শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯
Tuesday, 01 Oct, 2019 04:17:59 pm
No icon No icon No icon

ড্যান্ডি খাইলে খাওন দাওন ভুইলা যাই!

//

ড্যান্ডি খাইলে খাওন দাওন ভুইলা যাই!

ইমতিয়াজ আহমেদ: নির্ঘুম চোখে মেলে ধরা শুধু স্মৃতির রশ্মি, অবেলায় ফোটা মাটির ফুল , ঝড়ে পড়ে কেবলি কুর্নিশে নিয়ত পরস্পর , যে জ্বলায় আধারে তিমিরন-বুনো জোনাকিদের মেলায় কিছুটা অধরায় লেখাহয় তাদের শিরোনাম। তখন কেউ কেই ভাতের চিঠি বুকে ঝুলিয়ে পাখি হয়ে যায়। বৃদ্ধা পাতাদের আবডালে খসে পড়ে নৈ:শব্দেরা,তবুও অলোর মেদুরতায়  কোটর থেকে বেড়িয়ে আসে গুটি পোকার দল ; জানান দেয় আমরা এখনো বেঁেচ আছি,ফুল হয়ে, ঘ্রান হয়ে, থোকা থোকা মঞ্জুরূপে,কিন্তু এই পৃথিবী ততক্ষনে আলোহীন হয়ে পড়বে ..   
খুব বেশি ফিরিস্তি দিতে চাইনা প্রথম ছবির এরা হোল ফাতেমা, আখি, বশির মিয়া,সাকিব খান আর বাপ্পারাজ। নামগুলো অদ্ভুত হলেও এইরূপ নামকরনের অদিঅন্ত খুজবার প্রয়োজন মনে করি নি আমি। ময়মনসিংহের থানার ঘাট বস্তিতে থাকে তারা সবাই। ফাতেমার বয়স ১৩ বছরে পরলো এবার ,বাবা ফেরিওয়ালা , লেইছ ফিতা,চুড়ি,সস্তা গহনা বিক্রির জন্য  ফেরি করে  আর  মা বাসা বাড়ির ছুটা বুয়ার কাজ করে। ভাবছেন তাহলেতো হোলই? কিন্তু সে আসলে ফাতামোর আপন মা না সত,মা ।আর সত, মায়র অত্যাচারে মেয়েটি রাতে মাথা গোজার ঠাই পেলেও দু-মুঠো ভাত জোটে না পেটে।
 বশির মিয়ার মা নাই, তার  ঘরেও সত মা, বশির নাকি আবার তার সতমায়ের চোখের খেজুর কাটার মত  বিধে থাকে, ছোট বেলা একবার আমার পায়ে খেজুর কাটা বিধেছিলো, অসহ্য রকমের ব্যাথা করছিলো পায়ে, অনেকেই বলে খজুর কাটায় বিষ আছে, সেই বিশ সারা শরীরে চলতে পারে। তাহলে বুঝেন এইবার সেই কাটা যদি চোখে বিধে কেমন অবস্থা ? বশিরের মত শিশুর আধপোড়া কপালে সারাদিনে তার ঘরে  জোটেনা এক বেলা ভাত আর আখি, সাকিব খান, বাপ্পারাজ জানেনা তাদের বাবাদের কোন খোজ, স্বপ্নেও দেখে নাই বাবার মুখ, এদের মা কাজের জন্য সকালে  বেড়িয়ে যায় ফেরে সন্ধায়। 
স্থানিয় কোন এক সংস্থা বস্তির এসব ছিন্নমূল শিশুদের বিনামুল্যে পড়ানোর জন্য প্রজাপতি” নামের স্কুলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো; সেই প্রজাপতি ¯কুলে এরা সবাই পড়তো, দুপুরে নাকি খাবারের ব্যবস্থাও ছিলো সেখানে । হঠাৎ একদিন স্কুলের বৃষ্টি ম্যাডাম এসে বললো, কাল থেকে তোমরা আর স্কুলে আসবে না, কাল থেকে স্কুল বন্ধ। এতে অবাক হবার কিছু নাই, কেননা এনজিও কিংবা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলোর ফান্ডে টান পড়লে এমন ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু না। বাংলাদেশের এমন অনেক নামিদামি বেসরকরি প্রতিষ্ঠান ফান্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, তবুও এমন শিশু দিবসগুলোতে তাদের  বিশেষ গোল টেবিল আলোচনা,সভা-  সেমিসারের আয়োজন চলে , আর সেই আয়োজনে বক্তাদের আশার  বানী বিলিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আর পথশিশুদেও হাতে জুটে এক পেকেট চিনিগুরা চালের বিরানী ।
এবার প্রসঙ্গে ফেরাযাক, তারপর থেকেই এই ক্ষুদার্থ জাদুকররা সারাদিন পড়ে থাকে পার্কে, কিংবা ময়মনসিংহ শহরের কোন অভিজাত রেস্তোরার সামনে দেখা মেলে তাদের। পার্কে কোন যুগলবন্দিকে দেখলেই সবাই দলবেধে ১০টা ৫ টাকার জন্য শুরু করে খামছাখামছি। টাকা না পেলে কোন ছাড়াছাড়ি নাই,অনেকে বিব্রত হয়ে টাকা দেয় আবার অনেকে দেয়না। সবাইকে একসাথে দেখে বললাম, তোমাদের একটা ছবি তুলি? সবার  মধ্যমনি হয়ে ফাতেমা বলে বসলো- হ, ফটু তুলবাইন? তে ১০ টেহা দেওন লাগবো! অমিও যথারিতি দিতে রাজি হোলাম। ওদের সাথে আলাপের এক সময় জানতে চাইলাম,আচ্ছা আখি তোদের আবার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না ? প্রশ্নটা করতে যতক্ষন আর উত্তর দিতে সবমিলে হুমড়ি খেয়ে পড়লো আমার ওপর । হ, স্যার স্কুল যাইতাম, ভর্তি কইরা দিবাইন? বই কিনা দিবাইন ? জামা কিনা দিবাইন ? এমন প্রশ্নের উত্তরে আমি বেমালুম রিফুজি হয়ে গেলাম মাইরি। প্রতি শুক্রবার ময়মনসিংহের কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে বিয়ের অনুষ্ঠান হয় আর সেই অনুষ্ঠানগুলোতে এরা খূব পুরনো দাওয়াতি । আলাপের ফাকে বসির মিয়া বলছিলো “শুক্কুর বারে আমরা বিয়া বাড়িতে আইডা  খাবার খাইতে যাই; মেলা গুস্ত থাহে হেই হানে । 

[দুই মেয়ে  শিশুর এক সাথের ছবি ] 
এই পার্কেই আমার সাথে আলাপ হয় আরো দুটো কোমল পৃথিবীর, এক পৃখিবীর নাম বৃষ্টি আর রুষ্ক-খুস্ক  বিড়ালের বাচ্চার মতো পৃথিবীটার নাম  সোনিয়া । আলফাজের চায়ের দোকানটার সামনে রোজ ছুটোছুটি করতো এরা দুজন ।  নাগরদোলায় উঠে  যখন অন্যসব শিশুরা তার বাবামার দিকে তাকিয়ে আনন্দ করতো , কেউবা ভয়ে চিৎকার করতো তখন সোনিয়া আর বৃষ্টি হা করে  নাগরদোলাটারদিকে তাকিয়ে থাকতো । ওদের সমবয়সী শিশুগুলোর আনন্দ দেখে আনমনে ওরাও হেসে ফেলতো ।  
ওদের  কাছে গিয়ে বললাম তোমাদের বাড়ি কই ? সোনিয়া জবাব দিলো ঃ ওই দুহানের পিছে ; কিন্তু ওখানে আমি কোন ঘর দেখলাম না । একটা চৌকি আর তার নীচে দুটো তিনটে পোটলা কাথা বালিশ হবে হয়ত । 
তোমার আব্বার নাম কি? আব্বা নাই ! কোখায় ? যানি না ... তোমার আম্মা?  বাসাত কাম করতে গেছে ! দুপুরে খাবে না? সোনিয়া তার রুস্কখুস্ক চুলগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, মায় খাওন লয়াবো ; দেও ৫টা টেকা দেও ! খুব  বেশি কিছুনা এই টুকুন চাওয়াই ওদের । এই শিশু দুটো হয়ত তখন কোন স্কুলে থাকতো, চাকুরে কোন বাবা না হোক পেশায়  একজন দিনমজুর ওদের বাবা হতে পারতো । গ্রামে ছনপাতার একটা ঘর থাকতো , মা হয়ত সোনিয়ার চটচটে চুলে একটু তেল মেখে দিতো। খেলার জন্যে কয়েকটা মাটির পুতুল থাকতো , পুতুলের বিয়ে থাকতো হয়ত এত কিছুর ভীরেও একটা জীবন থাকতো। 
বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোকই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। বাংলাদেশের  প্রেক্ষাপটে  পথশিশু বা ছিন্নমূল শিশু নিয়ে আপনি যত জরিপ অর  গবেষনাই করেন মোটা দাগে বলাযায় এদের জীবনের গল্প একই রকম । তবে হে একটা ভয়ংকর রকমের খারাপ সংবাদ  অদুর ভবিষৎতে  আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বৈকি। এখন সময় এসেছে এই ভয়াবহ সমস্যা থেকে উত্তোলনের পথ খুজে বের করার পথ বেড় করার। সোজাসাপটা করে যদি বলি  তা হোল মাদকের ভয়াল ছোবল শুধু ময়মনসিংহ শররেই না ঢাকাসহ দেশের আনাচে কানাচে এই মাদক  গ্রাস করছে  পথশিশু কিংবা সমসাজের যাদের আমরা ছিন্নমূল শিশু বলে চালিয়ে দিতে থাকি হরহামেশ । 
কর্ম সুত্রে আমার ঢাকা থাকা হয়বলে এই চিত্রটি আমার কাছে অরো সুস্পষ্ট  হয়ে ফুটে ওঠে চোখের সামনে । রাস্তার আনাচে কানাচে বেশ কয়েকজন শিশুকে জরো হয়ে নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পাবে এই শহরের  যেকেউ । বর্তমান সময়ে তাদের হাতে হাতে থাকা  অতি পরিচিত মাদকটির নাম ড্যান্ডি,জুতার মুচিদের কাছে এটা সলিশন আঠা নামে পরিচিত। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে এই আঠা শিশুরা কোথায় পায়?  নিশ্চই দোকানদার কিংবা সেই মুচি এই আঠা তাদের  কাছে বিক্রি করে । ধরুন আপনি যদি এই দেশের কোন ওষুধের দোকানে গিয়ে ডাক্তারের ব্যবস্থা না নিয়ে ঘুমের ওষুদ চান তাহলে দোকানদার আপনাকে ওষুধ দিবে না । অথচ এই আঠা যেকোন সময় যে কেউ কিনতে পারে অনায়াসেই। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরে কোন নীতিমালা আছে কিনা আমার জানানেই। 
মহাখালির ওয়্যারলেস গেইট এলাকার ফুট ওভার ব্রিজের সামনে বেশ কয়েকজন শিশুকে হাতে হতে পলিথিন নিয়ে একসাথে জরো হয়ে পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে নিশ্বাস নিতে দেখাযায়।এ্টা প্রতিদিনকার চিত্র ,  একটু পর অচেতনের মতো পরেও যায় কেউ কেউ।সারাদিন কাধে বস্তা নিয়ে প্লাষ্টিকের বোতল টোকায় আর সেই টাকায় ড্যান্ডি সেবন করে শিশুগুলো। ড্যান্ডি সেবনকানী ১৩ বছরের কিশোরী মুন্নি (পোষাকী নাম ) জানায়, ড্যান্ডি খাইলে মাথাটা ঝিমায়, মরার মত পইরা থাহা যায় , খাওন দাওন ভুইলা যাই ড্যান্ডি খাইলে। সুমন নামের আরের ড্যান্ডি সেবনকারী বলে,  ড্যান্ডি টানলে আমি এই শহরের বাদশা হয়াযাই।মনে হয় আকাশ দিয়া উড়তাছি । ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকাসহ এমন অসংখ্য পয়েন্টগুলোতে আপনি এমন দৃশ্য প্রতিদিন দেখতে পাবেন ।      
[দুই বন্ধু একসাথে বসে আছে ]
২  অক্টোবর জাতীয় পথশিশু দিবস , পথ শিশুদের সঠিক সুরক্ষা আর তাদের নায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে প্রতি বছর আমাদের দেশে এই দিবসটি পালিত হয় । আজকের এই শিশুটিই আমাদের নতুন প্রজন্ম , নতুন দিনের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশে  আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে পথশিূশুর সংখ্যা , দেশে প্রায় ৮০ লাখের বেশি পথশিশু রয়েছে । যাদের মধ্যে মারাত্বক ঝুকিদে আছে ১০ লাখেরও বেশিশিশু। যাদের অধিকাংশই, অপুষ্টি, যৌনরোগ,মাদকের মত ভয়াল ছোবলে আসক্ত। বাংলাদেশের শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে ৮৫ শতাংশ পথশিশু মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ ধূমপান, ২৮শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক নিয়ে থাকে । জাতীয় মসানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের সূত্র মতে ,ঢাকা বিভাগে মসাদকাসক্তি শিশু প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে । মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছরের শিশুরা মারাত্বক মানসিক ও স্বাস্থ্য ঝুকিতে রয়েছে । উপরোক্ত গবেষনা যাইহোকনা কেন  বাস্তবে দিনে দিনে  এর চিত্র আরো ভয়াবহ আকার ধারন করছে দেশে। 
দুমুঠো ভাতের জন্য যখন একটি শিশু মানুষের দারে দারে ঘুরে , ভিক্ষাবৃত্তি করে  তখন তাদের পরিচয় হয় পথশিশু । নিশ্চই শিশুটি জন্ম থেকেই পথশিশু না , পরিবার, সমাজ বাস্তবতা, রাষ্ট্র  আজ পথশিশুদের  এই পথে এনেছে । রাষ্ট নামের শব্দটি যদি থাকে তবে আপনাকে অবশ্যই মানতে হবে একটি শিশু তার পূর্ন   অধিকার নিয়ে এই পৃথিবীতে জন্মায় । তাকে সুরক্ষা দেয়ার দয়িত্ব  আমাদের  যেমন রয়েছে পাশাপাশি   রাষ্টেরও বড়  দায়িত্ব এদের যথাযথ  পুর্নবাসনের ।  
সংশ্লিঠরা  মনে করেন জাতীর পিতা  বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২২জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) করেছিলেন। যেই আইনের আওতায় শিশুদের নাম, জাকীয়তার অধিকার আদায়ের স্বীকৃতি, সকল ধরনের অবহেলা, নির্যাতন, খারাপ কাজে ব্যবহার হওয়া ইত্যাদিসহ শিশুদের  সুরক্ষার্থে তাদের অধিকার নিশ্চিত করায় কাজ করবে, যদিও বর্তমান সরকারের শিশুদের জন্য গৃহিত নানামুখি উন্নয়নমূলক প্রকল্প চালু রয়েছে তারপরও  তা পর্যাপ্ত নয়, সুতরাং সমাজের এই ছিন্নমূল পথশিশুদের জণ্য আরো সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহন করা প্রয়োজন ।  

লেখা ও ছবি :
ইমতিয়াজ আহমেদ 
সংবাদকর্মী
[email protected]  

  

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK