শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Wednesday, 12 Jun, 2019 06:48:47 pm
No icon No icon No icon

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র দৌরে অভিযুক্ত শিক্ষকরা

//

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র দৌরে অভিযুক্ত শিক্ষকরা


টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে নিয়োগের জন্য মন্ত্রনালয় থেকে সুপারিশ করা হয়েছে ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এক শিক্ষক ও আর্থীক দূর্নীতিতে অভিযুক্ত অন্য এক শিক্ষক। একজন হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব ও অন্যজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগে অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। এর মধ্যে ড. মাহবুব শুধু ভর্তি জালিয়াতি নয় আর্থিক অনিয়ম, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ব্যাক্তি জীবনে বিয়েও করেছেন তিনি তিনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নেতার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে দশ বছর ধরে বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে। এই দশ বছরে কোন আয় ব্যয়ের হিসাব না দিয়ে নিজের মতই পরিচালনা করছেন কোর্সটি। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার আবেদন করেছেন বিভাগের শিক্ষকরা। তবে কোন সমাধান হয়নি। এই কোর্সের আয়-ব্যয়ের হিসাবে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এবার তাকেই সম্প্রতি শূণ্য হওয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যায় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  এক শিক্ষককে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থীক অনিয়ম, নম্বর টেম্পারিং, যৌন হয়রানীসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের মুখে ভিসিকে পদত্যগে বাধ্য করানো এমন একটি বিশ্ববিদ্যাল অভিযুক্ত শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিলে আবারে আন্দোলন হতে পারে বলে আসঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের ২০০৩-২০০৪ সেসনের পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও টেবুলেটর ছিলেন অধ্যাপক মাহবুব। ওই পরীক্ষায় লিখিত অবৈধ ভর্তির নিয়ম না মানার অভিযোগের প্রমান পায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তদন্ত শেষে ৩০-১২-২০১০ তারিখে সিন্ডিকেটে তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শাস্তি হিসেবে তাকে তিরষ্কার, ভবিষ্যতের জন্য শতর্ক করা এবং পরবর্তী দুই বছর টেবুলেটিং ও সব ধরনের পরীক্ষা কমিটির কাজ থেকে তাকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আরো জানা যায়, গত ৬-২-২০১৮ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে ‘বিভাগীয় কারিকুলাম প্রণয়ন’ সভার সিদ্ধান্ত অনুযাই অধ্যাপক মাহবুবকে বিভাগের কারিকুলাম, বিভাগীয় রেজাল্যুশন ও ব্যয় হিসাব একই বছরের ৩০ এপ্রিল আইকিউএসি-ঢাবি (IQAC-DU) কার্য্যালয় জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছিলো। ওই সময়ের মধ্যে তিনি জমা দেননি। এর পর আবারো চিঠি দিয়ে তাকে ২৫-২-২০১৯ তারিখে জমা দেয়ার কথা বলা হলেও তিনি অদ্যবধি তা জমা দেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি সূত্র জানায়, সান্ধ্যকালিন কোর্সের প্রধান হিসেবে একজন শিক্ষত তিন বছর থাকতে পারেন। কিন্তু অধ্যাপক মাহবুব প্রভাব খাটিয়ে প্রায় দশ বছর ধরে প্রধান হিসেবে আছেন। ওই কোর্স থেকে আয়ের হিসেবেও গড়মিল থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে আরো জান যায়, ওই বিভাগেরই একজন নারী শীক্ষিকা অধ্যাপক মাহবুবের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও তার প্রথম স্ত্রী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে নম্বর পছন্দের স্টুডেন্টদের বেশি নম্বর আর অপছন্দের স্টুডেন্টদের কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্য দিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে প্রস্তাবিত অপর শিক্ষক ড. মিজানুর আর্থীক দূর্নীতিতে অভিযুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগে দুই বছর মেয়াদি একটি প্রোগ্রাম চালু করেছে; যার নাম মাস্টার্স অব অ্যাকাউন্টিং ইন ট্যাক্সেস (ম্যাট)। এ প্রোগ্রামের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। যিনি কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ না করে অননুমোদিত অসংখ্য খাতে ব্যয় দেখিয়ে ‘ভুতুড়ে’ বিল দিয়েছেন প্রায় কয়েক লাখ টাকার। ফলে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরী বেশ কিছু বিলে স্বাক্ষর করেননিএ। বিভাগের সর্বোচ্চ ফোরাম অ্যাকাডেমিক কমিটির (এসি) সভায় অ্যাজেন্ডাভুক্ত আলোচনা হয়। ভুতুড়ে বিল যাচাইয়ে গঠিত কমিটি আর্থিক অসঙ্গতি পেয়েছে উল্লেখ করে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট বা অসম্মতি জানিয়েছেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন। ম্যাট প্রোগ্রামের পরিচালকের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে অন্য শিক্ষকেরাও ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারা অবিলম্বে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ম্যাট প্রোগামের পরিচালক হিসেবে অনেক সিনিয়র শিক্ষককে ডিঙিয়ে ড. মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রোগ্রামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাপানের একজন অধ্যাপককে তিনি অতিথি হিসেবে নিয়ে আসেন। এই জাপানি অধ্যাপককে অতিথি করা নিয়ে বিমানে যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ দেখিয়েছেন তিনি। বিদেশী অধ্যাপককে অতিথি করার ব্যাপারে বিভাগের এসি কমিটির অনুমোদন নেয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। জাপানি অধ্যাপককে অতিথি করার বিনিময়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে অধ্যাপক মিজানুর রহমানও জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন মাস শিক্ষকতা এবং জাপানে যাতায়াত করেছেন বলে অভিযোগ। ওই সময় অ্যাকাউন্টিং বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হাকিম। যিনি সম্পর্কে মিজানুর রহমানের ভাইরা হন। ফলে তার কাছে কোনো বিল গেলে কিছু না দেখেই তিনি তাকে স্বাক্ষর করতেন। পরে বিভাগের চেয়ারম্যান হন অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান। তিনিও যথারীতি বিলে স্বাক্ষর করতেন। কিন্তু কিছু দিন আগে তার কাছে কয়েকটি বিলের পরিমাণ অস্বাভাবিক মনে হলে তিনি আর স্বাক্ষর দেননি। এভাবে প্রায় দেড় মাসে অন্তত ১৮টি অননুমোদিত খাতে লক্ষাধিক টাকার বিলিং করেছেন প্রোগ্রাম পরিচালক মিজানুর রহমান। তবে বিলের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানা যায়নি। বিভাগ সূত্র জানায়, ম্যাট প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য তিনজনের একটি সমন্বয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ড. মিজানুর রহমান পরিচালক, ড. হামিদ উল্লাহ ভুঁইয়া সহযোগী পরিচালক আর বিভাগের চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে সদস্য। ম্যাট প্রোগ্রাম পরিচালনা তথা ভর্তি পরীক্ষা নেয়া, প্রশ্নপত্র তৈরি করা, সিলেবাস প্রণয়ন, ক্লাস রুটিন তৈরি, শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ তৈরিসহ বিভাগীয় অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা শিক্ষকেরা বিশেষ দায়িত্ব হিসেবে সম্পাদন করেন। এ জন্য তারা বেতনভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু ম্যাট প্রোগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান এসব খাতে আলাদা করে বিল তৈরি করেছেন। এমনকি ম্যাট প্রোগ্রামে ভর্তি পরীক্ষার খাতা অন্য শিক্ষক দেখার পরও ওই শিক্ষক এবং পরিচালক নিজের নামে বিল করেছেন। বিভিন্ন বিলের অসঙ্গতি চিহ্নিত করতে ৫ সদস্যের একটি যাচাই কমিটি করা হয়।
এ কমিটির আহ্বায়ক হলেন বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহমিনা খাতুন। সদস্যরা হলেন, অধ্যাপক ড. ধীমান কুমার সরকার, অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান, অধ্যাপক ড. মাহমুদা আক্তার ও অধ্যাপক ড. মো: মহব্বত আলী। সম্প্রতি ট্যাক্স নীতির ওপর একটি সেমিনারের আয়োজন করেন তিনি। যদিও সেমিনারের ব্যাপারে বিভাগের চেয়ারম্যান বা এসি মিটিংয়ে অনুমোদন নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ। তবুও এই সেমিনারের অতিথিদের জন্য ঢাকা ক্লাব থেকে দুপুরের খাবার বাবদ ১ লাখ টাকার বিল নিয়েছেন অধ্যাপক মিজানুর রহমান।
অ্যাকাউন্টিং বিভাগের এসি মিটিংয়ে অধ্যাপক মিজানুর রহমানের ভুতুড়ে বিল তথা অননুমোদিত খাতে অতিরিক্ত বিল করা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। আর্থিক অসঙ্গতি যাচাই কমিটি একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনও জমা দেন; যাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, অধ্যাপক মিজানুর রহমান যেসব খাতে বিলের যে ভাউচার করেছেন তাতে অসঙ্গতি রয়েছে। ম্যাট প্রোগ্রামে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া, প্রশ্নপত্র তৈরি করা, সিলেবাস প্রণয়ন, ক্লাস রুটিন তৈরি, শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ডাটাবেজ তৈরি করা বিষয়ে তিনি আলাদা বিল জমা দিয়েছেন। অথচ এ জন্য সমন্বয় কমিটি ও স্টাফ রয়েছে। এসব কাজ তারাই করেন। যেসব খাতে ভুতুড়ে বিল করে টাকা নিয়েছেন সেগুলো বিভাগে ফেরত দেয়ার সুপারিশ করেছে যাচাই কমিটি। পাশাপাশি অসচেতনভাবে অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি অ্যাকাডেমিক কমিটিকে পুনর্বিবেচনার (ক্ষমা) কথা বলা হয়।

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK