বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Sunday, 16 Sep, 2018 12:27:17 am
No icon No icon No icon
ছোট গল্প

মেঘ বালিকা


মেঘ বালিকা


হাসনা হেনা রানু: আজ শ্রাবণী অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে।কারণ আজ একটা বিশেষ দিন। গত ছয় বছর আগের ঘটনা,এই দিনটাতে শ্রাবণীর
এম.এ রেজাল্ট বের হয়েছিল।আর সেদিনই সে বেকার প্রেমিক অনিককে বিয়ে করে পালিয়েছিল।
কিছুদিন পর পূবালী ব্যাংকে শ্রাবণীর চাকুরী হয়ে গেল।তার জন্য শ্রাবণীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিলো। ইন্টারভিউ শেষে শ্রাবণী সোজা অফিসের জি এম মিল্টন খন্দকারের টেবিলে যেয়ে কেঁদে ফেলেছিল ।জি এম মিল্টন খন্দকার ছিলেন অমায়িক লোক। তিনি শ্রাবণীর সমস্যার কথা শুনে চাকুরীটা ওকেই দিলেন। শ্রাবণীর ইন্টারভিউ ও সন্তোষজনক ছিল । আর শ্রাবণীর সাহসের তারিফ ও করেছিল সবাই।ব্যস..! চাকুরীটা শ্রাবণীর হয়ে গেল। সেই থেকে শ্রাবণীকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় দুই বছর পর এই মিল্টন খন্দকার তার এক বন্ধুর প্রাইভেট কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার পদে অনিককে চাকুরী দিলে দূজনের আয়ে ছোট সংসারটা বেশ গুছিয়ে নিয়েছে শ্রাবণী। বলতে গেলে তাদের ছোট সংসারে এক অনির্বাচনীয় সুখ যেন উপচে উপচে পড়ে।
প্রতিদিন নিয়ম করে অনিক অফিস শেষে দ্রুত বাসায় চলে আসে । চাকুরী আর শ্রাবণী ছাড়া সে আর অন্য কিছুই বোঝে না। শ্রাবণীর মনে পড়ে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে অনিক ওকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য ছুটির কথা গোপন রাখে।সে সকালে অফিসে চলে যায়। দুঘন্টা পর সে বাসায় ফেরে ২০০ পাউন্ড একটা কেক, অসংখ্য চকলেট, ছোট্ট একটা ছুরি আর চমৎকার একটা নেকলেস নিয়ে।
শ্রাবণীতো অবাক অনিকের পাগলামী দেখে।
অনিক বিকালে শ্রাবণীকে নিয়ে শপিং মলে গেল।
 টুকটাক কিছু কেনাকাটা করার জন্য।
সন্ধ্যায় ওরা বাসায় ফিরল । আজ শ্রাবণীর খুব খুশি খুশি লাগছে। বিয়ের পর থেকে মেয়েটা বাবা-মাকে ছেড়ে অনিকের সাথে সংসার করছে। কখনোই মেয়েটা অনিকের কাছে বাবা-মা, ভাই-বোনদের কথা তুলে মন খারাপ করেনি। ধৈর্য্য আছে মেয়েটির। অনিক ও যে বিষয়টি নিয়ে মাঝে মধ্যে একটু আধটু ভাবে না তা নয়। অনিক ও ভাবে। কিন্তু ও কিছু বলে না। আজ শ্রাবণীকে দেখে অনিকের ও ভালো লাগছে।
হঠাৎ শ্রাবণী বলে, অনিক.. অনিক..

"----এই একটা জীবন পেয়ে আমি অনেক
খুশি
আমি এখন যখন তখন
পাখি হয়ে উড়তে পারি নীল আকাশে
ডানা মেলে,
মেঘ পরীদের ছবি আঁকতে পারি
রং পেন্সিলে ..
শ্রাবণ মেঘে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারি
আকাশ পাড়ের ------
কাঠবাদামী বিকালে..
গোলাপ হয়ে ফুটতে পারি ভালোবাসার
গহীন অরণ্যে -------"


অনিক বলল,ব্যস! অনেক হয়েছে মহারানী সাহেবরা এবার আসুন আমরা বিবাহবার্ষিকীর ছোট্ট একটা সেলিব্রিটি করি। শুধুমাত্র তুমি আর আমি।আর কেউ নেই আমাদের মাঝে। ভালোই হয়েছে, তোমার বস এখন দেশের বাইরে আছেন। দেশে থাকলে উনাকে বলা যেত। শ্রাবণী বলল, তুমি ঠিকই বলেছ।বস অনেক হেল্পফুল একজন মানুষ। ঠিক আছে অনিক তুমি আমাকে ২০ মিনিট সময় দাও আমি সব এরেন্জ  করছি। শ্রাবণী ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের কাজে।
কিছুক্ষণ পর ও কেক সাজিয়ে অনিকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অনিক ধীর পায়ে এগিয়ে আসে শ্রাবণীর কাছে।বলে ,ওয়াও.... শ্রাবণী!
দারুন লাগছে তোমাকে। অনিক মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রাবণীর কাছে এসে মৃদু কন্ঠে বলল,এই শ্রেয়া দু'চোখ বন্ধ কর।ও পরম মমতায় নেকলেসটি
পরিয়ে দিল শ্রেয়ার গলায়।ও চোখ বন্ধ করেই নেকলেস এ হাত বুলিয়ে বলল,ওহ গড! এ তুমি কি করেছ?
এতোগুলা টাকা নষ্ট না করলে কি হতো না? আর.. এতো বড় কেকের কি প্রয়োজন ছিল? তুমি না একটু বেশি বেশি.... 
অনিক শ্রেয়ার ঠোঁটে হাত স্পর্শ করে বলল, প্লিজ!চুপ করো। আজ এসব কথা বলো না। আজ একটা বিশেষ দিন। এই নেকলেসটা তোমার স্কুল শিক্ষিকা শ্বাশুড়ি আম্মার টাকায় কিনেছি। টাকাটা আম্মা দিয়েছে । আর এই কেক -- তোমার বস গিফট করেছে।সো, আমি আবার কি করলাম? ভুলে যাচ্ছ কেন ..আমি তোমার বেকার স্বামী, বুঝতে পেরেছ?আর পরিবারে ওয়াইফ যখন সন্মান জনক একটা জব করে, অথচ হাজবেন্ড বেকার থাকে তার মত লজ্জার আর কিছু হতে পারে? শ্রেয়া অনিকের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে,অ্যাই অনিক তুমি এভাবে বলছ কেন? তুমি তো ছোট খাটো একটা কাজ করছ । তোমার হাত খরচাটা তো চলে যাচ্ছে। এটাই বা কম কি? প্রসঙ্গটা চেঞ্জ করে,
শ্রেয়া নেকলেস এ হাত স্পর্শ করে কেঁদে ফেলে।বলে ,আমি খুব ভাগ্যবতী অনিক। শ্রেয়া কাঁদছে। অনিক ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলল,আর কান্না নয় ,এসো আমরা কেক কাটি।
অনিক সহাস্যে মোম নিভিয়ে শ্রেয়ার হাত ধরে দূজনেই সম্মিলিত ভাবে কেক কাটল।ওরা দুজনেই একত্রে বলে উঠলো-- Happy Anniversary Day.....অনিক
এক টুকরো কেক শ্রাবণীর মুখে তুলে দিল। শ্রাবণী ও অনিককে কেক খাইয়ে দিল। শ্রাবণী হতভম্ব হয়ে অনিকের দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। অনিক বলল, হালকা সাজেই তুমি কত অসাধারণ। আমার পলক ফেলতে ইচ্ছে করছে না। নয়ন ভরে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। অনিক পরেছে অ্যান্ডিসিল্কের এ্যম্বোডারি করা পাঞ্জাবি। শ্রেয়ার পছন্দে কেনা ।আর শ্রেয়া পরেছে মিষ্টি রং জামদানি শাড়ি। শ্রেয়াকে সুন্দর মানিয়েছে।চিৎকার করে অনিক বলল,আজ আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ শ্রেয়া। আবেগে সেদিন শ্রাবণী কেঁদে ফেলে অনিকের বুকে মাথা রেখে বলেছিল,হ্যা, অনিক
শুধু তোমার জন্য অসীম ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে আমার হৃদয়, প্রতিটিক্ষণ, প্রতিটি মূহুর্ত। অনিক বলল, এই শ্রাবণী আজ কী দারুণ জ্যোৎস্নারাত ।চলো না ছাদে যাই..! শ্রেয়া বলল, বেশ চলো....
ওরা জ্যোৎস্নারাত দেখতে ছাদে চলে আসে।
অস্ফুটে বলল শ্রেয়া, ইশ্.....!প্রমত্ত জ‍্যোৎস্নায় ভাসছে রাতটা । আজ কি ভরা পূর্ণিমা ? এমন জ‍্যোৎস্না রাতে সমুদ্র বড় বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে। এমন ভরা পূর্ণিমায় আমাকে একদিন সমুদ্রের কাছে নিয়ে যাবে? অনিক আর একটু নিবিড় হলো।ও শ্রেয়ার একটি হাত তুলে নিল নিজের হাতের মুঠোয়।ও কোমল স্বরে বলল, আগে আমার চাকরিটা হোক। তারপর আমি তোমাকে নিয়ে  সারা বিশ্বে উড়ে বেড়াব দুটো ডানা লাগিয়ে। বলো কোথায় কোথায় যেতে চাও তুমি? নিরাপদ দূরত্বে সরে এসে শ্রেয়া হেসে উঠলো হি হি করে। ও বলে ,আর আমি তোমার ডানায় ভর দিয়ে উড়বো বুঝি ? না না, আপাতত আমি কোথাও যাচ্ছি না এক সমুদ্র সৈকতে ছাড়া। তুমি আমাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছ ?
অনিক আড় চোখে একবার তাকাল শ্রাবণীর দিকে।ও কোন প্রতিবাদ করল না তর্ক ও না।ও আস্তে করে বলল, শ্রাবণী মন অনেক কিছুই করতে চাই কিন্তু পারি না। আমার যে মিনিমাম একটা রোজগার নেই। আমি তো বুঝি তোমার ও কিছু চাওয়া পাওয়া আছে, সে সব আমি পূরণ করতে পারছি না।
শ্রেয়া অনিকের বুকে মাথা রেখে বলে,অত ভাবছ কেন ? তুমি তো চাকরির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছ। দেখো , হয়ে যাবে।
হঠাৎ অনিক বলে ,তাই যেন হয়।এই শ্রেয়া একটা কবিতা শোনাব তোমাকে , শুনবে ? শ্রেয়া বলল, শোনাও---
অনিক দৃঢ় কন্ঠে ক'চরণ কবিতা উচ্চারণ করল----


পৃথিবীর শেষ দিনে ও... আমি তোমার থাকব 
যদি এ দেহে প্রাণ থাকে,
যদি ভালবাসার বিশ্বাস টুকু বেঁচে থাকে --
তখন ও আমি শুধু তোমারই রব ,
এই জ‍্যোৎস্নাস্নাত রাত
আকাশে শ্রাবণ মেঘেদের ভীড় ---
প্রজাপতি হলুদ বিকেল,
শিশির ভেজা ঘাস ফুল
সমুদ্র বুকে মিশে থাকা নীল আকাশের উচ্ছলতা..
মাধবীলতা ফোঁটা মায়াবী সন্ধ্যা--
এইসবই তোমার ভালবাসার মাঝে খুঁজে পেয়েছি ।

তোমার জন্য বুকের মাঝে  চাষ করেছি নীল গোলাপ ভালোবাসা,
আমার ভালো লাগা এক নীল আকাশ আছে ..
আমি নিঃশব্দ রাত্রির নির্জনতা বড় ভালবাসি।
পৃথিবীর শুরুর দিনে ও আমি তোমার ছিলাম
এই ফুল, পাখি
নদী, সমুদ্র, নীলাকাশ
শ্রাবণ বিকেলের টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ--
ভোরের নিবিড় অরণ্যে বিন্দু বিন্দু শিশির জমে থাকার গল্প..
জল মেঘের কাব্য কথা;
বউ কথা কও পাখির ডাক
বাবুই পাখির সাজানো নীড় ---
আকাশ বুকে চাঁদ মেঘের লুকোচুরি খেলা
কাঁঠাল চাঁপার গন্ধ ,
এসব কিছুই ভালোবাসা হয়ে ছুঁয়ে আছে
তোমার আমার
আমাদের ভালোবাসার গল্প ।।


শ্রেয়া হেসে বলে, অনিক এতো ভালোবাসার কথা বলো না---

তুমি প্রিয়তি রাত হলে
আমি ঘুম হবো..
নিঃশব্দ স্বপ্নপুরীর তোমার চোখ জুড়ে, প্রিয়তম তোমার চোখ জুড়ে !!


শ্রেয়া বলে ,কত রাত এখন?
বাইরের বাতিগুলো সব নিভে গেছে।
--- অ‍্যাই অনিক ,চলো রুমে যাই । এভাবে তোমার কবিতা শুনতে থাকলে আজ রাত শেষ হয়ে যাবে। আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুম ঘুম জড়ানো চোখে শ্রেয়া দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ ও মাথা ঘুরে পড়ে গেল।
পরদিন সকালে বাসায় ডাক্তার সাহেব এসে শ্রেয়াকে প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা করে বলেন,মি: অনিক কংগ্রাচুলেশনস..!   আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন। অনিকের সেকি আনন্দ ডঃ সাহেবের কাছে শুভ সংবাদ শুনে। শ্রেয়ার শরীরের অস্তিত্ব আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।ও দিন দিন কেমন শুকিয়ে যায়। কিছুই খেতে পারে না।ওর অসুস্থ সময়ে অনিক ছায়ার মতো পাশে থেকেছে।চার মাস পর ওকে ডঃ এর কাছে নিয়ে গেল চেক আপের জন্য অনিক।ও শ্রেয়ার কানে কানে ফিসফিস করে বলে, ছেলে হবে নাকি মেয়ে?
অবশ্যই সেটা নিশ্চিত করবে। ছেলে হলে নাম রাখব প্রেম , মেয়ে হলে নাম রাখব ভালোবাসা। এমন অদ্ভুত নাম শুনে শ্রেয়া ভীষণ হেসেছিল। ওকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হলো। অথচ কি আশ্চর্য ! ডঃ অন‍্য তথ্য দিলেন। শ্রেয়া প্রেগন্যান্ট নয়।ওর পেটে টিউমার।
অনিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। দুই তিন দিনের মধ্যে শ্রেয়ার অপারেশন হলো।একটু সুস্থ হয়ে শ্রেয়া বাসায় এল। এই ক'দিনে অনিক যেন কেমন হয়ে গেছে। সে আর আগের মতো শ্রেয়ার সাথে মন খুলে কথা বলে না ডঃ অনিককে বলেছে শ্রেয়া আর কোন দিন মা হতে পারবে না। কিন্তু বিষয়টি অনিক মেনে নিতে পারেনি। এদিকে কঠিন বাস্তবতাকেও সে অস্বীকার করতে পারে না।
দেখতে দেখতেই পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হল। ওদের দাম্পত্য জীবন এখন অনেকটাই বিষিয়ে উঠেছে। অনিক এখন শ্রেয়াকে সহ‍্য করতে পারে না। অনিক আমূল বদলে গেছে।তার এখন অনেক টাকা হয়েছে।
শ্রেয়ার ভালোবাসার অনিক হারিয়ে গেছে অন‍্য ভুবনে। এতো দিনে শ্রেয়ার তিল তিল করে গড়ে তোলা ভালোবাসার ঘরটা আজ বিবর্ণ বিষাদে ভরে উঠেছে।

আজ ওদের ৬ষ্ঠ বিবাহ বার্ষিকী। শ্রেয়া চারটায় বাসায় ফিরেছে। কিন্তু অনিক আসেনি। সন্ধ্যার পর সে অনিকের অফিসে ফোন করল।ও প্রান্ত থেকে একটি ঘুম ঘুম জড়ানো কন্ঠস্বর ভেসে এলো। প্লিজ আপনি কাকে চাচ্ছেন? মেয়েলি কণ্ঠস্বরটা শ্রেয়াকে প্রশ্ন করল। বিরক্ত হয় শ্রেয়া। আমি অনিকের ওয়াইফ বলছি, ওকে দিন। প্লিজ ডার্লিং মনে হয় তোমার স্ত্রী ফোন করেছে।ধরো কথা বলো। শ্রেয়া আবার ও সেই মেয়েলি কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেল।একটু পরেই অনিকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো।ইয়েস অনিক স্পিকিং ...
গলার স্বর কি ঘুম জড়ানো, --- নাকি মাতাল মাতাল ভাব ।
অনিক তুমি আজ বাসায় আসবে না?
আজ একটা বিশেষ দিন। তোমার মনে নেই? নিজেকে আর সামলাতে পারে না শ্রেয়া,ডূকরে কেঁদে ওঠে। তুমি বাসায় এসো । বিরক্ত হল অনিক। ওহ্ শিট ! তুমি আর ডিস্টার্ব করার সময়  পেলে না?
আমি এখন ডার্লিংয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাচ্ছি । শোন তুমি এত কাল যা দিতে পারনি , আঁখি আমাকে তাই দেবে। সেই কচি কন্ঠে বাবা ডাক শোনার জন্য আমার ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। আঁখি আমাকে সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে। যেটা তুমি দিতে পারনি এত কাল। অনিকের গলা বেশ উঁচুতে ওঠে ।ওর গলা একটু ও কাঁপলো না বলতে? কিছুক্ষণ শ্রেয়া নীরব হয়ে যায়। সে বলে, অনিক তোমার পাশের মেয়েটা কে ? চিৎকার করে উঠল অনিক।ও আমার স্ত্রী, আঁখি দেবনাথ।আমরা বিয়ে করেছি ।ও আমার কলেজ জীবনের  প্রেমিকা।আর তুমি ওর পরে আমার জীবনে এসেছ । সুতরাং দাবি ওর বেশি।আর কোন প্রশ্ন করোনা । রাতে আমি বাসায় ফিরব না।
চিৎকার করে কেঁদে ওঠে শ্রেয়া ।ওর হাত থেকে টেলিফোন পড়ে গেছে। অনিকের এমন সব প্রশ্নে শ্রেয়ার থমকে যাওয়ার কথা .....!
কিন্তু না, শ্রেয়া সেদিন অবাক হয়েছে অনিকের এভাবে বদলে যাওয়া দেখে।ও আর কি বলতে পারত অনিককে। সারা রাত কেঁদে কাটালো শ্রেয়া।ও ভাবে , রাতে সে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে মাত্র। সকাল হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অফিস শেষে অনিক ঠিকই রাত্রে বাসায় ফিরে আসবে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে। সন্ধ্যা শেষে রাত্রে ও অনিক বাসায় ফেরে না। অপেক্ষায় থাকে শ্রেয়া।
রাত্রে ওর বেশ ক'বার বমি হয়েছে। সকালে ও বমিবমি ভাব আছে দেখে ও ডঃ এর কাছে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। আলমারি খুলে টাকা নিতে যেয়েই শ্রেয়া সারপ্রাইজড হয়ে গেল।
কিছু কাগজপত্র নিচে পড়ে গেল।ও সেগুলো তুলে দেখল, অনিকের দ্বিতীয় বিয়ের কাবিন নামা। একটা ফ্ল্যাটের দলিল অবশ্যই আঁখির নামেই দলিলটা।আর একটা নতুন গাড়ির লাইসেন্স । এতো সব কাগজপত্র অনিক আলমারিতে রেখেছে । অথচ আমি এর কিছুই জানলাম না ..! থরথর করে কাঁপছে ওর শরীর।ও মূহুর্তে মাথা ঘুরে পড়ে যেয়ে জ্ঞান হারায়।
ওর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সে হাসপাতালের বেডে। মিল্টন বস শ্রেয়ার পাশে বসে আছেন। উনি শ্রেয়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,দূঃখ করো না । আমি তোমার পাশে আছি । তোমার কাজের মেয়ে আমাকে সময় মত ফোন না করলে কি যে ঘটে যেত..!
ঠিক তখনই ডঃ সাহেব এসে শ্রেয়াকে বললেন, কংগ্রাচুলেশন মিসেস অনিক আপনি প্রেগন্যান্সি । এবার আপনি সত্যিই মা হতে যাচ্ছেন। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে শ্রেয়া। না, ডঃ আমি আর মা হতে চাই না। আপনি কেন এই নিষ্ঠুর সত‍্য প্রকাশ করলেন? দু'চোখ বন্ধ করে প্রলাপ বকছে শ্রেয়া। হঠাৎ কার ও পায়ের শব্দে চমকে উঠে ও চোখ মেলে তাকাল।ওর বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আঁখি আর অনিক। আঁখি মৃদু কন্ঠে বলল, বড় আপু আপনি আমাদের সাথে নতুন ফ্ল্যাটে চলুন। আমরা সবাই এক সাথে থাকব।আপু আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। বড় আশা নিয়ে এসেছি।
ডুকরে ডুকরে কাঁদছে শ্রেয়া।বলে , না তা হয় না। আমার অক্ষমতা  নিয়ে আমাকে একা থাকতে দাও। তোমাদের সুখের সংসারে আমাকে টানা হেঁচড়া করো না।
ঠিক তখনই চিৎকার করে উঠলেন মিল্টন খন্দকার। বললেন, অক্ষমতা ?এ তুমি কি বলছ শ্রেয়া ...! মি: অনিক আপনি কি জানেন শ্রেয়া প্রেগন্যান্ট..। অবশ্যই আপনার জানার কথা নয়। আপনি তো সুন্দর একটা জীবন বেছে নিয়েছেন। আপনার সংসারে একটু একটু করে আলো ফুটছিল ।আর আপনি? মিল্টন খন্দকার এবার ক্রোধের শেষ সীমায়।কবে থেকে এমন লাগাম ছাড়া হয়ে গেলেন ?
অনিক বলল,মানে...মানে... ঠিক এরকমটা তো আমি চাইনি। কিভাবে যে কি হয়ে গেল আমি বুঝতে পারছি না। শ্রেয়া কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ঘরে স্ত্রী রেখে শেষ পর্যন্ত একটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েকে বিয়ে করতে হলো? ছিঃ ছিঃ... স‍্যার ওদের নাটক বন্ধ করে চলে যেতে বলুন ।
আঁখি দেবনাথ অনিকের মনের অবস্থা বূঝতে পেরে খপ করে ওর একটা হাত চেপে ধরে বলল,----ও তার মানে তুমি দুদিকই বজায় রাখতে চেয়েছিলে ,তাই তো? এখন তুমি আমাকে দোষারোপ করছ কেন আঁখি? তুমি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছ না তো?
অনিকের স্বর মৃত্যুর চেয়েও শীতল হয়। 
মিল্টন খন্দকার বললেন, শ্রেয়া আমার ছোট বোনের মতো।ওর পাশে আমি আছি সবসময়। আপনি কি করবেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব‍্যাপার মি: অনিক। আমি এখন আসছি। উনি চলে গেলেন। 
আঁখি আর কালক্ষেপণ না করে, কোন  রকম রিস্ক নিতে গেল না ।ও  অনিকের হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। অনিক চলে যাওয়ার সময় হাতের তালুতে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। যেন একটা গভীর ক্ষত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ও বুকের মধ্যে....!


লজ্জা ,ঘৃণায় শ্রেয়ার সমস্ত শরীর  রি রি করে উঠল।ও অন‍্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নিজেকে আড়াল করে কেঁদে কেঁদে প্রলাপ বকছে.... ক' বছর সংসার করেও মানুষ চিনতে পারিনি, হয়তো আমার ব‍্যর্থতা ....!
শ্রেয়া পেটে হাত স্পর্শ করে বলল,তুই বড় অভাগারে .....!ওর  
আকাশ ফাটানো চিৎকার কিছুক্ষণ পর থেমে গেল।ও বিড়বিড় করে বলে, অনিক... অনিক .....
তোমারা সুখে থাকো। 
শুনেছি সবার কপালে আবার সুখ নাকি সয়না । আমি ও না হয় , সেই না সয়াদের দলের একজন।ভয় কি .....!
এখন আমি "মেঘ  বালিকার " মত কাঁদতে শিখেছি। আমার আবার দুঃখ কি ..................?

লেখিকা:হাসনা হেনা রানু, সাহিত্যিক, কবি।
খুলনা।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK