শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
Saturday, 10 Nov, 2018 11:51:54 pm
No icon No icon No icon

বুড়িগঙ্গা রিভার ডেভলোপমেন্ট এন্ড এন্টারটেইনমেন্ট মেগা প্রজেক্ট-(২)


বুড়িগঙ্গা রিভার ডেভলোপমেন্ট এন্ড এন্টারটেইনমেন্ট মেগা প্রজেক্ট-(২)


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: বুড়িগঙ্গা নদী উন্নয়ন এবং বিনোদন মহাপ্রকল্পকে সংক্ষেপে বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্টও বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ঢাকায় রেল সার্ভিস চালু হবার পর থেকে যুক্তপাকিস্তান আমল পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী ঢাকা উত্তর দিকে সম্প্রসারিত হওয়ায় দক্ষিণ দিকের বুড়িগঙ্গা নদীপথ ও পুরান ঢাকা অঞ্চল বিকাশমান উত্তর ঢাকা তথা নতুন ঢাকার পশ্চাৎপদ অঞ্চলে পরিণত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিকাশমান নতুন ঢাকা রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় এবং রেল-সড়ক-আকাশ পথে যোগাযোগ অব্যাহত গতিতে বৃদ্ধি পাবার প্রেক্ষাপটে বুড়িগঙ্গার বাণিজ্যিক, আর্থিক গুরুত্ব স্থায়ীভাবে হ্রাস পেলেও আন্তঃজেলা নৌ যোগাযোগের প্রধান অভ্যন্তরীণ নৌপথ হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদী এবং তার প্রধান লঞ্চ টার্মিনাল সদরঘাটের অপরিহার্য গুরুত্ব আজো রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বুড়িগঙ্গা নদী ঢাকা শহরের অক্সিজেন/প্রাণ। এজন্য বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য অবিলম্বে/যথা সম্ভব দ্রুত বুড়িগঙ্গা নদী, এর অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও নৌবিহার ব্যবস্থা, নদীর দুই তীরের নদী রক্ষা বাঁধ/নদী শাসনব্যবস্থা, দুই পাশের প্রধান সড়ক পথ, বিভিন্ন ঘাট, ব্রিজ, পুরানো নড়বড়ে ও নতুন নির্মিত স্থাপনাগুলো নিয়ে সমন্বিতভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্মত করে আধুনিকায়ণ করার, এগুলোর মাধ্যমে আকর্ষনীয় দর্শনার্থী ও পর্যটন বান্ধব বিনোদন ও পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার, স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষা করার একটি মাস্টার প্লান/মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এজন্য-

১/বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট যেহেতু একটি চলমান প্রক্রিয়া তাই এর সার্বিক বাস্তবায়ন এবং সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর হাতে দিলেই সর্বোত্তম হবে। এজন্য এখানে বঙ্গবন্ধু সেতুর মত সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে পৃথকভাবে বুড়িগঙ্গা রিভার প্রটেক্ট রেজিমেন্ট গঠন এবং স্থায়ী আর্মি এন্ড নেভী ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। তাদের অধীনে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী কোন স্থানে স্থল, নৌযান ও হেলিকপ্টার দ্বারা ফায়ার ব্রিগেড স্টেশন এবং রেসকিউ টিম গঠন ও স্থাপন করতে হবে। 
২/শত বছর ধরে বিভিন্ন নালা দিয়ে ঢাকা শহরের লাখ লাখ টন ময়লা-আবর্জনা পড়ে পড়ে নদীর নিচে এগুলোর স্তর জমে বুড়িগঙ্গা নদী কেবল দূষিত নয় এর নাব্যতা/গভীরত্ব হাড়িয়েছে। তাই পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার নাব্যতা পুনরায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। 
৩/এছাড়া বেশ কয়েকবার বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীরে প্রভাবশালীদের নির্মিত/স্থাপিত/রাখা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা, মালামাল উচ্ছেদ, ধবংস, জরিমানা করলেও তা শেষপর্যন্ত কোন বারই সফলভাবে স্থায়ী হয়নি। তাই নদী তীরের দুইপাশের সকল অবৈধ স্থাপনা ও মালামাল উচ্ছেদ, ধবংস করে বুড়িগঙ্গা নদীকে স্থায়ীভাবে অবৈধ দখল মুক্ত করার, রাখার এবং বাঁচানোর বলিষ্ঠ সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪/বুড়িগঙ্গা নদীর ক্যামিকেল বর্জ্য ও পয়ঃআবর্জনা মিশ্রিত দূষিত পানিকে দেশি/বিদেশি নদী বিষয়ক বিজ্ঞানী, গবেষক, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী মিলে এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রিফাইনিং সিস্টেম স্থাপন করে যথাসম্ভব মাত্রাতিরিক্ত পানি দূষন কমানোর এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১৮ সাল থেকে সরকার বুড়িগঙ্গায় পানি দূষন রোধ এবং একে রক্ষা করার লক্ষ্যে হাজারীবাগ থেকে সকল চামড়ার ট্যানারী বন্ধ করে গাজীপুরের সাভারে চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ জারি ও ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। যা মহাজোট সরকারের একটি বাস্তব সম্মত সাহসী, দূরদর্শী এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এতে বুড়িগঙ্গার পানি দূষন কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে এবং নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু সাভারের ট্যানারীগুলো থেকে নির্গত বিষাক্ত বজ্যের কারণে এখন আবার ধলেশ্বরী নদীর পানি দূষনের অভিযোগ উঠেছে। তাই চামড়ার ট্যানারীগুলোর বজ্য পরিশোধিত করে ফেলার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।
৫/বহুপূর্ব থেকে ঢাকা-কাচপুর বুড়িগঙ্গা-১ ব্রিজে কোন টোল সিস্টেম ছিল না। অথচ স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ঢাকা-মাওয়া বুড়িগঙ্গা-২ ব্রিজে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে টোল সিস্টেম অব্যাহত ছিল। এতে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দুই ধারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ পরিবহন ও সাধারণ যানবাহনের যানজটের চাপে জর্জরিত/অতিষ্ঠ ছিল। সরকার ২০১৮ সালে এক আদেশ বলে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের নিত্যদিনের প্রচন্ড যানজট ও সাধারণ ব্যবসায়ী, মানুষের চরম দুর্ভোগ কমাবার লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গা-২ ব্রিজ থেকে টোল ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়। এটিও মহাজোট সরকারের একটি বাস্তব সম্মত সাহসী, দূরদর্শী এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এতে মূল পুরান ঢাকা ও মাওয়া এলাকার ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে নিত্যদিনের অবর্ণনীয় যানজট ও জনদুর্ভোগ স্থায়ীভাবে অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।

৬/বিনোদন ও পর্যটন শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গায় আধুনিক ও শক্তিশালী নৌপরিবহন এবং নৌবিহার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। যা বিস্তারিতভাবে এর ১ম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭/ঢাকার সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সকল অঞ্চলের আন্তঃজেলা নৌপরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।দেশের প্রধান অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর সদরঘাট থেকে ৪৫ টি রুটে লঞ্চ ও স্টিমার যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করে। বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর, চাঁদপুর, খুলনা, বাগেরহাট, হাতিয়া প্রভৃতি জেলায় এগুলো নিয়মিত যাতায়াত করে। বিলাসী নৌপরিবহন ও সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকার সাথে চাঁদপুর, নোয়াখালী, বরিশালের উন্নত নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের মান্ধাতা আমলের পুরানো অচল অবকাঠামো, দীর্ঘকাল ধরে অব্যবস্থাপনায় চরম জনদুর্ভোগ নিত্যদিনের এবং এর সাথে ঘাট শ্রমিকদের মাস্তানী, অত্যাচার, অপমানে সাধারণ যাত্রী, মানুষ অতিষ্ট, অসহায়। এতে এখানে বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। তাই জনগণের স্বার্থে, যাত্রীসেবার মান বাড়াতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের অবকাঠামোকে আধুনিকরণ করার ব্যবস্থা, কার্যকরভাবে সকল অব্যবস্থাপনা দূর করার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ এবং সাধারণ যাত্রী, মানুষদের প্রতি ঘাট শ্রমিকদের মাস্তানী, অত্যাচার, অপমান বন্ধ করার স্থায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া বাবু বাজার, সোয়ারী ঘাট, বাদামতলী ঘাটের মত প্রাচীন ঘাটগুলোও যাত্রীবান্ধব, সংস্কার এবং আধুনিকরণ করতে হবে।

এইসব পদক্ষেপের ফলে-
ক/দীর্ঘ মেয়াদের জন্য দেশ, জাতি, সরকার সামাজিক, আর্থিক ও বাণিজ্যিক, মনস্তাত্ত্বিকভাবে উপকৃত এবং লাভবান হবে। 
খ/বুড়িগঙ্গা নদী ও এর দুই পাশের তীর অবৈধ প্রভাবশালী দখলদারদের হাতে ধবংসের কবল থেকে, নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে, দূষন মুক্ত হবে এবং স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। 
গ/বুড়িগঙ্গা নদী ও তার দুই তীর পুনরায় ঢাকার একটি আকর্ষনীয় বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ঢাকাবাসী/দেশের মানুষ, দেশি/বিদেশি পর্যটকরা বুড়িগঙ্গা নদীর নৈঃস্বর্গিক সৌন্দর্যকে নতুনভাবে অবলোকন ও উপভোগ করার অবারিত সুযোগ লাভ করবে। 
ঘ/বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে এই সেক্টর/খাত থেকে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমান ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায় ও লাভ করতে পারবে। 
ঙ/বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্টের জন্য ব্যয়কৃত এবং প্রতি বছরের মেইন্টেনেন্স খরচের টাকা উঠাবার ব্যবস্থা করেই বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আকর্ষনীয় ও উপভোগ্য বিনোদন ও পর্যটন ক্ষেত্র গড়ে তুলতে হবে।
চ/বুড়িগঙ্গা নদী ও তীর তার পুরানো হারানো গৌরব এবং ঐতিহ্যকে আবার নতুন রূপে ফিরে পাবে। আর ঢাকাবাসী পাবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন।
ছ/এতে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে ঢাকাবাসী এবং দেশি/বিদেশী পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষনীয় বহুমুখী বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে।

আমার বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট প্রস্তাবনা, তার আলোকে মাস্টার প্লান প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করার চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষন, বিবরণ কোন অলিক, অসম্ভব আকাশকুসুম কল্পনা না। বরং এজন্য প্রথমত প্রয়োজন সরকার প্রশাসনের আন্তরিকতা এবং তার আলোকে বলিষ্ঠ উদ্যেগ গ্রহনের ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থেই এই ইস্যুতে সরকার, বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সবাই মিলে এই মহাকর্ম যজ্ঞকে এগিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত সরকারী অর্থ বরাদ্দ, দেশি/বিদেশি উদ্যেক্তাদের বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য আনুমানিক প্রায় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় করতে হবে। চতুর্থত নানাদিক থেকেই এটি সরকারের জন্য একটি নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক মেগা প্রজেক্ট। তাই দ্রুত বিনিয়োগ সহায়তা পাবার লক্ষ্যে সরকারকে দেশি/বিদেশি বেসরকারী উদ্যেক্তাদের সহজ চুক্তি ও শর্তে বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা ও লাভ করার সুযোগ করে দিতে হবে। সরকার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশানের উচিত বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরবাসী, দেশি/বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ও পর্যটন সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্র প্রসারিত করে প্রতি বছর বিপুল পরিমান ট্যাক্স, ভ্যাট আদায় ও লাভ করার কার্যকর দীর্ঘ মেয়াদী জনবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহন করার এবং সরকারী ফান্ডে অর্থ মজুদ বাড়ানোর উপর অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া সরকার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশান যদি বুড়িগঙ্গা মেগা প্রজেক্টের মহা কর্মযজ্ঞে আমাদের মত ইতিহাসপ্রেমী, ঐতিহ্য উৎসাহী, সংস্কৃতমনা, স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি/নাগরিকদের কাজে লাগাতে চায়, আমন্ত্রণ জানায় তাহলে আমরা তা সাদরে গ্রহন করব এবং এই ব্যাপারে তাদের আন্তরিকভাবে সর্বাত্নক সহযোগীতা করব সিভিলিয়ান/টেকনোক্রাট ভলেন্টিয়ার/স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। শেষ পর্ব(তথা ২য় পর্বে সমাপ্ত)।
লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
 [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK