বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
Friday, 11 Oct, 2019 05:09:18 pm
No icon No icon No icon

আদম সুরত অতঃপর একজন এস এম সুলতান !

//

আদম সুরত অতঃপর একজন এস এম সুলতান !

ইমতিয়াজ আহমেদ: ১০ অক্টোবর ছিলো বাংলাদেশের  প্রখ্যাত চিত্রশিল্পি এসএম সুলতানের ২৫ তম  মৃত্যু বার্ষিকী। তাকে  নিয়ে কথা বলার আগে  একটু  কথা বলতে চাই তারউপর নির্মিত আন্তর্জাতিক পুরষ্কারপ্রাপ্ত অকাল প্রয়াত   চলচিত্রকার তারেক মাসুদের  প্রথম  প্রামান্য চলচিত্র  আদমসুরতের নির্মান শৈলী সম্পর্কে। অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বর্তমানের তরুন প্রজন্ম, যদি আমাকেই দিয়েই ধরে  নেই তবে এস এম  সুলতানের ভাবনা,জীবনধারা,তার কর্মময় জীবনের এক আশ্চর্য দার্শনিক রূপ কিন্তু আমি তার আকা ছবি দেখে যতটানা বুঝতে পারি আদম সুরতের মাধ্যমেই খুজে পেয়েছি তার জীবনধারা,একজন শিল্পির প্রকৃত আদর্শিক পরিপূর্ন রূপটা। সেহেতু আমার কাছে আদমসুরত প্রামান্যচিত্রটি বিশেষভাবেই গুরুত্ববহন করে । 
পুরো ছবিটা নির্মাতা শেষ করেছেন ভোর থেকে  পড়ন্ত বিকেলের মধ্যে। চিত্রশিল্পি  সুলতান থাকেন চিত্রানদীর পারে ,চিত্রা নদীতে সারাক্ষন থাকে স্্েরাত, সেই স্্েরাতে ভেসে যায় নৌকা, শিল্পি আপন মনে এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করেন। বিদেশের যস খ্যাতি , পিকাসোর মত বড়বড় চিত্র শিল্পিদের সাথে এক্সিভিশন করার পরও তাদের সক্ষ্যতা ফেলে এসএম সুলতান ফিরে এসেছেন তার নীজ দেশে। শুধু দেশ বললে ভুল হবে  নীজ জন্মভ’মি, সবুজ শ্যামল ছবির মত নীজ গ্রামে।  
১০০ মিলিমিটারের  ফিল্মে সুট হয় আড়াই মিনিটের চিত্র, কথা ছিলো একটা ওয়াইড এ্যাংগেইল  ফ্রেমে মাষ্টার  নেয়ার পর শেষ দৃশ্যে এসএম সুলতানের একটা ক্লোজাপ থাকবে।আলো কম হলেও চালিয়ে নেয়া সম্ভব। কিন্তু চিত্রার চকচকে জলের বুকে ভেসে যাওয়া  নেীকা আর প্রকৃতির এত মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে পরিচালক দৃশ্যধারন  শুরু  করে দিলেন, এমন সময় ফিল্মের স্টকও প্রায় শেষ, মাষ্টার শর্ট আর কেøাজাপে যাবার সময় আলোও কমে আসছিলো খুব দ্রæত। 
ছবিটির ক্যামেরাম্যান হিসেবে থাকবার কথা ছিলো তখনার সময়ে এদেশের  প্রখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনের। যখন সবকিছুই ঠিক ঠাক,এস এম সুলতানকেও কথা দেয়া শেষ, তখন আনোয়ার হোসেন জানালেন তিনি এই ছবিতে কাজ করতে পারছেন না। কারন তখন ইউনেস্কোর একটি এ্যাসাইনমেন্ট  থাকায় তিনি স্টিল ফটোগ্রাফি করতে ৩ মাসের জন্য আফ্রিকাতে যাবার অফার পেয়ে গেলেন। এমন পরিস্থিতীতে পুরো কাজটাই পিছিয়ে দিতে হতো পরিচালক তারেক মাসুদের। কিন্তু তারেক মাসুদের পক্ষ্যে কাজটা পেছানোরও উপায় ছিলো না সে সময়। এদিকে অনেক কষ্টে টাকা পয়সা জোগার কওে রেখেছে তারেক নিউয়র্কে  ফিল্মের ওপর পড়াশোনা করতে যাবে বলে  কিন্তু এস এম সুলতানের ওপর, এই ছবিটি বানানোর আবেগ উচ্ছাস মোটকথা  সবকিছুমিলিয়ে   তার আর তর সইছিলো না প্রামান্যচিত্রটির কাজ শুরু করার ।  
তারের মাসুদ এরিমধ্যে অনোয়ার হোসেনের কাছে হঠাৎ একদিন খবর পেলেন  এসএম সুলতান গুরুতর অসুস্থ্য। তখনি সে  সিন্ধান্ত নিলেন তার ফিল্মের উপর  পড়ার জন্য যে টাকা তিনি জোগার করেছিলেন তা  দিয়ে তিনি এসএম সুলতানের উপর প্রামান্যচিত্র বানাবেন, কেননা এই প্রামান্য চিত্রটিই কালের সাক্ষ্যি হয়ে,সুলতানের স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। 
এমন ভাবনার ঘোর কাটতে না কাটতেই  তখন ধানমন্ডিদিয়ে রিক্সায় করে যাচ্ছিলেন তার আরেক  বন্ধু স্টিল ফটোগ্রায়ার এবং শহীদ বুদ্ধিজীবি মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক মুনীর। হঠাৎ করইে রিক্সাটা থামিয়ে  তারেক মাসুদ  ফিল্মটা বানাচ্ছে শেষপর্যন্ত এবং এর সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বটাও মিশুকে নিতে বললেন নির্মাতা তারেক মাসুদ। মিশুক মুনির আগে কখনো ভিডিও ক্যামেরা চালান নি,তারেক মাসুদও আগে কখনো ফিল্ম নির্মান করেননি। তবে মিশুকের কাছে ছিলো ছিলো আমেরিকান সিনেটোগ্রাফির ম্যানুয়েল আর  ক্রেং ক্যামেরা। গাড়িতে যেতে যেতে চট করে দেখে নিলেন ক্যামেরার প্রয়োজনীয় ম্যানুয়ালগুলো । কোনরূপ চিত্রনাট্য ছাড়াই এই ছবিটি বানিয়েছেন ছবিটি নির্মানে তারেক মাসুদ। মূলত তিনি মনে করেছেন এস এম সুলতানের কর্ম-ভাবনা,তার প্রতিদিনের কর্মকান্ড,তার কাজ,গ্রামীন পরিবেশ মোটা দাগে বলতে গেলে তিনি যখনন যা প্রয়োজন মনে করবেন তখন তাই দৃশ্যধারন  করতে চেয়েছেন ১৬ মিলি মিটারের এই প্রামান্য চিত্রটিতে।
তারেক মাসুদের ভাস্যমতে পুরো  ফিল্মের প্রসেসিং এর কাজ হয় ব্যাংককে,জুম আর ফুটেজের বিভিন্ন জায়গায় কাপাকাপি থাকলেও এক্সপোজার কন্টিনিটি ছিলো অসাধারন কোথাও কোন সিকুয়েন্সে  ডি-ফোকাস ছিলোনা  ফুটেজ। তবে শেষ পর্যন্ত ইন্টারভিউয়ের জন্য তারেক মাসুদ পরলেন মহা বিপদে, সে সময়  বাংলাদেশে সিং-সাউন্ড ক্যামেরা ছিলোনা। তবে এর একটা  সমাধানও পেয়েগেলেন খুব দ্রæত , বিবিসির একটি টিমের সাথে বাংলাদেশে অনেক দিন ধরেনই কাজ করছিলেন তারেক, কাজ শেষে যখন তারেককে বিবিসি টাকা সাধলেন তখন তারেক মাসুদ টাকা না নিয়ে , বিবিসির সংগে থাকা ১৬ মিলি মিটারের সিং-ক্যামেরাটা চাইলেন সুলতানের  ইন্টারভিউ করার জন্য। বিবিসির কলাকুশলীরা  যখন শুনলেন তারেক মাসুদ ফিল্ম বানাচ্ছে তখন শুধু ক্যামেরাটা দিলেনা সাথে ৪০০ মিলি মিটারের ফিল্ম স্টকটাও দিলো রোলের জন্য। তারেক মাসুদ এর আগে ১০০ মিলি মিটার করে ফিল্মে সুট করেছে। বিবিসি যেহেতু নড়াইলে যাবেনা সেহেতুশিল্পি এস এম সুলতানকে ঢাকায় এনে  পেছেনে গাছের ব্যাগ্রাউন্ড  দিয়ে টাইট ফ্রেমে তার  ইন্টারভিউ করা হলো যাতে করে দর্শক বুঝতে পারে এটা  গ্রামেই সু করা হয়েছে ।
১৯২৩  সালের ১০ আগষ্ট নড়াইল জেলার মাসিমদিয়ায় জন্মগ্রহন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত গুনি চিত্রশিল্পি এস এম সুলতান। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় চিত্রকলায় অনেকেই আধুনিক চিত্রকর্মের  কাজ করছিলো। যে যার মত করে  নানান শৈলীতে শিল্পিরার তারা তাদের  চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তুলছিলো। ঠিক সে সময়টাতে  অনেকটা গুটিয়ে যাওয়া শামুকের মতই তিনি সবার অগোচরে চলে  যান , ফিরে যান আপন জন্মভ’মি নীজ গ্রামে,অনেকটা আত্মঅভিমানে ছবি আঁকা থেকে দূরে থাকেন প্রায় এক  যুগেরও বেশি সময়। তারপর মিশে যায় গ্রামের মানুষের সাথে,এক নিবির সখ্যতায় তিনি আবার তুলির আচর কাটতে লাগেন ক্যানভাসের বুকে,সে সময়কার তার চিত্রকলায় যে বিষয়গুলোতে গ্রাম বাংলার কৃষককে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন এক সুঠাম দেহীরূপে- বলশালী হিসেবে -
আদম সুরত ছবিতে বক্তব্যের  সময়  শিল্পি এস এম সুলতান বলেন, একজন কৃষক কখনো চিন্তা করে না, তারা খুব ভালো থাকবে। তারা শুধু উৎপন্ন করে  চলেছে । কৃষকের জন্য বহু সাহায্য বিদেশ থেকে আসে কিন্তু সে সাহায্য গ্রাম পর্যন্ত পৌছায় না, তা শহরেই থেকে যায়। উচু দালানে বসবাস করতে করতে মানুষের মন মানসিকতাও উচু স্বভাবের হয়ে গেছে। আধুনিক চিত্রকর্ম নিয়ে এস এম সুলতান খুব একটা ভাবতে চাননা । তার মতে এসব ভাববিলাশ ছাড়া খুব যে একটা বিশেষ কিছু প্রকাশ করে  বলে তার মনে হয় না। 
শিল্পি আরো বলেন, আজকাল শহরের মানুষেরা তারা তাদের ড্রইংরুমে মর্ডান এ্যাবস্ট্রাক পছন্দ করে,কিন্তু সাধারন দেশবাসী অভ্যস্তনা এসকল মর্ডান এ্যাবস্ট্রাক দেখে.তারা এসব দেখে বুঝেনা, প্রশ্ন করে এটা কি একেঁছেন আমাদের বুঝিয়ে দেন, আমরা বুঝতে পারলাম না। তারা মনে করে ্এটা বুঝতেগেলে অনেক পড়াশোনা করার দরকার আছে..  
কৃষকের জীবন যে ছবির সাজেক্ট হতে পারে? এস এম সুলতানের মতে এটাই অনেককেই মানতে চাননা। যে  মানুষটা আদীমকাল থেকে সংগ্রামী, প্রতিবাদী, একটা ভয়াবহ জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে এই কৃষকদের বেড়ে ওঠা শিল্পি তাই তুলে আনতে চেয়েছেন তার চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে ।   

শুধু তাই নয় তার ছবিতে গ্রামীন  নারীদের দেখাযায়, সুডৌল ও সুঠাম গরনের।নারীর চিরায়িত রূপলাবন্যের চিত্রকল্প অত্যন্ত দক্ষতার সাে থ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন যা নিঃসন্ধেহে বলাযায় সহজ, সাবলীল এবং সবার জন্য বোধগম্য। শিল্পি এস এম সুলতান তেল রঙ এবং জলরঙে ছবি আঁকতেন এবং রেখাচিত্রও আঁকতেন তিনি।তার ছবি আঁকার কাগজ ছিলো একেবারে সারারন কাগজ,রঙ এবং জটের ক্যানভাস  ব্যবহার করেছেন।তার অনেক ছবি তিনি কয়লা দিয়েও একেছেন। সুলতান তার চিত্র কর্মে তার নিজস্ব ভাবধারা গ্রহন করেছিলেন তার এই চিত্র কর্মের সমালোচনাও সে সময় অনেক আধুনিক চিত্রশিল্পিরা করেছেন কিন্তু সুলতার তার চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে আসেন নি একবিন্দু।  
সুলতানের সৃষ্টিকর্মের মূল সুর তথা প্রান খুজে পেয়েছিলেন আবহমান গ্রাম বাংলার রূপ,কৃষকের জীবন-সংগ্রাম,প্রতিবাদ,দ্রোহ,সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দীন জীবনধারা,উৎস্ববসহ তার চিত্র কর্মে ফুটে উঠে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি শ্রমজীবি মানুষের যুদ্ধে সংগঠিত হবার চিত্রের পাশাপশি পাকবাহীনির নিষ্ঠুর বর্বরতার চিত্রও। বাংলাদেশের গ্রামগুলোযে এক পরিপূর্নতার ভান্ডার,এ দেশের অর্থনীতির একটা বড় অবদান এইসব গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের অক্লান্ত পরি¤্রমের  ফলে সম্ভবতো তাই তিনি প্রমান করে ছেড়েছেন। 
প্রামান্যচিত্রটি আদম সুরত  বা কাল পুরুষ নামকরনে  বিষয়ে নির্মাতা তারেক মাসুদ তার বক্তব্যে বলেছেন, যে নাবিক পথ হারিয়েছে,সেই নাবিক তার কালপুরুষ দেখে সে আবার তার দিকনির্দেশনা ফিরে পায়,তার জীবন তার দর্শন তার শিল্পের মধ্যে কিন্তু আমরা সেই দিক নির্দেশনা পাই ; কিন্তু আমার মনে হয়না আমরা সেই দিকনির্দেশনা ফিরে পাই ,আমিও বিদেশে ছিলাম আমিও দেশে ফিরে এসেছি কিন্তু আমি দেশে ফিরে এসেছি ঢাকা শহরে কিন্তু সুলতান ঢাকা শহরে  ফিরে আসেনি, তিনি তার শৈশবে , আপন গ্রামে আপন শৈশবে ফিরে এসেছে। আমরা অনেক কিছুই করি কিন্তু আমাদের ফিরে  আসাটা আসলে সব সময়র অর্ধেক, কোথায় যেনো নি¤œ মধ্যবিত্তপর্যন্ত এসে আমাদের শিল্পকর্ম শেষ হয়ে যায়। সুলতানের ছবি কিন্তু শুধু সাধারন মানুষকে নিয়ে নয় সাধারন মানুষের জন্য। সুলতানের শেষ সংলাপ আদম সুরতে ,কৃষক যখন আমার ছবি দেখে বলে এটা আমার লাউয়ের মাচা,গরু দেখে ছবিতে বলে এ্টা আমার বলদের মত দেখতে, যথন ছোট ছোট শিল্পিরা তার কাছে ছবি আকা শিখছে ,তখন সুলতান বলেন, আমি ওদেরকে অনেককিছু শেখাইনা, শুধু শেখাই বিভিন্ন দেশীয় গাছের পাতা আঁকতে কোনটা আমপাতা কোনটা জাম পাতা সেইটা যেনো পার্থক্য বোঝাযায় ওদের ছবিতে। এইযে ডিটেলের সুক্ষতা ,গভীর ভাবে নীজের দেশকে এই ছোট্ট পাতার মধ্যদিয়ে সুলতান নতুন প্রজন্মকে দেশকে শেখার বোঝার , জানার এবং এর প্রতিরূপ সৃষ্টিকরার প্রেরনা আমাদের দিয়েছে। সুলতানের ছায়া আমার জীবনে,আমার কাজে আমার মৃত্যুতে । ১৯৯৪ সালের ১০অক্টোবর এই গুনি চিত্র শিল্পি  পৃথিবী থেকে চীরবিদায় নেয় ; শিল্পি আত্মা শান্তিতে থাকুক ।

     আমাদের কেন আদিবাসী বলেন ? আমরাতো বাঙালী !

ইমতিয়াজ আহমেদ 
সংবাদকর্মী 
ছবিঃ ফাইল ছবি ।
[email protected]
তথ্যসূত্রঃ [আদম সুরত প্রামান্যচিত্র]
  

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK