সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
Thursday, 08 Nov, 2018 11:24:41 pm
No icon No icon No icon

মিশরীয় কপটিকস সম্প্রদায়


মিশরীয় কপটিকস সম্প্রদায়


জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা :মিশরের মিনইয়ায় একটি মঠে যাওয়ার সময় কপটিক খ্রিস্টানদের বহনকারী বাসে হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৭ জন নিহত হয়েছে।এ ঘটনায় ১২ জনের বেশি আহত হয়েছেন।এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। খবর রাশিয়া টুডের। নিরাপত্তা বাহিনীর এক সূত্রে জানা যায়, বাসটি আনবা স্যামুয়েল থেকে মিনায়ার উদ্দেশে যাচ্ছিল।সে সময় মিশরীয় এক গণমাধ্যম সুত্র জানিয়েছিল যে, দুইটি বাস ও একটি ট্রাকে করে কপটিক খ্রিস্টানরা মিনায়া প্রদেশের খ্রিস্টান অধ্যুষিত এক গ্রামে যাচ্ছিল।তাদেরকে লক্ষ্য করে কমপক্ষে দশজন হামলাকারী প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে থাকে।

মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাতাহ আল-সিসি খ্রিস্টানদের ওপর এই হামলার পর সিনাই উপদ্বীপে ইসলামিস্ট জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।টুইটারে একটি পোস্টে তিনি লিখেন, আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি এবং কালো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

মিশরে কপটিক খ্রিস্টানরা প্রায় সময়েই সন্ত্রাসীদের হামলার স্বীকার হন।গত আগস্টে কপটিক খ্রিস্টানদের চার্চে বোমার হামলা চালানো হয়।সম্ভাব্য আত্মঘাতী এ বোমা হামলা ব্যর্থ হয়।কারণ ওই হামলায় যে বোমা বিস্ফোরণ হয় তাতে শুধু হামলাকারী নিহত হয়।

এর আগে ২০১৬ সালে একটি খ্রিস্টান চার্চে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়।এ বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়।এরপর ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাম সানডেতে কায়রোর দুটি কপটিক চার্চে দুটি আত্মঘাতী হামলায় কমপক্ষে ৪৭ জন নিহত হয়েছিলেন।

মিশরের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী জনগন কপটস (Copts) নামে পরিচিত।এদের ভাষাটিও কপটস বা ‘কপটিক’ নামে পরিচিত।কপটসদের বিশ্বাস অনুযায়ী এদের শিকড়টি প্রোথিত প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ।কপটসরা ধর্মে খ্রিস্টান হলেও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণে ইহুদি সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে।মিশরের জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েও আজও কপটিকরা নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছে।চিহ্নিত জঙ্গীগোষ্ঠীর আক্রমনের পর্যুদস্ত কপটসরা মিশরের এমন এক শিকড়সংলগ্ন জাতিগোষ্ঠী- যাদের ভাষার বর্ণমালার মূলে রয়েছে গ্রিক ভাষার অক্ষর।

খ্রিস্টপূর্ব সময়ে গ্রিকরা মিশরকে বলত Aigyptioi. যা ইংরেজিতে Egyptos অথবা Egypt. এই শব্দের উৎস প্রাচীন মিশরের শব্দ: ‘হুট-কা-তাহ’ ।প্রাচীন মিশরের রাজধানী ছিল মেমফিস। ‘হুট-কা-তাহ’ শব্দ দিয়ে এই মেমফিসকেই বোঝাতো ।আরবরা মিশর জয় করে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে। মিশরীয়দের তারা বলত Gypt; এই শব্দের উৎস হল গ্রিকদের Egypt শব্দটি. এই ইজিপ্ট শব্দটিরই আর একটি আরবি প্রতিশব্দ হল qubt ।এই qubt শব্দটির অর্থ-‘মিশরীয়’।Copt শব্দটির উদ্ভব এই আরবি qubt শব্দ থেকেই।

কপটিকরা ধর্মে খ্রিস্টান। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে প্রথম খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করা হয়েছিল। এই কারণে মিশরের কপটিকদের ইতিহাস আলেকজান্দ্রিয়া শহরটির সঙ্গে সর্ম্পকিত। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ইহুদিরা বসবাস করত। এদেরই কেউ কেউ প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেছিল। সময়টা খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক। মিশরে রোমান শাসন চলছিল।

সেন্ট মার্ক আলেকজান্দ্রিয়ায় এসে ‘চার্চ অভ আলেকজান্দ্রিয়া’ প্রতিষ্ঠা করলেন। এর ফলে মিশরের জগনের একটি অংশ নবপ্রচারিত ধর্মমতটি গ্রহন করে।

গ্রিকরা খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিশর জয় করেছিল। মিশরের নিজস্ব ভাষাটির বিকাশ হচ্ছিল।সে সময়ই গ্রিক বর্ণমালার সমন্বয়ে মিশরে নতুন এক ভাষার প্রচলন হয়।যে ভাষার নাম হয় ‘কপটিক’ ভাষা। যে ভাষাটি পরবর্তীকালে মিশরীয় কপটিকদের ধর্মীয় ভাষা হয়ে ওঠে এবং এই জন্য ২০০০ বছর পরে তাদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল, মিশরে খ্রিস্টানধর্ম প্রচারিত হওয়ার ফলে মিশরে কপটিক ভাষার উদ্ভব হওয়ার ফলে কপটিক ভাষায় খ্রিস্টান ধর্মচর্চা হওয়াই স্বাভাবিক।

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে কপটিক ভাষাটি আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের মিশরীয় শাখা।যার শিকড় প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় প্রোথিত।খ্রিস্টীয় তেরো শতক অবধি কপটি ভাষাটি ছিল মিশরের রাষ্ট্রীয় ভাষা ।তারপর মিশরের রাষ্ট্রভাষা হয় আরবি ভাষা।

গত ২০০০ বছর ধরে মিশরে কপটিক ভাষা এবং এই ভাষায় কথা বলা মানুষের সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে।এটিই স্বাভাবিক।কপটিকরা যেহেতু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, সে কারণেই গত ২০০০ বছর ধরে মিশরে ‘কপটিক’ খ্রিস্ট ধর্মটিরও বিকাশ হয়েছে।বর্তমানে অবশ্য কপটিকরা আরবি ভাষায় কথা বললেও এদের ধর্মীয় জীবনের ভাষা কপটিক।

মিশরে কপটিক গির্জা ‘কপটিক অর্থডক্স চার্চ’ নামে পরিচিত।কপটিক গির্জার নিজস্ব গির্জাপিতা বা পোপ রয়েছে। পোপ বাস করেন কায়রো শহরে।পোপকে ধর্মজীবনের বিধিবিধান অত্যন্ত কঠোর ভাবে মেনে চলতে হয় । পোপকে বছরে ২০০ দিনই উপবাসে কাটাতে হয়।এ সময় যে কোনও ধরণের পশুজাত খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ। যেমন দুধ, ডিম, মাংস, এবং চিজ তিনি পরিহার করেন।কপটিকদের ধর্মীয় আচরণে ইহুদি ধ্যানধারণার প্রভাব রয়েছে ।যেমন, জুতা খুলে প্রার্থনাগৃহে প্রবেশ করা বা লিঙ্গের ত্বকচ্ছেদ।এ কারণ সম্ভবত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ইহুদিরা বসবাস করত। এদের মধ্যে অনেকেই প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেছিল।মিশরের কপটিকরা অর্থডক্স, ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ে বিভক্ত।তবে ক্যাথলিকদের সংখ্যাই বেশি।

মিশরে কপটিকদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি।আরও দশ লক্ষ কপটিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হল্যান্ড, ব্রাজিল এবং এশিয়া ও আফ্রিকার নানা দেশে ছড়িয়ে আছে।মিশরে নানা প্রদেশে কপটিকরা বাস করলেও কোনও প্রদেশেই এরা সংখ্যা গরিষ্ঠ নয়।

চিহ্নিত কিছু জঙ্গীগোষ্ঠী ১৯৯০ সাল থেকে এদের ওপর নির্মম হত্যা নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। কপটিকদের ওপর অমানবিক আক্রমনের বিরুদ্ধে তাদের মুসলিম প্রতিবেশিরা তীব্র প্রতিবাদ করেছে যদিও তবে এতে লাভ হয়নি। একটি সূত্র এ বিষয়ে লিখেছে: This violence horrified Muslim neighbors who were quick to condemn the attacks, but these condemnations did little to stem the attacks - it certainly did not move the government to actually treat the Copts like real citizens worthy of protection.

তথ্যসূত্র: 
http://en.wikipedia.org/wiki/Coptic_history 
http://st-takla.org/Coptic-church-1.html 
http://www.omniglot.com/writing/coptic.htm

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK