সোমবার, ১২ নভেম্বর ২০১৮
Friday, 19 Oct, 2018 11:22:06 am
No icon No icon No icon

কাগজের বউ


কাগজের বউ


হাসনা হেনা রানু: কমলা রঙের বিকেলটা বেশ ভালই লাগছে অরণ্যর কাছে। দীর্ঘ ৫ বছর পর ও দেশে ফিরেছে।  অরণ্যর পরিবার সিঙ্গাপুর থাকে। ওর বাবা সিঙ্গাপুরে সেটেল্ড হয়েছেন, তাঁর আর দেশে ফেরা হয়নি। সিঙ্গাপুরেই তাঁর তিন ছেলে- মেয়ের জন্ম,বেড়ে ওঠা।তিনি ক' বছর পর পর স্বপরিবারে দেশে বেড়াতে আসেন। দেশে তাঁর বৃদ্ধা মা - বাবা,এক ভাই ও বোন আছেন।যশোর নড়াইলে গ্রামের বাড়ি। অরণ্য একাই দেশে এসেছে। ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। দু' সপ্তাহ হয়ে গেছে অরণ্য নড়াইলে এসেছে। আজ সন্ধ্যায় অরণ্যের আব্বু- আম্মু দেশে এসেছেন,কিন্ত ছেলের জন্য সেটা ছিল সারপ্রাইজ।  অরণ্য জানতই না আব্বু- আম্মু দেশে আসবেন।গ্রামে অরণ্যর দাদা প্রভাব শালী লোক। তিনি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।  অরণ‍্যর দাদা বাড়ি দোতলা। বাড়িটির সামনে বড় শান বাঁধানো পুকুর আছে। দোতলা বাড়িটির অধিকাংশ রুমগুলো তালা বদ্ধ অবস্থায় থাকে।বাড়িতে লোক সংখ্যা বলতে দাদা- দাদু আর অরণ্যর এক কাজিন থাকে। অরণ‍্যর ছোট চাচা সিলেটে চা বাগানে চাকরি করেন। ফ্যামেলি নিয়ে   উনি সিলেটে থাকেন। এত সুন্দর দ্বিতল বাড়িটা ছবির মত সাজানো পরিপাটি।গত বছর অরণ‍্যর ছোট চাচা ছুটিতে এসে বাড়িটাতে মাল্টিকালার রং করিয়েছেন। বাড়িটাকে বেশ মানিয়েছে মাল্টিকালারে।
বিকেলবেলা অরণ‍্য পুকুর ঘাটে বসে বাড়িটার সৌন্দর্য খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল।
অরণ্য ভাবে, এই মুহুর্তে ছোট চাচুকে সামনে পেলে একটা ধন্যবাদ দিতাম। বাড়িটা অরণ‍্যর কাছে একটা বাংলো বাড়ির মত লাগছে।একটু পরই অরণ‍্যর দাদু ফ্লাক্স ভর্তি চা আর কাপ হাতে এসে বসলেন পুকুর ঘাটের সিঁড়ির ওপর। অরণ‍্য বলল,দাদু তুমি কষ্ট করে চা  আনতে গেলে কেন? আমি কি তোমার কাছে চা খেতে চেয়েছি? অরণ‍্যর এ কথায় দাদুর মন খারাপ হয়ে গেল।তিনি অনেকটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে বলেন, দাদু ভাই আমি তোর সঙ্গে এখানে গল্প করতে এসেছি। এখন তুই বল,খালি মুখে কি কখন ও গল্প জমে? তাছাড়া চা তো আর আমি করিনি।তোর খুশি ফুপির মেয়ে স্বপ্না করেছে।ও খুব ভাল মেয়ে।যা দারুণ রান্না করে ও।আর চা ও কেমন বানায় সে কথা আমি নাইবা বললাম। তুই খেলেই বুঝতে পারবি।দাদুর কথা শুনে একটু মুচকি হাসল অরণ‍্য।বাব্বা! তুমি যে প্রসংশা করলে মেয়েটার। তাহলে তো চা খেয়ে দেখতে হয়। অরণ‍্য ফ্লাক্স থেকে দু' কাপ চা ঢালল। এক কাপ দাদুকে দিল এক কাপ নিজে হাতে তুলে নিল।চায়ে ক' বার চুমুক দিয়ে বলল,হুম দারুণ হয়েছে।এমন চা বহু কাল খাইনি।চা - পর্ব শেষে অরণ‍্য দৈনিক পত্রিকা নিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর সাদা রঙের একটা গাড়ি এসে থামল বাড়ির গেটের সামনে।       ----------অরণ‍্য ভেবেছে সিলেট থেকে ওর ছোট চাচু এসেছেন। ও  গাড়ির কাছে ছুটে আসতেই দেখতে পেল গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন ওর আব্বু- আম্মু। অরণ্য ভীষণ উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলো। আব্বু- আম্মু তোমরা? কেমন করে, কি ভাবে এলে? আমার এখন ও বিশ্বাস হচ্ছে না, তোমরা এসেছ। দাদু আমি কোন দিবা স্বপ্ন দেখছি না তো?অরণ‍্যর আম্মু হেসে উঠে বললেন, এ কোন দিবা স্বপ্ন নয়। এ সত্য, আমরা এসেছি।তোমাকে আমরা সারপ্রাইজ দেব বলে বলিনি। অরণ‍্য বাপা, আগামী পরশু আমরা দু' পরিবার মিলে কক্সবাজার যাচ্ছি। অরণ‍্যর আব্বু ও হেসে উঠে বললেন, হা  বাপা,আমরা ক' দিন খুব হৈ চৈ করব। আজাদ, এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। মা,ও মা তুমি কেমন আছ? বেগম সানজিদা একটু নড়ে চড়ে বললেন,আমি ভাল আছি বাপ।আগে বল তোরা কেমন ছিলি? আমার দিদিমণিকে আনিসনি কেন? অনন‍্যা , অর্ণবকে তোরা কেন রেখে এসেছিস? ওরা আসতে চাইনি? সালমা আজাদ এগিয়ে এসে শ্বাশুড়িকে সালাম করে বললেন,ও মা-ওরা আবার আসতে চাইনি? ওরা জানে ওদের ভাইয়ার বিবাহ দেওয়ার জন্যই আমরা দেশে এসেছি। ওরা কি থাকতে চায়? কিন্ত মা সামনের সপ্তাহে ওদের পরীক্ষা। ইচ্ছে থাকলে ও আনতে পারলাম না।   
আগামী বছর ওরা ঘুরে যাবে। বেগম সানজিদা বললেন, পরীক্ষা থাকলে কিভাবে আসবে? ওরা খুব ভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আজ কত দিন পর আমার বাড়িটা ভরে উঠেছে।ওরে আজাদ,তূই আসাদকে ও আসতে বলে দে।ওরা  ঘুরে যাক। আজাদ বললেন,হা মা রাতে ওদের সাথে কথা বলব। অরণ‍্য বলল,আম্মু তোমরা তাহলে আমার বিবাহটাই সারপ্রাইজ দিতে দেশে এসেছ ? তোমরা খুব ভাল করেই জানো,মারিয়াকে আমি ভালবাসি। সেটা জেনেও তোমরা একটা অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করতে যাচ্ছ? কাজটা তোমরা ভাল করছ না। অরণ‍্যর আব্বু- আম্মু  বললেন, হুম! সারপ্রাইজ তো অবশ্যই । কাজটা  নিঃসন্দেহে খুব  ভাল হচ্ছে। হঠাৎ অরণ‍্যর একটা ফোন আসল। সিঙ্গাপুর থেকে মারিয়া ফোন করেছে। অরণ্য মারিয়াকে ভালবাসে। একটা জমকালো পার্টিতে দু' জনের পরিচয়।সেই থেকে কথা বলার সূত্র পাত।এবং আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা। যতদূর মেয়েটার সঙ্গে অরণ‍্য মিশেছে তাতে সে বুঝতে পেরেছে মেয়েটা খুব ভাল, কিন্ত দূঃখী।সিঙ্গাপুর জন্ম মেয়েটার। পড়াশুনা,বেড়ে ওঠাও ওখানে।অথচ কি সুন্দর বাংলায় কথা বলে মেয়েটা।ওর বাবা অস্ট্রেলিয়ান  মা বাংলাদেশী।
অরণ্য বলল,জানো মারিয়া তুমি ঠিক যেমনটি কল্পনা কর তোমার একটি বাংলো হবে নদী ঘেঁষা। বাংলোর সামনে একটি শান বাঁধানো বড় পুকুর থাকবে। পুকুর জলে দল বেঁধে হংস মিথুন ভেসে বেড়াবে। আমরা দু' জন পূর্ণিমা রাতে জ‍্যোৎস্না  দেখব। ঠিক সে রকম একটা বাংলো বাড়ির সামনে পুকুর ঘাটে বসে আমি তোমার সাথে কথা বলছি। তুমি আমার বউ হলে তোমার একটা স্বপ্ন পূরণ হবে। মারিয়া বলল,ওয়াও ... তাই? এটা কোথায়? অরণ‍্য ছোট্ট করে বলল,  আমার দেশের বাড়ি নড়াইলে। বাড়িটা একটা ছবির মতো । বিশ্বাস করো, মারিয়া আমি এ বাড়ির প্রেমে পড়েছি ।হেসে ওঠে মারিয়া। ভেরি স্ট্রেঞ্জ? বলো কি? আমি কাকে বিশ্বাস করব? তোমাকে না তোমার নতুন প্রেমকে?
আচ্ছা, তুমিই যদি বাড়িটার প্রেমে পড়ে যাও, তাহলে আমার কি হবে? দিলে তো বাড়িটাকে আমার সতিন কাঁটা বানিয়ে? ও বাড়িতে আর কে কে থাকে? কোন সুন্দরী যুবতী মেয়ে নেই? অরণ্য রহস্য করল, আছে তো  ।শুনতে চাও কে সে? মারিয়া এবার সত্যি চমকে উঠলো,আছে? সর্বনাশ! তুমি আর ও বাড়িতে থেকো না। প্লিজ! চলে এসো। শেষে দেখো কোন অঘটন  ঘটে যাবে। হোঃহোঃ  করে এক গাল হেসে নিল অরণ‍্য।ও বলল,আমার প্রতি তোমার এই বিশ্বাস? এত ঠুনকো!  শোন, তোমার ভয়ের কোন কারণ নেই।স্বপ্না খুব ভাল মেয়ে। ও আমার ফুফাতো বোন।ভীষণ লাজু। গ্রামের মেয়ে বোঝাত। ভীষণ চাপা স্বভাবেরও । ও আমার দিকে চোখ তুলেই কথা বলে না।আর তুমি সেই আনাড়ি মেয়েটাকে নিয়ে কি সব ভাবছ।    
মারিয়া দৃঢ় কন্ঠে বলল,ও বলে না, কিন্তু তুমি তো বলো? নইলে এত কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুমি দেখতা নাকি?  অরণ‍্য বলল, আরে আমি জাস্ট একজাম্পোল দিলাম।ছাড়ো তো--! শোন মারিয়া, তোমার জন্য ভীষণ একটা খারাপ খবর আছে। বাবা- মা হুট করে দেশে চলে এসেছেন। শুধু সেটা হলে  হত। আমার বিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছেন।কি করব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। একটু বুদ্ধি ধার দাও ---।
হেসে উঠলো মারিয়া, বটেই বিয়ের কথা শুনলেই সব পুরুষ তোমার মত হ্যাংলা হয়ে যাই।  এখন বলো পাত্রী ঠিক হয়েছে? কে সে? নিশ্চয় আমি না,অন্য কেউ? কি নাম ধাম  ম্যাডামের? অরণ‍্য বলল,পাত্রী তুমি হলে  কোন কথাই ছিল না।ও আমার আম্মুর বান্ধবীর মেয়ে রাইসা মণি। কবে কোন ছোট বেলায় আম্মুরা দু' বান্ধবী কথা দিয়ে রেখেছেন। তুমিই বলো না,এসব পাগলামীর কোন মানে হয়? লাইফ আমার ।রাইসার পরিবার ঢাকায় থাকে। আমি এ বিয়ে করতে পারব না মারিয়া।তুমি চলে এসো প্লিজ! মারিয়া বলল,পাগল নাকি? ---------- আমার একজাম চলছে। আমার কথা ছাড় ---! তোমার স্বপ্ন কন্যার সঙ্গে কবে দেখা হচ্ছে ? --------- অরণ‍্য একটু হেয়ালি করে বলল, ঠিক কার কথা বলছ তুমি? স্বপ্না? না রাইসা? বেশ রেগে গেল মারিয়া,কেন এখানে আবার স্বপ্নার কথা আসছে কেন? সেও কি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি? তোমাদের পুরুষদের কোন বিশ্বাস নেই। তোমাদের অনেক সমস্যা।
--------- মারিয়ার এ কথা শুনে কপাট রাগ দেখিয়ে অরণ্য বলল,স্বপ্না ফেলনা নয়।ও যথেষ্ট সুন্দরী। তবে,কাজিন   বলে কথা। নইলে একবার চান্স........!
---------- অরণ্য  মুখের কথা শেষ করতে পারে না, মারিয়া খপ করে কথা ধরে ফেলে বলল, অমনি শুরু হয়ে গেল ? এই তোমরা পুরুষ মানুষ।
আমি তোমার রাইসা মণিকেই কংগ্রাচুলেশন জানাচ্ছি।যাও তোমরা কক্সবাজার থেকে ঘুরে এসো। খুব, খুব ইনজয় করবে তোমরা। মারিয়ার কন্ঠ কি একটু ধরে আসছে? আর একটু হলে কেঁদে ফেলবে মেয়েটা।  অরণ‍্য ভাবে, মনের অজান্তেই ওকে কষ্ট দিয়েছি। মারিয়ার জন্য অরণ্যও কষ্ট পাচ্ছে খুব। মারিয়া বিদায় নিতে চাইলে অরণ‍্যর বুকের ভেতর ধ্বক করে কেঁপে উঠলো। ও বুঝতে পারে মারিয়া গুমরে গুমরে কাঁদছে।                   ------- --অরণ‍্য  বলল,তুমি কি পাগল হয়েছ মারিয়া? কাঁদছ কেন? আমি তোমার ছিলাম,আছি,থাকব সারা জীবন। কেঁদো না লক্ষিটী!    
আমি আম্মুকে বলে দিয়েছি এ বিয়ে করব না। তুমি  মন খারাপ করে থেকো না। মারিয়া ধরা কন্ঠে বলল,আমি ঠিক আছি। তুমি ভাল থেকো। রাখছি এখন।মারিয়া ফোনের সুইস্ট অফ করে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
গত দু' দিন  মারিয়া ওর সেল ফোনের সুইস্ট অপ করে রেখেছে।  অরণ্য ট্রাই করে ওকে পাচ্ছে না। তৃতীয় দিন অরণ‍্যরা   কক্সবাজার পৌঁছে গেছে। ওরা হোটেলে উঠেছে।   
মারিয়া সেল ফোনের সুইস্ট অফ করে রাখাতে খুব রাগ হয়েছে অরণ‍্যর। রাত এগারটা বাজে , অরণ‍্যর চোখে ঘুম নেই।  
ও ভাবে, মারিয়া গত দু' দিন আমাকে এত কষ্ট দিতে পারল? কত মেয়ে আমার কাছে আসতে চেয়েছে। বন্ধুত্ব করতে চেয়েছে। অথচ, আমি আজ পর্যন্ত কোন মেয়ের দিকেই তাকাইনি । এক মারিয়া ছাড়া। এই তার প্রতিদান? খুব কষ্ট পাচ্ছে অরণ‍্য । কি মনে করে ও  মারিয়াকে ফোন করল। মারিয়া ফোন রিসিভ করেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।     
ওর কান্নার মধ্য দিয়ে বুকের ভেতরের
যন্ত্রণার অনুরণন ঘটাচ্ছে। ওর কান্নার শব্দেই স্তব্দ হয়ে গেল অরণ‍্য ।   
ও বলল,এই মারিয়া তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি? এত কাঁদছ কেন? আরে আমি আছি তোমার লাইফে। আমার বিয়ের কথা চলছে। এমন তো নয় আমি বিয়ে করে ফেলেছি?গত সন্ধ্যায় আমার পরিবারের মধ্যে বিয়ে নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তাতে বুঝলাম বিয়েটা আমাকে করতেই হবে। আর আমিও দেখতে চাই, রাইসা কি করে আমার স্ত্রী হয়? আমি বিকল্প কিছু ভাবছি।     
মানে, রাইসার সাথে বিয়েটা ঠিকই হবে,তবে ও আমার কাগজের বউ হবে। মাত্র কটা দিনের জন্য।
মারিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কি বলছ তুমি অরণ‍্য? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? রাইসা তোমার প্রস্তাব মেনে নেবে কেন?   
অরণ‍্য বলল,আমি ওকে রাজি করাব। আমার বিশ্বাস রাইসা রাজি হবে।
মারিয়া বলল, এত ফরমালিটির কোন প্রয়োজন নেই। তুমি রাইসাকেই বিয়ে কর। আমি সরে যাব তোমার লাইফ থেকে।
মানে?    
হঠাৎ অরণ‍্য উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,বাজে কথা রাখো? তোমার কি হয়েছে মারিয়া? যে ভালবাসার মূল্য দিতে জানে না, সে একটা খুনি।
 আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে ফিরে আসছি।  
একটু অপেক্ষা কর। মাত্র ক' টা দিন। মারিয়া চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করে।কান্নার ভেতরে ও সে অরণ‍্যর এটুকু কথা স্পষ্টই শুনেছে, অরণ‍্য ওকে অপেক্ষা করতে বলেছে ।
 সে মনে মনে ভাবে, আমি এটাই চেয়েছি। কিছুক্ষণ কেটে গেল, দু' পক্ষই নীরব। হঠাৎ অরণ‍্য নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, তুমি ভেবনা লক্ষিটী! আমি এখনই আমাদের বিষয়টা নিয়ে আম্মুর সঙ্গে কথা বলব। আমি তোমাকে জীবন সাথী করে পেতে চাই।
তুমি একটুও ঘাবড়াবে না। আমি বরং সবার সামনে তোমার কথা বলব। মারিয়া বলল,তুমি যেটা ভাল মনে কর সেটাই করবে। মারিয়া বিদায় নিয়ে লাইন কেটে দিল।
অরণ‍্য মনে মনে বলল, হে বিধাতা তোমার ইচ্ছাতে সব কিছুই যেন ভাল হয়।
খুব ভোরে, চারিদিকে আলো ফোঁটার আগেই অরণ‍্য একা একা চলে আসলো সমুদ্র সৈকতে।
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এই অশান্ত সাগরের পানির স্পর্শটুকু ওর খুব ভাল লাগে।সাগরের ঠান্ডা পানি হাতে নিয়ে মুখে ঝাপটা দিল।একটু পরেই পাশ থেকে ফিসফিস আওয়াজ ভেসে আসে অরণ‍্যর কানে। ও ভাবে,এ হয়ত সাগর থেকে ওঠে আসা বাতাসের সা-সা শব্দ। সে ভুল শুনেছে।একটু পরে আবার সেই একই ফিসফিস শব্দ-----------!      কী  হতে পারে ?অরণ‍্য পিছনে ফিরে তাকিয়ে চমকে ওঠে..।
সুন্দর মিষ্টি একটা মেয়ে অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে। অরণ্য একটু অবাক হল। মেয়েটি ধীরে ধীরে ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। বলল,হায় ! আমি রাইসা মনি। আপনি নিশ্চয়ই অরণ‍্য?    
কম অবাক হয়নি  রাইসাও। সে উত্তরের অপেক্ষা না করে বলল,কাল থেকে আপনাকে এক পলক দেখার অদম্য ইচ্ছেটাকে আমি
সামলাতে পারলাম না।তাই ভোরেই ছুটে এসেছি সাগর পাড়ে আপনাকে এক পলক দেখবো বলে...। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল মেয়েটা।ওর ঠোঁটের বাঁকে এক চিলতে মিষ্টি হাসি খেলা করছে।মেয়েটার কন্ঠে মধুর প্রণোদনা -----!
রাইসার দিকে চোখ ছোট করে অরণ‍্য জিজ্ঞেস করল,আপনি বুঝলেন কি করে এই সাত সকালে আমি সাগর পাড়ে -------। মন বলছিল,ছোট্ট করে হেঁয়ালি গলায় বলল রাইসা।
আপনার মন আর কি কি বলে? হেঁয়ালি করল অরণ‍্য ও। মন অনেক কিছুই বলে, কিন্ত সব সময়,সব কথা কি আর বলা যায়! কিছু কিছু কথা থাকে যা বুঝে নিতে হয়।আপনি কিন্ত আমার কল্পনার চেয়েও সুন্দর। আমি এতটা আশা করিনি । হঠাৎ রাইসার চোখ ভিঁজে গেল।  অরণ‍্যকে ওর খুব ভাল লেগেছে সে জন্য ।  
 হঠাৎ ওর চোখ পড়ল অরণ‍্যর চোখে।এক বুক আশা ভেঙ্গে গেলে কারও কারও যেমন হয়।ওর মলিন চেহারা হয়।
হঠাৎ অরণ‍্য বলল, চলুন আমরা সাগরের জলে নামি, আপনার আপত্তি আছে? হঠাৎ অরণ‍্যর   সাগরের জলে নামার আহ্বানে কেঁপে ওঠে রাইসা। ও অপলক তাকিয়ে থাকে অরণ‍্যর চোখের দিকে।  
অরণ‍্য লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে,সরি! আপনার আপত্তি থাকলে দরকার নেই।এটা নিশ্চয়ই আমার বাড়াবাড়ি। মৃদু হেসে রাইসা বলল,ওকে,নো প্রবলেম। আপনার ওই বাড়াবাড়িটা যে আমার খুব পছন্দ।
অরণ‍্য একটু জোকস করল,আামার আর কি কি পছন্দ আপনার?
ও  কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল অরণ‍্যর মুখের দিকে। ও  কথা ঘুরিয়ে বলল,এই দেখুন না , কত সহজেই আমরা খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম। রাইসা বলল, রুমে বসে থাকতে  ভাল লাগছিল না। আপনার আম্মু আমাদের রুমে এসে, আমাকে জোর করে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।উনারা এখন দু' পরিবার মিলে আমাদের বিয়ের ব্যাপারে সলা পরামর্শ করছেন। 
 কিন্ত আমার  জানা হল না, পাত্রী কি আপনার পছন্দ হয়েছে? গলায় উত্তেজনা মিশিয়ে প্রশ্ন করেছে রাইসা। ওর উত্তেজনার কাছে হার মানল অরণ‍্য। বিশ্বাস হচ্ছিল না তার। অরণ‍্য যে খুব একটা ভুল ভেবেছে রাইসাকে নিয়ে তা কিন্ত নয়।দুই পরিবার থেকে তাদের বিয়ের আয়োজন চলছে।এবং এ বিয়ে ওঁরা
সম্পন্ন করেও ছাড়বে।অরণ‍্য সে কথা জানে।ও বলল,আমাকে আপনি খুব ভাল বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন । মনে করার চেষ্টা করুন ...! আবার বিয়ে --------? মানে আপনার স্বামী হব? আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আপনি চাঁদের চেয়েও সুন্দর।সে এবার হাত বাড়িয়ে রাইসাকে এক হাঁটু জলে নিয়ে গেল।রাইসা ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।         অরণ্য বলে,ভেজা ভেজা গোলাপ পাপড়ির মতো নরম মায়া কাড়া মুখচ্ছবি আপনার।
মাখনের মতো নরম গাল
তুলতুলে ভেজা ঠোঁট,
পলক টানা ভ্রুরু 
রেশমী সিল্কি চুল ..
নীলাক্ষী চোখ ,
আপেল রঙা গায়ের রং
তুমি স্বর্গের দেবী 
মর্তে নেমে এসে সমুদ্র স্নান করছ : 
এমন মেয়েটি আমার বৌ হলে ধন‍্য হব  ....!
কিন্তু আমি বাঁধা পড়ে আছি অন‍্যখানে ।অন‍্য কোন হৃদয়ে।রাইসা আমাকে তোমার হেল্প করতে হবে।কথা দাও..!
অরণ্য এবার রাইসার কাঁধ ধরে দাঁড়ায়।শির শির করে কেঁপে ওঠে রাইসা ।
অরণ‍্যর দু'হাত বড় শক্ত করে ধরে আছে রাইসার দু'বাহু ।রাইসা টের পাচ্ছে ,ওই হালকা স্পর্শে আছে অনেক বসন্ত। অনেক ভাললাগা।
অরণ‍্যর গরম নিঃশ্বাসের স্পর্শ রাইসার কাঁধে, মুখে লাগছে। ও এক বুক সাগরের জলে নেমে গেছে।
একটু সামান্য পিছনে সরে গেছে রাইসা। তখনো অরণ‍্য রাইসার দু'হাত ধরে রেখেছিল। বড় বড় কয়েকটি ঢেউ এসে এক ঝটকায় ওদের দুজনকে আলাদা করে দিল।
হাত থেকে রাইসা সরে যেতেই অরণ্য আস- পাশে পাগলের মতো ওকে খুঁজতে লাগল।
একটু দূরে রাইসা তলিয়ে যেতে থাকে। অরণ্য এক ডুবে ওকে টেনে তুলে নিল কাঁধের ওপর।
আস্তে আস্তে ঢেউ এর ধাক্কা সামলে ছোট ছোট ডুব দিয়ে সাবধানে ওকে সাগর পাড়ে এনে উঠাল।
মূহুর্তে রাইসা ঝাঁপিয়ে পড়ে অরণ‍্যর বুকে।ও কাঁদছে।ও কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, আমি আগেই বলেছি, সাগরে নামব  না। আমি সাঁতার জানি না।
তারপর ও আপনি শুনলেন না আমার কথা।
অরণ্য দুষ্টু হাসে। বলে, আমি তোমার নায়ক হতে পারব না ঠিকই। কিন্তু খল নায়ক হতে পারি।আরে .. দূর অত ভাবছ কেন? তোমার খল নায়ক আছে না পাশে ? অরণ্য রাইসার মুখে আলতো হাতের স্পর্শ দিয়ে বলে, কি হত আজ ? তুমি তলিয়ে গেলে ?শুধু ওই এক পলকের জন্য ...... কত জীবন হারিয়ে গেল সাগরের বুকে।
 বিশ্বাস করো রাইসা আমি তোমাকে হারিয়ে যেতে দিতাম না। আমি তোমার সঙ্গেই আছি।রাইসা ভীষণ কাঁদছে। ও বলে, এর থেকে মৃত্যু আমার জন্য ভাল ছিল। কেন বেঁচে গেলাম আমি?
 হা,তুমি আমার পাশে আছ অরণ‍্য । কিন্তু সেটা  ক্ষণিকের জন্য। আমার হোল লাইফে নয়।ও একটু স্বাভাবিক হয়ে বলে,ওসব বাদ দাও। তুমি যেন কি হেল্প চাইছ আমার কাছে অরণ‍্য ।
 রাইসার প্রশ্ন, বিষন্নতা এবং হাসি তিনটি লেগে আছে চোখে, মুখে, ঠোঁটে। অরণ্য রাইসার হাত ধরে নিয়ে ওকে একটা ছাতার নিচের বসাল। রাইসার ভেজা শরীরে অন‍্য রকম এক শিল্পীত নৈঃস্বর্গীক দৃশ্য ফুটে উঠেছে। চমৎকার শীতের সকাল প্রকৃতির বুকে খেলা করছে।
আকাশে হালকা নরম মেঘ ।তার মাঝে নীল ছড়িয়ে আছে। প্রকৃতির উষ্ণ ঠোঁটে হালকা শীতের আমেজ বিরাজ করছে। অক্টোবর এর মাঝামাঝি সময়। 
আকাশের এই সাদা নীল মেঘের খেলা অরণ‍্য বেশ উপভোগ করছে।
মূহুর্তে অরণ‍্য অনুভব করে,ওর সামনে আকাশ থেকে নীল পরী নেমে এসেছে।ও বলে, তোমাকে আজ নীল পরী মেয়ে লাগছে।
 অরণ‍্য মারিয়ার সব কথা রাইসার কাছে বলল। অরণ্যর কথা শুনে ও রাইসার মুখ থেকে সব রক্ত সরে গেছে। ওর মুখ এখন ফ‍্যাকাশে বিবর্ণ রক্ত শূন‍্য লাগছে। ওর খুব কান্না পেল।ও ভেঙ্গে না পড়ে নিজেকে শক্ত করে বলে,হা বন্ধু বলো আমি তোমাকে ঠিক কিভাবে হেল্প করতে পারি ? আমি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করব । আমি তোমার মতো সুন্দর মনের একটা বন্ধু পেয়েছি।
রাইসা কাঁদছে। কিছুক্ষণ সময় অস্বস্তির মধ্যে কাটলো দু'জনের।
অরণ্য রাইসার চোখের জল মুছে দিয়ে ওর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলল, প্লিজ বন্ধু !কেঁদো না। আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি।
রাইসা কিছুটা শান্ত হলো।ও কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, না বন্ধু আমি কোন কষ্ট পাইনি। তুমি বলো আমাকে কি করতে হবে?
অরণ্য খুব বিষন্ন কন্ঠে বলে,আসলে ব‍্যাপারটা খুবই সিম্পল ।
তুমি আমার কাগজের বউ হয়ে সিঙ্গাপুর যাবে। অর্থাৎ তোমাকে একটু অভিনয় করতে হবে। কিন্তু সেটা কেবল সমাজের চোখে, লোক দেখানো।
সবাই জানবে আমরা স্বামী স্ত্রী। মাত্র কয়েকটা দিনের ব‍্যাপার। 
শুধু সিঙ্গাপুর যাওয়া পর্যন্তই। ও দেশে যাওয়ার পর আমি তোমাকে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে দিব। কোন প্রবলেম হবে না। আমি কথা দিলাম।
রাইসা বলো তুমি রাজি আছ? আমাকে তুমি বাঁচাও প্লিজ !
অরণ্য ওর দু'হাত আঁকড়ে ধরে।
মূহুর্তে রাইসার মনে হলো, ওর পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গেছে। ওর বসার চেয়ার টাও যেন দুলে উঠলো।
অরণ্য একি বলছে ?
আমাকে ওর কাগজের বউ হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত যেতে হবে ?এর অর্থ ও কি বোঝে? তবে কি অরণ‍্য বিয়েটাকে ছেলে খেলা মনে করছে?
ওর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ জন্মেছে।এক জীবনে সবার সব আশা পূরণ হয় না।  রাইসার কাছে মনে হয়েছে ব‍্যাপারটা অরণ‍্যর কাছে গরম দুধে ঠান্ডা জল ঢেলে দেয়ার মতো একটা সিম্পল বিষয়।ও যদি আমাকে ওর কাগজের বউ করে ,ওর সমস্যার সমাধান করতে পারে তো করুক। আমার না হয় দুঃখের আকারটা বড় বেশি ভারী হবে।তবু অরণ‍্যর তো কোন ক্ষতি হবে না। ওর মুখে হাসি  ফোঁটানোই হবে আমার প্রথম কাজ।
------ অনেক কষ্টের মাঝে ও রাইসা অস্ফুটে হেসে ওঠে বলে,  আমি রাজি।রাইসা শশব‍্যস্ত হয়ে বলে, গল্প, উপন্যাসে এ রকম কাহানি পড়েছি। কিন্তু কখনও ভাবিনি সেই কাগজের বউ একদিন আমি হবো। রাইসার দু'চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে টলমল করছে। নিমিষেই অরণ‍্যর সাথে ওর চোখাচোখি হয়ে যায়।ও নিজেকে দ্রুত আড়াল করার জন্য তাৎক্ষণিক উঠে পড়ে ।বলে,সরি আমাকে উঠতে হচ্ছে। আমার তাড়া আছে।আমি আসি।
------ অরণ‍্য নীরব হয়ে গেল।ও রাইসা কে বাঁধা দেয় না।রাইসা বলে,অরণ‍্য বিয়ের আয়োজন করো।কি মনে করে অরণ‍্য বলল, কিন্তু তুমি এতটাই ভেঙ্গে পড়েছ ? আমি  তোমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছি না তো বিষয়টা ? এখন ও সময় আছে ।আর একবার ভেবে দেখো। তুমি চাইলে আমি এ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারি।
-----অস্থির হয়ে রাইসা বলল,না না অরণ‍্য আমি এ বিয়ে ভাঙার কথা বলিনি।
আমি তোমার শর্তে রাজি হয়েছি। কোন শুভ দিন দেখে বিয়ের দিন ধার্য করো। অরণ্য আমার একটা শর্ত আছে। বিয়ের দিন আমাদের দেখা হবে ,তার আগে তুমি কোন ভাবেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না। অরণ্য বলল,এটা তুমি রাগ থেকে বলছ । খুব বেশি কষ্ট পেয়েছ রাইসা ?
-------- রাইসা গম্ভীর হয়ে অন‍্য দিকে তাকিয়ে বলল, একদম না। আমি ঠিক আছি। তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সময় পেলাম কোথায় ? তোমাকে সরাসরি যখন দেখলাম, খুব ভাল লেগেছে । যখন তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম ঠিক তখনই তুমি  অন‍্য কাউকে ভালবাসার কথা বললে । ভালই করেছ । আমাকে আর কোন কষ্ট স্পর্শ করবে না। স্বপ্ন দেখার আগেই ভেঙ্গে গেল।
----------- রাইসা কষ্ট লুকিয়ে ব‍্যর্থ হাসার চেষ্টা করে বলল, তুমি কিছু ভেবো না অরণ‍্য।দেখো , আমি নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিক ঠিক পারব তুমি যেমনটি চাইছ ।রাইসা আবার ও ঠোঁট টিপে হাসলো। ওর সে হাসিতে কষ্ট লুকিয়ে আছে, সেটা অরণ‍্যর চোখ এড়িয়ে গেছে।
----- রাইসা বলল, "কাগজের বউ " মানে তো আমি তোমার নকল বউ হতে যাচ্ছি । এটাই বা কম কী আমার জন‍্য। দুঃখ একটা আছে বৈকি !
লাইফে মানুষের একবার বিয়ে হয়। হাঁ, রিয়েলি ! ও মন খারাপ করে বলে,আহা ! হোক না, বিয়ে নিয়ে ছেলে খেলার মতো কিছু একটা। আমি যা মুখপুড়ি ! আমার জন্য এটাই ঠিক।কার ও নকল বউ হওয়া।
----------অরণ‍্য তাকিয়ে দেখছে রাইসার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।ও নিঃশব্দে রাইসার কাছে এসে  বলল, কাঁদছ কেন? আমি তোমাকে শুধু কষ্টই দিচ্ছি। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি মারিয়াকে অসম্ভব ভালবাসি। আমাকে না পেলে আমার মারিয়া মরে যাবে । সে আমি সইতে পারব না।  আমি ও মরে যাব।
---------তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু হয়ে থাকবে সারাজীবন। তোমাকে একটা অনুরোধ করব ।রাখা না রাখা একান্তই তোমার ব্যক্তিগত ব‍্যাপার। তুমি আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড উচ্ছ্বাস আদ্রিনকে বিয়ে করতে পার।ও খুব ভাল ছেলে। উচ্ছ্বাস মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জার্মানি জাহাজে কর্মরত আছে। ও বাংলাদেশের ছেলে। তুমি দেখতে পারো ওকে।
---------- অরণ‍্য মুঠোফোন থেকে উচ্ছ্বাস আদ্রিনের কয়েকটি ছবি রাইসা কে দেখালো। রাইসার দু'চোখ দিয়ে তখনো জল গড়িয়ে পড়ছে।ও ব‍্যথিত কন্ঠে বলে, তুমি হঠাৎ এমন অদ্ভুত একটা প্রোপোজ কেন করলে ? তাও আবার নিজের নয়, বন্ধুর জন‍্য ? কেন তোমার বন্ধু কি তার বিয়ের দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছে?
------------ ঠোঁট শক্ত করে অরণ‍্য বলে, তুমি এভাবে বলছ কেন? বিষয়টি ঠিক এরকম নয়। আমি তোমাকে অল্প ক'দিন চিনেছি। কিন্তু উচ্ছ্বাস আদ্রিনকে আমি অনেক দিন থেকে চিনি।ও আমার কলেজ লাইফের  খুব প্রিয় বন্ধু। তোমাকে ও আমার ভীষণ ভাল লেগেছে । আমার  মন কোথাও বাঁধা রাখা আছে।
-------- সে ক্ষেত্রে একমাত্র উচ্ছ্বাসের পাশে আমি দু'চোখ বন্ধ করে তোমাকে ভাবতে পারি।  দেখো রাইসা,  এষ্টাবলিশমেন্ট বলে  একটা ব‍্যাপার আছে। পার্ফেক্ট ম‍্যাচিং  ।
সব কিছু বিবেচনা করে আমি প্রস্তাব দিয়েছি। তুমি ভেবে দেখো। এটাই  করতে হবে এমন নয়।  লাইফ তোমার, ডিসিশন ও তোমাকে নিয়ে হবে। আমি কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিব না তোমার ওপর।
----------একটু স্বাভাবিক হলো রাইসা। একটু যেন দমে গেল ও। অরণ্য রাইসার চোখের জল মুছে দিল। রাইসা সচেতন হয়ে লজ্জাবনত মুখে বলল, অ‍্যাই এ‍্যাম ভেরি সরি অরণ‍্য । আমি তোমার কাগজের  বউ হতে পারছিনা। তোমার প্রস্তাব ভেবে দেখব।
------ অরণ‍্য রাইসার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, প্লিজ রাইসা এভাবে বলো না। তোমাকে এটুকু অভিনয় করতে হবে। নইলে আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। তুমি নিশ্চয়ই সেটা চাইবে না। অরণ্য কেঁদে উঠলো।
-------- রাইসা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,জাষ্ট নকল বউ হয়ে যতটুকু অ‍্যাক্টিং  করার প্রয়োজন, আমি কেবল ততটুকুই করব।কথাটা মনে রেখো অরণ‍্য। আর একটা কথা, তুমি আমার বিশ্বাস নষ্ট করো না কখনো।
------ অরণ‍্য অবাক হওয়ার ফান করে বলল,এই.. এই.. তারমানে তুমি শুধুই অভিনেত্রীর রোলে অভিনয় করবে ? কিন্তু এই সমাজ, সংসার তোমার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু আশা করবে। রাইসা বলে,  লোক দেখানো সেটুকু করব। কিন্তু তুমি আশা না করলেই হলো।
অরণ্য স্মিত হেসে বলে,করব না,করব না।কথা দিলাম।
----- রাইসা ঠোঁট উল্টে বলে, এখন পাম দিচ্ছ। কিন্তু কথাটা  যেন তখন মনে থাকে তোমার।
অরণ্য বলে,কি আশ্চর্য..! তোমাকে আবার পাম দিলাম কখন আমি। কিন্তু  রাইসা , তখন তুমি আমার বউ......! আর আমি কিনা তোমার থেকে দূরে দূরে সরে থাকব ? আচ্ছা সময় হোক তখন না হয় দেখা যাবে ।কি কি করব ,আর কি করব না। এখন আগাম বলা মুশকিল।
---- রাইসা বলে, আমিও দেখতে চাই মহাশয় ! আমাকে দেয়া কমিটমেন্ট তুমি কি করে ভাঙ্গো ?  যতদিন বিয়ে না হচ্ছে আমার সাথে কোন  যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। অরণ্য রাইসার হাতে একমুঠো চকলেট দিয়ে বলল ,ভাল থেকো।রাইসা চকলেট গুলো হাতে পেয়ে হালকা হেসে অরণ‍্যর দিকে তাকিয়ে বলল, এমন ভাবে তুমি চকলেট গুলো আমার হাতে দিলে যেন আমি কোন চকলেট পাগল শিশু।
---- অরণ‍্য হাসি হাসি মুখ করে বলে, হতে পার। নো প্রবলেম। রাইসা কোন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে যাওয়ার জন্য এক পা,দু' পা বাড়ায়।
------ এক মাসের জন্য জাহাজ এখন সিঙ্গাপুর পোর্টে ডক ইয়ার্ডে অবস্থান করছে ।
সকালে উচ্ছ্বাস মারিয়াকে ফোন করল, বিকেলে পোর্টে সী-  বীচে আসার জন্য। সিঙ্গাপুর জোহর বন্দর থেকে উডল‍্যান্ডস শহর পাশেই।এ শহরে আবাসিক উঃ অঞ্চলে মারিয়ার পরিবার থাকে।
--- সন্ধ্যা নেমে এসেছে।সেদিকে মারিয়ার খেয়াল নেই। বেশ কিছু দিন ওর মন খারাপ।ও সৈকত ঘেঁষা বাংলোর পাশে  কফি শপে উচ্ছ্বাসের জন্য অপেক্ষা করছে।
----- অরণ্য ওকে ক'বছর আগে উচ্ছ্বাস আদ্রিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে ওদের মাঝে ভাল বন্ধুত্ব পূর্ণ একটা সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেছে।
---- হায় ...! মারিয়া হঠাৎ উচ্ছ্বাস আদ্রিনের কন্ঠে একটু চমকে ওঠে  । আদ্রিন এসেই বলল,সরি..সরি..অ‍্যাই এ‍্যাম এক্সট্রিমলি সরি ম্যাডাম ! অ‍্যাই এ‍্যাম লেট । কি করব বলুন সী পোর্টে  জব। ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করে চলতে হয়।

-------- মারিয়া বলে,ওকে নো প্রবলেম। হায় !উচ্ছ্বাস কেমন আছেন ?হাসল উচ্ছ্বাস,মাথা নেড়ে বলল হুম ভাল আছি।  ম‍্যাম, আপনার চোখ ফোলা কেন ? খুব কেঁদেছেন মনে হয়। কোন প্রবলেম? মারিয়া দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,কই না তো? তেমন কিছু না। আপনার বন্ধুর খবর কি বলুন ? কতদিন কথা হয়নি আপনার সঙ্গে? উচ্ছ্বাস বুঝতে পারে মারিয়া প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। উচ্ছ্বাস ও পুরনো আলোচনার ইতি টেনে বলল,বোধ হয় গত সপ্তাহে কথা হয়েছে। ফেইসবুকে ইনবক্সে কথা  হয় প্রায় । ম‍্যাম একটু বসুন আমি আসছি।
উচ্ছ্বাস চলে গেল।
-------- টেবিলে রেখে গেছে লেপটপ আর একটা ডায়েরি। মারিয়া লেপটপ অন করে কয়েকটি ছবি সহ মেসেজ দেখতে পেল। রাইসার ছবি  অরণ্য পাঠিয়েছে।
------- ছবির নিচে উচ্ছ্বাস একটা কবিতা লিখেছে ।


আজ একটা ছবি দেখলাম
মুঠো ফোনে
এক অচেনা মিষ্টি মেয়ের,
নাম রাইসা :
সেই রাইসা কে আমার বলতে ইচ্ছে করছে,
হ‍্যালো .. মেয়ে ..
আজ আমার একি হয়েছে 
তোমাকে ছাড়া যে আমার একদম ভাল লাগছে না ,
কেন যে তুমি আমার হৃদয়ে এসেছ ----
জানি না ;
আজ রাখছি অচেনা মেয়ে..... বাই :
আবার কথা হবে অন‍্য কোন সময় .......!

------ রাইসার ছবি দেখছে মারিয়া। রাইসার চুল সোনালি সিল্কি। বেশ লম্বা চুল। কোমরের কাছ অব্দি নেমে গেছে। লম্বাটে মুখ। চোখের মণি সবুজ কটা।গোলাপি অ‍্যাপেল গায়ের রং। গোলাপি পাতলা ঠোঁট। সবুজ বাংলার মেয়ে।
-------- এ মেয়ে চোখের পলকে যে কোন পুরুষের হৃদয় হরণ করতে পারে।
মারিয়া ভাবে, অরণ্য তাহলে আগুন নিয়ে খেলছে? 
মারিয়া লেপটপ বন্ধ করে রাখল। ওর মন আরও এক পোজ গাঢ় বিষন্নতায় ডুবে গেল।
প্রায় দশ মিনিট পর উচ্ছ্বাস কফি শপে ফিরে এল।ও বলল,সরি ম‍্যাম .. পাশের শপিং মলে আমার একটা বাঙালি বড় ভাইয়া আছেন। উনার সাথে দেখা করে আসলাম।কি খাবেন বলুন ?
-------- মারিয়া বলল,আজ মুড নেই।অন‍্য আর এক দিন খাবো। পাওনা থাকল । উচ্ছ্বাস অবাক হয়ে বলল, কিছু তো খাবেন।অন‍্যদিনের টা অন‍্যদিন দেখা যাবে । আপনার কোন কারণে মন খারাপ? 
-------- মারিয়া বলল, আপনি কবিতা লেখেন ? জানতাম না তো ...! উচ্ছ্বাস বলল হা , আমি লিখি। হঠাৎ এ প্রসঙ্গ কেন?
-------- উচ্ছ্বাসের কথার উত্তর না দিয়ে মারিয়া বলল,আপনি কি কাউকে ভালবাসেন ? উচ্ছ্বাস বলে, ঠিক জানি না। তবে সম্ভাবনা আছে।কি হয়েছে ম‍্যাম ? অবান্তর প্রশ্ন করছেন যে ! মারিয়া বলে,এটা আমার মনের প্রশ্ন।কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করা আর কি। আচ্ছা উচ্ছ্বাস কে আপনার বেশি প্রিয় ?
এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উচ্ছ্বাস বলে,ম‍্যাম আপনি কি আমার লেপটপে হাত দিয়েছেন? মারিয়া দ্রুত বলে, হুম। উচ্ছ্বাস বলল, খুব খারাপ ম‍্যাম। কার ও ব‍্যক্তিগত কোন জিনিসে হাত দেয়ার আগে তার অনুমতি নিতে হয়। যাই হোক যদি ও বিষয় টা তেমন সিরিয়াস কিছু না।আপনাকে আক্রমণ করে এ ধরনের কথাবার্তা প্রকাশ‍্যে বলা বা  শোনানো সম্ভবত আমার উচিত হচ্ছে না। যদিও আপনি এখনো অভ‍্যস্ত হয়ে ওঠেননি। অরণ্য গতকাল রাতে পাঠিয়েছে ছবিগুলো।
------ মারিয়া বলল,পারলে  ক্ষমা করবেন আমাকে । প্লিজ ... ওই প্রসঙ্গে আর কোন কথা হবে না। বেয়ারা এসে ফালুদা, লাচ্ছি, আইসক্রিম রেখে গেছে টেবিলে।
সবশেষে কফি ।
কফি খেতে খেতে এক ফাঁকে মারিয়া বলল , এখানে এক মাস আছেন। মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসুন। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করা যাবে। উচ্ছ্বাস মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, হুম আসব ম‍্যাম ।  পিচ্চি দুটো কে আমার  স্নেহ আদর পৌঁছে দিবেন ম‍্যাম।
উচ্ছ্বাস বলল,ম‍্যাম আপনি ইচ্ছে করলে প্রতি দিন বিকেলে এই বীচে আসতে পারেন। আমি  ফ্রি আছি। আপনাকে সময় দিতে পারব। 
------- মারিয়া বলল, ভাবছি অরণ্যর সঙ্গে একটা ব্রেকআপ হওয়া দরকার। আমার এ কঠিন সময়ে আপনাকে আমি পাশে চাইছি। উচ্ছ্বাস বলল,না .. ম‍্যাম আপনি এভাবে বলতে পারেন না। অরণ্য আপনাকে অনেক বেশি ভালবাসে । কাল আসুন এ বিষয়ে কথা হবে।
------- ওরা কফি শপ থেকে বের হয়ে,কথা বলতে বলতে পাশাপাশি হেঁটে চলে।  জ‍্যোৎস্নালোকের পালকে   জেগে উঠেছে রাত।
রাত আটটার দিকে উচ্ছ্বাস ট‍্যাক্সি ডেকে মারিয়াকে তুলে দিয়ে  ফিরে এল জাহাজে।

-------- এক সপ্তাহ পর শুক্রবারে খুব ধূম ধাম করেই বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হল।রাইসা এখন খান বাড়ির নববধূ।দ্বিতল ভবনটা লাইটিং করা হয়েছে।
------- দোতলার বড় হল রুমে রাইসা বসে আছে।খান বাড়ির সবাই রাইসা কে বধূ হিসেবে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে।
--------- দেয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং করে এই মাত্র রাত বারোটা বাজার সংকেত দিল।
-------- রাইসা ফুল শয্যায় বাসর ঘরে বসে আছে একা। সন্ধ্যার পর থেকে অরণ‍্যর কোন পাত্তাই নেই।এ নিয়ে রাইসার মন খারাপ।
----------ক্রমেই রাত বাড়ছে।রাইসা বিয়ের পোশাক সাদা লাহেঙ্গা পরেছে। দিল্লী থেকে বিয়ের মার্কেটিং করেছে অরণ‍্যর বাবা আজাদ খান। রাইসার গলায় ছ' ভরি ওজনের সীতা হার।পায়ে স্বর্ণের নূপুর।সারা শরীর ভারী গহনায় ভর্তি।
--------- রাত সাড়ে বারোটায় অরণ্য দু'বোতল ওয়াইন নিয়ে ছাদ থেকে নামল।এটা জাষ্ট অরণ‍্যর প্লান।  বাসর ঘরে মদ খেয়ে ,মাতাল হয়ে রাইসার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করবে।
যেন রাইসা অরণ্যকে ভুল বুঝে দূরে সরে থাকে।
---------- অন‍্যরা ঘুমিয়ে পড়েছে। অরণ্য মদ খেয়ে মাতাল হয়ে রুমে ঢুকল । ওর এক হাতে  মদ। ও তখন ফোনে কথা বলছে খুব সম্ভবত মারিয়ার সঙ্গে। মারিয়া ভীষণ কাঁদছে।
------ অরণ‍্য ওকে বৃথা শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রায় এক ঘন্টা  কথা বলল ওরা ।
--------- কথা বলা শেষ হয়েছে।অথচ প্রায় আধাঘণ্টা কেউ কোন কথা বলল না।
রাইসা বসে আছে অনেক ক্ষণ। অরণ্য এবার স্ট্রেইট তাকালো রাইসার দিকে। বলল, ওয়াও ...! ভীষণ সুন্দর লাগছে তোমাকে।
--------- আজ তুমি আমার বউ। রাইসা তাকালো অরণ্যর দিকে।বলল, ওভাবে বলো না।বলো ,নকল বউ।
-------- অরণ‍্য বুঝতে পারে,রাইসা ওকে আক্রমণ করতে চাইছে।ও গম্ভীর হয়ে বলে, নকল বউ !তুমি এত রাত জেগে আছ কেন? কার অপেক্ষায় ? রাইসা ওর গোলাপি ঠোঁট নেড়ে বলল, কেন তোমার ।এত রাত অবধি কোথায় ছিলে?
------ অরণ‍্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল,এটা অনাধিকার চর্চা তোমার। আমি হার মানছি , তুমি সত্যিই খুব সুন্দরী। আমাকে মুগ্ধ করার জন্য কি তুমি এত রাত্রি জেগে বসে আছ? 
-------- যদি তাই করো ,তাহলে বলতে হয় তুমি সত্যিই খুব বোকা। আমি ঠিকই ছাদে বসে আমার মারিয়ার সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসলাম।শুয়ে পড়। আমি মাতাল হয়েছি, দেখেছ ?
আমি আরও মদ পান করব। আমার সামনে দূর্দান্ত সুন্দরী তরুণী বসে আছে।বলা তো যায় না,যদি আমি এই মাতাল অবস্থায় তোমাকে স্পর্শ করি ? তখন তোমাকে দেয়া কমিটমেন্ট এর কি হবে ?
তাই বলছি , লক্ষী মেয়ের মতো শুয়ে পড়।
---- রাইসা বলে, আমি তোমার নকল বউ। আমার কোন অধিকার নেই তোমাকে বাঁধা দেয়ার।একটা অনুরোধ করব রাখবে ? এখন তোমার বন্ধু উচ্ছ্বাস আদ্রিনের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে ? অরণ্য বলে, এখন ? এই অবস্থায়? রাত দুটো বাজে । ঠিক আছে আমার কোন আপত্তি নেই। অরণ্য রাইসার পাশে বসে লেপটপ অন করে ইন্টারনেট চালু করলো।ও ভিডিও কলে ফোন দিল। উচ্ছ্বাস ডিভিও কল রিসিভ করেই বলল,হায় ! দোস্ত তোর কি খবর বল ? অরণ্য বলল, খবর খুব ভাল বন্ধু।আজ আমি বিয়ে করেছি।তোকে  কিছুই বলা হয়নি।সব বলব তোকে। উচ্ছ্বাস বলল, তুই কাকে বিয়ে করলি ? মারিয়া  এখানে? অরণ্য বলল,সে অনেক কথা।পরে বলব। আমি রাইসাকে বিয়ে করেছি।এই রাইসা সামনে এসো । মূহুর্তে রাইসা লেপটপের সামনে এসে বসলো।ও হাত নেড়ে বলল,হায় !
----- হঠাৎ উচ্ছ্বাস বলল,এই অরণ‍্য তুই যে মেয়ের ছবি পাঠিয়েছিস এ সেই মেয়ে না ? অরণ্য বলল, দোস্ত হা,ও রাইসা।আরে ও আমার কাগজের বউ। কথাটা বলতে পারলো না অরণ‍্য। ওপ্রান্ত থেকে উচ্ছ্বাস লাইন কেটে দিল।
----- উচ্ছ্বাসের ভীষণ খারাপ লাগছে।এ ক'টাদিন উচ্ছ্বাস রাইসাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছে।
---- রাইসার ছবি বের করে উচ্ছ্বাস কাঁদছে।
ও বিড়বিড় করে উচ্চারণ করে,


শোন ও মিষ্টি মুখের মেয়ে 
তোমার জন্য কবি হতে ইচ্ছে করে,
তোমায় নিয়ে কবিতা  লিখি হাজারো হাজারে :
চাঁদের চেয়েও সুন্দর তুমি মেয়ে ,
তাকাতে পারিনা তোমার চোখের দিকে 
বড় ভয় হয় ----
যদি হারিয়ে যাই তোমার ওই চোখের মায়াবী দৃষ্টির গভীরে ,
আর নয়নে দেখি তোমাকে 
তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে হাত বাড়াই 
তখনো ভয় হয় ,
যদি হারিয়ে ফেলি তোমায় ?
তাই তো স্বপ্নের মায়া জালে তোমায় বেঁধেছি----
হৃদয়ের খামে তোমার নাম লিখে ছবি এঁকেছি ;

আমি জেনে গেছি সত‍্যিই তোমায় ভালবাসি ।
ও মিষ্টি মুখের সোনালি মেয়ে ..
তুমি একমুঠো বিশুদ্ধ সবুজাভা বিশ্বাস
তুলে দিতে পারলে না
আমার এ হাতে  ?

আজ তোমায় হারিয়ে আমি 
কাঁদছি তবে :

---- অরণ্য জানে মারিয়া ভীষণ কাঁদছে। ওর কিছু ভাল লাগে না। এর মধ্যে অরণ‍্য এক বোতল মদ সাবাড় করেছে। ওর এভাবে মদ খেতে দেখে 
রাইসা গেয়ে ওঠে --------

" তোমায় ছেড়ে যাব কোথায়
বহুদূরে ---- যাব কোথায় ...
এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়.......

গান শেষ হলে অরণ‍্য বলল, গান গেয়ে তুমি আমার মন টলাতে পারবে না।
রাইসা বলে, আমি তোমার নকল বউ। আমার গানে তোমার মন টলুক সে আমি আশা করি না।জাষ্টা মিনিট ওয়েট কর আমি আসছি। রাইসা পাশের ঘরে যেয়ে গহনা এবং শাড়ি চেঞ্জ করে সুন্দর একটা মিষ্টি কালারের থ্রিপিস পরে এসেছে।ও বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়ছি । শুভ রাত্রি।
 কিছুক্ষণের মধ্যেই রাইসা ঘুমিয়ে পড়ে।
--------রুমে জিরো পাওয়ারের লাল, নীল রঙের নিয়ন বাতি জ্বলছে। ঘুম নেই অরণ্যর চোখে।ও ভাবে ,মদ খাওয়ার প্লানটা বেশ কাজে লেগেছে।

--ঘুমন্ত রাইসার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অরণ‍্য। ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে রাইসা কে। মনে মনে বলে, আমি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিই নি ।যা হয়েছে ভালই হয়েছে।
ও বলে,রাইসা তোমার শরীরে কোন ক্ষুত নেই। সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আপন হাতে তৈরি করেছেন।

------- ওই দুটো টানা টানা চোখ
পাতলা মসৃণ গোলাপি দুটো ঠোঁট ,
মসৃণ চিবুক ;
সরু কোমর 
সুঢৌল বুক 
চঞ্চলা হরিণীর মতো দু'টি চরণ ,
যেন মূর্তিমতী মূর্তিমান যৌবনা বতীর ছবি ভাসছে অরণ্যর দৃষ্টিতে।

অরণ্য ভাবে ,কত কবি সাহিত্যিকরা এমন অপরূপা সুন্দরীর সৌন্দর্যের উপমা দিয়েছেন।আর এ কোন কাল্পনিক সুন্দরীর প্রতিমূর্তি নয়। বাস্তব আর সে এখন আমার সম্মুখে।অথচ তাকে আমি ছুঁতে পারছি না। থেকে থেকে অরণ্যর দৃষ্টি রাইসার মুখে আটকে যাচ্ছে।

---- এক সপ্তাহ হয়ে গেছে রাইসা নতুন সংসারে বেশ ভালই মানিয়ে নিয়েছে। হঠাৎ ওর জীবনে দুঃস্বপ্নের মতো অরণ‍্যর আগমন ঘটেছে। অরণ‍্যর মোহ ওর মন থেকে  কেটে গেছে।ও অরণ‍্যর কাগজের বউ হওয়াতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে।শুধু লোক দেখানো বিয়ে হয়েছে ।অরণ‍্যর হৃদয়,মন দখল করে আছে অন‍্য কেউ। রাইসার জন্য তার হৃদয়ে কোন স্থান নেই। এটা ভীষণ দুঃখ জনক ঘটনা রাইসার জীবনে। প্রায় দু' সপ্তাহ ধরে বড় ধৈর্য সহকারে রাইসা অরণ‍্যর বউ' র ভূমিকায় অ‍্যাক্টিং করল।
---- মারিয়ার সঙ্গে অনেক দিন উচ্ছ্বাসের কোন যোগাযোগ নেই। মারিয়া ইচ্ছে করে যোগাযোগ করেনি। প্রায় বিশ দিন হয়ে গেল অরণ‍্য রাইসাকে বিয়ে করেছে।
--- মারিয়া ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছে। অনেক দিন পর মারিয়া সী বীচে আসল।ও সরাসরি  জাহাজে  গেল।
---- উচ্ছ্বাস মারিয়াকে জাহাজে সাদর অভ্যর্থনা জানালো। আসুন ম‍্যাম...!
অ‍্যাপ‍্যায়নের কোন ত্রুটি হলো না। বরং বেশি হলো, মারিয়া নাস্তা শেষ করে উচ্ছ্বাসকে নিয়ে বীচে আসল।
---- মারিয়ার মন খারাপ হয়ে আছে।ও বালুর তটে  দাগ কেটে কেটে অরণ্যর নাম লিখলো কতবার । প্রতি বার ঢেউয়ের জলে বালির উপর লেখা নাম ধুয়ে যাচ্ছে। দূরে থেকে বিষয়টা উচ্ছ্বাস দেখলো।
---- হঠাৎ উচ্ছ্বাস মারিয়ার কাছে এসে বলল, বৃথাই লিখছেন ।এ নামের মানুষ কখনো আপনার হবেনা।

---- হঠাৎ কি মনে করে মারিয়া  বলল, আমার এ হাত তুমি সারা জীবনের জন্য ধরতে পারো না ? উচ্ছ্বাস এগিয়ে এসে বলল,  হুম পারি ..  কেন পারব না ম‍্যাম ..! একবার সাহস করে ,হাতটা বাড়িয়ে  দেখো  না ...। মারিয়া উঠে দাঁড়িয়ে  হাত বাড়িয়ে দিল। উচ্ছ্বাস ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মারিয়াকে বুকে টেনে নিল।
---- মারিয়া কেঁদে ওঠে বলে, একজন এ হৃদয় ভেঙ্গে চলে গেছে। তুমি সে হৃদয়ের ক্ষত সাবধানে পরিপূর্ণ করতে পারবে না ?
উচ্ছ্বাস মাথা নেড়ে বলে, খুব পারব ম‍্যাম । মারিয়া বলল, তবে আর দেরি কেন ? চলো  আমরা কাজী অফিসে যাই ।
---- উচ্ছ্বাস বলল, আমার আপত্তি নেই।চলো, কাজী অফিস থেকে বের হয়ে আমরা  কেনাকাটা করতে মলে যাব।
---- উচ্ছ্বাস জাহাজ থেকে দুজন সিনিয়র কে নিয়ে গেল কাজী অফিসে। বিয়ে শেষে সিনিয়র হেসে ওঠে বললেন, ইয়াং ম‍্যান দারুণ একটা কাজ করেছ। তোমার ওয়াইফকে নিয়ে জাহাজে থাকতে পার।  জাহাজে ফ‍্যামেলি রাখার অনুমতি আছে।
 ছয় মাস রাখতে পারবে। জাহাজে আমরা পাঁচ জন থাকি।  তোমার ফ‍্যামেলিকে নিয়ে আজ জাহাজে চলে আস । উচ্ছ্বাস ভীষণ খুশি হলো ।
বলল,স‍্যার আজ নয়, দুই একদিন পরে নিয়ে যাব।
উচ্ছ্বাস মারিয়াকে নিয়ে  কেনাকাটা করতে মলে গেল।
উচ্ছ্বাস মারিয়ার সঙ্গে ওদের বাসায় গেল। মারিয়ার বাপী - মামনি কিছুক্ষণ মন খারাপ করে থাকেন। তাদের মেয়ে সিঙ্গাপুর ছেড়ে জার্মানিতে চলে যাবে জেনে। মারিয়ার ছোট দুই ভাই বোন, মারিসা ও মাসবির ও ভীষণ মন খারাপ।
রাত দশটায় উচ্ছ্বাস জাহাজে ফিরে এল।
--- মারিয়া এভাবে হুট করে বিয়ে করবে , এটা কেউ আশা করেনি।
--- পরদিন বিকেলে উচ্ছ্বাস এসে মারিয়াকে জাহাজে নিয়ে গেল।  জাহাজে নতুন সংসার, মারিয়া ও বেশ উপভোগ করছে। ঘুরে ফিরে সময় কেটে গেল।
----বিকেলে জাহাজ সিঙ্গাপুর জোহর বন্দর ছেড়ে চলে যাবে ।
---- মারিয়া বাবা - মা ,ভাই - বোন এবং এতদিনের পরিচিত শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নেয়।
--- অরণ‍্য রাইসা কে নিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে গতকাল বিকেলে বিমানে ওঠেছে।সকাল দশটায় বিমান সিঙ্গাপুর বিমান বন্দরে ল‍্যান্ড করে।
--- বিকাল চারটায় অরণ‍্য রাইসা কে নিয়ে শাহ্ আমানত জাহাজে পৌঁছে গেছে। জাহাজে সেকেন্ড ইন্জিনিয়ার উচ্ছ্বাস আদ্রিনের নাম বলতেই সিনিয়ররা উচ্ছ্বাসকে ডেকে দিল।
--- অরণ‍্য আর রাইসাকে দেখে উচ্ছ্বাস ভীষণ খুশি হলো।
---- উচ্ছ্বাস মারিয়াকে ডেকে বলে,এ‍্যাই দেখো কারা এসেছে ? মারিয়াকে জাহাজে দেখে অরণ‍্য বলল, তুমি এখানে কেন ? 
--- উচ্ছ্বাস বলল, আমি বলছি ,আমরা বিয়ে করেছি ।এক সপ্তাহ আগে।
---- অরণ‍্য চিৎকার করে উঠলো  'হোয়াট এ‍্যা সারপ্রাইজ'   ।            ওহ্ শীট ! এই ছিল তোদের মনে ? আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারলি না তোরা ? আমি তোকে কথা দিয়েছিলাম,রাইসা কে তোর হাতে তুলে দেব। আমি আমার কমিটমেন্ট রেখেছি।
--- উচ্ছ্বাস তুই রাইসা কে গ্রহণ করে আমার মারিয়াকে আমার কাছে ফিরিয়ে দে। আমি ওকে অনেক ভালবাসি।
--- মারিয়া বলল, এখন আর সেটা সম্ভব না।
--- রাইসা বলে, আমি ওর কাগজের বউ। এই সম্পর্ক টা অনেক দূর্বল ।কথা ছিল সিঙ্গাপুর এসে যে যার মতো হয়ে যাব।
কিন্তু মারিয়া তোমরা এটা কি করেছ ? ফিরিয়ে নাও তোমার অরণ‍্যকে ....!
---- মারিয়া বলল,নিতে পারি একটা শর্তে ,  আমার আগের অরণ‍্যকে ফিরিয়ে দাও  ? পারবে না ।যেটা হয়েছে মেনে নাও।
---- অরণ‍্য বলল, মারিয়া তুমি এটা
 কি করলে ? আমার জন্য আর কটা দিন অপেক্ষা করতে পারলে না ? এই তোমার ভালবাসা ?
--- মারিয়া বলল,রাইসা তোমার ওপর হিংসে করেই আমি উচ্ছ্বাস কে বিয়ে করেছি। যা হওয়ার হয়েছে।মেনে নাও ।
--- রাইসা কেঁদে ওঠে বলে,কি মেনে নেব? আমি অরণ‍্যর কাগজের বউ সেটা ?
এ অসম্ভব প্রায় ।
অরণ্য এবার রাইসার হাত ধরে বলে,কি অসম্ভব? আরে নকল বউ আসল হতে কতক্ষণ  ?
----অরণ‍্য মুখে দুষ্টুমির হাসি ফুটিয়ে বলে,যা হয়েছে ভালই হয়েছে। এতদিন আমিও তোমার সঙ্গে ঢের অ‍্যাক্টিং করেছি।সেকি তুমি আমার চোখ, মুখ দেখেও বোঝেনি ?
আর কত ...।
এই সোনা বউ ...  শুধু তুমি মেনে নিলে হয় ।
--- রাইসা বলে,এই আস্তে বলো,কেউ শুনবে ।  আমি তোমার কাগজের বউ। পাশ থেকে  হেসে ওঠে  উচ্ছ্বাস ।
মারিয়া বিষন্ন কন্ঠে বলে,সত‍্যিই কি তাই ...
তুমি অরণ‍্যর  শুধুই কাগজের বউ.....?
ততক্ষণে জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে । এবার যাত্রা সুদূর অষ্ট্রেলিয়া।
---ওখানে দু'মাস থাকবে ।
জাহাজ সিঙ্গাপুর বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
শেষ বারের মতো হাত নেড়ে বিদায় জানালো উচ্ছ্বাস, মারিয়া।
ডক ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানালো অরণ‍্যরা । ওরা
 দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল .....!
 আর অরণ‍্য ? প্রিয়জন বিয়োগ ব‍্যথায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দিল   সীমাহীন গভীর শূন্যতায় ।
রাইসা অরণ‍্যর বুকে মাথা রাখলো ......... 
-- সমাপ্ত

 

 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK