শনিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৮
Friday, 14 Sep, 2018 10:11:23 pm
No icon No icon No icon

একটি সুইসাইডাল নোট


একটি সুইসাইডাল নোট


হাসনা হেনা রানু: খুব আস্তে করে বলল,তোর এত বড় সাহস, তুই আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরি করিস । বেশ কিছুদিন ধরেই আমি ভাবছি তোকে আমি আমার জীবন থেকে মাইনাস করে দিব।আর সহ্য করব না তোকে । আমি ঢাকায় ফিরেই একটা পদক্ষেপ নিব ।
----প্রবল কান্নার চাপে কেঁপে উঠলো দিশার শরীর। ও কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতেই বলল,  এটাই বাকি ছিল । শেষ পর্যন্ত তুমি আমার গায়ে হাত তুললে ? অন‍্যায় করেছ , আমার ঘরে আগুন জ্বালিয়ে তুমি অন্য মেয়ে মানুষ নিয়ে ফূর্তি করবে আর আমি তোমার স্ত্রী হয়ে  কিছু বলতে পারব না?  আবার আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? আমি তোমাকে এমন একটা সংবাদ দেব যে , তোমার সুখ শান্তি হারাম হয়ে যাবে। আমি মা হতে চলেছি । তুমি ডাঃ , এতদিন কথাটা তোমাকে বলার সাহস হয়নি । তুমি বাচ্চা পছন্দ কর না।কথাটা শুনে তুমি যদি আবার আমাকে এ‍্যাবরোশন করতে বাধ্য কর ,সে ভয় ও হয়েছে। এখন আর সেটা পারবে না । অলরেডি তিন মাস পার হয়ে গেছে। এর আগে দু'বার এম আর করেছি।  দিশা  চোখে চোখে কথা বলে দৃঢ় ভঙ্গি নিল । এই মেয়ের সঙ্গে তোমার এত মাখামাখি কিসের ? কি হয় সে তোমার? 
-------- তুমি আজ আমার গায়ে হাত তুলে আমাকে  আঘাত করলে ... সেটা ক্ষমার অযোগ্য।অন‍্য কোন স্ত্রী হলে এতক্ষণে সে এই মুখ আর দেখাত না। দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত সমুদ্রে। নেহাৎ আমি কনসিভ করেছি । আমি আমার সন্তানের কথা ভেবে ওই কাজটা করতে পারলাম না। তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। তোমার সন্তান আমার গর্ভে । আমি তোমার প্রথম স্ত্রী বর্তমান । আমার অনুমতি ছাড়া তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পার না। আমি চাইলে তোমাকে মামলায় ফেঁসে দিতে পারি। আইনের কাঠগড়ায় তোমরা দুজনেই সমান অপরাধী।কাজেই গলা নামিয়ে কথা বলো ।ঘরে ফিরে চলো ।
--------এ‍্যস্ট্রেন্জ ! ক্ষেপে গেল মিলান । তোমার কথা শেষ হয়েছে ?এখন যাও ..। এই শোন, আমি তোমার কথা মত এখানে আসিনি।আর আমি তোমার কোন কথা শুনতে বাধ্য নই ।শুনেছ ? তুমি নিজেকে নিয়ে ভাব, নিজেকে সামলাও । আমাকে জ্ঞান দিতে এস না।যে নিজের খবর রাখেনা ,সে আবার পড়শির খবর কি করে রাখবে? ডঃ সোনিয়া এখন আমার স্ত্রী ।আরে বিয়ে করে আমি  দেশান্তরী হয়েছি নাকি ?  ------ ওকে নিয়ে ঠিকই ঘরে ফিরতাম । তখন তুমি সব জানতে পারতে । এখানে কেন এসেছ? হোয়াই ? প্রচন্ড রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলো মিলান।
------------- দিশা প্লিজ ..! এখানে আর সিনক্রিয়েট করো না।মিলানের ধমকে দিশা একটুও দমে না। মনের দিক থেকে সে খুব ভেঙ্গে পড়েছে। ডঃ সোনিয়ার ওপর ওর ভীষণ রাগ হল ।ও চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতেই বলল,এ‍্যাই মেয়ে তুমি জানতা না মিলান ম‍্যারিড পারসন । জানা সত্ত্বেও তুমি ওর গলায় ঝুলে পড়লে ?তোমরা ও পার । ডঃ সোনিয়া বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেল।শত চেষ্টা করেও নিজের অপ্রস্তুত চেহারায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে পারছে না।ও বলল,বিয়ে কি আমি করেছি ওকে ? না ও আমাকে করেছে ..। সে একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, মিলান সব সময় একটা কথা বলত, তুমি নাকি ভারী আনকালচারড্ মেয়ে । তাই ও আমার মত কালচার্ড মেয়েকে বিয়ে করেছে ।এটা ওর একটা কমিটমেন্ট ছিল।
--------- দিশা বুঝতে পারল , ডঃ সোনিয়া এই মূহুর্তে উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করছে ।ও মনে মনে ভাবে,এই সোনিয়া নামের সুন্দরী মেয়েটি মিলানের কাছে আমার চেয়ে বেশি প্রিয় ! সোনিয়ার ওপরেই ঘোর দৃষ্টি দিশার। মেয়েটি নিঃসন্দেহে সুন্দরী। বেশ স্মার্ট , লম্বা পাঁচ ফুট তিনের কম হবে না।হাই হিল না পরলেও পারত।ছিপ ছিপে গড়ন ।সাদা ফর্সা মসৃন মুখ লম্বাটে। মিষ্টি রঙের চিনন সিল্কের একটা থ্রি পিস পরেছে । ড্রেস এর সঙ্গে ম‍্যাচিং করে মুখের মেকআপে সবুজ আভা ফেলেছে।
স্ট্রবেরি কালারের লিপস্টিকে ঠোঁট বেশি ছুঁয়ে গেছে।সদ‍্য রং ধরা অস্ট্রেলিয়ান সাদা লালচে কালারে অ‍্যাপেলের উপমা মনে করিয়ে দেয়।এ মেয়ের গায়ের রং সে রকম। কাঁধ ছাঁটা থ্রি স্টেপের চুলে আর ও অনন‍্যা হয়ে উঠেছে সে। চুল পনি -- টেইল করে বাঁধা । টানা টানা চোখে কাজল পরেছে । এ মেয়ের কাছে নিজেকে খুব নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রভ মনে হলো। বিষন্নতা জেঁকে ধরেছে ওকে।দিশা এতক্ষণ সোনিয়াকে মনোযোগ দিয়ে দেখছিল।
-- হঠাৎ মিলান বলল, সোনিয়া চলো আমরা রুমে যাই।
এক ঝলক হাসির ভঙ্গিতে  'নড ' করার ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল সামান্য সোনিয়া ,হা চলো । অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি ।ওরা চলে গেল। দিশার বন্ধু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে ও থমকে দাঁড়ায় ।বলে ,এই দিশা তুই রুমে যা । এখন তোর একটু রিল্যাক্স দরকার। নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দিশা চলে গেল রুমে।
------------ পরদিন খুব ভরে পাখি ডাকার শব্দে দিশার ঘুম ভাঙল।সে কাউকে কিছু না বলে,একাই চলে এসেছে ঢাকা । দিশার বন্ধু আবীর এখন ও হোটেল কক্ষে অবস্থান করছে। স্বয়ং আবীর ও জানে না দিশা ঢাকায় চলে গেছে।
-- সত‍্য মেনে নিতে পারছে না দিশা ।ও প্রতি মূহুর্তে কষ্ট পাচ্ছে । মনের মাঝে চাপা তুষের আগুন কেবলই জ্বলতে লাগল। একি ঘটে গেল? এখন সতিন সহ‍্য করতে হবে? অসম্ভব ..। পরাজয় জেনেও হাল ছাড়েনা দিশা। 

-------- হঠাৎ সে শ্বাশুড়ি আম্মাকে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানাল । কিন্তু শ্বাশুড়ির কাছে তেমন একটা পাত্তা পেল না। উল্টো শ্বাশুড়ি কি বলল, এত দেখছি শুভ সংবাদ। তবে নাটকীয় মনে হচ্ছে । এ সব কথা শুনে দিশার পিত্তি জ্বলে যায়।এমন একটা দুঃসংবাদ শুনে কোথায় শ্বাশুড়ি আম্মা বৌমাকে শান্তনা দেবে ,তা নয় উল্টে আরও রসিকতা করল। দিশা আর কথা বাড়ালো না।সে ঠেকেছে । মিলান ওকে চরম ভাবে ঠকিয়েছে।
---------- দু'দিন হলো মিলান বৌ নিয়ে বাসায় এসেছে। দিশা মিলানের সঙ্গে একটা কথা ও বলেনি । অভিমান বড় কঠিন জিনিস। কিন্তু দিশার এ অভিমানের মাত্রা অন‍্য  রকম। দিশা ভেবেছিল, মিলান বাসায় এসে তার কাছে ক্ষমা চাইবে । তখন দিশা কি ওদের ক্ষমা করত না? ক্ষমা তো চাইনি উল্টো আরও বলেছে , এখানে তোমার অসুবিধে হলে চলে যাও।  আমি তোমাকে আটকাবো না । 
----------- সরাসরি নয়,আস- পাশ থেকে মিলান দিশাকে তীর্যক ভাবে আক্রমণ করছে ।দিশা খুব কাঁদছে। দিশা মনে মনে মিলানের বিয়ে মেনে নিয়েছে।
----দিশা মানছে সে খুব বেশি স্মার্ট না। ঠিক আছে। কিন্তু এখন সে তার স্ত্রী। বিয়ের আগে এসব পয়েন্ট গুলো তার মাথায় আসেনি কেন? বিয়ের এত কাল পর এসে কেন এত প্রশ্ন হচ্ছে? আমি যথেষ্ট সুন্দরী নই, আবার খুব যে খারাপ তাও না। মিলান নিজেকে কি মনে করে? খুব চালাক--------। মাথার মধ্যে চক্কর দিচ্ছে দিশার ।ও কাঁদতে কাঁদতেই বেসামাল হয়ে পড়েছে। একদিকে মানসিক চাপ অন‍্য দিকে প্রথম প্র‍্যাগন‍্যান্ট এর ধকল ।সব মিলিয়ে পাগল হওয়ার অবস্থা।
---------- দিশার এই কঠিন সময়ে ওর বয়ফ্রেন্ড অর্ণব ওর পাশে দাঁড়ায়।
মাঝে মধ্যে মুঠোফোনে কথা হয় দু'জনের । ব‍্যাপারটা মৌ ভাল মনে নেয় না।ও ভাবে এত কি কথা হয় দু'জনের মধ্যে? কোন প্রবলেম নয় তো ? অনেক চেষ্টা করে মৌ অর্ণবের মুখ থেকে আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারে না।মৌ জীদ করে , এ নাটকের রহস্য সে উদঘাটন করেই ছাড়বে ।
------------ সে বাস্তবিকই খুব ভাল মেয়ে।রাতে ডিনারে বসে অর্ণব লক্ষ্য করে মৌ ভীষণ আপসেট হয়ে আছে। হঠাৎ সে বলল, এই মৌ তোমার কি হয়েছে ? কোন কারণে কি তোমার মন খারাপ? আমাকে বলো প্লিজ ..!  মৌ ঠিক করেছিল , 
আজই সে অর্ণবকে একটা শুভ সংবাদ দেবে ।এত বড় শুভ সংবাদ অর্ণবের জীবনে  দ্বিতীয় বার আসেনি। সত্যিই ও ভীষণ এ‍্যাক্সাসাইটেড হয়ে যাবে। কিন্তু কথাটা বলতে যেয়েই ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল।দিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,কি আবার ? খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমি আগেও তোমাকে বলেছি , ভুল পথে চলো না । সঠিক পথে এস। অর্ণব বলে, হেঁয়ালি ছাড়ো তো ? তুমি কি দিশার কথা বলছ ? আরে ও বেচারীর এখন কঠিন বিপদ । আমি একটু সাহায্য না করলে ও চোখের  জলে ভেসে যাবে ‌। এই দুঃসময়ে ওর পাশে আমাকে থাকতে হবে । তুমি কেন মন খারাপ করছ ?  মন খারাপ করার মত একটা বিশেষ কারণ তো চাই ? 
--- মৌ অন‍্যমনষ্ক কন্ঠে বলল, কিন্তু ঘটনা যদি এ রকম ঘটে , ওকে হেল্প করতে যেয়ে উল্টে তুমিই ফেঁসে যাচ্ছ ?
এই কথা ভেবে আমার মন খারাপ হয়েছে। তুমি ভুলে যাচ্ছ আমাদের নয়ন মনি আসছে এ পৃথিবীতে। কি? মূহুর্তে অর্ণবের মুখের ভাষা বদলে গেল। সত্যি বলছো? আমাদের সন্তান আসছে? কবে ,কখন ? বলো না প্লিজ...! আমি চলে যাচ্ছি আর তুমি শুভ সংবাদ এখন জানাচ্ছ ? আমি চলে গেলে তুমি একা নিজেকে সামলাতে পারবে তো ? ভেবে দ‍্যাখো , তারচেয়ে আমার  ফ্লাইট বাতিল করি ? সেটা ভাল হয় না? তুমি কি বলো? মৌ উষ্ণ স্বরে বলল, উফ্ !তুমি এমন কথা আর বলো না। অনেক সাধনা করে তুমি কানাডার ভিসা পেয়েছ । কানাডার এ‍্যাম্বাসিতে কত বছর চাকরি করছ ভেবে দেখেছ ? এমন সুযোগ বারবার আসবে না।এই সময় আমি অসুস্থ ঠিকই ,সামলে নিতে পারব। তুমি ভেবো না। ছ'মাস পর তুমি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে । দেখতে দেখতে ছ'মাস কেটে যাবে। তোমার টেনশন বাড়লো তাই না অর্ণব? ---- অর্ণব মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, হুম একটু নয় অনেক খানি ।
--- ওরা ডিনার সেরে ঘুমাতে আসল বিছানায়। অনেক কিছুই ভাবছে মৌ ।ওর যে শারীরিক অবস্থা এখন অর্ণবের অবর্তমানে সে নিজেকে সামলাতে পারবে তো ? একটু নার্ভাস ফিল করে মৌ ।
কিন্তু অর্ণবকে সে কিছুই বুঝতে দেয় না।

------------ দু'সপ্তাহ পর অর্ণব কানাডা চলে গেল। স্ত্রীকে সে শ্বশুর বাড়িতে রেখে গেছে। ওর শরীরে এখন বাড়তি যত্নের প্রয়োজন।মৌর দু'চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠে যখন তখন। দেখতে দেখতেই কয়েক মাস কেটে গেল। আর কিছু দিন পর স্বদেশ ছেড়ে তাকে প্রবাসে চলে যেতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যে অর্ণব দেশে আসবে ।মৌ নিয়মিত ডঃ এর কাছে গিয়ে চেকআপ করে আসে ।সব কিছুই ঠিক আছে। অর্ণব সকাল, বিকাল,রাতে তিন চার বার ফোন করে স্ত্রীর খোঁজ খবর নেয় ।
--------- সপ্তাহ খানেক পর অর্ণব দেশে এসেছে।মৌ এখন অনেক সুস্থ । ডঃ বলেছেন,এ সময় আকাশ পথে ভ্রমণ করলে কোন ক্ষতি হবে না। যাওয়ার দু'দিন আগে ডঃ আবার মৌকে ভাল করে চেক আপ করলেন।
ওদের যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।মৌর দু'চোখ বার বার অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠছে ।আজ ওদের ফ্লাইট। হঠাৎ দরজায় ডোর বেল বেজে উঠলো ।মৌ এগিয়ে এসে দরজা খুলে থমকে দাঁড়ায়। বিমর্ষ কন্ঠে উচ্চারণ করল,আরে আপনি ? কেমন আছেন ?দিশা মলিন কন্ঠে বলল, হ‍্যাঁ আমি চিনতে পেরেছ দেখছি । তোমার স্বামী কি একবার আমার সাথে দেখা করতে পারে? মৌ হাসলো তারপর বলল, আমি সত্যিই দুঃখিত। আমারা আর কিছুক্ষণ পরেই চলে যাচ্ছি। এভাবে বলছেন কেন ? আমার স্বামী আপনার প্রেমিক পুরুষ। কোন সমস্যা নেই। ভিতরে আসুন ।মৌর কথা শুনে দিশার চোখ অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠে।ও বলে,থাক আমার জন‍্য তোমাকে আর দুঃখ পেতে হবে না। আমি অভাগী। আমার সংস্পর্শে যারা আসে তাদের দুঃখ ছাড়া আমি আর কিছুই দিতে পারিনা।মৌ তুমি ভীষণ ভাল মেয়ে ।কান্না ভেজা কন্ঠে দিশা আবার বলল,আসলে তোমরা চলে যাচ্ছ শুনে আমি শেষ দেখা করতে এলাম। আমি তোমাদের সঙ্গে যেভাবে জড়িয়ে গেছি,তাতে আর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারিনি । তুমি আবার আমাকে ভুল বুঝোনা দিভাই ।
-- গতকাল আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে । সংসার টিকিয়ে রাখতে পারলাম না। অনেক চেষ্টা করেছি। কখন যেন অর্ণব ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।ওর চোখ ছলছল করে ওঠে।অর্ণব বলে, আমি দিশাকে আসতে বলেছি।
-------দিশা কোন কথা বলতে পারেনা  । সম্ভবত প্রয়োজন ও নেই। নিজেকে সে ভাগ‍্যের হাতে সঁপে দিয়েছে। ওরা এয়ার পোর্টে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠলো ।দিশা বিদায় নিয়ে চলে আসবে ...। কিন্তু বাঁধ সাধলো মৌ।ও বলল, দিশা আপনি আমাদের সঙ্গে এয়ার পোর্টে যাবেন । গাড়িতে উঠুন । দিশা যেতে চাই না। মৌ জোর করে দিশাকে গাড়িতে উঠালো । সর্বোচ্চ আশি স্পীডে গাড়ি ছুটে চলেছে এয়ার পোর্টের হাইওয়ে ধরে।
------- যেতে যেতে মৌ বলে, এতদিন সংসার করেও জীবনের ব‍্যর্থতার দায় ভাগ সবটুকু কি একাই নিলেন? আর ওই পুরুষের কি কোন দায় ভার নেই ? ভুলে যান সবকিছু। আবার নতুন করে বাঁচতে শিখুন। কিন্তু আপনার চলবে কেমন করে? বেঁচে থাকার জন্য একটা অবলম্বন থাকা চাই চাই। আচ্ছা অর্ণব, তুমি তো চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছ । ওখানে একবার চেষ্টা করে দেখ, উনার জন্য কিছু করতে পার কিনা ? আমি যতটুকু জানি, তোমার একটা পাওয়ার আছে । প্লিজ দেখ না ...!
---------- অর্ণব বলে, তুমি খুশি হবে ?
----- মৌ বলল, একটা জীবন যদি বেঁচে যায় , তাহলে আমার এখানে খুশি অখুশির কি আসে যায়। 
------- অর্ণব মুগ্ধ চোখে একবার তাকাল মৌর দিকে ।বলল, আচ্ছা ট্রাই করে দেখি -----।
অর্ণব অফিসে ফোন করে ওর এক কলিগের সাথে এ বিষয়ে কথা বলল । অফিস থেকে আশ্বাস দিয়েছে শতকরা পঁচাশি পার্সেন্ট সমূহ সম্ভাবনা আছে।ওরা এয়ার পোর্টে নেমে গেছে।
--------- দিশার দু'চোখ বার বার অশ্রু সিক্ত হয়ে ওঠছে।সে ভাবে,ভাগ‍্যাকাশে যখন দূর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেয়, তখন চারিদিক কেবল অন্ধকারে ঢেকে যায় ।এই আপ্ত বাক‍্যটি দিশার জীবনে চরম সত্য হয়ে গেল। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে এমন একটা দূর্ঘটনার কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।ভাগ‍্য তাকে কোথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে,সে নিজেও জানে না।আজ কয়েক ঘণ্টা সময় কাটাল সে অর্ণবদের সঙ্গে।
--------- বিদায় বেলায় দিশা কেঁদে ওঠে বলল, মৌ তুমি সত্যিই খুব ভাল মেয়ে। অসাধারণ ।
--------- এখনই অর্ণব মৌকে নিয়ে ইমিগ্রেশন এ ঢুকে যাচ্ছে।ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে , ভালবাসার দিশাকে ছেড়ে যেতে । তবু একটু সহজ ভঙ্গিতে হেসেই সে বলে, হলো না। তুমি ভুল বললে ,আসলে জীবনকে সহজ ভাবে গ্রহণ করার মধ্যেই তো মানুষের মহত্ত্ব, মানুষত্ব ..! 
এই না হলে কিসের মানুষ । মৌর সে সুন্দর মনটা আছে ।ও সত‍্যিই অদ্বিতীয়া  !
---------- ওরা চলে যাচ্ছে, পেছনে পেছনে অর্ণব হাত নাড়ছে । অথচ হাত নাড়ানোর এতটুকু শক্তি নেই দিশার ।
-- বিমান আস্তে আস্তে উড়ে যাচ্ছে আকাশে দিশার দু'চোখের দৃষ্টি ঘেঁষে।এক সময় দিশা হৃদয়ে গভীর শূন্যতা অনুভব করল।
---------- ও এয়ার পোর্ট রোড ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে । ঠিক তখনই ঘটে গেল লোমহর্ষক এক ঘটনা। একটা ট‍্যাক্সি ক‍্যাবের সামনে দ্রুত ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মূহুর্তের মধ্যে ট‍্যাক্সি ক‍্যাব ওকে চাপা দিয়ে চলে গেল। কয়েক জন পথচারী ওকে একটা ক্লিনিকের এমার্জেন্সি ওয়ার্ড এ ভর্তি করল। ওখানকার একজন ডঃ , ডঃ মিলানের কাছের বন্ধু।সে দিশাকে চিনতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে ডঃ মিলানকে ফোন করল। রাতেই মিলান এসে হাজির হলো ক্লিনিকে ।দিশা ততক্ষণে মারা গেছে।ডেড বডি শব ঘরে রাখা হয়েছে। ডাঃ মাহি বন্ধু মিলানকে নিয়ে দিশার ডেড বডি দেখাল ।দেখতো দোস্ত চিনতে পারিস কিনা? এত ভাবির ডেড বডি । ডঃ মিলান দিশার মুখ দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমি ওকে অনেক ভালবাসি।ওর এ দশা হলো কেমন করে? মিলান বেমালুম সত‍্য কথাটা বলে দিল ডঃ মাহিকে ।সে বলল, ও আমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছিল। ডঃ মাহি আৎকে উঠলো যেন ,একি বলছিস দোস্ত ? তুই কি জানিস না সন্তান গর্ভে ধারণ করা থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত ডিভোর্স হয় না। আরে আহম্মক ,ভাবি এখন ও তোর স্ত্রী।ওকে তুই নিয়ে যা ।ওর শেষ কাজটাও তোকে করতে হবে।তুই তার স্বামী।
------------ মিলান কাঁদতে কাঁদতেই বলল,হ‍্যা, দোস্ত তুই ঠিক বলেছিস ।হতভাগী ডিভোর্স সহ‍্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছে।আর আমি গতকাল নেশার ঘোরে ওকে ডিভোর্স দিয়েছি। আমি ভুল করেছি। আমার শাস্তি হওয়া উচিত।
------ একজন নার্স  এগিয়ে এসে দিশার পার্স থেকে ছোট্ট একটা "সুইসাইডাল " নোট বের করে ডঃ মিলানকে দিল । 
'সুইসাইডাল'নোট টা অর্ণবকে লেখা ------------
প্রিয় অর্ণব ,
তুমি যখন স্বদেশ ছেড়ে আকাশে উড়ে চলেছ একটানা বিদেশ বিভূঁইয়ের নেশায় ।
আমি তখন এ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। 
'সুইসাইডাল'নোট টা আমি তোমাকে দেয়ার জন্য এনেছিলাম ।দিতে পারলাম না। ভাল থেকো।
তুমি চলে যাচ্ছ । অথচ কাল আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি আর কি নিয়ে বেঁচে থাকব ? অবশেষে আত্মঘাতীর পথ বেছে নিলাম।
বিদায় ।
হতভাগী দিশা ।
দিশার মোবাইলে একটা ছোট্ট মেসেজ , সেটা তর্জমা করলে অর্থ দাঁড়ায় , মিলান তুমি আমার ডেড বডি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিও ।  আমি এখন একা নই, আমার সন্তান আছে সাথে । ওকে নিয়ে আমি চলে গেলাম।
--------- মিলান একটা অ‍্যম্বুলেন্স ঠিক করে ডেড বডি নিয়ে রওনা হবে ঠিক তখনই দিশার পরিবারের সদস্যরা এসে পৌঁছেছে। সেখানে হৃদয় বিদারক এক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। 
-----------দিশার পরিবার অ‍্যাম্বুলেন্স নিয়ে রওনা হলো।মিলানের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। ক্রমাগত সে গভীর শূন্যতায় ডুবে যাচ্ছে। 
--------- অর্ণবরা উড়ে চলেছে স্বপ্নের দেশে। প্রেমিকার বিয়োগ ব‍্যথা ওকে কি স্পর্শ করছে? আসলে অদ্ভুত এই অনুভূতি স্পষ্ট। হয়তো ওর মন খারাপ। হয়তো অর্ণব কিছুটা বুঝতে পারছে .....।

উল্লেখ্য: গল্পের শেষ পর্ব।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK