বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯
Sunday, 21 Apr, 2019 10:50:15 am
No icon No icon No icon

উন্নয়নের নামে অপরিণামদর্শী প্রকল্প নেয়া উচিত নয়

//

উন্নয়নের নামে অপরিণামদর্শী প্রকল্প নেয়া উচিত নয়


ড. মাহবুব উল্লাহ্: প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের আবশ্যকীয় শর্ত। কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়। প্রবৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা, দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে কিনা ও শ্রেণীতে শ্রেণীতে এবং অঞ্চলে অঞ্চলে বৈষম্য কমছে কিনা এসব বিষয়গুলোও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশে হাল আমলে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। সরকারের হিসাবের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধির হিসাবে হেরফের আছে। তা সত্ত্বেও বলা যায়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবের অঙ্কটিও বেশ ভালো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
এ কারণেই এই প্রবৃদ্ধিকে বলা হয় Jobless Growth, যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা প্রধানত অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের বিশাল বিনিয়োগের ফল। এই বিনিয়োগের গুণাগুণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। প্রকল্পগুলোতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় তার তুলনায় আরও কম ব্যয়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব বলে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন। সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার ফলে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে সন্তোষজনক বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে, সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ যদি গতি পায় তাহলে অব্যাহতভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হতে পারে।
গত কিছুদিন ধরে শেয়ারবাজারের সূচকে নিম্নগতির প্রেক্ষাপটে অদূরভবিষ্যতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বেগবান হবে বলে আশা করা যায় না। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অব্যাহতভাবে বিদেশে অর্থ পাচার চলছে। এর ফলে অর্থনীতি রক্তশূন্যতায় পড়তে পারে। বিদেশে অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ আস্থার ঘাটতি। এ আস্থার ঘাটতির উৎস কোথায় সেটাও গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। সরকারি খাতে বিনিয়োগের অর্থায়ন হয় রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে। বাংলাদেশে রাজস্ব জিডিপির অনুপাতেও হতাশাব্যঞ্জক। রাজস্ব আদায়ে সঠিক কলাকৌশল ও প্রণোদনার অভাবে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রায়শই অর্জিত হয় না।
ফলে অর্থবছরের শেষ পাদে এসে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার নিম্নমুখী সংশোধন করতে হয়। রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার একটি বড় কারণ দুর্নীতি। কিন্তু দুর্নীতি রোধ করা খুব সহজসাধ্য নয়। আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলেই এসব বিপত্তি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। গোষ্ঠীতন্ত্র ও স্বজনতন্ত্র আইনের শাসন নিশ্চিত করার পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
কেবল প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে আলোচনা করাই আজকের কলামটির উদ্দেশ্য নয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি অর্জনে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হল সঠিক মাত্রায় অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত জোগান দিতে না পারা। উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয় লব্ধ আয় থেকে ভোগের অঙ্ক বাদ দিয়ে। অর্থনীতিবিদরা উদ্বৃত্তকে দুইভাগে ভাগ করে দেখেন। এর একটি হল প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত এবং অপরটি হল সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত। সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রাপ্ত উদ্বৃত্তের তুলনায় বেশিই হয়ে থাকে। অপচয়ধর্মী ও বিলাসী ব্যয় হ্রাস করা গেলে প্রাপ্ত উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আমীর-ওমরা, ভূস্বামী-জমিদার এবং নোংরা ধনীদের ভোগ-বিলাসের অন্ত নেই। এই ভোগ-বিলাসের রাশ টেনে ধরতে পারলে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অপচয়ধর্মী ব্যয়ের পরিমাণ বিরাট অঙ্কের- একথা মানতেই হবে। যদিও এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।
ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উৎসা পাটনায়েক কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেই সময় তিনি ঢাকার রাস্তায় দামি বিলাসবহুল গাড়ির মিছিল দেখে হতাশ হয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন, এভাবে ভোগ-বিলাসে চলতে থাকলে দেশ কিভাবে উন্নত হবে। তার এই উক্তির যথার্থতা অস্বীকার করা যায় না। দামি পোর্শে গাড়ির পরিবর্তে কাজ চালানোর উপযোগী গাড়ি ব্যবহার করলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রাও বাঁচে এবং আমদানি ব্যয় কমানো যায়।
এভাবে শত শত দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। যেসব বিলাসী ব্যয় আমাদের দেশের ধনীরা করে তা না করলে বিনিয়োগের জন্য উদ্বৃত্ত সম্পদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হতো এবং দেশে কর্মসংস্থান পরিস্থিতিরও উন্নতি হতো। প্রখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এরিখ হবসবম তার একেকটি গ্রন্থের নামের সঙ্গে অমব শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন। যেমন Age of Revolution, Age of Empire, Age of Extremes ইত্যাদি। তার প্রতিটি গ্রন্থই সুখপাঠ্য এবং অন্তরভেদী বিশ্লেষণে সমুজ্জ্বল।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বাংলাদেশের জন্য কোনো ইতিহাসবিদ যদি একটি গ্রন্থ রচনা করত যার শিরোনাম হতো Age of Filthy Rich অর্থাৎ নোংরা ধনীদের যুগ, তাহলে বাংলাদেশোত্তরকালে নোংরা ধনীরা দেশের কী সর্বনাশ করেছে তা ফুটে উঠত। ব্যক্তিগতভাবে আমি Genuine Rich বা খাঁটি ধনীদের ব্যাপারে কোনো বিদ্বেষ পোষণ করি না। ধনী হওয়া চারিত্রিকভাবে দোষের কিছু নয়। তবে এই ধনীরা ধনী হবেন নিজস্ব কৃচ্ছ সাধন, বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে। ব্যাংক ঋণখেলাপি হয়ে নয়। কারণ মানুষ তো দরিদ্র থাকার জন্য পৃথিবীতে আসেনি। আমাদের কামনা সব মানুষের জীবনেই সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতা আসুক।
প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার একটি বড় কারণ অপচয়ধর্মী এবং অদূরদর্শী বিনিয়োগ। এ ধরনের বিনিয়োগ অনেক সময় নিষ্ফল হয়ে যায় সম্পূরক উপকরণের অভাবে। যেমন- বাংলাদেশের অনেক হাসপাতাল সম্পর্কে গণমাধ্যম থেকে জানা যায়,- এক্সরে মেশিন, রেডিয়েশন থেরাপি মেশিন, সিটিস্ক্যান মেশিন বা এমআরআই মেশিন বিদেশ থেকে আমদানি করার পর বাক্সবন্দি রয়েছে এবং মরচে ধরে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এগুলো বাক্স বা প্যাকেট থেকে কখনই খোলা হয়নি। কারণ উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের অভাব। যুগপৎ মেশিন এবং মেশিনের প্রয়োগ করার মতো লোকবলের ব্যবস্থা না করে শুধু মেশিন আমদানিতে দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ যাদের মাধ্যমে আমদানি করা হয় তারা বিরাট অংকের কমিশন পায়। এই কমিশন আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ক’দিন পর রাস্তার আইল্যান্ড পরিবর্তন এবং খোঁড়াখুঁড়িও অপরিণামদর্শী ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার ১৭ এপ্রিল ২০১৯-এর সংখ্যায় প্রধান শিরোনামটি হল, ১২০০ কোটি টাকা গচ্চা। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস নেই জেনেও পাইপ লাইন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫ জেলায় গ্যাস দিতে অবাস্তব ২টি প্রকল্পের কাজ চলেছে ৪ সরকারের আমল জুড়ে। খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫ জেলায় গ্যাস সরবরাহের জন্য গত ৪টি সরকার ১,২০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু ১৪ বছরেও ওই এলাকায় গ্যাস যায়নি। এখন গ্যাস সরবরাহের প্রকল্পই বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ এই জেলাগুলোতে গ্যাস দেয়ার মতো গ্যাস দেশে নেই।
হয়তো রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এ প্রকল্পটি করা হয়েছিল। বিস্ময়ের বিষয়, একের পর এক চারটি সরকার এই প্রকল্পের জন্য অর্থ ব্যয় করতে বিবেকের দংশন অনুভব করেনি। যথাযথ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে এ রকম আরও অনেক প্রকল্প রয়েছে। লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি, নিজেদের লোকজনকে কিছু পাইয়ে দেয়ার অসৎ পন্থা এবং দুর্নীতি করার অভিপ্রায় থেকেই এ ধরনের অপচয়ধর্মী এবং অপরিণামদর্শী প্রকল্পের উদ্ভব হয়। উন্নয়নের নামে এ ধরনের উন্নয়নের ছেলেখেলা রোধ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK