বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
Tuesday, 01 Oct, 2019 04:24:41 pm
No icon No icon No icon

প্রবীণদের জন্য উন্নয়ন দরকার

//

প্রবীণদের জন্য উন্নয়ন দরকার

সৈয়দ সাইফুল করিম: আজ ১লা অক্টোবর আর্ন্তজাতিক প্রবীণ দিবস। বাংলাদেশে গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে বার্ধক্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া এদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণ জনগোষ্ঠী আজ নানা কারণে বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার।
প্রবীণ দিবসকে কেন্দ্র করে প্রবীণ বিষয়ক সামাজিক আন্দোলনকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ হিসেবে রিক জাতি সংঘ কর্তৃক ১ অক্টোবরকে প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রায় শুরু থেকেই দিবসটিকে মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে। 

জাতিসংঘ ঘোষিত এবছরের প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো:“The Journey to Age Equality”,যার  অর্থ দাঁড়ায়-‘বয়সের সমতার পথে যাত্রা’-যাবাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস- ২০১৯ এর প্রতিপাদ্য শ্লোগানটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-১০ এর লক্ষ্য- বৈষম্য হ্রাস এর সাথে একীভূত হয়েছে যা কিনা বর্তমান ও ভবিষ্যত বার্ধক্যের অসমতাকে প্রতিরোধ করতে একটি পাথেয় হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশে প্রবীণ বৈষম্য পরিস্থিতি আলোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবীণ স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দেশের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে প্রবীণদের স্বাস্থ্যের বিষয় উল্লেখ নেই; এমন কি অসংক্রামক রোগ-বালাই অংশেও প্রবীণ বয়সীদের স্বাস্থ্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি।আবার,জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালায়ওপ্রবীণ নারীদের কোন বিষয় নেই; অথচ প্রবীণ বয়সেই একজন নারী সবচেয়ে বেশি নাজুক। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে এসব নীতিমালা পরিপূর্ণতা পায়না। অন্যান্য নীতিমালাসমূহ পর্যবেক্ষণ করলেও হয়তো এরূপ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণদের প্রতি বৈষম্যের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। আবার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা এবং সামাজিক  সুরক্ষা নীতিমালায় প্রবীণদের  বিষয়ে সুপারিশ থাকা সত্তে¦ও তা বাস্তবায়নে এখনবধি কোন সুনির্দিষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। 


১৯৯০ সালের ১৪ই ডিস্মেবর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবে প্রবীণদের এই দিবসটি প্রবীণদের জন্য পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে সারা বিশ্বে এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে। ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে স্পেনের মাদ্রিদে জাতিসংঘে দ্বিতীয় প্রবীণটি বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সম্মেলন আয়োজন করে।

প্রায় তিন যুগ ধরে প্রবীণদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেরিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)নানা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।একটি সুসমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তৃণমূল প্রবীণদের ক্ষমতানের পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং সমাজের সব বয়সী মানুষকেপ্রবীণ উন্নয়ন ও প্রবীণ অধিকার বিষয়ে অবগত ও সচেতন করার মাধ্যমে একটি প্রবীণবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠাই রিক -এর মূল মিশন।
মাদ্রিদে কম পরিকল্পনা তৈরির পর সব রাষ্ট্রেই কমবেশি প্রবীণ কল্যাণকর বিষয় সমূহের উপর জোর দেয়। উন্নত পুষ্টি, স্বাস্থ্য সেবা এবং উন্নত জীবনযাপনের কারণে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এর পাশে বাড়ছে প্রবীণদের নিঃঙ্গতা এবং অবহেলা। নারী ও পুরুষ উভয়েই বৃদ্ধ বয়সে নানা কারণে তারা বঞ্চিত ও নিপীড়ত। আগে প্রবীণেরা যৌথ পরিবারের কাছ থেকে সেবা ও সহায়তার মধ্যে তাদের জীবনটা অন্য রকম ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা নেই। অথচ উন্নত দেশে লোকেরা সাধারণত যে বয়সে অবসরে যায় সে বয়সকে প্রবীণ বয়সের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। দূর্যোগে কালে শিশুদের মতো প্রবীণদের অসহায়ত্ব অপেক্ষাকৃত বেশি।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে প্রবীণ সংখ্যা ১৯৭৫ সালে ছিল ৩৫ কোটি। ২০০০ সালে এটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬০ কোটিতে। আগামী ২০৫০ সালে নাগাদ সারা বিশ্বে ৬০ বছর বয়সী লোকের সংখ্যা বর্তমানের ৭ থেকে বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাবে জন্মের পর বাংলাদেশে প্রত্যাশিত বর্তমান আয়ু হচ্ছে ৭৬ লক্ষ এবং ৭০ বছরের মধ্যে পুরুষদের জন্মের পর প্রত্যাশিত আয়ু হচ্ছে ৬৮.২১ বছর। মহিলাদের ৭১.৯৮ বছর।
প্রবীণদের বিভিন্ন পেশার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, দিন মজুর, রিক্শা চালনা, মাটি কাটা, ইট ভাঙ্গা, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন, মাদুর তৈরি, কাঁথা সেলাই, শাকসবজি বিক্রি, মাছ ধরা ইত্যাদি। তাদের ঋণ না পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে তাদের প্রতি সীমাহীন অবঙ্গা আর অবহেলা। তাছাড়া প্রবীণরা বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকে। 

রিসোর্স ইন্ট্রিগ্রেশন সেন্টার (রিক) ১৯৯১ সাল থেকে প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছে।

প্রবীণদের জন্য সর্বাগ্রে দরকার একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার যার মাধ্যমে দেশের সকল প্রবীণ জনগোষ্ঠী উপকৃত হতে পারে। এর জন্য দরকার দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা যার মাধ্যমে তাদের বয়স উপযোগী কর্মসংস্থানের সুযোগ। যার মাধ্যমে আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সীমাহীন দারিদ্র্যের মাত্রা একটি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।

তাই শুধুমাত্র প্রবীণ দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং এই সময়টাকে প্রবীণের কল্যাণের লক্ষ্যে একটি চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।


সর্বোপরি বলা যায় প্রবীণ দিবস হচ্ছে-‘সম্মানিত জ্যেষ্ঠ্য নাগরিকের সমস্যা ও অধিকার’ নিয়ে আলোচনার একটি বিশেষ দিন। এই দিনের তাৎপর্য তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-১০’এর মুল লক্ষ্য:সুযোগকে সমভাবে নিশ্চিত আর অসমতার প্রভাবকে দূর করতে প্রবীণদের বয়স বৈষম্যকে ‘না’ বলা-এবারের প্রবীণ দিবসের মূল আহ্বান হোক-যাতে করে বাংলাদেশের প্রবীণদের অধিকারের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে জীবনের শেষে এসেও আমাদের সবার ইচ্ছা হোক প্রবীণরা তাদের শেষ জীবনে এসে আমাদের সবার মাঝেই থাকুক। সবার আনন্দ বেদনার সাথী হয়ে তার শেষ আশা পূরণ হোক।

লেখক : সৈয়দ সাইফুল করিম, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK