বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
Friday, 02 Nov, 2018 12:59:10 am
No icon No icon No icon

আল্লার মাইর, দুনিয়ার বাইর


আল্লার মাইর, দুনিয়ার বাইর
প্রভাষ আমিন : আমার সহকর্মী গনী আদম পেশায় সাংবাদিক, স্বভাবে কবি। তার কবিতার বইও আছে বাজারে। ব্যারিস্টার মইনুলের গ্রেপ্তারের পরদিন আদালতে হাজির করার ছবি দেখে তিনি বললেন, এটা পোয়েটিক জাস্টিস। তিনি আবার এর অনুবাদও করে দিলেন, সুশীল অনুবাদ হলো, প্রকৃতির বিচার। আর খাস বাংলা হলো আল্লার মাইর, দুনিয়ার বাইর। আসলেই এক-এগারোর সরকারের সময় এই মইনুলের আমলে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ অনেক রাজনীতিবিদকে এভাবে আদালতে নেয়া হয়েছে। আর ব্যারিস্টার মইনুল তখন দাঁত কেলিয়ে হেসেছেন আর সবাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। টিভির লাইভ টক শোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলার ঘটনায় দায়ের করা মানহানির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা ঠিক মানহানির মামলা সরাসরি গ্রেপ্তারের মতো গুরুতর মামলা নয় এবং এটি জামিনযোগ্য। একজন নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে গ্রেপ্তারের মামলাটা হওয়া উচিত ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। যদিও গ্রেপ্তারের পর সেটি হয়েছে।
 
তবে আমার ধারণা, মইনুলকে দ্রুত গ্রেপ্তারের পেছনে সেদিনের টক শোর দায় যতটা, তার চেয়ে বেশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। যদিও গ্রেপ্তারে আগে তার পক্ষে ড. কামাল হোসেন বিবৃতি না দেয়ায় তিনি ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। বিপদে পড়ে নিজের গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে তো পাশে পানইনি, পাননি বিএনপিকেও। ফাঁস হওয়া এক টেলিফোন কথোপকথনে ব্যারিস্টার মইনুল বলেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ধ্বংস করতেই তিনি ড. কামালকে সামনে এনেছেন। এরপর বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিএনপিও তার গ্রেপ্তারে খুশিই হয়েছে।
 
২৪ অক্টোবর সিলেটে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম সমাবেশে ব্যারিস্টার মইনুল ছিলেন এক ভুলে যাওয়া নাম। মুক্তি দাবি তো দূরের কথা, কেউ তার নামও উচ্চারণ করেনি। ব্যারিস্টার মইনুলকে এখন দেশের নারীসমাজ ঘৃণা করে, আওয়ামী লীগ অপছন্দ করে, বিএনপি অপছন্দ করে, কাওয়ার্ড বলার পর নিশ্চয়ই ড. কামালও তাকে পছন্দ করবেন না। আহা রে বেচারা। তবে আমি গনী আদমের সাথে একমত। নিছক মুখ ফসকে একজন নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলার কারণেই শেষ বয়সে ব্যারিস্টার মইনুলককে কাঁটা চামচে বিদেশি খাবারের বদলে জেলের ভাত খেতে হচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। আসলে তার সারা জীবনের পুঞ্জীভ‚ত পাপের ফল, পোয়েটিক জাস্টিস।
 
ব্যারিস্টার মইনুলের একাত্তরের ভ‚মিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, আজ ব্যারিস্টার মইনুল সরকারবিরোধী বলে তার নামে অপরাধ বানানো হচ্ছে। শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে তুলে নেয়ার ঘটনায় ব্যারিস্টার মইনুলের ভ‚মিকা সন্দেহজনক। এই তথ্য সিরাজউদ্দিন হোসেন স্মারকগ্রন্থে আছে। তারপরও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথম সংসদে সদস্য হয়েছিলেন। তার মতো একজন নোংরা মানুষকে কেন আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছিল, সেটা আমার অনেক দিনের কৌত‚হল। তবে ব্যারিস্টার মইনুলের মনোনয়ন-রহস্য শুনলাম কদিন আগে। ব্যারিস্টার মইনুলের মা বঙ্গবন্ধুকে ছেলের মনোনয়নের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কৃতজ্ঞ ও উদার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মানিক মিয়ার স্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
 
১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ৭৫ সালেই বাকশাল করার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল। তখন অনেকেই তার সাহসের তারিফ করেছিল। কিন্তু নিজের আসল চেহারা দেখাতে একদম সময় নেননি এই ব্যারিস্টার। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর তিনি বনে যান খন্দকার মুশতাকের ঘনিষ্ঠ সহচরে। এই সেদিনও তিনি বলেছেন, ৭৫-এর ১৫ আগস্টে নাকি রাস্তায় বেরিয়ে তিনি স্বস্তির ভাব দেখেছিলেন। ইত্তেফাক নিয়ে আপন ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাথে তার দ্ব›দ্ব অনেক পুরনো। এ নিয়ে ইত্তেফাক ভবনে লাশ পড়েছে। তখনই খুনের দায়ে জেলে যেতে পারতেন ব্যারিস্টার মইনুল।
 
মাসুদা ভাট্টিকে লাইভ অনুষ্ঠানে গালি দিয়েছেন বলে সবাই সেটা শুনেছে। কিন্তু গালাগালির অভ্যাস তার পুরনো।  আপন ভাইকে তিনি গালি দেন ‘জারজ’ বলে। এই গালিতে কার অপমান হয়, সেটা বোঝার মতো জ্ঞান মইনুলের আছে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ব্যারিস্টার মইনুল বিলাত থেকে খালি বিলাতি খাওয়া শিখেছেন; অ্যাটিকেট, ম্যানার, কথা বলা শেখেননি।
 
 
 
তবে ব্যারিস্টার মইনুলের পাপের ভান্ডার পূর্ণ হয়েছে এক-এগারো সরকারের সময়। ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মানসপুত্র’ বারিস্টার মইনুল মাঠে নেমেছিলেন দেশ থেকে রাজনীতি, গণতন্ত্র দূর করার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। দুই নেত্রীকে মাইনাস করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন মইনুলরা। খালেদা জিয়া আজ যে মামলায় কারাভোগ করছেন, সেটি কিন্তু ব্যারিস্টার মইনুলদের আমলেই করা। এখন তিনি বিএনপির উদ্ধারকর্তা সেজেছেন!
 
এক-এগারোর সময় সবচেয়ে সরব ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল। প্রায় প্রতিদিনই তিনি জাতিকে সবক দিতেন। অবাক হয়ে তার চোটপাট দেখতাম। ভাবতাম, নিশ্চয়ই একদিন এই ব্যারিস্টারকে লোকজন জবাব দেবে, প্রকাশ্যে ঘৃণা করবে। কিন্তু হায়, সেই ব্যারিস্টার এই দেশে আবার বড় বড় কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। বিরাজনীতিকরণের কুশীলবের কণ্ঠে এখন গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না। ব্যারিস্টার মইনুলকে দেখলে বুঝি আমাদের স্মৃতি কত স্বল্পস্থায়ী, আমরা অবলীলায় কত কিছু ভুলে যাই।
 
এক-এগারোর পর দীর্ঘ শীতনিদ্রায় ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল। হঠাৎ গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশে ব্যারিস্টার মইনুলকে দেখে শঙ্কিত হই। এক-এগারোর কুশীলবরা আবার তাহলে মাঠে নেমেছে। এমনিতে সরকারের বিরুদ্ধে বি. চৌধুরী আর ড. কামালের বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা লক্ষ করছিলাম কৌত‚হল নিয়ে। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের ঐক্য গড়ার চেষ্টা অস্বাভাবিকও নয়, নতুনও নয়। আমি তাদের উদ্যোগকে বরাবরই স্বাগত জানিয়েছি। কিন্তু এই উদ্যোগে ব্যারিস্টার মইনুলের উপস্থিতি আমার কাছে এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনা মনে হয়েছে। এখন দেখছি ঐক্য প্রক্রিয়ায় ব্যারিস্টার মইনুল এক ফোঁটা চনা নন, মনে হচ্ছে পুরো পাত্র চনায় ভর্তি করতেই মাঠে নেমেছেন তিনি।
 
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি রাজনৈতিক জোট। কিন্তু রহস্যজনক দুই অরাজনৈতিক ব্যক্তি এই ঐক্যের মূল ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছেন। একজন আত্মস্বীকৃত অসুস্থ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। অপরজন এই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এই জোটে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নেই। কিন্তু যে কৌশলে বি. চৌধুরীকে ঐক্যফ্রন্টের বাইরে রাখা হলো, তাতে বোঝা যাচ্ছে জামায়াতের স্বার্থটা ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারছেন ব্যারিস্টার মইনুল। তার জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অসংখ্য উদাহরণ ইউটিউবে আছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্মেলনে গিয়ে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন। সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক মাসুদা ভাট্টি এই প্রশ্নটাই করেছিলেন তাকে। জবাবে তিনি বলতে পারতেন, জামায়াতের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু তিনি তা না করে মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে গাল দিয়ে দেন। আমরা জানি, কারো যখন যুক্তি ফুরিয়ে যায়, তখনই তিনি গালি দেন। যিনি ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে গিয়ে বক্তৃতা দেন, তাকে জামায়াতের প্রতিনিধি মনে করাটা অন্যায় নয়।
 
ব্যারিস্টার মইনুল সারা জীবন মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু কাজ করেছেন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। গণতন্ত্র মানে মানুষের মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা, নারীদের সম্মান দেয়া, ভিন্নমতকে ধারণ করা, সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেয়া। গণতন্ত্র মানে হলো- তোমার সাথে আমার ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমি শেষ পর্যন্ত লড়ব। কিন্তু ভিন্নমত সম্পর্কে যেন ধারণাটাই ব্যারিস্টার মইনুলের নেই। গণতন্ত্র মানে প্রশ্নের জবাব দেয়া, যুক্তির জবাবে যুক্তি দেয়া; গালি দেয়া নয়।
 
লেখক: প্রভাষ আমিন, বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।
এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK