রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯
Friday, 05 Apr, 2019 12:11:32 am
No icon No icon No icon

ঢাকা যেন হয়ে উঠছে এক মৃত্যুপুরী

//

ঢাকা যেন হয়ে উঠছে এক মৃত্যুপুরী


পি.আর. প্ল্যাসিড: প্রবাসে বসে দেশের পানে চোখ রাখা প্রবাসীদের স্বভাব। সে ধরনের প্রবাসীদের মধ্যে আমিও একজন। যে যত দূরের দেশেই বসবাস করুন না কেন মন কিন্তু সবসময় পরে থাকে দেশে। আত্মীয় পরিজনদের ভাল মন্দ নিয়ে চিন্তা করা আর ঢাকা শহরে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসার দুশ্চিন্তায় অনেকটা অন্যমনষ্ক করে ফেলে প্রবাসীদের। এতে প্রবাসে অনেক প্রবাসী কর্ম ক্ষেত্রে নিজের দ্বায়ীত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়।
গত মাসে পুরাতন ঢাকার চুড়িহাট্টায় মর্মান্তিক এক অগ্নিকান্ড ঘটেছে। আমি পুরাতন ঢাকায় থেকে পড়ালেখা করা ছেলে। সময় পেলেই পুরাতন ঢাকার অলিগলি ঘুরে বেরিয়েছি রিক্সায় বসে। অনেক এলাকাই আমার চেনা জানা। একারণেই যখন পুরাতন ঢাকার কোন দুঃসংবাদ বা দুর্ঘটনার কথা পত্রিকা বা টেলিভিশনে দেখি তখন চমকে উঠি। মন খারাপ হয় পুরাতন ঢাকার কোন অযাচিত ঘটনার কথা শুনে। 

sbac ad
পুরো ঢাকা শহরের কথা বাদ দিই কি করে? ঢাকা আমাদের রাজধানী। চোখের সামনেই ছোট থেকে বড় হয়েছে। মনে পড়ে ছোট বেলা বাবাকে যখন কোন কাজে ঢাকা আসতে দেখেছি তখন বাবার সাথে ঢাকা শহরে আসার বায়না ধরতাম। ঢাকা শহরের উচু তলা ভবন বলতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং ওয়াপদা ভবন দেখতে চাইতাম। যখনকার কথা বলছি তখন আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা আসার জন্য বর্তমানের মত এত সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না। রেল বা নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন। 
মাঝে মধ্যে মার অনুরোধের কারণে বাবা আমার আবদার রাখতেন। মা আমার ভোর পাঁচটার সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে কাপড় পরিয়ে প্রস্তুত করাতেন ঢাকা যেতে। ঢাকার পুরাতন ঢাকায় তখন এক পিসিমা থাকতেন। পিসিমা পুরাতন ঢাকায় অবস্থিত সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স স্কুলে শিক্ষকতা করতেন আর থাকতেন পুরাতন ঢাকার ল²ীবাজার। তার বাসাই ছিল আমাদের গন্তব্য। পিসিমার বাসায় যাবার পর কাজ শেষে খেয়ে দেয়ে সেখান থেকে রিক্সায় ঢাকা শহরের কিছু স্থান ঘুরে দেখিয়ে কমলাপুর রেল স্টেশন হয়ে আবার রাতে ফিরে আসতেন গ্রামের বাড়ি। সেই সময়কার ঢাকা শহর আর এই বর্তমান ঢাকা শহরের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান।
ঢাকা শহর তখন আয়তনে ছিল অনেক ছোট এবং সবুজে ঘেরা। শহরের মাঝখান দিয়ে খালও দেখেছি বয়ে যেতে। এখন খাল আর সবুজ তো দূরের কথা, গাড়ি আর দালানে ভরে গেছে। বড় কথা রাজধানী এখন মানুষের অযোগ্য এক শহরে পরিনত হয়েছে। ঢাকা শহরের বুকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্ষমতা বদলের সাথে পোস্ট মর্টেম করেছেন। তাদের ক্ষমতার দাপেেটর কারণে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত ভাবে দালান কোঠা গড়ে উঠেছে। এসব দেখার যেন আমাদের দেশে কেউ নেই। মনে হচ্ছে, যে যত বড় বা উচু তলা বিল্ডিং এর মালিক হতে পারেন তিনি যেন সমাজে তত বেশী মূল্য পান বা বড় মাপের মানুষ হিসেবে গন্য হন। 
গত কয়েক বছর আগে ঢাকার অদূরে সাভার এলাকায় রানা প্লাজা নামের একটি বিল্ডিং ধ্বসে পরেছিল। ঘটনার পর আমরা যে তথ্য পেয়েছি বিল্যিংটি সম্পর্কে তার মধ্যে বিল্ডিং নির্মানের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে যত তলার, নির্মান করা হয়েছে তার চেয়ে বেশী বা উচু। সারা বিশ্বে সেই বিল্ডিং ধ্বসে পরার সংবাদ প্রচার হয়েছে। এমনকি আমাদের অর্থনীতিতেও ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল সেই রানা প্লাজার ঘটনা। সেটার পরেও কেন আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় অন্য উচু ভবন গুলির খোঁজ খবর নিচ্ছে না।

Union Bank Ltd.
পুরাতন ঢাকার চুড়িহাট্টার বিষয়টি না হয় পুরাতন শহর বলে এরিয়ে যাবার যুক্তি দাঁড় করানো যায় কিন্তু বনানী তো আর পুরাতন নয়। চুড়িহাট্টায় না হয় কেমিক্যাল এর মজুত ছিল, গলি ছিল সরু কিন্তু নতুন ঢাকা বনানীর এই অত্যাধুনিক বহুতল ভবনটির সামনে বড় রাস্তা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে নতুন সব কলাকুশলীদের দ্বারা নির্মানের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয় তার পরেও কেন পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই? কেন এবং কিভাবে ভবনটি ১৮ তলার অনুমোদন পেয়ে ২২/২৩ তলা হল? মন্ত্রণালয় কি করেছে বিষয়টি আমার মাথায় ধরে না।
পুরাতন ঢাকার বেলায় অযুহাত দেওয়া হলো এক, নতুন ঢাকা বনানীর বেলায় দেওয়া হলো আরেক। তবে একটি অযুহাতের মধ্যে মিল রয়েছে সেটা হচ্ছে পানি সরবরাহের কোন ভাল ব্যবস্থা নেই। মধ্য ঢাকাতেও এমন ঘটনা যে ঘটবে না সেটা নিশ্চিত করে এখনই বলা যায় না। ঘটলে একই অযুহাত দেওয়া হবে না যে তা এখনই বোঝা যায়। কিন্তু সেই ঘটনা ঘটার আগে পানি সরবরাহের কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
আগুনের ঘটনা এই দুটিতেই সীমাব্ধ নয়। আগে আরো কয়েক স্থানে ঘটেছে যা আমরা এরই মধ্যে ভুলে যেতে বসেছি। (এমনকি লেখাটি লিখে শেষ করতে না করতে বনানীর এক কাচা বাজারে আবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।) মন আমাদের এতটাই ছোট যে সব খবর ধারন করার পর্যাপ্ত স্থান নেই মনে। বনানীর এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা জাপানের ইলেকট্রোনিক মিডিয়াতেও বড় করে প্রচার করা হয়েছে। যা অনেক জাপানিজের মুখে শুনেছি। তাদের প্রশ্ন, আমার আত্মীয় স্বজনের কোন ক্ষতি হয়নি তো? তাদের কাছে বাংলাদেশ আর ঢাকা বলতেই যেন আমার আত্মীয় স্বজনের বাস বা বিচরণ ভূমি। এজন্যই তাদের চিন্তা। সত্যিই তাই, ঢাকা নয় শুধু সারা বাংলার মানুষই যেন প্রবাসীদের আত্মীয়। দেশে কোন কিছু ঘটলে প্রবাসীরা উত্তেজনায় টান টান থাকে। উদ্বিগ্ন থাকে কি ঘটলো দেশে বা কি হয়েছে দেশবাসীর? আহাজারী থাকে সকলের মধ্যে।
কিছুদিন পরপর ঢাকার রাস্তায় যে ভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটছে এসব দেখারও যেন কেউ নেই। নেই যেন বন্ধ করার কোন উপায় এবং ইচ্ছে। পাশাপাশি ধর্ষণ আর আগুন তো আছেই। ধর্ষন করেও রেহায় দিচ্ছে না আমাদের সমাজের মানুষ নামের পশু গুলো ভিন্ন লিংগের মানুষ গুলোকে। লাঁশ বানিয়ে ফেলে রেখে যায় ধর্ষনের পর। ঘটনা ঘটানোর পর কোন কোন ক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে ক্ষমতার বদৌলতে রক্ষাও পেয়ে যায় তারা। 


ধর্ষনকারীদের বিচার হয় কিন্তু সে কেমন বিচার জানি না। ধর্ষনকারী আর দুর্ঘটনা ঘটানো গাড়ির চালকদের একই ধরনের কঠিন শান্তি দেওয়া দরকার, না হলে বিল্ডিংএ লাগা আগুনের চেয়ে যে সমাজ এবং দেশে বা রাষ্ট্রের শরীরে আরো ভয়াবহ আগুন লাগার সম্ভাবনা ঘনিয়ে আসছে। বিল্ডিংয়ে লাগা আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও সমাজের আগুন তখন নিভাতে যে মাশুল দিতে হবে তা এমনও হতে পারে অপূরণীয়।
আমি দেশে ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা আর আগুন লাগাকে এক করছি না। তবে যে ভাবে ঘটছে এতে মনেই করতে পারি আমাদের ঢাকা শহর যেন ক্রমেই মৃত্যুপুরীতে পরিনত হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে সকলের সচেতনতা দরকার। দরকার লোভ সংযম করার শিক্ষা গ্রহণ করা ( লোভের কারণেই এত অনিয়ম )। না হলে একসময় দেশবাসীর মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলতে শুরু করলে আগুন যে নেভানো যাবে না। আমরা যে কজন প্রবাসী আছি, যারা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছি বলে জানি তাদের মনেও যে একসময় কঠিন আগুন ছড়িয়ে পরবে। তখন আমতো যাবেই ছালাও যাবে। এতে করে বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে উন্নয়নের মহা সড়কও। তাই এখনই সময়, সব ভুলে দেশ ও জাতির জন্য সকলকে লোভ ও প্রতি হিংসা বাদ দিয়ে কাজ করতে হবে। ( আমার কাছে কেন যেন মনে হচ্ছে এসব ঘটনা কোন কারণে হয়তে উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে ঘটানো হচ্ছে।) 
সর্বশেষ একটি বিষয় বলছি, বনানীর বহুতল ভবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন যখন অগ্নি নির্বাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের পানি সরবরাহের পাইপ লাইনে ফাটল হয়ে ফাটল দিয়ে পানি বাইরে ছড়িয়ে পরছিল। এ দেখে বস্তিবাসী যাকে গর্ব করে বুদ্ধিবীবিরা টোকাই নাম দিলেন তাদের একজন নাঈম ইসলাম সেই পাইপের ফাটল নিজের চেষ্টায় বন্ধ করে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের সাহায্য করেছে তার এমন সাহস ও উদ্যোগের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। 

ইতিমধ্যেই নাঈম বিখ্যাত সমাজকর্মীতে পরিনত হয়েছে এবং তার কর্মের ফলও পেয়ে গেছে। তার কাছ থেকে আমাদের পড়ালেখা জানা ওয়ালা যাদের হাতে দামী মোবাইল ফোন ছিল যা দিয়ে লাইভ প্রোগ্রাম করতে ব্যস্ত ছিল তারা কিছুটা হলেও যেন শিক্ষা নেয়। শুধু তাই নয় দুর্ঘটনায় পতিত অসহায় মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধার কর্মীদের পাশে থেকে কাজ করতে এগিয়ে আসেন সেই অনুরোধ করছি। তাহলে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ও পরিমান অন্তত কম হবে। বনানীর এই অগ্নিকান্ডে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত এবং হতাহতদের দ্রæত আরোগ্য লাভ কামনা করছি।

লেখক: পি.আর. প্ল্যাসিড, জাপান প্রবাসী।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK