সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Thursday, 09 May, 2019 12:53:29 pm
No icon No icon No icon

খাস ঢাকাইয়াদের মধ্যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষা চলের ঐতিহাসিক পটভূমি

//

খাস ঢাকাইয়াদের মধ্যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষা চলের ঐতিহাসিক পটভূমি


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: খাস ঢাকাইয়াদের একটি অংশ আজ যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় কথা বলছে তার পেছনে একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। এই শুদ্ধ ঢাকাই ভাষার চল খাস ঢাকাইয়াদের মধ্যে আকস্মিকভাবে আসেনি। এর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পেছনে দিকে ফিরে তাকাতে হবে এবং সেই পরিস্থিতির ক্রম বিবর্তনকে সম্মুখ উপলব্দি করতে হবে।

অধিকাংশ দেশি ও বিদেশী বাঙালী ও অবাঙালী ঐতিহাসিকরা ঢাকাইয়া সমাজকে খুব সহজেই মোটা দাগে কুট্টি এ বং সুব্বাসী দুই সমাজে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং বিভক্ত করে দেখিয়েছে। তারা ঢাকা শহরাঞ্চলে বাইরে থেকে আগত স্থানীয়ভাবে বসবাসরত ও তাদের বংশোদ্ভূত উর্দূভাষীদের সুব্বাসী আর স্থানীয় ঢাকাই বাংলাভাষী বাঙালীদের কুট্টি হিসাবে অভিহিত করত। সুব্বাসীরা ছিল অভিজাত ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আর কুট্টিরা ছিল নিচু ও ক্ষুদ্র পেশাজীবী শ্রেণির লোক।

বিশেষত ব্রিটিশ যুগে পূর্ববাংলার অন্য সকল অঞ্চলের শিক্ষিত ও অবস্থা সম্পন্ন বাঙালী মুসলমানদের মত ঢাকার শিক্ষিত ও অবস্থা সম্পন্ন মুসলমানরাও উর্দূতে কথা বলত। আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কারণে তাদের সাথে শিক্ষিত ও অবস্থা সম্পন্ন সুব্বাসীদের উঠাবসা ছিল। একই কারণে তাদের উভয়ের সাথে স্থানীয় অনগ্রসর সংখ্যাগরিষ্ঠ কুট্টি সম্প্রদায়ের কোন সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না বা হত না। আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে ঢাকার নমঃশুদ্র হিন্দুরা ছিল কুট্টিদের অন্তর্গত আর উচ্চবর্ণের হিন্দুরা শুদ্ধ মার্জিত বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলত।

অধিকাংশ ঐতিহাসিক ঢাকার এই শিক্ষিত উর্দূভাষী বাঙালীদের কুট্টি ও সুব্বাসীদের বাইরে আলাদা সম্প্রদায় হিসাবে বিবেচনা করেননি। তারা সম্ভবত উর্দূভাষী বাঙালীদেরও সুব্বাসীদের অন্তর্গত হিসাবে বিবেচনা করেছে। সহজ কথা যারা ঢাকাই উর্দূতে কথা বলে তারা সুব্বাসী আর যারা ঢাকাই বাংলায় কথা বলে তারা কুট্টি। এই ছিল তাদের ধারনা ও অভিমত এবং এখানেই তারা একটি ঐতিহাসিক ভুল করেছেন।

তাই ঐতিহাসিকভাবে ঢাকার স্থানীয় বাঙলীরা সবাই কুট্টি এটি সঠিক তথ্য না। কারণ ঢাকার স্থানীয় উর্দূভাষী অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাঙালী মুসলমানরা কখনোই কুট্টি ছিল না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ঢাকার স্থানীয় উর্দূভাষী বাঙালী মুসলমানরা স্থানীয় ও জাতিগতভাবে বাঙালী হলেও তারা শিক্ষা নিত উর্দূতে। তারা বাসাবাড়িতে, নিজেদের মধ্যে উর্দূতে কথা বলত। তাই তাদের শিক্ষার মাধ্যম ও মাতৃভাষা উর্দূ হলেও জাতিগতভাবে তারা অবাঙালী উর্দূভাষী সুব্বাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।

ফজলুল হক, বেগম রোকেয়া, শহীদুল্লাহ, ফররুখ আহমেদ, কাদের সরদার সবাই চোস্ত উর্দূতে কথা বলত। তখন ঢাকার অধিকাংশ স্থানীয় কুট্টি ও অভিজাত পঞ্চায়েত সর্দার ও সাধারণ শিক্ষিত মুসলমানদের মুখের ভাষা ও মাতৃভাষা ছিল উর্দূ। এজন্য উনবিংশ শতাব্দীর বিশ দশকের দিক থেকে এদেশের শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ছিল বাঙালী মুসলমানদের মাতৃভাষা কোনটা- বাংলা ভাষা না উর্দূ ভাষা?

বিশেষত ঢাকার স্থানীয় শিক্ষিত উর্দূভাষী বাঙালী মুসলমানরা পাকিস্তান আমলে বায়ান্নয়ের ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকার উর্দূভাষী বাঙালী পঞ্চায়েত সর্দারগণ এবং সাধারণ উর্দূভাষী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ বাংলাকেই তাদের মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকার করে নেয়।

এতে করে ঢাকার উর্দূভাষী বাঙালীদের মধ্যে এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানদের মধ্যে উর্দূ ভাষার চল ক্রমেই কমতে থাকে এবং তাদের মাধ্যমে শিক্ষিত ঢাকাইয়াদের মধ্যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষার উদ্ভব, বিকাশ ঘটতে থাকে। এতে ঢাকাই উর্দূ সুব্বাসীদের জবানী/মুখের ভাষায় সীমাবদ্ধ রূপ নেয়। আর অনগ্রসর কুট্টিদের মধ্যে ঢাকাই বাংলা ও বাংলা-উর্দূ মিশ্রিত ভাষার চল অব্যাহত থাকে।

কিন্তু যুক্তপাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ঢাকাই সমাজে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটায় পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম আধুনিক শুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যার ঢেউ লাগে অনগ্রসর কুট্টি সমাজে। ঢাকার স্থানীয় বাংলা শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাঙালীদের সাথে মিলে চলার সুবিধার্তে সুব্বাসীরাও বাংলায় শিক্ষা নিতে শুরু করে। তখন থেকে তারা কেবল বাসার ভেতর এবং নিজেদের মধ্যে উর্দূতে বাতচিত করে আসছে। ফলে ঢাকাই সমাজে কুট্টি বাংলা এবং উর্দূ ভাষার চল দুইই ক্রমে নিস্তেজ হতে থাকে। যার ফলে এই দুই প্রাচীন ঢাকাই ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে।

এভাবে কয়েক দশক ধরে ঢাকার শুদ্ধ ঢাকাই ভাষীদের কয়েক প্রজন্মই হচ্ছে আজকের শিক্ষিত শুদ্ধভাষী ঢাকাই সম্প্রদায়। তারা বাসাবাড়িতে, নিজেদের মধ্যে শুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় কথা বলে। তাই ঢাকাই বাংলা এবং উর্দূ ভাষা কখনোই তাদের মাতৃভাষা ও মুখের ভাষা নয়। এই দুই ঢাকাই ভাষা সম্পর্কে তারা ভালভাবে অবগতও নয়। কেবল পুরান ঢাকার ঢাকাইয়া সমাজের ভেতর এবং ঢাকাইয়া নাটকের সংলাপ থেকে তারা এই দুই ঢাকাই ভাষা সম্পর্কে সাধারণ ধারনা পায়। হতে পারে এক সময় কুট্টিদের ঢাকাই বাংলা বা ঢাকাই উর্দূ তাদের কয়েক প্রজন্মের পূর্বপুরুষদের মুখের ভাষা বা মাতৃভাষা ছিল।

এখন অবশ্য উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ঢাকাইয়া নতুন প্রজন্মের তরুন, কিশোর, শিশুদের একটি বড় অংশ ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করছে। আর স্যাটালাইট ও নেটের হিন্দী ছবি, নাটক, গান, বিনোদন অনুষ্ঠান দেখার ফলে তারা হিন্দী ও উর্দূ ভাষাও বুঝে। তারা বাসাতে বাংলায় কথা বললেও নিজেদের মধ্যে ওরা ইংলিশেই কথাবার্তা বলে এবং ইংলিশ মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকে। তারা বাংলা-ইংলিশ শব্দগুচ্ছ মিলিয়ে বাংলিশ ভাষার প্রসার ঘটাচ্ছে। তাদের কারণে আজ শুদ্ধ ঢাকাই ভাষাই চরম বিপদের মুখে পড়েছে এবং তার নিজের দুর্দশা শুরু হয়েছে।

সম্ভবত ঢাকাই উর্দূ, ঢাকাই বাংলা, শুদ্ধ ঢাকাই, বাংলিশ ভাষাগুলোর মধ্যে ঢাকাইয়াদের দুই প্রাচীন ভাষা সুব্বাসীদের ঢাকাই উর্দূ, কুট্টিদের ঢাকাই বাংলা এক পর্যায়ে বিলোপ হয়ে যাবে। আর শুদ্ধ ঢাকাই ভাষা টিকে থাকবে ঢাকাইয়া জনসাধারণের মুখের ভাষা এবং নাটকের সংলাপের ভাষা হিসাবে। কিন্তু এই ভাষাকেও নতুন প্রজন্মের বাংলিশ ও ইংরেজি ভাষার সাথে প্রতিযোগীতা করে চলতে এবং টিকে থাকতে হবে। 
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK