মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮
Friday, 09 Nov, 2018 12:46:37 pm
No icon No icon No icon

বুড়িগঙ্গা রিভার ডেভলোপমেন্ট এন্ড এন্টারটেইনমেন্ট মেগা প্রজেক্ট-(১)


বুড়িগঙ্গা রিভার ডেভলোপমেন্ট এন্ড এন্টারটেইনমেন্ট মেগা প্রজেক্ট-(১)


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: প্রাচীন ঢাকা নগরীর পত্তন হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে। দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর হচ্ছে ঢাকার সদরঘাট। তাই জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সংস্কারের মাধ্যমে একে হাতিরঝিলের মত একটি মনোরম বিনোদন কেন্দ্রস্থল বানাতে হবে। এজন্য খ্যাতনাম দেশী-বিদেশী বেসামরিক ও সামরিক স্থাপত্যবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ার, ইন্টোরিয়ালদের সমন্বয়ে তা করা সম্ভব। এক সময় বুড়িগঙ্গার পানি স্বচ্ছ ছিল। ফলে এতে প্রচুর শুশুক (এক প্রকার ছোট প্রজাতির কালো সীল মাছ বিশেষ) এবং গাঙচিল(মাছ শিকারী পাখি) দেখা যেতো। নানা প্রজাতির মাছ ছিল। নদীর দুই তীর ছিল প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত। বুড়িগঙ্গার সেই মনোরম নৈঃস্বর্গিক সৌন্দর্য আর নেই। ঢাকা শহরের পয়ঃনিষ্কাষনের সকল প্রধান নালা বুড়িগঙ্গা নদীমুখে সংযোগ করায় বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ টন ময়লা-আবর্জনা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ছে এবং হাজারীবাগের চামড়ার ট্যানারীগুলোর রাসায়নিক তরল বজ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গার পানির সাথে মিশ্রিত হয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। ফলে বুড়িগঙ্গা নদী কালো ঘন ময়লা, তরল রাসায়নিক দূষিত পানিতে পরিণত হয়েছে এবং অক্সিজেনের অভাবে বুড়িগঙ্গার সব শুশুক ও মাছ মরে গেছে/অন্যত্র চলে গিয়েছে। গাংচিলও আর তেমন দেখা যায় না। নদী তীরের দুইপাশে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদার ব্যবসায়ী ও দালালদের অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা, মালামাল/দ্রব্য, সামগ্রীর কারণে বুড়িগঙ্গা নদী এখন অতি সংকীর্ণ আকার ধারন করেছে। এই সমস্ত কারণে বুড়িগঙ্গা এখন এক মৃত প্রায় নদীতে পরিণত হতে চলেছে। কিন্তু তারপরও মেঘলা দিনের, শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতিতে, অঝোড় বৃষ্টিতে, চকচকে রোদের আলোক ছ্বটায় বুড়িগঙ্গা নদী একেক সময় একেক অপরূপ ধারন করে মানুষকে মোহিত করে।

এক সময় বিআইডব্লিউটিসির নৌবহরে ৮টি প্যাডেল চাকায় চালিত প্রাচীন স্টিমার ছিল এবং এগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী/প্রামাণ্য নিদর্শন। তার মধ্যে ১৯২৮-১৯৫০-এর মধ্যে নির্মিত গাজী, কিউই ও লামা নামের ৩টি দর্শনীয় স্টিমার ১৯৯৭-৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জ বন্দরের সোনাচরা ডকইয়ার্ডে এক রহস্যময় অগ্নিকান্ডে ধবংস হয়ে যায়।
এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা নিয়ে কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হয়েছিল বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, ৩টি স্টিমার মেরামত করা নিয়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম হলে তার প্রমাণ চিহ্ন মুছে ফেলার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়। বর্তমানে অবশিষ্ট ৫টি মাহমুদ ও অস্ট্রিন (১৯২৯), লেপচা(১৯৩৮), টার্ন(১৯৫০), সেলা(১৯৫১)-এ নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায় এবং এগুলো ঢাকা-খুলনা নৌপথে চলছে। ভবিষ্যতে অনুরূপ বিপদ, ষড়যন্ত্র ও ধবংসের হাত থেকে অবশিষ্ট ৫টি প্রাচীন ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমারকে রক্ষা করার স্বার্থে ক/অবিলম্বে/এখনই এগুলোকে পাবলিক স্টিমার সার্ভিস থেকে অব্যাহতি দেয়া, খ/এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা সীপ ইয়ার্ডের কাছে হস্তান্তর করে দেয়া এবং গ/শুধুমাত্র বিনোদন/পর্যটন নৌযান হিসেবে এগুলো ব্যবহার করার/সার্ভিস দেবার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত। এক্ষেত্রে সাপ্তাহিক সরকারী ছুটির দিনে ঢাকা টু মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা টু নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা টু চাঁদপুর রুটে বুড়িগঙ্গা ট্রাভেল প্যাকেজ ট্যুর সার্ভিস চালু করা যেতে পারে।

ব্রিটিশ যুগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অভিজাতরা তাদের নিজস্ব বজরায় করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘুরে বেড়াতো, বনভোজনে যেত, অন্য স্থানে গিয়ে পাখি/ হরিন/বণ্য শুকর শিকার করত, বাইজী দল নিয়ে প্রমোদ বিহার করত, বিভিন্ন জায়গা থেকে ঢাকায় বেড়াতে আসত।(বজরা একপ্রকার কাঠের তৈরী বড় আকারের নৌকা জাহাজ বিশেষ)। এটি মূলত দ্বিতল হত। এতে থাকার একাধিক রুম জানালাসহ, বাথরুমের ব্যবস্থা, খাবার রাখার স্টর রুম, রান্নাঘর থাকত। রুমে বিছানা, বসার সোফা, ড্র‍য়ার/আলমারী থাকত। ভেতরে বাইজী নাচের ব্যবস্থা করা হোত। বজরার ছাদে চেয়ার নিয়ে/মাদুর পেতে বসার ব্যবস্থা থাকত। ভাল অভিজ্ঞ খানদানী মাঝি-মাল্লারা বজরা চালাত এবং এর ভেতর নিচের পাটাতনের অংশে নির্মিত ঘরগুলোতে তারা থাকত। বজরার বিভিন্ন ছবি ও কাঠের তৈরি মডেল আমরা এখন কেবল যাদুঘরে দেখতে পাই। বিনোদন ও পর্যটন শিল্পের নতুনত্বের জন্য বিলুপ্ত বজরা নৌকার কয়েকটি সুন্দর মডেল বাছাই করে তার আলোকে অন্তত ২টি কাঠের বজরা তৈরি করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসানো যেতে পারে বিনোদন ও পর্যটন শিল্পের জন্য। এতে আরামে, আনন্দের সাথে থাকা, খাওয়া, বিনোদনের সব আধুনিক ব্যবস্থা, সুযোগসুবিধা রাখা হবে। এটাচ বাথরুম এসি/নন এসি কেবিন, টিভি/ছবি দেখার ব্যবসা, ওয়াইফাই সুবিধা, ক্যান্টিন, লাইফ টিউব ও জ্যাকেট, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা থাকবে। এগুলোতে ৩দিন-২রাত থাকা-খাওয়ার/বনভোজনের প্যাকেজ প্রোগ্রাম থাকবে।

এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে/ধারে নদীর উপর ঢাকা ক্যান্টরমেন্টের ত্রিবেনীর মত একটা সুন্দর অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিকমানের ডুপ্লেক্স ক্যান্টিন এন্ড মিনি কনভেনশান হল নির্মাণ করলে বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য ও আকর্ষন অনেক বাড়ত। 
তাছাড়া বুড়িগঙ্গা নদীতে রাত কাটাতে, থাকতে, এর চারধারের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করার জন্য বুড়িগঙ্গায় সেনা নিয়ন্ত্রিত একটি মাঝারি আকারের বিলাসবহুল প্রমোদতরী/সী ক্রজার নামানো যেতে পারে। এতে আবাসিকভাবে থাকার এটাচ বাথরুমযুক্ত এসি/নন এসি রুম/কেবিন, ওয়াইফাই সুবিধা, টিভি/ছবি দেখার ব্যবস্থা, ক্যান্টিন, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, সুইমিংপুল, ব্যাটমিন্টন কোড, বিলিয়ার্ড রুম, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, লাইফ টিউব, জ্যাকেট, বোট, সার্বক্ষণিকভাবে একজন এমবিবিএস ডাক্তার ও ফাস্ট এইড থাকবে। এতে হেলিপ্যাড সুবিধা থাকলে আরো ভাল হয়। এটি কেবল বুড়িগঙ্গা নদীতেই চলাচল করবে।
বুড়িগঙ্গায় ক্ষুদ্র ট্রাভেল সী-বোটের মাধ্যমে আহসান মঞ্জিল, রূপলাল হাউজ, লালকুঠি স্থাপত্য নিদর্শনগুলো পরিদর্শনের পেকেজ ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রতি বছর ১৪ই জানুয়ারী সাকরাইনে ঘুড়ি উৎসবের দিনে এবং ১লা বৈশাখ বর্ষ বরণের দিনে বুড়িগঙ্গা নদীতে ও নদীর তীরে সাতার, নৌকা বাইছ, নৌকা চালনার প্রতিযোগীতা, কুস্তি, বায়োস্কপ, নাগরদোলা, মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এসব বিশেষ দিনে পুরানো স্টিমার, বজরা, ক্রজার, সী-বোটগুলো বিশেষভাবে সাজানো হবে এবং বিশেষ আয়োজন করা হবে।
যেকোন একটি পুরানো প্যাডেল চালিত স্টিমারকে বুড়িগঙ্গা রিভার হিস্টোরী মিউজিয়াম বোট বানানো যেতে পারে। এর ভেতর বুড়িগঙ্গা নদীর পরিপূর্ণ ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে সাদা ও রঙ্গিণ ছবি ও চিত্রসহ সংক্ষিপ্ত আকারে মনোরম ভঙ্গীমায় বাংলা বিবরণ ও ইংরেজি অনুবাদ সহকারে তুলে ধরা হবে।

প্রভৃতি উদ্যেগ বাস্তবায়ন করা হলে/বাস্তবায়িত হলে সাধারণ দর্শনার্থী, দেশি/বিদেশি পর্যটকরা নিরাপদে, আরামে সারাদিন/একাধিক দিনের প্যাকেজে বুড়িগঙ্গা নদীতে স্টিমার, বজরা, ক্রজারে থাকতে, ঘুরতে পারবে। নৌবিহারের মাধ্যমে বিনোদন, আনন্দ, মজা করতে পারবে। রাত, সকাল, দুপুর, বিকাল বেলায় বুড়িগঙ্গা নদীর ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির নৈঃস্বর্গিক দৃশ্য ও সৌন্দর্যকে অবলোকন এবং উপভোগ করতে পারবে। এর সাথে/পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। চলবে-(পরবর্তী ২য় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ রইল)। 

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
যোগাযোগ: [email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK