সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
Sunday, 06 Oct, 2019 11:42:07 pm
No icon No icon No icon

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(১)

//

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(১)

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ : হুমুখী সংগীত সাধক প্রতিভা হিসাবে লালনঃ বাংলা গানের শক্তিশালী, ঐতিহ্যবাহী ধারা এবং অমূল্য রত্ন ভান্ডার হচ্ছে লোকসংগীত। আর বাউল সংগীত হচ্ছে এই লোকসংগীতের একটি শক্তিশালী ধারা এবং অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। বাউল গান আধ্যাত্নিক মরমী বিশ্বাস সম্পৃক্ত। লালনের বাউল গান লালন গীতি নামেই পরিচিত আর লালন গীতি হচ্ছে বাউল সংগীতের প্রধান শাখা। সাধারণভাবে মনে হতে পারে লোকসংগীতের ধারা ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু গবেষকরা তা বলছেন না৷ তাদের কথা লোকসংগীত এখনো প্রভাবশালী তবে প্রচলিত মিডিয়ায় এর উপস্থিতি এবং নাগরিক সমাজে এর প্রচারণা কম৷ লালনের জন্ম ও আবির্ভাবের দেড়শত বছর পূর্ব থেকে বাংলায় বাউল অনুসারী এবং বাউল সংগীতের ধারা বহমান ছিল। তবে লালনের মত শক্তিশালী বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন বাউল গীতিকার, সুরকার, সংগীত সাধক, দার্শনিক এবং সমাজ সংস্কারকের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে বাংলার সমাজব্যবস্থায় বাউল সংগীত প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। লালনের সংগীত সাধনা এবং মরমী দর্শনের মধ্য দিয়ে আবহমান বাংলার বাউল দর্শন এবং বাউল সম্প্রদায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি অর্জন এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলায় বাউল গানের প্রধান অগ্রদূত ফকির লালন শাহ। লালনের মরমী/বাউল সংগীত(যা এখন আমাদের কাছে লালন গীতি/সংগীত নামে পরিচিত)-কে কেন্দ্র করেই বিংশ শতকের দিক থেকে বাউল সংগীত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। 

বাউল সম্রাট লালন সাঁইজী বাংলা সংগীত জগতের এক বিস্ময়কর কালোত্তর বহুমুখী প্রতিভা এবং চির উজ্জ্বল নক্ষত্র। আধুনিক বাউল গানের জনক লালন সাঁই বিশ্বে পরিচিত একজন আধ্যাত্মিক মরমী সংগীত সাধক হিসেবে৷ বাউল সংগীত জগতে লালনের আবির্ভাবের পর থেকে
লালন সংগীত ছাড়া বাউল গান কল্পনাই করা যায় না এবং এজন্যই লালনকে বাউল সম্রাট বলা হয়। তিনি বাউল সংগীতকে গণমানুষের কাছে এক উচ্চ মর্যাদাকর স্থানে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তার লালন গীতির মাধ্যমেই বাউল সংগীত প্রত্যন্ত গ্রামবাংলা থেকে শহুরে নগর সমাজের সর্বস্তরের মানুষ/সর্বসাধারণের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করে। এভাবে বিগত কয়েক শত বছর ধরে লালন শাহ ও তার অনুসারীদের বাউল সংগীত সাধনা একটি স্বতন্ত্র ঘরানার সৃষ্টি করেছে বাংলার লোকসংস্কৃতিতে। প্রধানত লালন গীতির কল্যাণেই বাউল গানের জনপ্রিয়তা, সমাদর এখন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গন/পরিমন্ডলে প্রসারিত, পরিচিত, জনপ্রিয় হয়েছে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতেই জাতিসংঘের ইউনিস্ক বাউল সংগীতকে বিশ্ব সংস্কৃতির অমূল্য ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে লালনের বাউল সংগীত বা লালন সংগীত।

লালনের জীবন, ব্যক্তিত্ব, বহুমুখী প্রতিভার ইতিহাস, বাউলদের জীবনাচার, কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লালন তার হিন্দু-মুসলিম-ধর্মে অবিশ্বাসী অনুসারীদের আধ্যাত্নিক বিশ্বাস, গুরুবাদ, সর্বেশ্বরবাদ, মানব মনের চিরন্তণ প্রেম ও জৈবিক ক্ষুধার অনন্ত বাসনা, নৈতিক ও মানবতার ক্ষেত্রগুলোর অবস্থান, গুরুত্ব, সীমাকে গভীরভাবে উপলব্দি করে এবং এগুলোর ভেতর অবস্থান করেই সারা জীবন আধ্যাত্নিক, মারফতি, মুর্শিদী, বৈষ্ণব, দেহতাত্ত্বিক, ভালবাসা, জাতিবাদ বিরোধী, মানব বন্দনার গানগুলো বেধেছেন, গেয়েছেন এবং সংগীত সাধনা করেছেন। লালন  মরমী/বাউল সংগীত(যা এখন আমাদের কাছে লালন গীতি/সংগীত অতি উচ্চ মার্গীয়/ভাব দর্শন সমৃদ্ধ এই বিষয়ে কারো মধ্যে কোনপ্রকার সন্দেহ, দ্বিমত, বিতর্কের অবকাশ নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাহীন অজো পাঁড়াগায়ের/প্রত্যন্ত গ্রামের সংগীত সাধক হয়েও স্বভাবগতভাবে লালন একজন বিরল বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন মনীষী ছিলেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, গায়ক, সংগীত সাধক, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক ছিলেন। বহুমুখী সংগীত সাধক প্রতিভা হিসাবে তিনি তার অসাধারণ বিস্ময়কর বৈচিত্র‍্যময় মরমী সংগীতের শৈল্পিকতা, ছন্দ মাত্রা, ভাব, রূপ, রস, দর্শন দ্বারা বাংলা ও বিশ্বের সংগীত জগত/ভান্ডারকে বিপুল বৈচিত্র‍্যপূর্ণভাবে সৃজন, সমৃদ্ধ, আলোকিত করেছেন। এই সমস্ত কারণে লালনকে মানবতাবাদী বাউল দার্শনিক, মরমী সাধক বলা হয় এবং লালন শাহ বাউলদের কাছে সাঁই/সাঁইজী হিসাবে দেবতারূপে পূজনীয়। 

লালন সংগীত বাংলা সংগীত জগতের সাত রাজার গুপ্তধন। আবহমান বাংলার সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য ও অনবদ্য অংশ। এটা আমাদের দেহের অন্তরাত্নাকে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি, মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, আধ্যাত্নিকতার পানে টেনে নিয়ে যায়। লালনের প্রতিটি গানের স্বতন্ত্র/আলাদা শ্রুতিময় কথা, ছন্দ, সুর, ভাব, রস শ্রোতার চিত্ত/মনকে নানাভাবে নিত্যনতুন চিন্তায় ভাবিত, উৎসুক, ব্যাকুল, আপ্লুত এবং প্রশান্ত করে মজিয়ে দেয়। লালন সংগীতের ব্যাপক বহুমুখী বৈচিত্র‍্যপূর্ণ রচনা, সুর রস, ভাব তরঙ্গ, সার্বজনীন প্রাসঙ্গিক আবেদন লালনের সমকাল-যুগ-স্বদেশ-স্বজাতির গন্ডি/সীমা ছাড়িয়ে/অতিক্রম করে সর্বযুগ, সর্বকাল, সর্বদেশের সংগীত পিপাসুদের এবং বিশ্ব জগতের সকল ধর্ম-বর্ণ-জাত-শ্রেণির মানুষের চিত্ত/মনকে গভীরভাবে স্পর্শিত, ভাবিত, আপ্লুত, অনুপ্রাণিত, বিস্মিত, আলোকিত, প্রশান্ত করছে। এজন্য এই দেশ, জাতি, বিশ্ব, বিশ্ববাসী লালন সাঁই এবং তার লালন সংগীতের নিকট চির কৃতজ্ঞ। লালন বাংলা ও বিশ্বের সংগীত জগতের, সংগীতপ্রেমী শিল্পী, শ্রোতাদের কাছে এক চরম-পরম বিস্ময়, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, চির স্মরণীয়, বরণীয়, অনুকরণীয় সংগীত সাধন এবং দীক্ষা গুরু। বাংলাদেশের অধিকাংশ সংগীত শিল্পী এবং ব্যান্ড ভোকাল তাদের সংগীত জীবনে লালনের বিভিন্ন জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। দেশবিদেশের লক্ষ কোটি সংগীত পিয়াসী/রসিক লালন সংগীতের ভক্ত। আমি নিজেও রবীন্দ্র, নজরুল, লোকজ, আধুনিক বাংলা এবং ব্যান্ড সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক লালন গীতি শুনতে অত্যন্ত পছন্দ করি।
প্রথমদিকে লালন রচিত গানের কোনো লিখিতরূপ ছিল না বিধায় এর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ/সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি। তিনি হঠাৎ করেই মুখে মুখে গান বেঁধে গাইতে শুরু করতেন। ‘পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে‘ বললেই ভক্তরা একতারা আর ডুগডুগি হাতে বাদ্য বাজান শুরু করত। ভক্তদের হিসেবে তার রচিত গানের সংখ্যা আনুমানিক হাজারের মতো। এসব গানের রচয়িতা/গীতিকার, সুরকার, গায়ক ছিলেন একাধারের লালনই। পরবর্তীতে মানিক শাহ্‌ ও মনিরুদ্দিন শাহ্‌ সাঁইজীর গান খাতায় লিখে সংগ্রহ করা শুরু করেন। ফলে সেসব গান বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। লালন তার শিষ্যদের নিয়ে যশোর, ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় বাউল গানের মাধ্যমে তার মতবাদ প্রচার শুরু করেন। মানব বন্দনা, আত্মতত্ত্ব, পরতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরু/মুর্শিদতত্ত্ব, প্রেম/ভক্তিতত্ত্ব, আল্লাহ্-নবী তত্ত্ব, কৃষ্ণ-গৌড় তত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে লালনের শত শত গান রয়েছে। লালনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান, আমার আপন খবর আপনার হয় না, তুই যে আমার মন, আমি ছিলাম কোথায় এলাম হেথায়, আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে, হৃদ মাজারে রাখব ছেড়ে দেব না, খাঁচার ভেতর অচিন পাখি, বাড়ির কাছে আরশী নগর, ক্ষ্যাপা রে, চাতক বাঁচে কেমনে? মিলন হবে কত দিনে?, সময় গেলে সাধন হবে না, নামাজ আমার হইলা না, গুরুর নাম সুধা সিন্ধু, গুরুর প্রেম রসিক হব কেমনে?, এমন মানব জনম আর কি হবে?, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানবগুরুর নিষ্ঠাচার, জাত গেল জাত গেল বলে, সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে?, সোনার মানুষ, ধন্য ধন্য বলি তারে, তিন পাগলে হল মেলা, এসব দেখি কানার হাটবাজার, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না, ডুবে দেখ দেখি মন কি রূপ লীলাময়?, বলব কি সেই নূরের ধারা?, দেখ না মন ঝাঁক মাড়িয়া এই দুনিয়াদারী, দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙিলা দালানের মাটি গো, জীবনের ঐ তিরধারে আর মনরূপে সাঁই বিরাজ করে, আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়, আল্লাহ বল মন রে পাখি, পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়, বলি মা তোরে আর আমারে মারিসনে মা, দিন ফুরালো হরি হরি, কৃষ্ণপ্রেমে পোড়া দেহ, তোমরা কুঞ্জ সাঁজাও গো, কি ভাব নিমাই তোর অন্তরে?, কেউ বলে ভগবান কেউ বলে আল্লাহ তারে, ক্ষ্যাপারে কেন খুজিস মনের মানুষ মন?, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না, যেখানে সাঁই বারামখানা, তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা, সহজ মানুষ ভজে দেখরে মন দিব্য জ্ঞানে এরূপ অসংখ্য জনচিত্ত এবং কালজয়ী মরমী/বাউল লালন সংগীতের অমর স্রষ্টা গীতিকার, সুরকার, সংগীত সাধক লালন শাহ। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে। পরবর্তী ২য় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল।[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK