বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯
Thursday, 24 Oct, 2019 09:42:51 am
No icon No icon No icon

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(২)

//

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(২)


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্: খ্যাতিমান ব্যক্তিদের উপর লালনের বাউল গীতি ও দর্শনের প্রভাবঃ লালনের মৃত্যুর পর তার বাউল সংগীত ও দর্শনের প্রভাব পর্যায়ক্রমে গ্রামীণ সমাজের লোকাচারের গন্ডিসীমা ছাড়িয়ে শহুরে নাগরিক জীবনে অনুপ্রবেশ করে এবং এর আন্তর্জাতিকরণ শুরু হয়। এজন্য খুব স্বাভাবিকভাবে এর সাথে বিশুদ্ধ গ্রামীণ লালন গীতির আধুনিকায়ণ, নগরায়ণ এবং বিশ্বায়ণ ঘটেছে বিগত কয়েকশত বছরের পরিক্রমায়। যার কারণ পরিবর্তিত যুগ, সময়, গ্রামীণ জনসমাজ ও নগরের নাগরিক সমাজের অভিরুচি। লালন গীতি ও দর্শন দ্বারা দেশবিদেশের অনেক বিশ্বখ্যাত/খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, লেখক, দার্শনিক, ক্লাসিক ও ব্যান্ড সংগীত শিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতাগণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। তৎকালীণ সময়ে সমাজের অনেক গণ্যমান্য ও প্রতাপশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব ছিল এবং তারা লালন শাহের সঙ্গে মত বিনিময় করে নিজেদের উৎকর্ষিত করে তুলেছেন। এজন্য তখনকার অনেক শিক্ষিত ও অভিজাত ব্যক্তি লালনের সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তার গান শুনতে উৎসাহী/ব্যাকুল হয়েছিলেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও লেখকের লেখা, 'মনের মানুষ' উপন্যাস ও ছবি থেকে জানা যায়, বাংলা সাংবাদিকতার পথিকৃৎ "গ্রামবার্তা প্রকাশিকা"-র সম্পাদক কাঙ্গাল হরিনাথ, বিখ্যাত "বিষাদ সিন্ধু" মহাকাব্য গ্রন্থের রচয়িতা মীর মোশারফ হোসেন দুজন মিলে লালনের সাথে দেখা করতে, কথা বলতে, তার গান শুনতে এসেছিলেন। পাবনার আটঘোড়িয়ার জমিদার শ্রী মধুসূদন চৌধুরী লালনের গান শোনার জন্য তার বাড়ির আঙ্গিনায় বাউল সংগীত সভার আয়োজন করেছিলেন। 

কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল লালনের সংগীত ও বাউল দর্শনের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত ও সহানুভূতিশীল। তাদের মধ্যে তৎকালীণ ভারতের ব্রাহ্মধর্ম রচয়িতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নাম উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে মোঃ সোলাইমান আলী সরকার তার ‘লালন শাহের মরমী দর্শন’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘বঙ্গের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এমনকি ব্রাহ্মধর্ম রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক, ধর্ম সংস্কারক, রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত তাঁকে নিমন্ত্রণ করে শিলাইদহ নৌকায় নিয়ে ধর্মালাপে পরিতৃপ্ত হন’। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতা জমিদার জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃতমনা এবং চিত্রকর ছিলেন। তখন নদীয়া জেলার অন্তর্গত কুষ্টিয়া মহকুমার কুমারখালীর জঙ্গলমহলে অবস্থিত লালনের আখড়া এলাকাটি তার জমিদারীর অন্তর্গত ছিল। সংগীত সাধক লালনের গানের খ্যাতি এবং আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের কথা শুনে তিনিও লালনের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ/দেখা করতে নিজস্ব শিলাইদহ বোটে চড়ে নদীপথে কুমারখালীতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি তার বোটে লালনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লালনের একটি স্কেচ/ছবি আঁকার ফাঁকে/অবসরে তার সাথে নানা ব্যাপারে কথা বলেন, গল্প করেন এবং তার কাছ থেকে কিছু গান শুনেন। লালনের মৃত্যুর বছর খানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তার শিলাইদহ বোটে বসিয়ে তিনি পেন্সিল দিয়ে এই স্কেচটি আঁকেন। লালনের এই ছবিটি লালনের জীবিত অবস্থায় একমাত্র প্রতিকৃতি। এতে বৃদ্ধ লালন একটা চেয়ারে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছেন। তার এই স্কেচটি এখন ভারতীয় জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। লালনের মরমী সংগীতের ভাব মাধুর্যতা এবং দার্শনিকতায় তরুণ জমিদার জোতিরিন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে লালনের সংগীত এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট, বিমোহিত, প্রসন্ন্য হয়েছিলেন। লালনের সময়কার তরুন বিখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের যুগ প্রবর্তক কবি এবং কবিগুরু হিসাবে উপমহাদেশে খ্যাতি লাভ করেন। তিনিও লালনের মরমী বাউল সংগীত, দর্শন এবং ব্যক্তিত্ব দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলে। তিনিই প্রথম শহুরে নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন, তার সংগীত ও দর্শনকে পরিচিত করেছিলেন। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর লালন সংগীত ও দর্শনের প্রভাবঃ শহুরে নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি প্রসারে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। যতদূর জানা যায়, লালনের প্রথম জীবনীকার বসন্তকুমার পালের লেখা থেকে-জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গানের আসরেই বালক রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের প্রথম পরিচয় হয়, এরপর প্রায়ই লালন-শিষ্যদের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা এবং কথা হতো। আমার মতে, এই তথ্যকে সত্য হিসাবে ধরেও বলা যেতে পারে বালকাবস্থায় এক গানের আসরে রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের সাক্ষাতের ব্যাপারটা মোটেও তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না। আর পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের কোন সাক্ষাৎ না হলেও লালনের মরমী বাউল সংগীতের শৈল্পিকতা ও দর্শনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি লালনের মৃত্যুর দুই বছর পর তার আখড়া বাড়িতে যান। লালনের শিষ্যদের সাথে তিনি কয়েকবার দেখা করেছেন, কথা বলেছেন এবং এর মাধ্যমে লালনের দর্শন, বাউল সংগীত, জীবনাচার সম্পর্কে সম্মুখ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেছেন। এর আলোকেই পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ করে ১৯২২ সালে ভারতীয় প্রবাসী পত্রিকার হারামনি বিভাগ/শাখায় চারভাগে ২০টি গান প্রকাশ করেন এবং এভাবে পর্যায়ক্রমে লালনের প্রায় ২৯৮-টা গানের কথা প্রকাশ করেন। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনো-বেড়ি দিতাম পাখির পায়।’ লালনের এই গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ এমনই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’ শুরু করেছেন এই গান ’দিয়ে। এমন কি লালনের দেহতত্ত্বের এ গানটিকে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভায় ইংরেজি বক্তৃতায় এই গানের উদ্ধৃতিও দিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানের ইংরেজি অনুবাদ বিদেশি শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন। লালনের বাউল সংগীত এবং দর্শনের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ প্রায় দেড়শতকের মত কবিতা ও সংগীত রচনা করেছিলেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তৃতা ও রচনায় লালনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, তিনি লালনের আছে যার মনের মানুষ সে মনে করে এই গানে উল্লেখিত মনের মানুষকে তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি কবিতাও রচনা করেন। যার কথা ছিল 'আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই হেরি তায় সকল খানে...'। লালনের রচিত, সুরোপিত এবং গাওয়া 'আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে' গানটির ভাব, ছন্দ ও সুরের অনুকরণ করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি' সংগীতটি লিখেছিলেন। কবিগুরু তার ‘মানুষের ধর্ম’ রচনায় বলেছেন, ‘মানুষের দেবতা মানুষের মনের মানুষ; জ্ঞানে, কর্মে, ভাবে যে পরিমাণে সত্য হই, সেই পরিমাণেই সেই মনের মানুষকে পাই- অন্তরে বিকার ঘটলে সেই আমার আপন মনের মানুষকে দেখতে পাই নে। মানুষের যত দুর্গতি আছে, সেই আপন মনের মানুষকে হারিয়ে, তাকে বাইরের উপকরণে খুঁজতে গিয়ে, অর্থাৎ আপনাকেই পর করে ভোগের আয়োজনে দেখি। এই নিয়েই তো মানুষের যত বিবাদ, যত কান্না’। রবীন্দ্র সংগীতে 'লালন প্রভাব’ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আনোয়ারুল করিম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বহুবার বলেছেন, তিনি লালনের গানে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, নিজের গানে তিনি লালনের ভাবটি গ্রহণ করেছিলেন। কবিগুরু নিজেও লালনের মত সাদা আলখেল্লা পরিধান করতেন। মরমী সাধক লালন সাঁই’র বাউল গান, দর্শনে উৎসাহী ও অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে রবীন্দ্র-বাউল হিসেবে পরিচয় দিতেন। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে। পরবর্তী ৩য় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল। [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK