্মীর হাত ফসকে পালিয়ে যায় একজন। আটক দেনিশ ভিতোমস্কির দেওয়া তথ্যে পান্থপথের একটি হোটেল থেকে ভালেনতিন সোকোলোভস্কি, ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি, নাজারি ভজনোক, সের্গেই উইক্রাইনেৎস ও আলেগ শেভচুককে গ্রেপ্তার করে ডিবি। আগেই সটকে পড়ে ভিতালি ক্লিমচাক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ডিবির করা মামলায় ৩ জুন ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত ছয়জনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সূত্র: কালের কণ্ঠ।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK