মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Thursday, 07 Nov, 2019 09:27:14 am
No icon No icon No icon

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(৩)

//

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(৩)


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্: বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে লালনের সংগীত ও দর্শনের বিশ্বায়ণঃ মরমী সংগীত সাধক লালন সাঁইয়ের গানের সংকলন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্কের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস৷ সংকলনের নাম ‘সিটি অব মিরর, সংস অব লালন সাই', বাংলায় নাম আরশী নগর৷ মার্কিন গবেষক ড. ক্যারোল সলোমন ৩০ বছর ধরে লালনের গান নিয়ে গবেষণা করেছেন৷ তিনি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ছিলেন৷ এছাড়া তিনি পেনসিলভেনিয়া এবং শিকাগো ইউনিভার্সিটিরও প্রভাষক ছিলেন৷ ২০০৯ সালের মার্চ মাসে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান৷

 কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকেনি৷ তাঁর অনুবাদ করা লালনের গানের সংকলন বের হয়েছে তার মৃত্যুর প্রায় নয় বছর পর ২০১৭ সালে৷ আর তা সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের লালন গবেষক বাংলা একাডেমির ফোকলোর জাদুঘর এবং মহাফেজখানা বিভাগের সহপরিচালক ড. সাইমন জাকারিয়া৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত একটানা লালনের গান বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করেন ক্যারল৷ ফকির সাধুদের সঙ্গে মিশেছেন তিনি৷ 

এসব গান নিজ হাতে বাংলায় লিখেছিলেন৷ লিখেছেন শব্দার্থ, টিকা, ভাবার্থ৷ এরপর নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন৷ তাঁর মৃত্যুর পর ২০১২ সালে আমি নিউইয়র্কে যাই তাঁর ওপর বক্তৃতা করতে৷ সেখানেই তাঁর পরিবার আমাকে সংকলনটি সম্পাদনার দায়িত্ব দেন৷'' সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘‘গত ২৬ বছর ধরে আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরছি৷ এখনো সপ্তাহে তিন দিন আমি গ্রামেই থাকি৷ আগের মতই এখনো বাংলাদেশে লোকসংগীতের চর্চা বেগবান৷ কিন্তু এগুলোকে আমাদের মিডিয়া আমাদের প্রচার মাধ্যমে তুলে ধরছে না৷ এটাই সমস্যা৷''

০৮/০৮/২০১১ তারিখে বাংলা একাডেমীতে লালন দর্শন ও  সংগীতের উপর এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন লালন সাঁইয়ের তত্ত্ব ও দর্শন গবেষক সাইমন জাকারিয়া। স্বাগত ভাষণে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, লালন সম্পর্কে সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাজ আমাদের নতুন অন্তর্দৃষ্টির দ্বার উন্মোচন করবে। লালনের উদার মানবতাবাদী দর্শন যে বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব অঙ্গনে ব্যাপ্ত ‘Man of the Heart’ তারই সাক্ষ্য বহন করে। 

অনুষ্ঠানে লালন সাঁইয়ের দর্শন ও সংগীত(গান, অভিনয় ও কথা) উপস্থাপন করেন ইংল্যান্ডের লাফবোরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, দীর্ঘ পনের বছরের গবেষণা ও ক্ষেত্র সমীক্ষার ফসল তার ‘Man of the Heart’। এটি একাধারে লালনের জীবন, কর্ম, সংগীত প্রভৃতির মিশ্রণ। লালনের গান শুধুমাত্র সুরেলা বাণীরূপ নয় বরং তা একইসাথে ধারণ করে আছে রাজনীতি ও দর্শনের সুগভীর বোধ। ‘Man of the Heart’ নাট্য পরিবেশনায় আমি লালনের দর্শনকে লালনের তত্ত্ব ও গান উভয়ের যুগলবন্দি আকারে উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়েছি। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা প্রভৃতি জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে বাউল ফকিরদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আমি লালনকে নতুনভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি যে লালনকে কোনো ধরাবাধা গতিতে আবদ্ধ করা যায় না। দেশ -কাল-ধর্ম-ভাষার সংকীর্ণ সীমানা ভেদ করে অচিন পাখির মতোই লালন ছুটে চলেন দিকবিদিক। তিনি আরও বলেন, উপনিবেশবাদ আমাদের প্রত্যক্ষভাবে শোষণই করেনি, পাশাপাশি আমাদের চিন্তা কাঠামোকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই আমরা উপনিবেশি তত্ত্বের চোখে লালনকে ভুলভাবে বিশ্লেষণ করি। ‘Man of the Heart’-এ আমরা উপনিবেশি চিন্তা ও পরিবেশন কাঠামোর বাইরে গিয়ে লালনকে বোঝার চেষ্টা করেছি। 

আনুশেহ আনাদিল জোনাস হেলবর্গের সাথে কাজ করেন। তার গাওয়া গান সুশিলা রমনের “মিউজিক ফর ক্রোকোডাইল”–এ অন্তর্ভুক্ত হয়। আনুশেহ্‌ “ইন্ডিয়ান ওশান” ব্যান্ডের সাথে অভীক মুখোপাধ্যায়ের “ভূমি” সিনেমার জন্য একটি গান রেকর্ড করেছেন। তিনি তন্ময় বোসের সাথে “বাউল এন্ড বেয়ন্ড” নামে একটি গানের প্রকল্পেও কাজ করেন। আনুশেহ্‌ মাভেরিক চলচ্চিত্র-নির্মাতা Q's এর সিনেমা “তাসের দেশ” এর জন্য গান রেকর্ড করেন, যা অনেক প্রসংশিত হয়। তিনি পশ্চিমবঙ্গেও ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি ভারত, নেপাল, জার্মানী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে স্টেজ পারফর্ম করেছেন। লালন ব্যান্ড সারা বাংলাদেশে কনসার্ট করার পাশাপাশি বিদেশে বিভিন্ন স্থানে কনসার্টে অংশগ্রহন করেছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ আধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনসার্টে লালন ব্যান্ড ও সুমি 'আমি অপার হয়ে বসে আছি' গানটিসহ তিনটি গান পরিবেশন করে দেশের জন্য অনন্য সম্মান বয়ে আনেন। ২০১৭ সালে বর্ষবরণ ১৪২৩ এ ‘ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি ১৪২৩ বর্ষবরণ উৎসব’ এ ওয়াশিংটন মাতিয়ে আসে লালন। তারা ইউকে এবং শ্রীলংকায় ফেস্টিবলে গেয়েছেন। 

সুমির রক লালন সং প্রবাসী বাঙালীদের মাঝে ব্যাপক সারা ফেলেছে।
লালন তার বিস্ময়কর মরমী দার্শনিক সংগীত সাধন প্রতিভা গুণ ও শক্তির কারণে দেশবিদেশে  আধ্যাত্নিক, মানবতাবাদী সংগীত সাধক, দার্শনিক, এবং সমাজ সংস্কারক হিসাবে পরিচিত, অভিনন্দিত। আবার অনেকের কাছে লালনের জীবনাচার এবং তার মরমী বাউল দর্শন চরম বিতর্কিত। তবে লালনের প্রবল সমালোচকও লালনের কালোত্তর সংগীত প্রতিভা এবং লালন সংগীতের ভাব রসের প্রশংসা করতে এবং তাতে মজতে বাধ্য হন। 

বাংলা কাব্য ও সংগীত জগতের দুই দিকপাল ভারতের জাতীয় কবি/কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাদেশের জাতীয় কবি/বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিখ্যাত মার্কিণ কবি এলেন গিন্সবার্গ, ইংল্যান্ডের লাফবোরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, মার্কিন গবেষক ড. ক্যারোল সলোমন লালন সাঁইয়ের মরমী সংগীত এবং তার দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। সাম্যবাদের কবি হিসাবে নজরুল আজীবন হিন্দু-মুসলিম উভয়ের শাস্ত্র-ঐতিহ্য-ইতিহাস-সংস্কৃতি-সাহিত্য সমন্বয়ের সাধনা করেছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষন-অত্যাচার, নজরুলের নিজের জীবনের কঠোর দারিদ্র-কষ্টে ভরা তিক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা, ব্রিটিশ যুক্তবাংলা-ভারতের হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যকার চিরন্তণ ধর্ম-সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ-সংঘাত, রাজনীতি, সমকালীণ দেশবিদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন কাহিনী ও দর্শনের মত নজরুল লালনের বাউল সংগীত ও দর্শন থেকেও আধুনিক সুফি/কাওয়ালী, বৈষ্ণব/কীর্তণ সংগীত রচনা করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। সুদূর আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন। যার ফলে তার রচনাবলীতেও লালনের রচনা শৈলীর অনুকরণে স্বনাম দেখা যায়। এছাড়া তিনি 'After Lalon' নামে একটি কবিতাও রচনা করেন। শ্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়" গানটির অবস্থান ১৪তম। 

যুক্তপাকিস্তান আমলে ১৯৬৩ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়ার লালন আখড়া বাড়িতে "লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র" প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় "লালন একাডেমী"।
 এখান থেকে অনেক লেখক, গবেষক, শিল্পী লালনের জীবনী, সংগীত ও বাউল দর্শন, বাউলদের জীবনাচার ও সংস্কৃতির উপর গবেষনা, গ্রন্থ রচনা এবং লালন সংগীত চর্চা করেছেন। এখন প্রতি বছর আমাদের দেশে বাংলা একাডেমিতে বাংলাদেশ-ভারত বাউল সংগীত উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। একইভাবে প্রতি বছর বাংলাদেশ এবং ভারতের ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টিবলগুলোতে জনপ্রিয় বিভিন্ন লালন সংগীত গাইছেন আখড়ার বাউল, আধুনিক সংগীত শিল্পী, ব্যান্ডের গায়ক-গায়িকা, দলরা। বাংলা ও বাহক ব্যান্ডের ভোকাল আনুশেহ আনাদিল এবং লালন ব্যান্ডের ভোকাল সুমি দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সংগীত উৎসবে একক/দলীয় পারফর্ম দ্বারা লালন সংগীতকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মাঝে এবং স্বদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণের নাগরিক সমাজে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। 

উপমহাদেশের প্রখ্যাত লালন সংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীন হিন্দী ভাষাতে লালন সংগীতের এলবাম বের করেছেন। জাভেদ আকতার লালন সংগীতের হিন্দি ভাষান্তর করছেন। ভারতের কোক স্টুডিওতে আসামের পাপোন ও পাঞ্জাবের হার্সদিপ কাউরের ডুয়েট/দ্বৈত "দিনে দিনে খোসিয়া পড়িবে রঙিলা দালানের মাটি গো সাঁইজি কোন রঙে", অনুপম রায়, সত্যকি ব্যানার্জী ও বাবুল সুপ্রীয়ের ফিউশান/মিলিত সংগীত "মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষেরও সনে" গানগুলো গেয়েছেন। রেয়ান "এমন মানব জনম আর কি হবে?" গানটি সলো/এককভাবে গেয়েছেন। রবীন্দ্র ও লোক সংগীত শিল্পী শাহানা বাজপায়ীর গাওয়া লালন সংগীত 'বাড়ির কাছে আরশীনগর', 'জাত গেল জাত গেল বলে', 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি', 'তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, এমন মানব সমাজ কবে হবে?' 

'আমি অপার হয়ে বসে আছি' প্রভৃতি গান অসাধারণ সুরে গেয়েছেন দেশবিদেশের শ্রোতাদের সামনে। তাদের সমবেত প্রচেষ্টার ফলে দেশবিদেশের আধুনিক নাগরিক সমাজ লালন সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট ও ভাবিত হয়েছেন। লালন সংগীতের জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে উপমহাদেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ক্রমান্বয়ে পরিব্যাপ্ত হচ্ছে; বিশ্বায়ণ ঘটছে। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে। পরবর্তী ৩য় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল। [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK