রবিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Friday, 09 Nov, 2018 08:13:06 pm
No icon No icon No icon

কিছু গল্পের কোন নাম হয় না


কিছু গল্পের কোন নাম হয় না


হাসনা হেনা রানু: গত তিনদিন ধরে একটানা বিরতিহীন বৃষ্টি হচ্ছে। চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে আছে। আজ নিশাতের একটুও অফিসে যেতে ইচ্ছে করছিল না।ওয়েদার খুব খারাপ। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ  স্থান গুলো এক হাঁটু জলের নিচে তলিয়ে আছে। নিশাতের অফিসে  যেতে না চাওয়ার মূল কারণ  জলবদ্ধতা।ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও অফিসে গেল। অফিস থেকে বের হতে বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। তখন মনে হল সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশে মেঘ গুড় গুড় করছে।কি জানি কখন আবার ভেঙ্গে চুরে নামবে ।
------- ছুটতে ছুটতে স্টপজে এসে বাস ধরার জন্য থামলো নিশাত ।
------- একটা গাড়ি এই মাত্র ছেড়ে চলে গেছে।ত্রিশ মিনিট পর পর এ লাইনে গাড়ি চলে।
তারমানে গাড়ি ধরতে নিশাতকে এখনো আধা ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।
------ কিছুটা বিরক্ত হয়  নিশাত ।ও একটা রিক্সা খোঁজার চেষ্টা করে। কি আশ্চর্য !
আশে -পাশে একটা রিকশা, সিএনজি বা অটোরিকশা পর্যন্ত নেই।

---- দশ মিনিট পর, একটা রিকশা এদিকে এল। কিন্তু রিকশাওয়ালা একশো টাকা ভাড়া  হাঁকালো। বেশ রেগে গেল নিশাত। ও বলল,এই খালি আপনার মাথা ঠিক আছে তো ? ত্রিশ, চল্লিশ টাকার ভাড়া আপনি একশো টাকা চাইছেন কেন ?
বৃষ্টি দেখলে আপনারা খুব বেয়াড়া হয়ে ওঠেন। আর তখন দূর্ভোগে পড়তে হয় আমাদের মতো মধ‍্যবিত্ত সাধারণ যাত্রীদের ।
----- রিকশাওয়ালা তার হলুদ দাঁত বের করে ফিক করে হেসে ওঠে বলে,আফা ...ও আফা অধৈর্য হয়েইন না।আপনেরে লইয়া যামু এই এক হাঁটু কাঁদা পানি ভ‍্যাইঙ্গা আমার ও তো কষ্ট হইবো। ভাড়া আমি বেশি চাই নাই। সন্ধ্যা আসন্ন  প্রায় । ভাষানটেক থেকে  মিরপুর ১৪ কম রাস্তা না আফা ।
আর বৃষ্টি কি কম বেয়াড়া হইছে কন ?হেইতো লাফায়া লাফায়া নামতেছে। ঠিক আছে আফা আপনে আমারে আশি ট‍্যাকা দিয়েন।
আর কোন কথা কইয়েন না আফা ।উঠেন...
---- নিশাত কোন কথা না বাড়িয়ে ওঠে বসল। রিকশা চলছে । বৃষ্টি খুব জোরে শুরু হয়েছে।
সাথে দমকা হাওয়া।
রিকশার পর্দায় মানাচ্ছে না। নিশাত ভিজে একাকার হয়ে গেছে।
------- বাসায় ফিরতে দেড় ঘণ্টা লেগে গেল। মায়ের সঙ্গে নিশাত এ বাসায় থাকে। ওর শরীর রিরি করছে।
--------চারিদিকের পচা ডোবা পানিতে সে হেঁটেছে। নিশাত ওয়াশরুমে আধা ঘন্টা ধরে সাবান,শ‍্যাম্পু আর স‍্যাভলোন সহযোগে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে ওঠে ।এখন ওর মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে।
--------- এক কাপ চা হাতে নিশাত ব‍্যালকনিতে এসে বসল। ও একবার আকাশের দিকে তাকাল । কালো মেঘে আকাশ ঢেকে আছে।
তখনো বিরতিহীন ভাবে বৃষ্টি ঝরছে।
------------হঠাৎ নিশাতের মনের ভেতর থেকে অন্য এক মন যেন কথা বলে উঠল -----------
নিশাত , তুমি কি সায়ান খানকে ভুলে গেছ ?
 কত বছর পর সায়ানের চিঠি হাতে পেয়েছ তুমি। অথচ কি লিখেছে সে চিঠিতে ..   একবার ও কি তোমার  পড়তে ইচ্ছে করছে না?   সে কেমন আছে ?
নিশাত দুম করে বলে উঠল,ওতো আমাকে ভুলে গেছে । আমি কেন ওকে মনে রাখতে যাব ?
কখনোই না।যে চলে যাবার সে ঠিকই চলে গেছে। পুরনো দিনের হিসেব কষে আর কি লাভ ?ওতো একা যাইনি সঙ্গে আমার মেয়েকেও নিয়ে গেছে।
------------যে মেয়ে আমার হৃদয়ের একটা অংশ ছিল, অথচ সেই মেয়েকে ছাড়া আমিও এতটা বছর বেঁচে আছি কেমন করে?
------- নিশাতের দু'চোখ জলে ভরে ওঠে।ওর একটু ও ভাল লাগছিল না। কেমন হয়েছে মেয়েটা ? কত বড় হয়েছে ?
নিশাত সামান্য উচ্ছ্বাসিত হলো।
----- মুমু মামণি ,তুই কি কখনো আমার বুকে ফিরে আসবি না? আমি জানি,তোর বাপী তোকে বলেছে ,তোর মাম্মী আর বেঁচে নেই।মারা গেছে। সেটাই বলা স্বাভাবিক। আর এই ধারণা নিয়ে তুই ও বড় হচ্ছিস। কিন্তু আমার ছেলে  শিপনকে  আমি এমন কথা বলতে পারিনি।
ওকে আমি সত‍্য কথা বলেছি। তোর বাপী আমাকে ছেড়ে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় চলে গেছে।
----- কিন্তু তুই বড়ই হতভাগারে শিপন,তোর জন্মের কথা তোর বাপীকে জানানো হয়নি।
পাছে যদি সে তোকেও আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়ে যায় সেই ভয়ে।তোর বাপী যখন চলে যায়, তুই তখন আমার গর্ভে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিস ।
-----দেখতে দেখতে  কতগুলো বছর পার হয়ে গেছে , শিপন  আর সেই আগের মতো ছোট্ট খোকা বাবু টি নেই। অনেক বড় হয়েছে।
---নিশাত মনে মনে বলে,সায়ান খান শিপন  তোমার ছেলে । কানাডায় থাকে।ও এমবিবিএস পাশ করে ডঃ হয়েছে।।
------- নিশাত ওর অতীত দিনগুলোর কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
ওর মনে অনেক দুঃখ জমে আছে।
------নিশাত অনেক কষ্ট করে ছেলে  শিপনকে  আজকের এই অবস্থানে আনতে পেরেছে। সে জন্য নিশাত অনেক গর্ব বোধ করে।
------নিশাতের মায়ের জীবনটাও অনেক দুঃখ, কষ্টে ভরা।
আর এই দুঃসাহসিক জীবনটা পাড়ি দেয়া সে মায়ের কাছে শিখেছে।
------- যেদিন থেকে নিশাতকে মা - ছেলের সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল, সেদিন তার পায়ের নিচে শক্ত কোন মাটি ছিল না।
------সায়ান চলে গেল। নিশাতকে তখন একটা চাকরির জন‍্য অফিসে অফিসে ধর্ণা দিতে হয়েছে।
---- ক' মাস পর অগ্রণী ব্যাংকে ওর চাকরি হল।
তখন চাকরি পাওয়াটা ছিল দূলর্ভ। নিশাতের এক রিলেটিভ ওই ব‍্যাংকের ম‍্যানেজার ছিলেন । উনার রেফারেন্স এ চাকরিটা নিশাত পেয়ে যায়। 
----- শিপন , মাম্মী আর নানুর কাছে তার ছোট বেলার অনেক গল্প শুনেছে। কিন্তু আজ অবধি সে জানে না তার একটা বড় বোন আছে।  বোনটা তার বাপ্পীর কাছে।
---- বড় বিষাদ  মুখে নিশাত চেয়ার ছেড়ে ব‍্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়ালো। দোতলার ঝুল বারান্দা একটানা বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
বৃষ্টির এই শব্দটা আজ সারাদিন দুকানে বাজছে নিশাতের ।
---ক্ষণে ক্ষণে টুপটাপ বৃষ্টির এই এক ঘেয়ে সুর কোলাহলহীন
 বাড়িটাকে বড় বেশি নির্জন করে তুলছে ।
 নিশাতের আম্মা বাসায় নেই। পাশেই মামার বাসায় গিয়েছেন। রাতে চলে
আসবেন।
----বাইরে ঝড় বৃষ্টি, দোতলায় নিশাত একা । নিঃসঙ্গতা আরও বেশি জেঁকে বসেছে নিশাতের  মাঝে।

----- ফিরোজা বেগম  বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসায় আসলেন। দ্রুত শাড়ি বদলে মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
নিশাত বলল, আম্মা রাতে তুমি মামার বাসায় থেকে গেলে পারতা । বৃষ্টির মধ্যে আসার কি দরকার ছিল?
---- ফিরোজা বেগম বলেন,কী করব বল ? তোকে ছাড়া আমি কখনো কোথাও থেকেছি ? তোর কথা বলে, জোর করে চলে এসেছি ।
---- নিশাত কোমল স্বরে বলল, কাজটা তুমি ঠিক করোনি আম্মা। আমি ঠিকই চালিয়ে নিতাম। দুই একদিন তুমি থাকতেই পার ।
---- ফিরোজা বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,তোর কি মন খারাপ? কি হয়েছে আমাকে বল ?
নিশাত দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কিছু হয়নি আম্মা। আমি বেশ আছি। তুমি আছ ,শিপন আছে ।
---- ফিরোজা বেগমের দু'চোখ জলে টলমল করে ওঠে। উনি বলেন, পারবি তুই আমার কাছে নিজেকে আড়াল করতে ? মুমুর জন্য তোর কষ্ট হয় না ? আর মেয়েটা ও বা কি ? ওর কি মাকে দেখতে মন চায় না ? নাকি মেম মাকে পেয়ে তোর কথা ভুলে গেছে ?
--- আম্মা ? আর্তনাদ করে উঠল নিশাত।মুমু হয়তো জানেই না এদেশ ওর নিজের দেশ ।এ দেশে ওর মা এখন ও বেঁচে আছে ! আসলে কি জান আম্মা ,সবার জীবনে দুঃখ, কষ্ট  আছে ।এসব কষ্ট মনের মধ্যে পুষে রাখলে চলে না।  ঘুণে ধরা আবেগকে প্রশ্রয় দিলে কষ্টের দাঁড়ি পাল্লা আরও বেশি ভারী হবে আম্মা।এই দেখো  আমি এখন অনেক সহজ হয়ে গেছি।  তোমার মেয়ে না?
--- ফিরোজা বেগম জানেন, তাঁর মেয়ে নিশাত সব বিষয়ে দক্ষ এবং অনেক বেশি হিসেবী। গোছানো সুগভীর শৃঙ্খলাপরায়ণ আত্মবিশ্বাসী। তাঁর থেকে নিশাত অনেক বেশি বুদ্ধি রাখে।
--- ফিরোজা বেগম মনে করেন, নিশাত তাঁকেই শান্ত্বনা দিচ্ছে।হাসি পেল মায়ের। তিনি বলেন,এসব ছেদো কথার কি কোন মূল্য আছে ? আর শান্ত্বনাই বা দিচ্ছিস কিসের ?তোর বাবার মৃত্যু বলতে যে শোকময় দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে, স্বামীর ক্ষেত্রে ওরকম কোন দৃশ্য তো নেই তোর চোখে ?সে তো বেঁচে আছে।থাক না সে নিজের মতো করে....?
--- বিস্ময় প্রকাশ করল নিশাত ,আম্মা! একি বলছ তুমি? এরকম ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকায় অনেক ভাল। তখন মন কে শান্তনা দিতে পারতাম সে মানুষ টা মারা গেছে।সে বেঁচে থাকাতে আমার কোন্ উপকারটা হচ্ছে শুনি ?
সুখের সাগরে ডুবে যাচ্ছে নাকি আমার পৃথিবী ?
নাকি -- ভালবাসার গাঢ় রঙে রঙিন হচ্ছে আমার জীবন ? কোনটা ..... বলতে পার আম্মা ?
-- মেয়ের কথা গুলো বেশ মনে ধরল ফিরোজা বেগমের। তিনি কেঁদে ওঠে বলেন, আমি আর ক'দিন আছি বল ? আমার বয়স হয়েছে।কখন হুট করে চলে যাব তোর বাবার কাছে।সেতো আমাকে সব সময় তাঁর কাছে ডাকে । নিঃসঙ্গ জীবন যে কত দূর্বিসহ হয়ে ওঠে সে আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।এটা আমার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
----ফিরোজা বেগমের দু'চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। কষ্টের মাঝেও একটা ভাল লাগা অনুভূতি চিন চিন করছিল তাঁর বুকে।এ বাড়িটা তাঁর স্বামীর । ফিরোজা বেগমের দুই মেয়ে। দিহান আর নিশাত । বড় মেয়ে কানাডা থাকে। 
  --- তাঁর কোন পুত্র সন্তান নেই। হাজবেন্ড কলেজের অধ‍্যাপক  ছিলেন। আর
তিনি স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। নিশাতের বাবা ক‍্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ফিরোজা বেগমের পেনশনের টাকা স্বামীর চিকিৎসার জন্য ব‍্যয় হয়ে গেছে।এই তিন তলা বাড়িটা অবশিষ্ট  আছে। উপর নিচে ক' ঘর ভাড়াটিয়া আছে।
----নিশাতের বড় বোন দিহান কেমিষ্ট্রিতে অনার্স মাস্টার্স করে । পরবর্তীতে পি এইস ডি করতে স্কলারশীপ নিয়ে সুদূর কানাডায় চলে যায়। পড়া অবস্থায় কানাডিয়ান এক মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে । যোহান যোহায়ির কানাডিয়ান হলেও হাজবেন্ড হিসেবে অমায়িক এবং হেল্পফুল। যোহানের দাদা মোঃ কাইফি ভারতীয়  মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলেন।
 --- দিহানের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে যায়ান , মেয়ে নাতাশা। যায়ান মেডিক্যাল এ পড়ছে।  নাতাশা ফ‍্যাশান ডিজাইনে অনার্স পড়ছে।
-- শিপন ও লেভেল পাশ করার পর ওকে কানাডা নিয়ে যাওয়ার জন্য দিহান ছোট বোনকে  প্রস্তাব দিয়েছিল। নিশাত আর না করেনি। ছেলেকে  আপুর কাছে পাঠিয়ে দিল। শিপনের একটা এ‍্যাম্বিশন ছিল।সে ডাক্তার হবে।সে তার এ‍্যাম্বিশন থেকে একচুলও নড়েনি। শিপন এখন  ডঃ।
--- শিপন এবং নাতাশা দুজন দুজনকে ভালবাসে। বিষয়টি এখন শুধু ওদের দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দু' পরিবার জেনে গেছে। কাছাকাছি থাকলে যেটা হয়, 
ভাললাগা থেকেই ভালবাসার জন্ম। নাতাশাকে  প্রথম শিপন প্রপোজ করেছিল । নাতাশার যে শিপনকে ভাল লাগতো না তা নয়। 
এক বিকেলে নাশাতা বলল,এ‍্যাই শিপন ভাইয়া .. আমাকে সমুদ্রের কাছে বেড়াতে নিয়ে যাবে ? অনেক দিন সমুদ্র দেখিনি।
শিপন বলল ইয়েস সিস , কেন নয়?  বিকেলে চল , আমি ফ্রি আছি।
পড়ন্ত বিকেলের হালকা রৌদ্দুরে সেদিন প্রথম হারিয়েছিল দুজন দুজনের মাঝে। দুজন দু' রঙের দু'টো গোলাপ নিয়েছিল। অথচ কেউ কাউকে বলেনি সেকথা। 
 প্রথম শিপন গোলাপী রঙের গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করেছিল নাতাশাকে। শিপনের কাছ থেকে প্রপোজ পেয়ে, নাতাশার সেকি উচ্ছ্বাস! নাতাশা কেঁদে ওঠে বলেছিল , আমিও গোলাপ  এনেছি ... আই লাভ ইউ টু.! ও একটা লাল গোলাপ দিয়েছিল শিপনকে ।
---- নাতাশা বলল,জান শিপন ভাইয়া আমি অনেক আগে থেকেই বুঝেছি তোমাকে ভালবাসি। আমি রাতে ঘুমানোর আগে তোমার মুখটা দেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করি।যে রাতে আমি তোমাকে দেখে ঘুমাই ,

 আমার দুচোখ জুড়ে থাকো শুধু তুমি--
আমার স্বপ্নে থাকো তুমি ,
চোখ খুলে ,
শয়ন কি জাগরণে 
সব সময় তোমাকে দেখি :
তোমাকে ই ভাললাগে
তোমাকে ই বড় বেশি ভালবাসি!

শিপন বলল,কথা দাও কোনদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না।
হঠাৎ নাতাশা বলে,এ কথা কেন ? প্রথম দিনেই .!
শিপন বলল, কেন শুনবে ? আমার এই ভালবাসাতে ভীষণ ভয়। আমি বুঝতে শিখে কখনো বাবার আদর স্নেহ পাইনি। আমি জেনেছি বাপ্পী মাম্মীকে ছেড়ে চলে গেছে। আমার মাম্মীর অনেক কষ্ট! আমি চাইনা , মাম্মী- বাপ্পীর মতো আমার লাইফে ও এমন কিছু ঘটুক। সত্যি আমি মরে যাব।

..... তুমি নীল গোলাপ হবে ?
স্বপ্ন গুলো রং ধনু প্রজাপতি ডানা হবে -
কিম্বা তুমি লাল, নীল গোলাপ হলে 
আকাশটা রং ধনু সাত রং ডানা মেলবে 
মনের সুখে
এ বুকের গহীনে ;


তুমি কবিতা হবে?
তোমায় ছুঁয়ে..
ছোট্ট ছোট্ট শব্দ গুলো ভাষা পাবে ,

নির্জন গোপনে কোন এক কবি 
তোমাকে নিয়ে লিখবে ,
নীল দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে  থাকবে 
কবিতার সবুজ চোখের পাতা :
প্রকৃতির হলুদ শহরে গাঢ় স্তব্ধতার
এক নির্জন সন্ধ্যা খসে খসে পড়বে ,
মাধবীলতা স্বপ্ন কুঁড়ি ঠোঁটে
একটু একটু করে ---
সন্ধ্যাটা ধীরে ধীরে রাতের
গভীরে হারাবে ....!

তুমি নীল ঘাস ফুল হবে ?
পথের দু'পাশে বিষন্ন প্রকৃতি পূর্ণতা পাবে :
প্রকৃতির সকল বিবর্ণতা মুছে যাবে
ঘাস ফুল তোমার ঠোঁটে ----
নতুন ভোরের শিশির ভালবাসার নগ্নতায় স্বপ্ন আঁকবে ....
কি করে বলব তোমাকে ----
আমি তোমাকেই ভালবেসেছি 
ও মায়াবী মিষ্টি মেয়ে!

-----কবিতা শুনতে শুনতে নাতাশা স্বপ্নের এক আশ্চর্য মায়াবী জগতে হারিয়ে যায়। শিপন বলে, আমার জীবন বড় বিচিত্র । অদ্ভুত রহস্যময় ও। আমার এই ছন্নছাড়া অগোছালো জীবনের সঙ্গে তুই নিজেকে জড়িয়ে ফেললি ? এখন ও সময় আছে নাতাশা,ভেবে দেখ।
--- নাতাশা মন খারাপ করা কন্ঠে বলে, তুমি আমাকে অনেক আগে থেকেই ভালবাস আমি জানি। ঠিক আমিও তাই।
এতদিন তুমি বলেছ , মেডিকেল পড়া শেষ না করে তুমি এসব ভাবছ না । আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি । এখন মনে হয়েছে সেই সময় এসেছে। আজ তুমি অন্য কথা বলছ ? দেখো শিপন ভাইয়া,সবাই সব দিক থেকে পরিপূর্ণ হয় না। সংসারে কার ও বাপ্পা  থাকে না।আবার কার ও মাম্মী থাকে না। একেক জনের দুঃখ একেক রকম। মন খারাপ করে সারাক্ষণ দুঃখী হয়ে থাকার কোন মানে হয় না।
তোমার কষ্ট আমি বুঝি বলেই আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি শিপন ভাইয়া।
আমার ভীষণ ভাললাগে যখন তুমি আমার বাপ্পা কে বাপ্পা বলো ।মামকে  মাম সোনা বলো।
----প্রসঙ্গ চেঞ্জ করতেই নাতাশা বলল, টরন্টো শহর থেকে লিংকন সাগর খুব একটা দূরে নয়। শিপন ভাইয়া , তুমি আমাকে মাঝে মাধ‍্যে এখানে নিয়ে আসবে। সাগর আমার ভীষণ পছন্দ। চলো ফেরা যাক।ওরা দু'জন গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল। নাতাশা বলল,আগে কখনো এখানে এসেছ ?
শিপন বলল, হুম অনেক বার। বন্ধুদের সঙ্গে এসে লিংকন সাগরের পাড়ে আড্ডায় মেতে উঠেছি। মেডিকেল পড়ার সময়ে। নাতাশা হতাশ হয়ে বলে,ও...
মূহুর্তে পরিবেশ টা  ভারি হয়ে ওঠেছে সেটা বুঝতে পারে শিপন।
ও গাড়ি ড্রাইভ করছে , পাশেই নাতাশা বিষন্ন মনে বসে আছে।
--- হঠাৎ শিপন নাতাশার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলল,এ‍্যাই সোনা এমন মুড অফ করে বসে আছ কেন ? মেডিকেল পড়া অবস্থায় ওই মূহুর্তে তখন আমার মনে প্রেম জাগে নি। ক‍্যারিয়ার নিয়ে ব‍্যস্ত ছিলাম। যখন মেডিকেল পড়া কমপ্লিট করলাম তখন প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে একটু আধটু ভাবতে শুরু করলাম। তারপর আবিষ্কার করলাম আমার ভাললাগার জায়গাটা তুমি দখল করে আছ। একটা কথা না বললেই নয়,কানাডায় একজন পূর্ণ ডঃ হতে প্রায় দশ বছর লেগে যায়। সেখানে আমার সাত বছর হল। এখন ও তিন চার বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাকে। নাতাশা বলল, তোমার অপেক্ষার দিনগুলোতে আমি তোমার পাশে আছি।হুট করে শিপন নাতাশার ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে বলে,এটা তোর এক্সট্রা পাওনা।
----হঠাৎ করে ফিরোজা বেগম ম‍্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাস খানেক নার্সিং হোমে থাকলেন। জ্বর কিছুতেই ছাড়ছিল না। নিশাত ছেলেকে কিছুদিন ছুটি নিয়ে দেশে আসতে বলল। মায়ের আদেশ পালন করতে শিপন একমাসের ছুটিতে উড়াল দিল দেশে।
----ফিরোজা বেগমের অসুস্থ দিনগুলোই নানুর পাশে ছায়ার মতো লেগে থেকেছে। নানুর জ্বর মেপেছে  প্রতি ঘন্টায়,পালস্ দেখেছে । শেষ সপ্তাহে টেম্পারেচার চার্ট দেখে শিপন হাসি মুখে বলল, নানু তুমি সুস্থ হয়ে গেছ। একদিন পরে তুমি বাসায় যেতে পারবে।ছেলের কথায় সায় দিয়ে নিশাত বলে,হা আম্মা তোমার কিছুই হয়নি।এরা শুধু শুধু তোমাকে নার্সিং হোমে আটকে রেখেছে।
---- ফিরোজা বেগম বুঝতে পারলেন, তাঁর নাতি শিপন জোর করে তার মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তিনি হেসে ওঠে বললেন,নানু ভাই আমি খুব খুশি হয়েছি । তোমার এই সাফাল‍্যে। এতদিন কোন ডঃ আমাকে সুস্থ করতে পারছিল না। তুমি আমাকে সুস্থ করেছ। তুমি মস্ত বড় ডঃ হয়ে গেছ। যাও ---- তোমাকে আমি ডঃ এর স্বীকৃতি দিলাম। মূহুর্তে শিপনের বুকটা আনন্দে ভরে উঠল।ও নানুকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি আমাকে দোয়া কর নানু আমি যেন বড় ডঃ হয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। ফিরোজা বেগম বলেন,সেকি আর বলতে হয়রে নানু ভাই ! 
--- নিশাত কেঁদে ওঠে বলে,জান আম্মা কত হাজার বছরে ও এমন শুভদিন আসেনি। আমার ভীষণ ভাললাগছে শিপনের কথা শুনে ।
----এ যেন গভীর অন্ধকারের বুকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়েছে অপ্রত্যাশিত ঝলমলে আলো ।শিপন ওর মাম্মীর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলে, আমাদের দুঃখের দিন ফুরিয়ে এল মাম্মী । তুমি কাঁদছো কেন? আজ কোন কান্না নয় ।
----- পাগল ছেলে ,কই কাঁদছি নাতো ? নিশাত ঠোঁট টিপে হাসল।এত আমার চোখে আনন্দ অশ্রু! ও তুই বুঝবি না শিপন।
--- শিপনের পাশে ডঃ চ‍্যাটার্জী এসে দাঁড়ালেন। উনি রিপোর্ট নর্মাল দেখে বললেন , ইয়াং ম‍্যান তোমার পেসেন্ট  এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তুমি উনাকে কাল বাসায় নিয়ে যেতে পার। আর কোন সমস্যা নেই।কড়া অ‍্যান্টিবায়োটিক শরীরের সব রস নিংড়ে নেয়।তবে সাবধান থাকলে ভয়ের কিছু নেই। তুমি একবার আমার ল‍্যাবে এস । তোমার সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে। ডঃ চ‍্যাটার্জী এ পর্যন্ত বলেই চলে গেলেন। 
----নিশাত বলে, আম্মা তোমার খুব একটা অসুখ হয় না। শেষ কবে বিছানায় পড়েছিলে তোমার মনে আছে ? বাবার মৃত্যুর আগে।দিন পনেরো তুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরে ভুগেছিলে।সেকি মারাত্মক জ্বর। কিছুতেই ছাড়ে না।
--- ফিরোজা বেগমের দু'চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে।ফ‍্যাকাশে মুখে বললেন,তোর বাবা অসুস্থ হয়ে ও আমার কপালে জলপট্টি দিত।একজন সেবিকার মতো মুখে জল ঢেলে ক‍্যাপসুল খাইয়ে দিত। তাঁর নিপুণ হাতের সেবায় আমি কত দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম তাই নারে নিশা ? 
এখনো চোখ বুজলেই আমি সেই হাতের স্পর্শ পাই।তোর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। পনেরো বছর হয়ে গেছে। আমার এতদিনে একটু শরীর খারাপ কি জ্বর ও হয়নি।অথচ হুট করে আমার ম‍্যালেরিয়ায় পেয়ে বসল।এখন আমার ঘরে ডঃ আছে।অসুখ আমাকে দেখলেই পালাবে ,তাই না নানু ভাই ? নানুর কথা শুনে হেসে ওঠে শিপন । হা,নানু তুমি ঠিক বলেছ। কোন অসুখ ----          নো চান্স! অন্ততঃ তোমার শরীরে ।

------ ডঃ চ‍্যাটার্জীর ল‍্যাবে  আসল শিপন। ডঃ ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে আছেন। কিছু একটা নিয়ে ভাবছেন । শিপনের আগমনে মাথা তুলে বলেন, ইয়াং ম্যান কতদিনের ছুটিতে এসেছ? শিপন ছোট্ট করে বলল,এক মাস স‍্যার।
----- মিঃ চ‍্যাটার্জী বললেন, আমি তোমাকে একটা প্রস্তাব দিব । তুমি আমার ক্লিনিকে দু' বছর কাজ কর। শুধু এমবিবিএস পাশ করলেই ডঃ হওয়া যায় না। তুমি পিএইচডি ডিগ্রীধারী, কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ । তোমাকে আমার ক্লিনিকে প্রয়োজন। আমি জানি তুমি কানাডার মতো দেশ ছেড়ে এখানে আসতে চাইবে না। কিন্তু তোমাদের মতো তরুণ মেধাবীদের আমার দেশে বড় প্রয়োজন। ডঃ চ‍্যাটার্জী থামলেন। আবার একটু পরে বলেন, আমি বোধহয় বেশি আশা করেছি ।
------ তোমার সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে  তোমাকে আমার মন্দ লাগেনি। তুমি আমার ক্লিনিক সামলে নিতে পারবে সে আত্মবিশ্বাস আমার আছে। আত্মবিশ্বাস টুকুই একজন ডাক্তারের মহা গুন।
----  শিপন মনে মনে মন স্থির করে ফেলেছে।
সে অপ্রতিভ মুখে বলে উঠল, ----- কিন্তু স‍্যার কথা সেটা নয়। কানাডায় এমবিবিএস বলে কোন ডিগ্রী নেই। চার বছর কোর্স করার পর ছাত্ররা পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে পারে। আমি পিএইচডি ডিগ্রীধারী ঠিকই। কিন্তু এখনো শিখছি। সেই অর্থে আমি নিজেকে কোন ভাবেই ডঃ মনে করিনা। আমি কি পারব ? স‍্যার আপনার প্রস্তাব আমি গ্রহণ করলাম। 
------ ডঃ চ‍্যাটার্জী উঠে দাঁড়িয়ে শিপনকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কন্ঠে বললেন,  কংগ্রাচুলেশনস ইয়াং ম্যান। আমি খুব খুশি হয়েছি।
----- শিপন বলল, এটা আমার দেশ । এখানে নতুন কাজ ... নতুন পরিবেশ... স্বদেশের মানুষের সাথে কাজ করব এত আমার সৌভাগ্য স‍্যার!
------ হঠাৎ ল‍্যাবে ঢুকলেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব স্মার্ট এক ভদ্র মহিলা।ভার কন্ঠে বলেন,মিঃ চ‍্যাটার্জী আপনি কি বিজি ?
---- ডঃ চ‍্যাটার্জী বলেন,হা কিছুটা । কেন ম‍্যাডাম ? না , ঠিক আছে । আমি বরং পরে আসি।উনি চলে যেতে এক পা তুলে আবার কি মনে করে শিপনের দিকে তাকিয়ে বললেন,মিঃ চ‍্যাটার্জী ছেলেটি কে ? এত দেখছি হুবহু সায়ানের কার্বন কপি ।ইউ আর মাই চাইল্ড ।
--- সায়ান নাম শুনেই শিপন চমকে উঠল।ও আড়চোখে একবার দেখল ভদ্রমহিলা কে।
---- উনার মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। উনি সন্দিগ্ধ চোখে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন শিপনের দিকে।
---- কৌতুহল দমিয়ে রেখে শিপনের কাছে এসে বলেন, তোমার বাবার নাম কি ?
---- শিপন বলল, সায়ান খান ।আর তোমার মায়ের নাম নিশাত ? ভদ্রমহিলার চোখ মুখ ভারী হয়ে গেছে। শিপন বলল,জী। আপনি কে? এতসব আপনি কিভাবে জানেন ?
----ভদ্রমহিলার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। উত্তেজিত কন্ঠে বললেন, ইম্পসিবল ? উনি গম্ভীর মুখে বলেন, আমরা জানি তোমার মা আবার দ্বিতীয় সংসার করছে। তুমি সেই ঘরের সন্তান। অ‍্যাম আই রাইট ? কিন্তু হিসেবে মিলছে না,এ তো দেখছি সায়ানের কার্বন কপি । এত মিল হতে পারে? তবে  কি সায়ান তোমার জন্মদাতা? ইট ইজ পসিবল ? ইহা কি সম্ভব?
-------- শিপন তপ্ত হল ।ও বলল, আপনার চোখে এখন আজব ঘোর। বললেন না তো আপনি কে ? আমার মায়ের দ্বিতীয় বার সংসার হয়নি। জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি আমাকে নিয়ে মা নানুর বাসায় আছে । আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
----- অদ্ভুত রকমের নীরব হয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা।
ডঃ চ‍্যাটার্জী নিরুত্তর।
উনি ঘটনার আদ‍্যপান্ত বোঝার চেষ্টা করছেন।
----- চোখের কোল মুছে চিৎকার করে কেঁদে উঠে ভদ্রমহিলা বলেন, আমি তোর ফুপ্পি ডঃ ফৌজিয়া।কত বড় একটা ভুলের মধ্যে আছি আমরা! সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে তোর বাবা - মা দু'জন আলাদা হয়ে গেছে। ওদের সেপারেশন হয়নি।এখন ও সময় আছে আমেরিকা থেকে তোর বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে আয় বাবা।তোর বাবার বয়স হয়েছে।সায়ানের যোগ‍্য ছেলে হয়েছিস তুই।
------ ফুপ্পির কথায় শিপনের বুক কাঁপিয়ে একটা নরম দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। শিপন বলল, আমার মাম্মীর ভাঙা সংসার  জোড়াতালি দিয়ে  সাজাবো।
সে জন্য আপনার সহযোগিতা আমার একান্ত ভাবে কাম্য।
------ শিপন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,আপনারা আমার মাকে উপেক্ষা করেছেন।
এতদিন আমার নিজেকে মৃত মনে হয়েছে।আজ একটু জীবিত মনে হচ্ছে।
ফ্রেঞ্চ পারফিউমের কড়া গন্ধ ডঃ ফৌজিয়ার নাকে এসে লাগল।
------ একটা ভারী আফসোস হয় শিপনের।ও বলে, পাশের কেবিনে আমার নানু অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছেন।মাম্মী ও আছে। আমি ওখানে আপনাকে যেতে বলব না। আপনার ভিজিটিং কার্ড দিন । আমি যোগাযোগ করব আপনার সঙ্গে।
------ ডঃ ফৌজিয়া কার্ড দিয়ে বলেন, আমি গাইনী বিশেষজ্ঞ। মাই চাইল্ড, আমি এতদিন জানতাম,সব মেয়েরা আপন ,ছেলেরা পর । বাবার কোলে ঝোল টানে মেয়েরা বেশি।ছেলেরা মায়ের কোলে ।
এখন দেখি ছেলেরা ও টানে ।
------- কেঁদে ওঠে শিপন বলল, আমি জন্মে কখনো বাবাকে দেখিনি। বাবার আদর স্নেহ কেমন আমি পাইনি। সেই আমি এতদিন পর বাবার সন্ধান পেয়েছি।
বোঝেন না , আমার মতো টগবগে যুবকের বাবা না থাকার কষ্ট!
আমার দুঃখ অনেক ভারী, আমার বাবা যখন  মাকে ছেড়ে চলে যায় তখন সে একবারও ভাবল না সংসারে স্বামী না থাকলে সে স্ত্রীর কি বেহাল দশা হয় ? বাবার মুখোমুখি হয়ে তাকে আমি এই একটা প্রশ্ন করব ।
শিপনের কান্না থেমেছে।
----- ডঃ ফৌজিয়া শিপনের চোখের জল মুছে দিয়ে মিচকি হেসে বলেন, হুম করো। উনি
খুশি খুশি মুখে বললেন, আমি আসি। ডঃ ফৌজিয়া চলে গেলেন।
--------ডঃ চ‍্যাটার্জী সুন্দর হাসি দিয়ে বলেন , ইয়াং ম্যান আমি খুব খুশি হয়েছি।যত দ্রুত তোমাদের বাবা - মা , সন্তানের মিলন ঘটে 
ততই মঙ্গল। তোমার ছুটি শেষ হবে কতদিন পর ।
------ শিপন ফ‍্যাকাসে হাসল।কি যে বলেন স‍্যার ? এখন কি হাতে গুনে ছুটি কাটানোর সময় আছে? আমি তো পারলে দুই একদিনের মধ্যেই চলে যাব। আমার হাতে এখন অনেক কাজ।
----- টেবিলে নাস্তা রেখে গেছে পিয়ন।শিপন চমকে উঠল,স‍্যার নাস্তা করার সময় নেই। এখন উঠব।মিঃ চ‍্যাটার্জী বললেন,হোয়াট ? তুমি নাস্তা না করলে আমি বিব্রত বোধ করব। কাউকে বিব্রত করাটা সঙ্গত নয়। শিপন সরি বলে,কেক আর মিষ্টি  মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ।
----- এক সপ্তাহ পর শিপন কানাডায় চলে এসেছে। শিপনের কাছে নাতাশা সব কিছু শুনার পর ওর মন ভালো এবং খারাপ দুটোই হয়েছে।

------ শিপন বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পর দেখছে নাতাশা মন মরা হয়ে আছে।  কোন প্রাণ নেই, উচ্ছ্বাস নেই।বিষয়টা ভাবতেই  বুকে চিনচিন একটা ব‍্যথা অনুভব করল।
ও ভাবল , নাতাশার এই বিষন্ন মনোভাব কাটানো দরকার।
----- শিপন বলল,হায় নাতাশা চল বিকেলে কোথাও ঘুরে আসি । নাতাশা বলল ,যেতে ইচ্ছে করছে না  আমি ঠিক আছি। তুমি চা খাবে? আমি বানিয়ে আনছি, একটু ওয়েট কর। নাতাশা উত্তরের অপেক্ষা না করে রান্না ঘরে গেল। শিপনের একটু অবাকই লাগছে ।যে মেয়ে কখনোই রান্নার ধার ধারে না।সে কিনা আজ আমার জন্য নিজের হাতে চা করতে গেছে ?
--------দিহান ও কম অবাক হয়নি মেয়েকে রান্না ঘরে যেতে দেখে।
নাতাশা তিন মগ কফি করে এনেছে।এক মগ মমকে দিয়ে এসেছে।
ও কফি হাতে শিপনের রুমে এসে বসল। শিপনের হাতে কফির মগ তুলে দিয়ে বলল, তোমার অনুভূতি ব‍্যক্ত কর কেমন হল ।
---- শিপন বলল,ম‍্যাম চায়ের কথা বলে কফি কেন ? যা ঘ্রাণ ... মনে হয় দারুণ হবে ।
নাতাশা বলল,চা না কফি খাবে তুমি কিছুই বললে না। আমার পছন্দ কফি নিয়ে এসেছি ।
------শিপন কফিতে চুমুক দিয়ে বলে ,ওয়াও অনেক সুন্দর হয়েছে। এই , তুই কেঁদেছিস ? তোর চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। নাতাশা উত্তর না দিয়ে বলে , ধন্যবাদ।এই প্রথম আমি তোমার জন্য কফি করলাম। নাতাশা উঠতে যাচ্ছিল, হঠাৎ শিপন ওর হাত ধরে বলে এই  আমার উপর কেন তুই রাগ করছিস? আমার এখন অনেক কাজ। আমি সারা জীবন তোর থাকব। দেখিস আমি তোর অন‍্য রকম এক স্বামী হব।তোকে আমি হৃদয়ে রাখব। এখন চল আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
------ নাতাশা লাজুক হাসল , একটু আগে কি বললে , শিপন ভাইয়া? তুমি আমার স্বামী হবে না প্রেমিক পুরুষ হয়ে থাকবে ? কোন টা ?
শিপন বলে, আপাততঃ দ্বিতীয়টা । প্রথমটা পরে দেখা যাবে।এই তুই চট জলদি তৈরি হয়ে আস। আমি মাম সোনাকে বলে আসছি। শিপন চলে গেল।
---- শিপনের অনুমতি মিলে গেল। দিহান বলল,তোর অনারে আজ কফি খেলাম। দিহান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,এই শিপন তুই আর আমাকে মাম সোনা বলবি না। কেমন যেন শোনায়। আন্টি মণি বলবি । শিপন বলল,আন্টি মণি ? না না আমি পারব না বলতে । দু'দিন পরে নাতাশা আমার ... আর বলতে পারে না শিপন।
----- কি বল ? থামলি কেন? আমি জানি এই কথাটাই তুই বলবি ? দিহান কর্তৃত্বের সুরে বলল, কিন্তু নাতাশাকে ওর বড় চাচু ছেলের বউ করতে চাচ্ছেন।মাহাদী ওমর ছেলে হিসেবে খুব ভালো।সিভিল ইন্জিনিয়ার।
শিপন ম্লান মুখে বলল, নাতাশাকে বলেছ ? দেখো ,ও কি বলে ? দিহান বলল, ওকে পরে বললে ও হবে । তুই বল কেমন হবে ? শিপন বলল, জানিনা।ওর চোখ দুটো ছলছল করছে। হয়তো কেঁদে ফেলবে।
হঠাৎ দিহান বলল, ওকে ভালবাসিস কথাটা বলতে পারলি না? তোর বাপ্পা, আমার তোকেই পছন্দ।ভাবিস না।যা ওকে নিয়ে ঘুরে আস। শিপন ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে দিহানের বুকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বলে,মাম সোনা আমি তোমার মেয়েকে অনেক ভালবাসি। ওকে না পেলে আমি বাঁচব না।
----- নাতাশা দরজায় পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখল ।ও কাঁদছে।
দিহান শিপনকে বলল, তাড়াতাড়ি আসিস তোরা। আমি টেনশনে থাকব।
----ঠিক আছে বলে ও বেরিয়ে এল। গাড়িতে উঠতেই শিপনের দৃষ্টি  গেল নাতাশার পোশাকে।ও বলল, এই স্কার্টের চেয়ে লং কামিজ লং গাউনে তোকে মানায় বেশি।আর যদি শাড়ি পরিস  তাহলে চোখ ফেরাতে পারব না। আমার জন্য তোকে পোশাক আশাকে একটু চেঞ্জ আনতে হবে। নাতাশা বলল,আনব শিপন ভাইয়া। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি।
----- শিপন গাড়ি ড্রাইভ করছে। ওর মন ভালো নেই।ও বলল,আজ তোকে নিয়ে অনেক প্লান করেছি। প্রথমে কিছু কেনাকাটা করব, রেস্টুরেন্টে খাব, পার্টিতে যাব । শেষে সোজা বাসায় ফিরব। নাতাশা বলল, তিন নম্বর বাদ দাও। তারচেয়ে বরং আমরা কোন পার্কে যেতে পারি । রাতে সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব নয়।কি বলো ভাইয়া ? শিপন কপট রাগ দেখায় বলে, তুই কি সারাজীবন আমাকে ভাইয়া,ভাইয়াই করে কাটাবি ?
----- রাগ নাতাশা ও কম দেখাই না,বলে আর তুমি যে আমাকে সারাক্ষণ তুই তোয়াক্কারি করে যাচ্ছ? সেটার কি হবে ? 
শিপন বলল,সরিরে । পুরনো অভ্যাস।কি করব বলো ? হয়ে যায়। আচ্ছা ঠিক আছে । আমাদের যেদিন বাসর রাত হবে সেই মূহুর্ত থেকে আমি তোকে তুমি করে বলব। এখন হ‍্যাপী ? নাতাশা শিপনের কাঁধে মাথা রেখে বলল, হুম ভীষণ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা একটা শপিং মলে ঢুকল।
----- শিপন নাতাশাকে একটা  স্টোনের ব্রেসলেট , স্টোনের নেকলেস সহ কানের দুল কিনে দিল। ব্লু   কালার নাতাশা চয়েস করেছে।
ও আর কিছুই নিতে চাইনি। ও শিপনের জন্য ঢাউসের একটা অফ হোয়াইট  এ‍্যান্ডি সিল্কের এ‍্যাম্বোডারি করা পাঞ্জাবি ট্রাওজারস কিনল।
---- শিপন বলল,এই তুই আমাকে পাঞ্জাবি দিয়েছিস।কি যেন বাদ থেকে গেল।ও.. আমি তোকে একটা শাড়ি দিই । তাহলে ম‍্যাচ করবে দু'জনকেই বেশ। নাতাশা বলল, হয়েছে আর ম‍্যাচিং করতে হবেনা। তোমার বাংলাদেশে যেয়ে কিনব ,ওকে.. ।
শিপন বলল,যথা আজ্ঞা মহারাণী সাহেবা।
---- ওরা একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে এসে বসল। বেয়ারা এসে অর্ডার নিয়ে গেল। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই খাবার সার্ভ করলো টেবিলে। ফালুদা, পিৎজা, চিকেন ফ্রাই,বাদামি সসের সঙ্গে ভাজা গলদা চিংড়ি সবশেষে কফি।
----খেতে খেতে শিপন বলল,রাত হয়ে গেছে। এগুলো শেষ করে নৈশভোজের মেন‍্যুর পুনরাবৃত্তি করব আমি।চল আমরা কোন বাঙালি রেস্তোরাঁয় রাইস খাব। এটা হবে আমার পছন্দের মেন‍্যু।
--- নাতাশা বলল, ইম্পসিবল ? এত খাওয়া যায় নাকি? আর একদিন হবে। এখন ওঠো। শিপন বলল,এত তাড়া কিসের?  নাস্তা শেষ কর। ডিনার সেরে যেতে চেয়েছিলাম।
--- নাতাশা বলল, তুমি আমাকে আর লজ্জা দিওনা। আমি আর খেতে পারব না।অন‍্য একদিন এসে তোমার বাঙালি রেস্তোরাঁয় ডাল,ভাত,মাছ খাব।
---- শিপন বলল,ওকে ম‍্যাম। ফিসফিস করে ও বলল,এই নাতাশা....
নাতাশার দৃষ্টি স্থির।একই রকম স্থির চোখে তাকিয়ে আছে শিপনের দিকে। শিপন ওর হাত চেপে ধরে বলল,কি হয়েছে সোনা ? অমন করে কি দেখছ? নাতাশা বলল, তোমাকে দেখছি । শিপন আশাঙ্কিত চোখে তাকাল ,---- জরুরি কিছু দেখছ ? এই মূহুর্তে তোমার চোখে ঘোর লাগা দৃষ্টি নাতাশা ।
--- নাতাশা সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে বলল,রাত হয়েছে চলো ।
শিপন মনে মনে খুশি হল নাতাশার একটু বেশিই মন ভালো দেখে ।

-----একমাস পর      শিপন নাতাশাকে সহ  বাংলাদেশে এসেছে । নাতাশাই থাকতে চাইনি। আসার আগে ওরা গোপনে বিয়ে করেছে।পরে বিষয়টি আর গোপন থাকেনি, জানাজানি হয়ে গেছে। শিপন ডঃ জিসি চ‍্যাটার্জীর ক্লিনিকে জয়েন করল। নতুন পরিবেশ, নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডঃ চ‍্যাটার্জীর অমায়িক ব‍্যবহার , সহকর্মীদের বন্ধু সুলভ আচরণ সহ ফুপ্পি ডঃ ফৌজিয়া খানমের আন্তরিকতা সব কিছু মিলিয়ে শিপন বেশ ভালোই আছে । মিরপুর নানুর বাসা থেকে অফিস করছে। ক্লিনিকের লাগোয়া কোয়ার্টার অফার করেছিল ,ও রাজি হয়নি।মাম্মীর কাছাকাছি থাকতে চেয়েছে।
----- শিপন ক্লিনিকের করিডোরে হেঁটে যাচ্ছিল, আচমকা ই ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটা মেয়ে হাত ইশারা করল ।সে এগিয়ে এসে বলল, এক্সিউজ মিঃ আর ইউ  শিপন খান ? বাঁক ঘুরে থমকে দাঁড়ালো শিপন।বলল, ইয়েস ম‍্যাম।অ‍্যাই এ‍্যাম এ শিপন খান । এন্ড ইউ ? মেয়েটি বলল, অ‍্যাই এ‍্যাম এ‍্যা অ‍্যামিশা খান মুমু।
-------- মুমু বলল, প্লিজ .... হেল্প মি! ডঃ শিপন , আমরা গত সপ্তাহে অ‍্যামেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছি।
আমার বাপী খুব অসুস্থ । তিন দিন আগে এই ক্লিনিকে বাপীকে  ভর্তি করেছি । প্লিজ! তুমি যদি উনাকে স্পেশাল ভাবে দেখার  দায়িত্ব নিতে,তাহলে আমি নিশ্চিত হতে পারতাম।
---- ম‍্যাম , আমাকে দেখতে হবে কেন ? কথাটা ক্ষীণ কন্ঠে বলল, শিপন। আমি এখনো শিখছি। আপনার বাপীকে নিয়ে একদম ভাববেন না।
-----------এখানে অনেক বড় বড় ডঃ আছেন। সব কিছু উনাদের উপর ছেড়ে দিন।
------ মুমু হেসে বলল,সব কাজ সবাইকে দিয়ে করানো যায় বলো ? তুমি কানাডা ফেরত ডঃ। তোমার ওপর আমার ভরসা অনেক খানি বেশি।
------ ঠোঁট টিপে হেসে শিপন বলে, হঠাৎ আমার ওপর এত আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল কেন ?জানতে পারি ? আর ও অনেক ডঃ আছেন।
----- উত্তর দিতে যেয়ে মুমু মনে মনে খুশি হল ।সে বলল,তোমাকে প্রথম দর্শনেই খুব আপনজন বলে মনে হয়েছে। রক্তের সম্পর্ক সব সময় খুব কাছে টানে।
------তুমি আমার বাবাকে দেখলেই বুঝতে পারবে। উনি তোমাকে কেমন চুম্বকের মত কাছে টানবে।
------ শিপন চোখ নাচাল ।
এস্ট্রেন্জ!তাহলে দেখতেই হয় আপনার বাবাকে। আমার বাবা নেই ।তাই বাবা কেমন হয় জানিনা।মুমু উচ্ছ্বাসিত হয়,বলে বেশ তো ? তুমি আমার বাবাকে বাবা বলে ডেকো ।
আমি বাবার ভাগ দিচ্ছি তোমাকে।
----কি ডাকবে ? চমকে উঠল শিপন ।সত‍্যি বলছেন? পরে শূন্যতা অনুভব করবেন না তো ?
সঙ্গে সঙ্গে শিপন বুঝতে পারে তার এই প্রাপ্তিতে কি আনন্দের মাত্রার চেয়ে একটু বা মন খারাপের দেখা পেল সে ?
ও বলল, চলুন আপনার বাপীকে দেখে আসি ।
----- শিপন আকস্মিক ভাবে মুমুর বাপীর বেডে এসে উনার মুখ দেখে থমথমে হয়ে গেছে।
-----অনেকটা চিমটি কাটার মত ব‍্যাপার। যেন কোন দর্পণে নিজের ছবি দেখে চমকে উঠল শিপন।
কে এই লোকটি? অবিকল আমার মত দেখতে? ডঃ ফৌজিয়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
উনি বললেন,দেখতো চিনতে পারিস কিনা?
---- সায়ান খানের দু'চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে। এই লোকটিকে দেখলে শিপনের কেমন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কেন?
শিপন লোকটিকে যতই দেখে ততই অদ্ভুত এক অতৃপ্তির ঘোরে তলিয়ে যেতে থাকে।
এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় শিপন ঘরে ফেরে।
----- আজ ও বিষন্ন মনে মাম্মীকে জড়িয়ে ধরে বলল,একটা সত‍্য কথা বলবে আমার বাপী কোথায় ? বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে ? বলো মাম্মী ...
ছেলের কথায় চমকে ওঠে নিশাত। বলে, কেনরে মায়ের ভালবাসায় ঘাটতি পড়েছে নাকি?

-----শিপন বলে ,মাম্মী  ক্লিনিকে এক বাবাকে দেখে এসেছি।হুবহু আমার প্রতিচ্ছবি।
আর উনার মেয়ে মুমু বাবার ভাগ দিয়েছেন আমাকে ?
--- মুমু নাম শুনেই নিশাত রিঅ‍্যাক্ট করে উঠল।কি মুমু ? নিশাত হোঁচট খেল সামান্য।মুমু কে দেখাবি ?
কত বড় হয়েছে? কেমন হয়েছে ?ও তোকে চেনে ?
মূহুর্তে ধরা পড়ে গেল নিশাত ছেলের কাছে ।মাম্মী মুমু কে তুমি চেনো? কে এই মুমু ?
আমাকে বলো?
--- নিশাত বলে, শিপন আমাদের হাতে একদম সময় নেই তোর বাপ্পাকে তোকেই বাঁচাতে হবে।আমাকে তুই ক্লিনিকে নিয়ে চল। শিপন বলে,মাম্মী রাত তিনটা বাজে।আগে সকাল হোক।আমরা সকালে ই যাব।
----- রাত সাড়ে তিনটায় একটা ফোন আসল মুমুর , শিপন তুই মাম্মীকে নিয়ে আয়। বাপীর সেন্স নেই।মুমু কাঁদছে।
------ জেগে থেকে কেটে গেল রাত । ভোর পাঁচটায় শিপন মাম্মী আর নাতাশাকে নিয়ে ক্লিনিকে আসল। মুমু ভীষণ কাঁদছে।
-----সায়ানকে একটা সাদা বেডশিট দিয়ে ঢেকে রেখেছে। শুধু মুখ খোলা আছে। নিশাত দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক মূহুর্ত।  হঠাৎ  দৌড়ে এসে স্বামীর বুকে পড়ে কাঁদতে লাগল।
পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ডঃ ফৌজিয়া।
নিমিষেই সায়ান খানের সেন্স ফিরে এল।সে চোখ খুলে তাকাল। একবার উচ্চারণ করল,নিশু,নিশু তুমি এসেছ ?
তুমি আসতে এত দেরি করলে কেন?
নিশাত বলল,হা সায়ান আমি এসেছি। তোমার কিছু হয়নি। তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না।সায়ান খানের দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

----- মুমু মাম্মীর  বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।মাম্মী মাম্মী বাপীর অনেক কষ্ট! তুমি এতদিন কেন দূরে সরে থাকলে ? আমার বাপী  মরে যাচ্ছে ? নিশাত বলল, অনেক দেরি হয়ে গেছে ।মুমু তুই কাঁদ , কেঁদে নিজেকে হালকা কর। তোর বাপী ভালো হয়ে যাবে।মুমু কি ভীষণ কাঁদছে।
------ডঃ ফৌজিয়া ভাবিকে অন‍্য পাশে সরিয়ে নিয়ে বলল, তুমি বড্ড রোগা হয়ে গেছ। মেয়েটা তোমার ও কষ্ট পাচ্ছে? ওকে সামলাও। হাতে সময় নেই। সায়ানকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব। আমরা পিঠাপিঠি ভাই-বোন। সায়ান আমার এক বছরের বড়।ওর কিছু হয়ে গেলে আমার সবচেয়ে বেশি লাগবে। 
--- সায়ানের একটা কিডনি ড‍্যামেজ হয়ে গেছে।ওটা অপারেশন করে সরানো জরুরী।  
---- ওকে শ্রীঘ্রই অপারেশন থিয়েটারে নিতে হবে। 
----- কয়েক জন ডাক্তার মিলে বোর্ড বসিয়েছেন।
 শিপন ডঃ চ‍্যাটার্জীকে বলল,স‍্যার আমি বাপ্পীকে একটি কিডনি দিব। আপনারা ব‍্যবস্থা করুন। নিশাত বলল, না আমি দিব। ডঃ চ‍্যাটার্জী ওর কথা শুনবেন না। আমি এখনো বেঁচে আছি।
------ সায়ানকে অপারেশন থিয়েটারে আনা হয়েছে। কিডনি পরীক্ষা শেষে নিশাতের কিডনি ম‍্যাচ করেছে ।
অপারেশন চলছে। শিপনের সাথে কয়েক জন ডঃ আছেন।
-------- সবাইকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ‍্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।প্রায় আট ঘণ্টা সময় লেগে গেল। শিপন অটি থেকে বের হয়ে বলল, অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। বাকীটা আল্লাহ্ ভরসা।আটচল্লিশ ঘন্টা  না গেলে কিছু বলা যাবে না।
সবাই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে সময় পার করছে।
------ দু'দিন কেটে গেল।এখনো সেন্স ফেরেনি।
নিশাতের সেই চিঠির কথা মনে পড়ল।কি লিখেছিল সায়ান চিঠিতে ..।
যা আজও পড়া হয়নি।
----- নিজেও খুব অসুস্থ,বেডে শুয়ে আছে নিশাত।
ও পার্স থেকে চিঠিটা বের করে ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল ------------

প্রিয় নিশু ,

তোমাকে আমি সুখী করতে পারলাম না। আমার ওপর আর অভিমান করে থেকো না। আমাকে ক্ষমা করো।
আমার কিছু বন্ধুরা বলেছিল, তুমি আবার সংসার করছ। তোমার দ্বিতীয় ঘরে একটা ছেলে হয়েছে।ভালোই করেছ। আমি পারিনি। তোমার ওপর কোন অভিযোগ নেই। তুমি সুখী হলেই আমার সুখ।
তোমার অনেক জীদ। আমার ও কম নয়।এই জীদ আমাদের দু'টি জীবনকে ধ্বংস করে দিল।
---- আমি তোমাকে একটা দুঃসংবাদ দেব। আমার দু'টো কিডনি ড‍্যামেজ হয়ে গেছে। ডাঃ আমার বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। আমি হাসপাতাল থেকে তোমাকে এই চিঠি লিখেছি। হয়তো শেষ বারের মত আমাদের আর দেখা হবে না। আমি আশাও করি না। তুমি এখন অন‍্যের স্ত্রী। আমি বড় একা ।
------- আমি স্বীকার করি তোমার উপর অন‍্যায় করেছি। মেয়েটাকে নিয়ে এসে। কিন্তু এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না।মুমু ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
----- আমার এখন শেষ মূহুর্ত। আমার মেয়েটা ভীষণ একা হয়ে পড়বে।মা হিসেবে তুমি ওর পাশে থেকো। এটুকু আমার দাবি।
আমি একজন ডাক সাইডে ইঞ্জিনিয়ার। দাপটের সঙ্গে চলেছি।অথচ সংসার লাইফে আমি ব‍্যর্থ ।
---- আমার একটা কষ্ট আছে।মুমু আমাকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করেছে। আমি ছেলেটাকে মেনে নিতে পারিনি। ওকে আমি দু'টো শর্ত দিয়েছিলাম।
ভালবেসে বিয়ে করবে না। আর কোন বিদেশী ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে না।ও শর্ত ভঙ্গ করে বিয়ে করেছে। খুব অভিমান হয়েছিল সেদিন আমার।
ওর সঙ্গে এক সপ্তাহ কথা বলিনি।
------ একটু বিরতী দিল নিশাত। চোখের জলে ওর বুক ভেসে যাচ্ছে।
আবার পড়তে শুরু করল । তোমার দ্বিতীয় সংসারের কথা ভাবলেই আমি পাগল হয়ে যায়,এ কথা সত‍্য। আর তাই দেশে ফেরা হল না। সংসার, স্বামী, সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই আছ।হায় সৃষ্টিকর্তা! বেঁচে থাকতে আমাকে এও দেখতে হল।
------ নিশাত চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, না তুমি যা জেনেছ সব মিথ্যা। আমি জন্ম জন্মান্তরে শুধু তোমার নিশু হয়ে বেঁচে থাকব। আকাশ, নক্ষত্র খন্ড বিখন্ড হয়ে যেতে পারে  -- 
তবুও জেনো আমি শুধুই তোমার।
নিশাত পড়তে থাকে ,
গুড বাই প্রিয় বাংলাদেশ ,
তোমার সায়ান।
" ইউ এভার গ্রো ইন আওয়ার হার্টস "!

------- আটচল্লিশ ঘন্টা পার হয়ে গেছে  সবাই    সায়ানের গভীর ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করছে ।
হয়তো সায়ান জেগে উঠবে , হয়তো না .....

 

-------- সমাপ্ত

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK