বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯
Sunday, 14 Apr, 2019 12:19:52 am
No icon No icon No icon

১লা বৈশাখ সম্পর্কে বাঙালী মুসলমানের ভ্রান্ত ধারনা


১লা বৈশাখ সম্পর্কে বাঙালী মুসলমানের ভ্রান্ত ধারনা


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: মধ্যযুগে ভারতবর্ষে মুঘল সালতানাত আমলে সুবা বাংলায় নতুন ফসল উঠার সময়কে কেন্দ্র করে জমিদারদের মাধ্যমে প্রজা-কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার সুবিধার্তে মুঘল সালতানাতের সম্রাট জালালুদ্দীন মুহাম্মাদ আকবরের আদেশক্রমে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং এরপর তার আদেশক্রমে সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান সুবাবাংলায় এই নতুন বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এজন্যই বাংলা সনকে ফসলী সন বলে অভিহিত করা হয়। মুঘল আমলে ১লা বৈশাখের দিন জমিদারগণ তাদের নিজ নিজ জমিদারী অঞ্চলের প্রজাদের মিষ্টি মুখ করিয়ে তাদের কাছ থেকে বাৎসরিক বকেয়া খাজনা আদায় করত এবং এই উপলক্ষ্যে নৌকা বাইচ, ষাড়ের লড়াই, কুস্তি, লাঠি খেলা, মেলার আয়োজন করা হত। মুঘল আমল পরবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে প্রথমদিক থেকেই কলকাতা ও পূর্ববাংলার বর্ণ হিন্দু জমিদার এবং হিন্দু বনেদী পরিবার শ্রেণির হাত ধরে ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তবাংলায় দূর্গাপূজার সাথে ১লা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসবটিরও ব্যাপক প্রচলন ঘটে। পর্যায়ক্রমে তা যুক্তবাংলার হিন্দু মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণির মধ্যেও প্রসার ঘটে। বিশেষ করে ১লা বৈশাখের দিন হিন্দু জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ীরা খুব ভোরে স্নান করে সপরিবারে নতুন কাপড়-সেন্ডেল পড়ে ঘর বা দোকান বা মন্দিরে পূজা-অর্চনা করে কাচারী/গদি ঘরে গিয়ে বসত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেত এবং এরপর তারা প্রজা/খাতক/ক্রেতা/গ্রাহকদের মিষ্টি মুখ করিয়ে তাদের বকেয়া খাজনা/টাকা আদায়/জমা করত।

এভাবে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা এবং পূর্ববাংলার সাধারণ হিন্দু জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী সমাজ বর্ষবরণের দিন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নতুন বছরের হালখাতা/নতুন হিসাব খাতা লেখা শুরু করত। তারা এই উপলক্ষ্যে কাচারি/গদি ঘর এবং দোকান/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করত। তারা সেখানে আমন্ত্রিত/সাধারণ প্রজা, খাতক, ক্রেতাদের মিষ্টি মুখ করিয়ে নতুন বছরের বকেয়া খাজনা, বিলের পাওনা টাকা বুঝে নিত। নতুন বছরের প্রথম দিনের বিক্রি ও লাভের নতুন হিসাব খাতা খুলত। এইদিনকে কেন্দ্র করে শহর ও গ্রামে নৌকা বাইচ, ষাড়ের লড়াই, কুস্তি, লাঠি লড়াই, যাত্রাপালা, মেলার আয়োজন করা হত। তখন এই দিনে হিন্দু অভিজাত ও স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সকল বয়সী পুরুষ-নারী, ছেলেমেয়ে, শিশুরা নতুন কাপড় পরিধান করত এবং বাসায় ভাল মজাদার খাবার রান্না হত, খেত। হিন্দু জমিদার, মহাজন, দোকান ব্যবসায়ীদের হালখাতা অনুষ্ঠান পালনের দেখাদেখি পরবর্তীকালে মুসলমান জমিদার ও ব্যাপারীরা সকালে মিলাদ পড়িয়ে মিষ্টি বিতরণ করে হালখাতা খোলার প্রথা শুরু করে। এজন্যই আলেম সমাজ এবং অনেক সাধারণ ধার্মিক মুসলমান ১লা বৈশাখকে হিন্দু সংস্কৃতি ভেবেছে এবং বলছে। যদিও ১লা বৈশাখকে হিন্দু সংস্কৃতি ভাবার ধারণা, কথা, প্রচারণা কোনটাই ঐতিহাসিকভাবে তথ্য ও যুক্তি নির্ভর এবং সঠিক না। নিতান্ত মীথ/অতিকথা এবং প্রপাগান্ডা/মিথ্যাচার মাত্র। কারণ বাংলা অঞ্চলে বাংলা সনের প্রবর্তক দিল্লীর মুঘল সম্রাট আকবর এবং সুবাবাংলার সুবেদার মুর্শিদকুলি খানের মত অবাঙালী মুসলিম শাসকরা। ঢাকার আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবার, ঢাকার বনদী পরিবারগুলো এবং পূর্ববাংলার মুসলমান জমিদার ও বেপারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ পালন করত হালখাতার মাধ্যমে।

বাংলা সাল প্রবর্তন, ১লা বৈশাখ উৎসব এবং হালখাতা প্রথার প্রচলন সবই আবহমান বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আর্থ-সামাজিক বিষয় সংশ্লিষ্ট এবং লোকজ ঐতিহ্য উৎসব মাত্র। এর সাথে হিন্দুদের সনাতন ধর্ম বা মুসলমানদের ইসলামী মূল্যবোধের সম্পৃক্ততার কোন ব্যাপারই নেই। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১লা বৈশাখ আমাদের বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। নিঃসঙ্কোচে এতে বাংলাদেশের এবং সারা বিশ্বের সকল দেশের সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতি, শ্রেণির বাংলাভাষাভাষী বাঙালীরা অংশগ্রহন এবং উৎযাপন করছে এবং করতে পারে। নদী বিধৌত মুসলিম প্রধান বাংলার অঞ্চলে আদিম প্রাগৈতিহাসিক যুগের কৃষিজ ও গ্রাম ভিত্তিক সভ্যতা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের কারণে পূর্ববাংলা অঞ্চল/পূর্বপাকিস্তান প্রদেশ বা বর্তমান বাংলাদেশে ১লা বৈশাখ সার্বজনীন জাতীয় উৎসব হিসাবে বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। চলতি একুবিংশ শতাব্দির প্রথমদিক থেকে প্রবাসী বাংলাদেশী বাঙালীরা বিভিন্ন দেশে ব্যাপক আনন্দ-উল্লাস, উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উৎসব পালন করছে। ফলে ১লা বৈশাখ এখন বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশী বাঙালীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎসব হিসাবে বিকশিত হচ্ছে এবং পরিচিতি লাভ করছে। তাই বর্ষবরণ উৎসবের মধ্যে কোন বিশেষ ধর্মালম্বী জনগোষ্ঠীর ধর্মাচার ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে সম্পৃক্ত করার ছল, কৌশল, অপচেষ্টা অত্যন্ত অন্যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত, বিপদজনক এবং অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতার পরিপন্থী। সদা সতর্কতার সাথে সবাইকে বাংলা বর্ষবরণ উৎসবকে সর্বপ্রকার ধর্মীয় প্রভাব এবং বিতর্ক মুক্ত রাখতে হবে। সবাইকে শুভ নববর্ষ। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন।

[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK