বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
Friday, 14 Sep, 2018 12:23:02 am
No icon No icon No icon

দিরাই-শাল্লা আওয়ামী লীগের জন্য কী কারণে দুশ্চিন্তার!


দিরাই-শাল্লা আওয়ামী লীগের জন্য কী কারণে দুশ্চিন্তার!


দীপক চৌধুরী: সাংবাদিক হিসেবে দেশের অবহেলিত বা অনাদরে থাকা বিভিন্ন জনপদ দেখার সুযোগ হলেও দিরাই-শাল্লা নামের সুনামগঞ্জের এই অবহেলিত জনপদ এদেশে সম্ভবত দ্বিতীয়টি নেই। গত বছরের ৩০ এপ্রিল ডজনখানেক মন্ত্রী-এমপি-আমলা নিয়ে নিজের চোখে শাল্লা দেখতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বন্যায় বুরো ফসলের ভয়ঙ্কর আগ্রাসন ও তলিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শুনে এসেছেন তিনি। প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রের নিয়মনীতি অনুযায়ী দেশ চালানোর এক অসাধারণ যোগ্যতার অধিকারী শেখ হাসিনার প্রিয় সম্পদ হচ্ছে দেশের মানুষ। তাই জায়গাটিকে সবোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে যাওয়া তাঁর। দেশের মানুষকে অকৃত্রিম  স্নেহের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন এই নেত্রী। অথচ এর উল্টোটাই যেন চোখে পড়ে অবহেলিত জনপদ দিরাই-শাল্লায়। এই এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়, অপ্রিয় হলেও সত্য গ্রামীণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত মানুষেরা নৌকায় ভোট দিলেও উন্নয়নের সঠিক বার্তা পায় না। এখানে নেই স্যানিটরি ব্যবস্থা, নেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যাতায়াত-যোগাযোগ ব্যবস্থা দুরুহ, বর্ষায় ‘আফাল’ থেকে বাড়ি রক্ষার উপায় নেই, নেই জীবনের শেষ ঠিকানার কবর বা শ্মশান। বর্ষা মওসুমে ভয়াবহ অবস্থা। বিস্ময়কর বিষয়, মাইলের পর মাইল পার হলেও সেখানে চোখে পড়ে না কোনো কবর স্থান, সেখানে চোখে পড়ে না কোনো শ্মশানের স্থান। আমাদের অগ্রগতি, উন্নয়ন ও তৃণমূলকে শক্তিশালী করার জন্য রাজধানী থেকে যে বার্তা দেওয়া হয় তাও এখানকার তৃণমূলে পৌঁছে না, পৌঁছানো হয় না। মানুষের কষ্টগুলো ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয় না, ভাগবাটোয়ারা করা হয় ভিজিএফ, রিলিফ, সরকারি সবরকম সহযোগিতা। গত বছর উপ-নির্বাচনে এমপি  ড. জয়সেন গুপ্তকে পাওয়ার পর মানুষের আগ্রহ বেড়েছিল। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেলো যেন।
জাতীয় সংসদের এই আসনটিই ছিল আওয়ামী লীগের। এই আসন আওয়ামী লীগের অক্ষয় কুমার দাসের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্বাধীনতার পর ৪৭টি বছর এর নেতৃত্ব ছিল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর সৃষ্ট শূন্যতার কারণে এখন এই আসনটিকে ঘিরে নাকি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও চিন্তিত। কারণ, এটি একবার হাতছাড়া হলে রাজনীতির অশুভশক্তি এখানে নতুন করে ঘাঁটি তৈরি করবে। এটাও বলা দরকার, শুধু এটি একটি নির্বাচনি এলাকা হিসেবে বিবেচ্য নয়। ’৭০-এর নির্বাচনে এটি নতুন মাত্রা পেয়েছিল। ফলে ২০১৮-তে আওয়ামী লীগ এই আসনটিকে কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেবে না।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। তৃণমূলের মানুষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাগুলো গ্রামপর্যায়ে পৌঁছেনি। দিরাই-শাল্লায় সরেজমিনে গিয়ে পিলে চমকানোর মতো তথ্য পেলাম। এটি কিছুদিন আগের কথা। তৃণমূলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো গণভবনে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে ইউনিয়ন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং দলীয় নির্বাচিত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান যোগ দেওয়ার কথা। প্রতিটি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং দলীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে ঢাকায় দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তা তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা হয়নি। দিরাই-শাল্লার তৃণমূলের অনেক নেতার কাছেও ওই দাওয়াতের চিঠি নাকি পৌঁছানো হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তৃণমূলের নেতাদের অন্ধকারে রাখার এই অপচেষ্টা কেন, কার স্বার্থে? এই দোষ কার? তৃণমূল নেতার নাকি অন্য কারো?


 
আমরা জানি, দেশের অগ্রগতি আর উন্নয়নের যে চিত্র দশ বছর আগে কল্পনায় ছিল না, কেউ চিন্তাও করতে পারেনি তাই হতে যাচ্ছে। তা কেবল দেশরতœ শেখ হাসিনার কারণেই। কমিউনিটি ক্লিনিকের চ্যালেঞ্জ,মাটির ঘরে বিদ্যুৎ, কিংবা গ্রামের মানুষ টেলিভিশনে ডিস সংযোগ পাবে এমনটা তো ভাবনায়ও ছিল না। অথচ বাস্তবেই এসব হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ টেলিভিশনে শেখ হাসিনার নির্দেশ শুনে, বক্তৃতা বোঝে, রাজনীতির বিচার –বিশ্লেষণ করে। একটি দল বা হাতেগোণা দুইতিনটি দলের অংশগ্রহণ ব্যতীত নির্বাচন হলেও ভোটারদের কিছু যায় আসে না, এমন মন্তব্যই তাদের। তৃণমূলের মানুষ চায় যথাসময়েই একাদশ সংসদ নির্বাচন হোক। তারা কাজ করতে চায়, কর্মসংস্থান চায়, রাজনীতির নামে পেট্রলবোমা নিক্ষেপে প্রাণ হারাতে চায় না, সহিংসতা চায় না, ২০১৩-১৪ সালের মতো পুড়ে মরতে চায় না। অতীতে দেখা গেছে এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে, সুন্দর সংসারে হাহাকার দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল মানুষের জীবনে।
মানুষ স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চায়। যেখানে কাজ করে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে বাঁচা যাবে । পুত্র-কন্যাকে লেখাপড়া করানোর চিন্তা মানুষের মননে, মস্তিষ্কে। তৃণমূল এটাও বোঝে, বিএনপি-জামায়াত এদেশে নতুন করে সংকট সৃষ্টি করতে চায়। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাংলাদেশকে পেছনের দিকে হাঁটাতে চায়। বিশেষ করে সর্বশেষ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও গুজবকে ঘিরে সৃষ্ট সমস্যাকে কৃত্রিম সংকট মনে করে তারা। বিএনপি-জামায়াত উন্নয়ন চায় না, যারা উন্নয়ন দেখে না তাদের চোখে শুধুই অন্ধকার। অথচ বিদ্যুৎ গ্রামে আছে, ফ্যান ঘুরে, ডিস আছে, গ্রামের মানুষ টেলিভিশন দেখে। সবরকম চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের খবর তারা মনোযোগ দিয়ে শোনে। তারা বিচার-বিবেচনাও করতে জানে। টকশোয় সরকারের একতরফা সমালোচনা মানুষকে আহত করে।

সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা উপজেলার ধল, কুলঞ্জ, হাতিয়া, তাড়ল, কালধর, জগদল, রাজানগর, ললুয়ারচর, শ্যামারচর, রনারচর, রফিনগর, মাহমুদনগর, বাংলাবাজার, সাতপাড়া, শাল্লা, ঘুঙ্গিয়ারগাঁওসহ হাওর জনপদের গ্রামগুলোতে বর্ষা মওসুমে একমাত্র যাতায়াত মাধ্যম নৌকা। প্রিয় বাহন নৌকায় ঘুরে তৃণমূলের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়েছি। আর দেখে অবাক হয়েছি; তৃণমূলের এসব সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা কত কষ্টের! লড়াকু ও সংগ্রামী মানুষের চোখে কেবলই উন্নত জীবনের স্বপ্ন। তারা বারবার ভোট প্রয়োগ করে কিন্তু আশা পূরণ হয় না। তাদের চোখে যেন কেবলই স্বপ্নভঙ্গের দুঃস্বপ্ন। রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কথায় কথায় তারাই প্রশ্ন করেন, শাল্লা বা দিরাইয়ের মতো অবহেলিত জনপদে গ্রেনেড-বোমা বিস্ফোরণ ঘটে কীভাবে? জনসভায় নেতার বক্তব্য শুনতে এসে মানুষ প্রাণ হারায় কেন? আমি উত্তর দিতে পারি না। সিলেট শহরে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারীর বাড়ি দিরাইয়ের জগদল বা রাজানগর হয় কীভাবে? এসব প্রশ্নের জবাব মানুষ পায়নি, সহসাই পাবে তাও নয়। আসল গলদ খুঁজে বের করতে চায় মানুষ।

সরকারের অনেক ইতিবাচক ও কল্যাণের রাজনীতি রয়েছে। সেই ইতিবাচক বিষয়গুলো যথাযথ প্রচার নেই বলেই চলে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চিন্তা-চেতনার অগ্রগতি এবং পরিস্থিতি উন্নয়নের চাবিও মানুষের হাতেই। কিন্তু এর দায়ভার যাদের নেওয়ার কথা তারাই বিয়েবাড়ির ‘অতিথির’ ভূমিকায়। দেশের অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন অর্থনৈতিক সুফলের জন্য কৃষকদের কাছে যেতে হবে। কৃষকদের মাথায় তুলে রাখার কথা শেখ হাসিনাও জোর দিয়ে বলে থাকেন। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন, যারা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনেই বেশি নজর দিচ্ছেন। সুতরাং তাদের ছাড় দেওয়া যাবে না।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের প্রধান সমস্যা হলো, মানুষ অনেক ও সম্পদ কম। ঠিক এর উল্টোটা হাওর-জনপদ দিরাই-শাল্লায়। এখানে দেখলাম ভালো ফসলের জন্য সেচই মুখ্য। নদীর নাব্যতা একদম নেই, ভীষণ সংকট। কৃষকের সীমাবদ্ধতাও আছে। এখন নতুন উৎপাত বজ্রপাত। মাঠে কৃষকরা জীবন বাজি রেখে কর্ম করছে। মৃত্যুর মুখেও তারা কাজ করতে চায়। কিন্তু সেই সুযোগ করে দেবে কে? সার্বিকভাবেই গ্রামঅঞ্চলের অবস্থা প্রায় অভিন্ন থাকার কথা। কিন্তু বহু এলাকায় অগ্রগতি-উন্নয়নে ভরপুর, কিছু এলাকায় কেবল ছোঁয়া লেগেছে। আর কিছু এলাকায় হাহাকার-হতাশ বিদ্যমান। দিরাই-শাল্লা সচিত্র প্রতিবেদন আমার মৃুঠোয়। সরেজমিনে দেখতে গিয়ে অসহায় তৃণমূলের অভাব-অভিযোগ শুনে বিস্মিত হয়েছি। তাদের স্পষ্ট উচ্চারিত প্রশ্ন, কৃষকদের অপরাধ কোথায়? কৃষিবান্ধব সরকারের আলামত কৃষকদের নয়নে পড়েনি। তৃণমূলের জীবনাচার নিয়ে চমৎকার রচনাশৈলী হতে পারে, সাহিত্য হতে পারে, কষ্ট ঘুচাবে কে? তাদের হাতে কাজ থাকে না; সাত মাস বেকার। জীবন বাজি রেখে ফলানো ফসল ঘরে তুলবার উপায় নেই। বন্যার করালগ্রাসে তারা অসহায়। হাওরে বজ্রপাত চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠতে। জরুরি দরকার হাওরে আশ্রয়কেন্দ্র। গোপাট নির্মাণ। ধানের মূল্য নেই। সরকারের বেধে দেওয়া মূল্য জেনেও কৃষকরা টাউট-বাটপারদের হাতে জিম্মি। তথাকথিত জনপ্রতিনিধির কাছে নালিশ দিয়ে অসহায় কৃষক পড়ে বিপদের মুখে। কোনো বিচার নেই, অবিচারের ‘খড়্গ’।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে,  শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য অনেক জায়গাতে মানুষ নতুন মুখের নেতৃত্ব চায়। জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তন চায় মানুষ। চায় নতুন ব্লাড, তারুণ্য। তারা জানে কী কী বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্রুত দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করতে হলে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের উচিৎ হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সুচিন্তিত প্রকল্পের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য তরুণ মেধাবী জনপ্রতিনিধি দরকার। তারুণ্যের যে জাগরণের কথা আমরা মুখে বলি বাস্তবেই তা দেখতে হলে সুযোগ দিতে হবে। আমরা বুঝি, এখন আর বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল নয় দেশ। সহায়-সম্পদ কাজে লাগাতে পেরেছি বলেই বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে আমরা এগিয়ে চলেছি। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা চাই, ৮০ ভাগ মানুষের বাস গ্রামে, তাদের প্রয়োজন মতো খাদ্যশস্য দরকার। তারা খরা ও বন্যার বিরুদ্ধে লড়তে জানে, বেঁচে থাকে কর্মের মাধ্যমে। তাদের জন্য দরদ রয়েছে এমন তরুণ জনপ্রতিনিধিই দরকার। দেশকে সামনের দিকে তারাই এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ঔপন্যাসিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK