সোমবার, ১৫ জুলাই ২০১৯
Friday, 28 Jun, 2019 11:49:50 pm
No icon No icon No icon

ঢাকাইয়া কারা?

//

ঢাকাইয়া কারা?


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: কাদের ঢাকাইয়া বলা যাবে? এই প্রশ্ন, প্রসঙ্গ নিয়ে ঐতিহাসিক, ইতিহাসবিদ, গবেষক, ঢাকার ঢাকাইয়া সমাজ, অঢাকাইয়া জনগোষ্ঠী এবং দেশের সাধারণ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে অনেক সংশয়, কৌতুহল, জিজ্ঞাসা, তর্ক-বিতর্ক আছে। কেউ বলছে, ১৯১২ সালের ব্রিটিশ সিএস পর্চা অনুযায়ী যারা ঢাকার জমির মালিক তারা/তাদের বংশধর/উত্তরসূরীরা হচ্ছে ঢাকাইয়া। অনেকের মতে, যাদের পরিবার প্রায় ১০০ বছর/৪-পুরুষ/প্রজন্ম ধরে বংশানুক্রমে ঢাকা শহরে বসবাস করছে তারা ঢাকাইয়া অথবা ৩-পুরুষ বংশানুক্রমে ঢাকা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা হলেই তারা ঢাকাইয়া। আবার অনেকের প্রশ্ন ও যুক্তি হচ্ছে, আমার মা অথবা বাবা একজন ঢাকাইয়া। অথবা মা-বাবা কেউ ঢাকাইয়া না হলেও আমি ঢাকায় জন্মগ্রহন করেছি। তাহলে আমি কি ঢাকাইয়া? এইসব ব্যাপার ও প্রশ্ন স্পষ্ট/পরিষ্কারভাবে জানতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে, ঢাকা শহরে ঢাকাইয়া বলতে কাদের বুঝায়? কিভাবে ঢাকা নগরীতে ঢাকাইয়াদের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে? ঢাকা শহরের বিকাশ, সমৃদ্ধ ঢাকাইয়া সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসের পেছনে ঢাকার আদিবাসী ও খাস ঢাকাইয়াদের কি ভূমিকা এবং অবদান আছে?

মুঘল সুবা বাংলার রাজধানী হিসাবে বর্তমান পুরান ঢাকায় প্রাচীন ঢাকা নগরীর পত্তন হলেও মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগেই ঢাকায় ঢাকাইয়া গোত্রের পত্তন এবং বিকাশ ঘটে। পুরান ঢাকা হচ্ছে ঢাকাইয়াদের আদি জন্মভূমি ও বিকাশ কেন্দ্র।মুঘল আগমনের পূর্ব থেকেই ঢাকায় নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা থাকত, মুঘল যুগে উত্তর ভারত থেকে আগত মুঘলরা, ব্রিটিশ যুগে কলকাতা অঞ্চল থেকে আগত উচ্চ বর্ণের বাঙালী হিন্দুরা ঢাকায় এসে বংশানুক্রমে বসবাস শুরু করেছিল এবং স্থানীয় ঢাকাইয়া বাঙালী মুসলমানদের পূর্বপুরুষরা অধিকাংশই ব্রিটিশ যুগে জীবন ও জীবীকার তাগিদে ঢাকার বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এসে ঢাকায় স্থায়ী এবং বংশানুক্রমে বসবাস শুরু করেছিল। যুক্তপাকিস্তান হাসিলের পর ঢাকা পূর্ববাংলা/পূর্বপাকিস্তান প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় এখানে অনেক নতুন নতুন চাকরী, ব্যবসা, পেশা, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং সারা দেশে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই সমস্ত কারণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থ-সামাজিকভাবে অবস্থা সম্পন্ন, সরকারী চাকুরীজীবী, পেশাজীবী, নতুন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মানুষ সম্প্রসারিত নতুন ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। তারাই ছিল ঢাকার আদিবাসী এবং খাস ঢাকাইয়া।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর উচ্চশিক্ষা, সরকারী চাকরী, ব্যবসা, পেশাগত কারণে, জীবীকার তাগিদে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নের লোকদের রাজধানী ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা করার প্রবণতা আরো বেগবান হয়। কয়েক দশকের ব্যবধানে এই নতুন বহিরাগত ঢাকাবাসীদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে নতুন আম ঢাকাইয়া জনগোষ্ঠী। তাই ঢাকাইয়া বলতে এখন ঢাকার আদিবাসী/তাদের বংশধর এবং নতুন ঢাকাইয়া জনগোষ্ঠী/তাদের বংশধরদের নিয়ে গঠিত ঢাকার স্থানীয় ঢাকাইয়া নগরজীবীদের বুঝায়। ভূ-সম্পত্তি ঢাকাইয়া পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন অপরিহার্য শর্ত নয়। কারণ সবাই ভূ-সম্পত্তির মালিক হয় না। তাই ঐতিহাসিকভাবে ঢাকায় অবস্থাগত সময়ের দিক থেকে ঢাকাইয়াদের দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। ১.আদি/খাস/খান্দানি ঢাকাইয়া এবং ২.নতুন/আম/সাধারণ ঢাকাইয়া। এই দুইয়ের মধ্যে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পার্থক্য আছে।

১.আদি ও খাস ঢাকাইয়াদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, ইতিহাসঃ খাস ঢাকাইয়া পরিচয়টি অর্জন করা যায় না/করা সম্ভব না। কারণ খাস শব্দ ও পরিচয়টি ঢাকার মূল আদিবাসীদের বংশধর ঢাকাইয়াদের প্রাচীন খান্দানি বংশভিত্তিক ইতিহাস ও নাগরিক পরিচয়কে সুনির্দিষ্ট করে ও তুলে ধরে। খাস ঢাকাইয়ারা পারিবারিকভাবে রক্ত সম্পর্কীয়, বংশগত, প্রজন্মগত, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যগত সূত্রেই ঢাকার মূল আদিবাসী বাসিন্দাদের বংশধর, ঢাকাইয়া পরিবারের সন্তান এবং ঢাকা শহরের ভূমিপুত্র। ঢাকাই তাদের পূর্বপুরুষদের আদিনিবাস, তাদের মূল আবাসস্থল এবং তাদের পরিবার ও আত্নীয়তার সূত্র, গন্ডীসীমাও ঢাকা শহর ভিত্তিক। খাস ঢাকাইয়াদের পত্তন, বিকাশ ঘটেছে প্রাচীন ঢাকা তথা বর্তমান পুরান ঢাকাকে ভিত্তি করে। ঢাকা নগরীর পত্তনে, ঢাকাইয়া ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, বিকাশে ঢাকার আদিবাসী ও খাস ঢাকাইয়াদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। তারা হচ্ছে ঢাকাইয়া কুট্টি, উর্দূ ও শুদ্ধ ঢাকাই ভাষার জন্মদাতা। তারা মুঘল ও ঢাকাইয়া ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধের ধারক, বাহক, প্রবক্তা। এই সমস্ত কারণে ঢাকার আদিবাসীদের বর্তমান বংশধরগণ তাদের আদি বংশগত জাত্যাভিমান থেকে নিজেদের খাস ঢাকাইয়া বলে গণ্য, অভিহিত এবং দাবী করে থাকে।

(ক)ঢাকার আদি অভিজাত-মধ্যবিত্ত শ্রেণিদের অবস্থানঃ পুরান ঢাকাভিত্তিক নিম্নবর্ণের তফসিল ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু, অবাঙালী বংশোদ্ভূত উর্দূভাষী সুব্বাসী, কুট্টিভাষী বাঙালী মুসলমানরা হচ্ছে ঢাকার মূল আদিবাসী এবং তাদের বংশধররাই হচ্ছে খাস ঢাকাইয়া। এরা ১০০ বছরের অধিককাল ধরে বংশানুক্রমে চিরস্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করে আসছে। উনবিংশ শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের যুক্তবাংলা প্রদেশের অন্তর্গত পূর্ববাংলা অঞ্চলের সর্ববৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর ঢাকার অধিকাংশ জমির মালিক ছিল অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বর্ণ হিন্দুরা। এ সময় ঢাকায় একটি ক্ষুদ্র আকারের শিক্ষিত, সম্পদশালী/স্বচ্ছল, প্রভাবশালী অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাঙালী-অবাঙালী মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল। তারা অধিকাংশই ছিল চোস্ত উর্দূভাষী। বিশেষত চল্লিশ দশকের দিক থেকে ঢাকায় ভূ-সম্পদশালী বাঙালী মধ্যবিত্ত মুসলমান শ্রেণির বিকাশ ঘটতে শুরু করে। তারা ঢাকার নবাব, জমিদার, পঞ্চায়েত সর্দার ও ধনাঢ্য ব্যাপারী পরিবার ভুক্ত, পারিবারিক ভূ-সম্পত্তির ওয়াকফ মুতুল্লি, চকের পাইকারী ব্যবসায়ী, জমি/বাড়ি/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান/দোকানের মালিক ছিলেন। ইমাম, কাজী, গৃহ/স্কুল/মাদ্রাসা শিক্ষক, উকিল, কবিরাজ, ডাক্তার, কবি, সাহিত্যিক, প্রকাশক, রাজনীতিবিদ, কন্ডেক্টার/ঠিকাদার, খেলোয়ার, সরকারী কর্মচারী ছিলেন ছিলেন। তাদের অধিকাংশের ঢাকায় এক/দোতালা পাকা উঠান বাড়ি ছিল। তাই ঢাকাইয়ারা গরীব, নিচু জাত থেকে উঠে এসেছে, অশিক্ষিত, ছোটলোক ছিল এসব কথা সর্বাংশে সত্য, সঠিক, নিরপেক্ষ ইতিহাস নির্ভর না বরং এগুলো অনেকাংশেই কিছু অঢাকাইয়া হিংসুক, স্বার্থান্বেষী মহল, মিথ্যা ধারনা প্রাপ্ত ব্যক্তি/ পোষনকারীদের গুজব/কান কথা, প্রপাগান্ডা/মিথ্যাচার এবং মীথ/অতিকথা মাত্র।

ঢাকার আদি নিম্ন মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের অবস্থানঃ তারা ছাড়া ঢাকার বাকী স্থানীয় অনগ্রসর, দরিদ্র নিরক্ষর/স্বল্প শিক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম-হিন্দু বাঙালীরা কুট্টি বাংলা, কুট্টি-উর্দূ মিশ্রিত ভাষায় কথা বলত। ব্রিটিশ ও যুক্তপাকিস্তান যুগে সংখ্যাগরিষ্ঠ ঢাকাইয়ারা বংশ পরস্পরায় রায়ত প্রজা, কৃষক/বর্গা চাষী, জেলে, বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও নিচু পেশার কাজ, চাকরী, ব্যবসা করে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস ও জীবীকা নির্বাহ করত। তারা মুদি, কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী, কসাই, বাবুর্চি, দর্জী, সেলুনের নাপিত, লাঠিয়াল, মালি, গরুর গাড়ি চালক, ঘোড়াগাড়ির কোচয়ান, হাতির মাহুত, কোর্টের মুহুরী, সেরেস্তা, জমির দালাল, মুচি, কামার, কুমার, নৌকা/বজড়ার মাঝি, বিভিন্ন ধরনের কারিগর শ্রেণির মানুষ, দিন মজুর ছিল। তারা জমিদার/বাসাবাড়ির মালিকদের জমি/বাসায় থাকত, রাস্তার ধারে/এলাকার বিভিন্ন বস্তি ঘর/মেসে থাকত। তাদের অনেকের এক টুকরো নিজস্ব জমি, সামান্য ছনের তৈরি ঘর ছিল। এখনো অনেক দরিদ্র ঢাকাইয়া আছে যাদের বাপ-দাদা-বড় বাবাদের জন্ম ঢাকাতে এবং তারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র, নিচু কাজ, পেশা, ব্যবসায় নিয়োজিত, জড়িত আছে। পুরানো বিভিন্ন পেশা ছাড়াও তারা সরকারী চাকরী, ফুটপাত/হকার দোকানদার/ব্যবসায়ী, কসাই, সবজি/মাছ/মুরগী বিক্রেতা, ভ্রাম্যমান পণ্য সামগ্রী বিক্রেতা শরবত, লেইসফিতা, আইসক্রিম, চানাচুর, চটপটি, হাওয়াই মিঠাই, কটকটি ওয়ালা। বাসা/এপার্টমেন্ট/মার্কেট/শিক্ষাঙ্গণ/হাসপাতাল/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান/দোকানের ম্যানেজার, কর্মচারী, বুয়া, দাড়োয়ান, রিক্সা/ভ্যান/ঢেলাগাড়ি/ট্যাম্পু চালক, সিএনজি/গাড়ি/বাস/ট্রাকের ড্রাইভার, নির্মাণ/শিল্প-কারখানা/গার্মেন্স শ্রমিক, তালা/কাঠ/গ্রিল/বাথ/ইলেক্ট্রিশিয়ান/টিভি/ঘড়ি মিস্ত্রি হিসাবে কাজ/ব্যবসা করে। তাদের অধিকাংশের নিজস্ব জমি, বাসা, ফ্লাট, দোকান, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। তারা ছোট বাসা, ছোট ফ্লাট, কোয়াটার, সাবলেট রুম, ব্যাচেলার, হোস্টেল মেস, বস্তি ঘরে ভাড়া থাকে। দোকান, অফিস, জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাড়া থেকে ব্যবসা করে। তাই ব্রিটিশ সিএস পর্চা এবং ৩-পুরুষ অনুসারে ঢাকাইয়া পরিচয় খোজা/নির্ধারণ করার বুদ্ধি ও নীতি অদ্ভূত ও ভ্রান্ত যুক্তি মাত্র।

(খ)চল্লিশ থেকে ষাটের দশকে ঢাকায় বসবাসকারী ঢাকাইয়া ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মঃ উনবিংশ শতকের ত্রিশ দশকের পূর্ব/ আগে থেকে যারা ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী ছিলেন তারা ঢাকার মূল আদিবাসী। শুধুমাত্র ৩-পুরুষ নীতির উপর ভিত্তি করে কারো খাস ঢাকাইয়া পরিচয় নির্ধারণ/দাবী করা কখনো সম্ভব নয় এবং এটা কোন সঠিক যুক্তিও না। এক্ষেত্রে খাস ঢাকাইয়া পরিচয় নির্ধারণের জন্য ঐতিহাসিকভাবে একটি নূন্যতম সুনির্দিষ্ট প্রামাণ্য সময়সীমা নির্ধারণ করলে সর্বোত্তম ও যৌক্তিক হবে। এই সময়সীমা অনুসারে বিশেষত যাদের পরিবার ব্রিটিশ ও পাকিস্তান যুগে উনবিংশ শতকের চল্লিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত ঢাকায় পরিবার নিয়ে বংশানুক্রমে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বসবাস, জীবন ও জীবীকা নির্বাহ করে আসছে তারা এবং তাদের বংশধরগণ ঢাকার আদিবাসী/ খাস ঢাকাইয়া হিসাবে গণ্য/বিবেচিত।

২.নতুন ও আম ঢাকাইয়াদের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, ইতিহাসঃ এরা ঢাকার আদিবাসীদের বংশধর, বংশগত ঢাকাইয়া পরিবারের সন্তান নয় এবং ঢাকাইয়া হলেও শংকর/মিশ্র। এই নতুন ও আম ঢাকাইয়াদের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী নতুন আধুনিক, পরিবর্তিত, সম্প্রসারিত নতুন ঢাকা অঞ্চল, তার সমাজ ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে, ঢাকাইয়া বাবা/মায়ের রক্তসূত্রে এবং ঢাকায় জন্মগ্রহন সূত্রে। তাই নতুন ও আম ঢাকাইয়াদের পরিচয়টি আদি ও খান্দানি বংশভিত্তিক না। এজন্য আমি খাস ঢাকাইয়া ব্যতিত অন্য সকল ঢাকাইয়াদের নতুন ও আম/সাধারণ ঢাকাইয়া বলেছি। তারা ঢাকাইয়া হলেও খাস ঢাকাইয়া না। এই নতুন ও আম ঢাকাইয়াদের আছে স্বতন্ত্র আত্নপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস-

(ক)রক্তবংশগত সূত্রে ঢাকাইয়াঃ এখন বাংলাদেশে অনেক দম্পত্তির মধ্যেই স্বামী ঢাকাইয়া এবং স্ত্রী অন্য জেলার অথবা স্ত্রী ঢাকাইয়া এবং স্বামী অন্য জেলার হয়ে থাকে। তাদের পরিবার ও সংসারে যে সন্তান-সন্তুতি হয় এবং তাদের সন্তানরা ঢাকা/ঢাকার বাইরে দেশে/বিদেশে যে স্থানেই জন্ম হোক না কেন? তারা ঢাকাইয়া বাবা বা মার রক্ত সূত্রে, ঢাকাইয়া দাদা বা নানার পরিবারের আত্নীয়তার সূত্রে ঢাকাইয়া। তবে তারা শংকর/মিশ্র এবং নতুন ও আম ঢাকাইয়া। সোজা কথায় যে ব্যক্তির মা/বাবার একজন অন্তত ঢাকাইয়া সে রক্তসূত্রে ঢাকাইয়া।
(খ)জন্মগতসূত্রে ঢাকাইয়াঃ বাপ-দাদা, মা-নানা কেউ ঢাকাইয়া না হলেও জন্মগতসূত্রে অনেকেই ঢাকাইয়া। কারণ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, যে শিশু যে রাষ্ট্রে জন্মগ্রহন করবে সে সেই দেশের নাগরিক। সেই হিসাবে সে আইনগতভাবে সেই রাষ্ট্রের নাগরিত্ব পরিচয়, সকল নাগরিক মর্যাদা, অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা পাবে। সেই একই বাস্তবতা, মানবিক কারণ এবং আইনগত ভিত্তিতে যে শিশু ঢাকা শহরে জন্মগ্রহন করেছে/করবে সে জন্মসূত্রেই ঢাকাইয়া। তবে যেহেতু তাদের বাবা-মা বিভিন্ন অঞ্চলের হন তাই স্বাভাবিকভাবে বাবা-মায়ের পারিবারিক সূত্র ধরে তাদের ঢাকার বাইরে দাদা-নানার পরিবার, জেলা শহর-গ্রামের সাথে একটি পারিবারিক এবং আত্নীক সম্পর্ক থেকেই যায় কমবেশি।

প্রজন্মগত বাস্তবতা, রক্তবংশ ও জন্মগত সূত্রগুলোর দিক থেকে এই নতুন ঢাকাইয়ারা ঢাকাইয়া সমাজেরই অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। তাদের মধ্যেও ঢাকাইয়া ভাষার চল আছে এবং তারাও ঢাকাইয়া সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধের অনুসারী/তাতে অভ্যস্ত কমবেশি। তবে নানাবিধ ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক বাস্তবতার কারণে নতুন ও আম ঢাকাইয়ারা ১০০% শুদ্ধ ঢাকাইয়া পরিবারের সন্তান এবং ঢাকাকেন্দ্রীক নগরজীবী না। ঢাকার বাইরেও তাদের অনেকের পরিবারিক ও আত্নীয়তার সূত্র, গন্ডীসীমা বিস্তৃত থাকে/আছে।
ঢাকাইয়ারা ভাষার দিক থেকে তিনভাগে বিভক্ত। কুট্টি ভাষী, উর্দূভাষী এবং শুদ্ধ ঢাকাই ভাষী। কুট্টি বাংলা, উর্দূ ভাষা আদিবাসী/খাস ঢাকাইয়াদের জবানী বোল হলেও ঢাকাইয়াদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার, রুচি, মূল্যবোধ, শ্রেণিগত আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি, পরিবর্তন এবং নানাবিধ প্রয়োজনে ব্রিটিশ যুগ ও পাকিস্তান আমলে চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের মধ্যে শিক্ষিত ঢাকাইয়াদের মধ্যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষার প্রচলন ঘটে। যা পরবর্তীকালে ঢাকাইয়াদের মধ্যে প্রসার লাভ করে। এই ঢাকাইয়াদের বাইরে ঢাকার অবশিষ্ট সকলেই অঢাকাইয়া জনগোষ্ঠী।
আশা করি, আমার এই লেখাটি ঢাকাইয়াদের তাদের আত্নপরিচয়ের শেকড়মূলে নিয়ে যাবে এবং তাদের পূর্বপুরুষদের প্রাচীন গৌরবময় ও সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন।

[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK