শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Sunday, 01 Sep, 2019 07:50:45 pm
No icon No icon No icon

প্রিয়জন যখন স্মৃতি

//

প্রিয়জন যখন স্মৃতি


মুহম্মদ জাফর ইকবাল: অ্যাডভোকেট সুপ্রিয় চক্রবর্তী কিংবা আমাদের রঞ্জুদাকে নিয়ে এ রকম একটি লেখা লিখতে বসব, কখনও ভাবিনি। বেশ কিছুদিন থেকে আমি দেশের বাইরে। রঞ্জুদা দেশে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন, খবরটি ভালো লাগেনি। মানুষজন অসুস্থ হবে এবং মাঝেমধ্যে হাসপাতালে যাবে, চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসবে- খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হওয়ার কথা। কিন্তু এই দেশে থাকার কারণে হাসপাতাল শুনলেই বুকটা ধক্‌ করে ওঠে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন সে রকম একটা খবরের জন্য অপেক্ষা করছি, তখন হঠাৎ করে খবর পেলাম রঞ্জুদা আর সেই। সেই থেকে মনটা বিষণ্ণ হয়ে আছে। দেশে থাকলে আপনজনের সঙ্গে কথা বলে মনটা একটুখানি হলেও হালকা করা যেত। এখানে থেকে তার উপায় নেই। ল্যাপটপে খবরগুলো পড়ে মনটা আরও ভার হয়ে থাকে।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী এবং তার স্ত্রী সুলতানা কামালের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে '৯৪ সালের দিকে, যখন আমরা দেশে ফিরে এসে সিলেটে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছি। ছেলেমেয়েরা ছোট, তাদের জন্য একটা স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ জানতে পারলাম, ‘আনন্দনিকেতন’ নামে একটি নতুন স্কুল তৈরি হয়েছে। সেখানে গিয়ে সুলতানা কামাল আর সুপ্রিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় হলো। তাদেরও আমার ছেলের সমান একটি মেয়ে রয়েছে এবং সেই স্কুলে পড়ছে। আমাদের ছেলেমেয়েকেও সেই স্কুলে ভর্তি করানো হলো। সুলতানা কামাল অনেক বড় মানবাধিকার কর্মী; কিন্তু তিনি সেই স্কুলটিকে দাঁড় করানোর জন্য সেখানে পড়ান। আমার স্ত্রীও সেখানে পড়ানো শুরু করল। সুপ্রিয় চক্রবর্তী সুযোগ পেলেই তার গাড়ি করে আমার স্ত্রীকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন; স্কুল থেকে বাসায় নামিয়ে দিতেন। তাদের মেয়ের সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব হলো, পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা হলো।

দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকে দেশে এসে আমাদের থিতু হওয়ার ব্যাপারে এই দম্পতির একটা অনেক বড় ভূমিকা আছে। তারা সবসময় আমাদের পাশে থেকেছেন। সুপ্রিয় চক্রবর্তী সিলেটের মানুষ। তিনি আমাকে সিলেটের সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে পরিচিত করে তুললেন। দেশে তখন জামায়াত-শিবিরের এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে। আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হলের নাম ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল’ দেওয়ার চেষ্টা করার কারণে একটা তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। আমাদের বাসায় বোমা পড়ল; সুপ্রিয় চক্রবর্তী ও সুলতানা কামালের বাসায় বোমা পড়া একটা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গেল। আমি মোটামুটি বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম, এসব ব্যাপারকে তারা থোড়াই কেয়ার করেন! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে দীর্ঘদিন থেকে সংগ্রাম করে আসছেন; তাদের জন্য এটি নতুন কিছু নয়। দু'জনে মিলে তারা আপাদমস্তক একটা মুক্তিযোদ্ধা দম্পতি।

সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে আমি এই সময় নতুন করে আবিষ্কার করলাম। আমি আবিষ্কার করলাম, সুপ্রিয় চক্রবর্তীর মাঝে বিচিত্র এক ধরনের আন্তরিকতা আছে, যেটা খুঁজে পাওয়া কঠিন। এত সহজ-সরলভাবে কথা বলেন, কথাবার্তায় এমন এক ধরনের সারল্য এবং বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধ আছে যে, এই মানুষটিকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় এ রকম মানুষ পৃথিবীতে খুব কম আছে। দেশ থেকে বহুদূরে বসে আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, আমার শুধু মনে হচ্ছে, কেন আমি তার সঙ্গে বেশি সময় কাটালাম না, আরও বেশি কথা বললাম না, আড্ডা দিলাম না। সুপ্রিয় চক্রবর্তীর চরিত্রের বর্ণনা দেওয়ার জন্য তার সম্পর্কে ছোট একটা ঘটনা বলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইনকাম ট্যাক্স হিসেবে কেটে নিত। আমার নিজের বিশেষ কিছু করার ছিল না। দেশে এসে আবিষ্কার করেছি, আমার ইনকাম ট্যাক্সটি নিজের দায়িত্ব। এসব ব্যাপারে আমি নেহাত আনাড়ি; তাই একজন ইনকাম ট্যাক্স লইয়ারের খোঁজ করতে থাকি। তখন প্রায় হঠাৎ করে জানতে পারলাম, সুপ্রিয় চক্রবর্তী ইনকাম ট্যাক্স লইয়ার। পরিচিত আপনজনকে এ রকম একটা কাজ দেওয়া যায় কি-না, সেটা নিয়ে এক ধরনের সংকোচ ছিল; কিন্তু তিনি জানতে পেরে সানন্দে আমার কাজ করে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। এর কিছুদিন পর আমি আমার ছেলেমেয়ে, পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গেছি। ফিরে এসে সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কাছে আমার ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, তিনি যে শুধু আমার কত টাকা ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে বের করেছেন তা নয়, নিজের পকেট থেকে সেই ইনকাম ট্যাক্সটুকু দিয়েও দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, কত টাকা দিয়েছেন জানার চেষ্টা করার পরও তিনি হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটি উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। তুচ্ছ টাকা নিয়ে কথাবার্তায় তিনি সময় দিতে চান না। আমি নিশ্চিত, সারা পৃথিবীতে সুপ্রিয় চক্রবর্তী একমাত্র ইনকাম ট্যাক্স লইয়ার যে, হিসাবপত্র করে ট্যাক্সের পরিমাণ বের করে নিজের পকেট থেকে সেটা দিয়ে দেয় (অনেক কষ্ট করে সেই পরিমাণটা বের করে আমি তাকে পরিমাণটুকু ফেরত দিতে পেরেছিলাম)!

কেউ যেন মনে না করে যে, মানুষটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য পাগল, সংস্কৃতি চর্চা এবং ক্রিকেট ছাড়া আর কিছু বুঝে না; সেই মানুষটা বুঝি প্রফেশনাল জীবনে মোটামুটি দায়সারা। মোটেও তা নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অ্যারেস্ট করে জেলে ঢোকানো শুরু হলো, তখন আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম। পত্রপত্রিকায় তার ছবিও ছাপা হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চয়ই সামরিক বাহিনীর লোকজনের পছন্দ হয়নি। কারণ ইনকাম ট্যাক্স অফিসের কর্মকর্তারা আমাকে বলেছেন, তখন সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দারা এসে আমার সমস্ত কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন, কোনো একটা ফাঁকফোকর খুঁজে বের করতে পারেন কি-না। কিন্তু সুপ্রিয় চক্রবর্তীর নিখুঁত কাজে কখনও কিছু খুঁজে পায়নি। সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কথা বলতে হলে তার কোন কথাটা আগে বলব, কোন কথাটা পরে বলব, বুঝতে পারি না। তিনি যে ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, একজন ক্রীড়া সংগঠক, সেটি সবাই জানে। আমরা যারা একটা অনুষ্ঠান উপভোগ করতে যাই, তারা শুধু কিছু অপূর্ব গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বাসায় ফিরে আসি। আমরা কখনও চিন্তাও করতে পারি না, এর পেছনে আয়োজকদের কত শ্রম গেছে। ভলান্টিয়ারদের কত বিনিদ্র রজনী, শিল্পীদের কত মান-অভিমান, আমলাদের কত রকম হম্বিতম্বি শেষে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা হয়, কত বিলের টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, সেটি শুধু আয়োজকরাই জানেন। সুপ্রিয় চক্রবর্তী হাসিমুখে সেগুলো করে এসেছেন। সাধারণ মানুষের জন্য তার ভেতরে এক ধরনের গভীর ভালোবাসা ছিল। সংস্কৃতি-অন্ত এই মানুষটি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক। তাই তার দেহটি বিজ্ঞান গবেষণার জন্য কুমুদিনী হাসপাতালকে দান করে গেছেন। তাকে কীভাবে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়, আমি জানি না। এক কথায় বলা যায়, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন বাঙালি।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী চলে যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে একটা খবর পড়ে মনে কষ্ট পেয়েছি। সুলতানা কামাল নাকি সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে কলকাতা নিয়ে চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। সুলতানা কামালকে ভারতীয় ভিসা দেওয়া হয়নি বলে তারা যেতে পারেননি। সুলতানা কামালকে ভারতীয় ভিসা দেওয়া হয়নি সুন্দরবন রক্ষার জন্য রামপালের কয়লা দিয়ে চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করার কারণে। আমার দেশের একটা ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য আমি তো আন্দোলন-সংগ্রাম করতেই পারি। সেই জন্য ভিন্ন একটা দেশ আমার ওপর বাধানিষেধ দেবে, সেটি কোন ধরনের যুক্তি? পৃথিবীর অন্য সব দেশের হাইকমিশন, অ্যাম্বাসি এক ধরনের হলেও ভারতীয় হাইকমিশন একটু অন্য রকম হওয়ার কথা। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক বন্ধন আছে। তারা কি এই দেশের সুলতানা কামালদের কথা জানে না?

রামপাল শক্তি কেন্দ্রের বিরোধিতা আর মৌলবাদীদের ভারতবিদ্বেষ যে এক ব্যাপার নয়, সেটি বোঝা কি এতই কঠিন? সরকার রামপালের পক্ষে যত কথাই বলুক কিছু কিছু ব্যাপার পুরোপুরি কমনসেন্স, যেগুলো বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। আমাদের সুন্দরবনের নদীগুলো একেবারে মাকড়সার জালের মতো একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে। উজানে কোথাও যদি নদীর মুখে কিছু ঘটে, দক্ষিণে পুরো নদীর নেটওয়ার্কে তার প্রভাব পড়ে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হওয়ার পর তার জ্বালানি হিসেবে যখন বার্জ বোঝাই করে এই নদী দিয়ে কয়লা আনা হবে, তখন যদি কোনো একটি বার্জ ডুবে যায়, তাহলে সেখানকার সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর সুন্দরবন এলাকাটিতে কি তার একটা বিরূপ প্রভাব পড়বে না? যখন একটার পর একটা বার্জ এই নদীগুলো দিয়ে উজানে আসবে, তার পরিত্যক্ত ডিজেল, নদীতটে ঢেউয়ের আঘাত, শব্দদূষণ- সেগুলো কি একেবারে তুচ্ছ বিষয়? তাহলে কেউ যদি সুন্দরবনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সেটা রক্ষার জন্য আন্দোলন করেন, তাহলে তাকে কি দোষ দেওয়া যায়? নিজের দেশকে ভালোবাসা, অন্য দেশের বিরোধিতা করা নয়- এই সহজ সত্যটা ভারত সরকার জানে না দেখে অবাক হয়ে যাই। একটা পুরো রাষ্ট্র প্রতিহিংসা নিয়ে একজন মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, সেটি বিস্ময়ের ব্যাপার। সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে কলকাতা নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারলে তিনি সত্যি সত্যি সুস্থ হয়ে যেতেন কি-না, আমরা জানি না। সেটি নিয়ে বুকের ভেতর একটুখানি ক্ষোভ থেকে যাবে। তবে তিনি এর সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। আমাদের বুকে এখন একটি স্মৃতি হয়ে থেকে যাবেন।

সেই স্মৃতিটা অসম্ভব মধুর একটি স্মৃতি, সেই কথাটি তাকে আর বলতে পারব না।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK