রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Saturday, 10 Aug, 2019 11:13:42 pm
No icon No icon No icon

একজন অধীর বিশ্বাস : বিবেকের দ্বীপ জ্বালাতে চান

//

একজন অধীর বিশ্বাস : বিবেকের দ্বীপ জ্বালাতে চান


ঋদ্ধিমান চৌধুরী: তার সঙ্গে যে আগেও দু’একবার দেখা হয়নি, তা কিন্তু নয়। তবে, গভীরতাটা কম ছিল। এবারে তাকে কেন্দ্র করেই যখন কাজ তখনতো তার সঙ্গে পরিচয়টা হবে বেশ জমিয়ে। তারপর তার পরিচয় ওঠে এসেছে টাইম ম্যাগাজিনের বেস্ট অফ এশিয়ার তালিকায়। একি চাট্টিখানি কথা! না এবারে তার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতেই বেরিয়ে পড়া। ট্যাক্সিওয়ালাদের চাতুরতা এবং  বিভিন্ন লোকের কাছে গন্তব্য জানতে চেয়ে সঠিক উত্তর না পাওয়ার মত সমস্যাকে গায়ে না মেখেই অবশেষে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো গেল।
এর আগে আগরতলা বিমান বন্দর থেকে আকাশে ওড়ার পরই মনে মনে একটা ছক এঁকে নিয়েছি। কলকাতা পৌঁছানোর পর প্রথমেই তার সঙ্গে দেখা করে নিতে হবে। তারপর বিশ্রাম নিয়ে দ্বিতীয় দিন টানা কাজ সেরে পরের  দিন ফের আকাশ পথে আগরতলা। কলকাতায় গরম বেশ। মধ্য জুলাইয়েতো গরম থাকবেই। তাছাড়া গোটা বিশ্বেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। মানুষের অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রকৃতি ফুঁসে ওঠেছে। যার পরিণতি শীতপ্রধান দেশেও এখন ৩০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে বইছে তাপমাত্রা।
সন্ধ্যা তখন নামেনি। ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে নেমে আসি। রাস্তা পেরিয়ে আমাকে গলিপথ ধরতে হবে। মুঠোফোনে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল জায়গাটির নাম। ক’জনকে জিজ্ঞেস করা হলে বিরক্তি প্রকাশ পেল চোখে-মুখে। তাতে কি, চলতে গিয়েতো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। ডানে-বায়ে সিনিয়র সিটিজেনের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। পুষ্টিহীন লিকলিকে দেহেও বনেদী ছাপ। ঠিক বিধ্বস্ত বলা যাবে না। তাঁকে নিয়ে বহু খ্যাতিমানের অবেগ জড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এটি কলকাতার বইপল্লী ‘কলেজস্ট্রিট’।
২০০৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ভারতের উল্লেখযোগ্য স্থানের স্বীকৃতি পায় কলেজ স্ট্রিট। ইতিহাস বলে দেয়, মধ্য কলকাতার একটি রাস্তার নাম কলেজ স্ট্রিট। ১.৫ কিলোমিটারের রাস্তাটির পাঁজর ঘেঁষে এই অঞ্চলের পুরানো একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার সুনাম ও ঐতিহ্য বহুকালের।  মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরেই কলেজ স্ট্রিট প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তীতে যা প্রকাশনা ও বিক্রয় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য। ১৮১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজটি। যা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়া ১৮৫৭ সালে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।  রয়েছে এশিয়ার প্রথম কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ সালে। আছে সংস্কৃত কলেজ। যার প্রতিষ্ঠা ১৮২৪ সালে।  এছাড়া ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতের প্রথম এমবিএ শিক্ষাকেন্দ্র ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট। ১৮১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হেয়ার স্কুল এবং  হিন্দু স্কুলের গোড়া পত্তন হয়  ১৮১৭ সালে।
রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠছে। আশপাশ থেকে ভেসে আসছে সন্ধ্যা আরতির শব্দ। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সরু রাস্তাটি ধরে। আলোআঁধাঁরিতে কিছুটা পথ এগুনোর পর একজন  ভদ্রমহিলার সাহায্য নিলাম। জানতে চাইলাম গাঙচিল প্রকাশনা কার্যালয়ে যাবো। ভদ্রমহিলা একবার আমার দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে দু’কদম হেঁটে গিয়ে আঙ্গুল তুলে বললেন, ওই যে ঘরটা, ওটাই গাঙচিল। তাকে সম্মান জানিয়ে এগিয়ে গেলাম। দরজা ঠেলে ভেতরে মাথা গলিয়ে দিতেই তামাটে রঙের এক ভদ্রলোকে বললেন-আসুন আসুন। ঘরটিতে প্রবেশ করতেই চারিদিকে তাকালাম। বিভিন্ন লেখকের প্রকাশিত বইয়ে প্রতিটি তাক ঠাঁসা। আমার দু’চোখে নেশা ধরে যায়। ঘরে আরও দু’জন ভদ্রলোক ছিলেন। সবাই যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধ সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। গাঙচিলের প্রতিষ্ঠাতা অধীর বিশ্বাস। আমার অধীর দা। সরল মানুষ। এক জায়গায় কঠিন। সেটি হচ্ছে প্রকাশনার ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে তার মধ্যে আবেগের লেশমাত্র নেই। বইয়ের রাজ্যে ঢুকে আমার গরম উধাও। তার সঙ্গী দু’জনের একজন দীপক রায় অপরজন সাহিত্যিক শৈলেন সরকার। অধীর দা বললেন, তোমাকে যেভাবে বলেছিল, সেইভাবে কাজ করতে হবে। আবেগের কোন স্থান নেই। মেদহীন কথা বলবে। অলংকারের চেয়ে তথ্যে ঠাঁসা থাকবে। বুঝলে তো। ইতিহাসের শরীরে যদি রঙ লাগাও, তখন তা আর ইতিহাসের গন্ধ থাকে না। মানুষকে জানাতে হলে, তার জন্য কাজ করতে হলে, সেরকম কাজ করতে হবে। এই দ্যাখো না, এখানের কাজ হচ্ছে, আমি না-আমরা।  মেজেয় বসে গেলেন দাদা। আমাকে ব্যস্ত থেকেই হাত দ্যাখে হাত তুলে বললেন, তুমি বসো। এরই মধ্যে চা এলো। চা-বিস্কুটের পালা শেষে দাদা আরও বেশ কিছু কথা বললেন, যা আমার কাজে লাগবে। অনেকগুলো বই দেখা হলো। সমৃদ্ধ প্রকাশনা গাঙচিলের। বাংলাদেশেও গাঙচিল প্রকাশিত বইয়ের বাজার রয়েছে। জানালেন দাদা। এক সময় হাতে একটি বই দিয়ে বললেন, দ্যাখো বইটি কেমন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই। এটি মূলত বীরাঙ্গনাদের নিয়ে লেখা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বর্বর পাকহানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরদের লালসার শিকার হন হাজারো মা বোন। লাখো শহীদ আর মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত লালসবুজের পতাকা। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ বীরাঙ্গনা নারীরা স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের মর্যাদা দিয়েছেন। গাঙচিল প্রকাশিত বইটির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন সাত্যকি হালদার। বইটিতে হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা ওঠে এসেছে।
অর্থ-সামর্থ্য বা অবস্থানে হয়তো ওমন উচ্চতায় নেই। কিন্তু, ঐ যে একটা কথা ‘আত্মার ঐশ্বর্য্য থাকলে দারিদ্রতা তাকে স্পর্শ করতে পারে না’।  অধীর দা এমন একজন মহৎ ব্যক্তি যিনি সমাজের মানুষদের উপদেশ বিলিয়ে থাকেন। নিজের যোগ্যতা, অর্থ-সামর্থ্য ও বিচার-বুদ্ধি দিয়ে আমাদের অন্যের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে এটা সামাজি দায়িত্বেরই একটা অংশ। যারা সমাজসচেতনতায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন এমন একজন অধীর বিশ্বাস। একাধারে প্রকাশক, সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের বাসিন্দা। জীবনভর কঠোর সংগ্রামী এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে সাহসি এক হার না মানা কর্মী। যিনি অধিকার রক্ষায় মানুষকে বিবেকের রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। তরুণদের সংগঠিত করতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা রুচিশীল বই প্রকাশ করে চলেছেন। পত্রিকার পাতায় তাদের সম্পৃক্ত করতে অবিরাম কাজ করছেন। তার মানবিকগুণের আবেদনটিকে নিবেদিত করেছেন সমাজের বিবেককে জাগিয়ে তোলার কল্যাণে। কাজ করে চলেছেন নিভৃতে। তাই বহুমাত্রিক অভিধাটি তার জন্যই মানায়। এ কারণেই আজকের একজন আলোকিত মানুষ অধীর বিশ্বাস। যিনি নিজেকে শুধু আপন বলয়ে আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়ালে বন্দী না রেখে সমর্পিত হয়েছেন বহুজনের মাঝে শুভ, সুন্দর, কল্যাণের মঙ্গলালোকে। তাই তিনি আমাদের সমাজের শুভবোধের সারথী। তিনি সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন পশ্চাৎপদ অনগ্রসর মানুষকে যে-কোন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে। তার এই মানবিক গুণের কারণেই লেখক-পাঠকদের মনমন্দিরে স্থায়ী আসন পাবার উপযুক্ত কাজ।  তিনি মনে করেন, কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে মানুষের মহত্ব প্রাপ্তির সুযোগ ঘটে। এই মহত্ব অর্জনের মধ্য দিয়েই সমাজের মলিনতা দূর হয়। অধীর বিশ্বাস সীমিত সামর্থের সেবাব্রত’র মন্ত্রে দু’বাহু বাড়িয়ে দিয়েছেন-এটাই তার জীবনের লক্ষ্য। তার দুয়ার সকাল-সন্ধ্যা-রাত অষ্টপ্রহরব্যাপী খোলা। তিনি প্রকাশ-পাঠক সমাজকে বিবেকের কাতারে দাঁড় করানোর  দ্বীপ জ্বালাতে চান।
আনন্দ বাজার পত্রিকার নীতিনির্ধারণী পাতাটির দায়িত্ব পালন করেছেন অধীর বিশ্বাস। গাঙচিল তাঁর স্বপ্নে উর্বর জমি। কায়মনোবাক্যে বিশ্বাসের ফসল বুনে যাচ্ছেন। অধীর দার সঙ্গে রয়েছেন দীপক রায়। তিনিও আনন্দবাজারে সাব এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রয়েছেন সাহিত্যিক শৈলেন সরকার। সবাই লব্ধজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। গাঙচিল হচ্ছে তাদের-আমাদের সাধনার মন্দির। যা মানবকল্যাণের পথে হাঁটার মন্ত্র শেখায়। গাঙচিলের প্রতিটি প্রকাশনার পরতে পরতে সাধনার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন অধীর বিশ্বাস তথা অধীর দা’রা। কোন ভাষায় শ্রদ্ধা জানাবো ঋদ্ধ এই মানুষগুলোকে? তবে, একটি কথাই বলবো ‘বই কাউকে বঞ্চিত করে না’। সেলুট কর্মীবীর অধীর দা।

লেখক: ঋদ্ধিমান চৌধুরী, রিপোর্টার নিউজ ভ্যানগার্ড টেলিভিশন, ত্রিপুরা, আগরতলা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK