শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Thursday, 13 Sep, 2018 01:09:46 am
No icon No icon No icon

একটি সুইসাইডাল নোট


একটি সুইসাইডাল নোট


হাসনা হেনা রানু: ছুটির দিনে অর্ণব চৌধুরী দুপুরের লাঞ্চ করে বিছানায় ঘুমাতে গেল।আজ ওর স্ত্রী মৌর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে।মৌ জীদ করে পাশের ঘরে ঘুমাতে গেল। অর্ণব পাশ ফিরে দেখল ওর পাশের স্থান শূন্য পড়ে আছে।তার মানে ,মৌ পাশের ঘরে। অর্ণবের আর ঘুম আসে না।এপাশ ওপাশ করতে থাকে।
-------- দশ মিনিট পর মৌ চলে আসে এ ঘরে ।বলে,এই  অর্ণব তোমার পাশে একটু শোব?  অর্ণব গম্ভীর কণ্ঠে বলল, কেন? মৌ হাসলো , আসলে দূরত্ব ঘোচাতে এসেছি । পাশের ঘরে একা একা একদম ভাল লাগছিল না ।দেখ , ঘরে বাইরে আমরা মাত্র দু'জন মানুষ। সেই আমরা যদি ঝগড়া করে একে অপরের সাথে কথা না বলি , মুখ না দেখি । তাহলে পরিবেশটা একদম নির্জন হয়ে যায় না? ভেবে দেখ ।
----------- না,হয় না । তখন ও গম্ভীর শোনাল অর্ণবের কন্ঠস্বর।মৌ তুমি লিমিট ক্রস করো না। তাহলে ফল ভাল হবে না।যাও ----- পাশের ঘরে গিয়ে ঘুমাও । আমাকে আর ডিস্টার্ব করোনা। প্লীজ... ! একা থাকতে দাও। অর্ণবের কথা শুনে মৌ অসাড় হয়ে গেল।এসব কি বলছে অর্ণব ...।

------------ শীতের বেলা দুপুর না গড়াতেই আকাশ কেমন ধোঁয়াটে মেঘে ছেয়ে গেছে। এমন মেঘলা দিনে অর্ণবের মনটা খারাপ হয়ে যায়। অবশ্য মন তার ক'দিন থেকে ভাল নেই। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সে চলে যাচ্ছে কানাডা।এর মধ্যে মৌ সামান্য বিষয় নিয়ে ওর সঙ্গে ঝগড়া করছে ? অর্ণবের এক বান্ধবী এসেছে সিলেট থেকে । বিয়ের পর এই প্রথম সে অর্ণবের বাসায় আসল। অর্ণব দিশাকে ভীষণ ভালবাসত ওদের বিয়ে হবে এরকম একটা কথা হয়েছিল দুই পরিবারের মধ্যে। হঠাৎ কিযে হয়ে গেল। দিশার বড় বোন দীপা হুট করে তারই এক ক্লাসমেট ডাঃ বন্ধুকে ধরে নিয়ে এলো বাসায়। একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে ছাড়ল। ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ের মতো অবস্থা হলো। কোন জাক -জমক ছাড়াই দিশার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর দিশা হাজবেন্ড এর সঙ্গে সিলেটে চলে গেল।দিশা মন থেকে কখনোই ওর হাজব্যান্ডকে মেনে নিতে পারেনা। কিছু দিন পর দিশা বুঝতে পারে মিলানকে বিয়ে করে সে সুখী নয়।মিলান  সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা,শ‍্যামলা এবং মিডিয়াম স্বাস্থ্যের।
এভাবে প্রায় তিন বছর কেটে গেল। ধীরে ধীরে দিশা আবিষ্কার করে মিলান যে প্রাইভেট ক্লিনিকের ডঃ তারই এক সহকর্মী মেয়ে ডঃ এর সঙ্গে মিলানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মাঝে মধ্যে মিলান ডাঃ সোনিয়াকে বাসায় নিয়ে আসে।দিশা পাশের ঘর থেকে ওদের দু'জনের ফিসফিস কথা শোনে ।
মিলানের প্রশংসায় ভীষণ খুশি হলো ডঃ সোনিয় । কেমন উগ্র পোশাক পরে এসেছে মেয়েটা। অর্ধেক নগ্ন বলা যায়।এরা উচ্চ ঘরের মেয়ে। স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করে। মিলান মাঝে মধ্যে  সোনিয়ার হাত ধরছে , মুখে হাত স্পর্শ করছে ।আর ডঃ সোনিয়া আহ্লাদে আটখানা হয়ে মিলানের কাঁধে গলে পড়ছে। পাশের ঘর থেকে জানালা দিয়ে সব কিছু দেখতে পাই দিশা । ঘরে ফুল স্পীডের ফ‍্যানের বাতাসে জানালা , দরজার পর্দা উড়ছে । মন না চাইলেও দিশার চোখ চলে যায় পাশের ঘরে। নির্জন কক্ষে মিলান তার বান্ধবীকে নিয়ে কি এমন কথা বলছে ? যেখানে আমি মিলানের স্ত্রী হয়ে ওদের মাঝে থাকতে পারিনা? স্বামীর এমন স্বভাব একটু ও ভাল লাগে না দিশার।
--------------মিলান প্রায় স্ত্রীকে বলে, তুমি বড্ড সেকেলে। তোমার পোশাক আশাক গুলো আমার খুব অপছন্দ। তোমার চাল চলন কথাবার্তা কিছুতেই প্রাণ নেই।আরে তুমি আমার বান্ধবী ডঃসোনিয়াকে দেখ ,সে কত স্মার্ট মেয়ে। আমার সহকর্মী বন্ধু বান্ধবদের স্ত্রীরা কত ফ‍্যাশনেবল ড্রেস পরে ঘুরছে, পার্টিতে যাচ্ছে আড্ডা দিচ্ছে। ওদের মধ্যে কোন জড়তা নেই।আর তুমি আমার স্ত্রী হয়ে ঘরের কোণে পড়ে আছ ।যা আমার একদম পছন্দ নয়। নিজেকে বদলাও বুঝলে ? তুমি কেমন মেয়ে ? আমার পাঁচ জন বন্ধুর সঙ্গে মিশতে পার না ।মিলানের প্রশ্নের উত্তর দিল না দিশা । সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে ও কেবলই মিলানের মুখটা জরিপ করছে।মিলান অন‍্যমনস্ক ভাবে চুপ করে থাকে। দিশার বুকের ভেতর অস্থিরতা বেড়ে যায়।ও ভাবে মিলান আমাকে ভুল বুঝে দূরে সরে যাচ্ছে না তো ------- অন‍্য কার ও কাছে । আমাকে জানতে হবে।
---------- মিলান প্রায় সোনিয়াকে নিয়ে অনেক দূরে ট‍্যুরে যায়। সপ্তাহ খানেক পর ফেরে।বিষয়টা দিশার কানে ও আসে।এরই মধ্যে ক্লিনিকে একটি গুজব ছড়িয়েছে । ডঃ মিলান আর সোনিয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।আর তারা হানিমুন করতে কোন দ্বীপে উড়াল দিয়েছে। ক্লিনিকের তৃতীয় পক্ষের কেউ একজন ফোন করে আজই বিকেলে দিশাকে এসব গোপন তথ্য দিল। লোকটির কথা বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল দিশার।ওর বুকের ভেতরটা কেমন থরথর করে কাঁপছে।হাত- পা কেমন হীম হয়ে আসছে।কি করবে এখন সে? ছুটে যাবে কক্সবাজার সোনা দ্বীপে ? দিশা শূন‍্যে দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বলল, তুমি একজন জেলাস প্রেমিক । অপেক্ষা কর আমি আসছি । তোমার হানিমুন আমি ছোটাচ্ছি ।দিশা দু'হাতে মুখ ঢেকে ভীষণ কাঁদছে।
---------- মিলান আর সোনিয়া বিকালে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। হঠাৎ সোনিয়া বলল, এই জান তোমার ওয়াইফ যদি আমাদের বিয়ের কথা জানতে পারে তাহলে কি হবে বলো তো ? সে কি সব কিছু ঠান্ডা মাথায়  মেনে নেবে ? না মাথা গরম করবে ? কোন টা সোনা ? খুব নিষ্ঠুর ভাবে সে বলে উঠলো,আরে বাবা------রূপ যখন তোর নেই , তখন অন্য কিছু দিয়ে স্বামীকে ধরে রাখ তুই --- । পুরুষ মানুষের মন যেমন চাই তেমন করে নিজেকে সাজিয়ে রাখ তুই ।এরা বড্ড বোকা মেয়ে ।কথা শেষ করে সোনিয়া এক চোট হেসে নিল । 
------------- মিলান বলল, তোমার কথা ঠিক আছে, কিন্তু একটা কথা কি জান সোনিয়া ----- তোমার জানা প্রয়োজন , পুরুষ মানুষরা কখনোই  স্ত্রীর প্রেমিক হয় না।মিলানের সতর্ক বাণী শুধু সোনিয়ার মনে গেঁথেই যায়নি বরং দুচিন্তা ও বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা।
-------- সোনিয়া প্রশ্ন করল, কিন্তু বিয়ের আগে তো তুমি আমার প্রিয় প্রেমিক ছিলে ? হ‍্যাঁ, তা ছিলাম বটে ! আর এখন ? শুধুই স্বামী ।বিয়ে না করলে আমি সারা জীবন তোমার ভাল প্রেমিক থেকে যেতাম।এটাই পার্থক্য । কি বলছো তুমি? মিলান তোমাকে বিয়ে করে তাহলে বলছো আমি ভুল করেছি? আর বিয়ে না করলে ........। মিলানের কথা গুলোই আবার পুনরাবৃত্তি করল...

সোনিয়া তারমানে? তুমি বলতে চাইছো এখন তোমার কাছে আমার প্রয়োজন কমে গেছে? মিলান কোন কথা বলে না । খুব অপাংতেও  মনে হয় নিজেকে তখন সোনিয়ার। ওর কেমন একটা জীদ হয় । সে ভাবে মিলান , একবার যখন বিয়ের গীটে শক্ত করে বেঁধেছি তখন সারা জীবন আমার আঁচল ধরে নাচতে হবে। আমি নিজেও ভাল নাচতে জানি ,আর তোমাকে ও নাচাবো। আমি দেশের বাইরে পড়াশোনা করে এসেছি। তোমার চেয়ে কত কত স্মার্ট ছেলেদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা। ওদের কাছে তুমি কিছুই না । তোমার দৌড় আর কতদূরে ? তুমি আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।
------------ মিলান বলল,এই তুমি কার ধ‍্যান জ্ঞান করছো ? সোনিয়া বিড়বিড় করল, কেন তোমার? তুমি আমার প্রেমিক হবে না তো কি অন‍্য নারীদের প্রেমিক পুরুষ হবে ? আমি তোমাদের মতো স্বামীদের খুব ভাল করেই চিনি । সোনিয়ার ঠাট্টায় তরল হলো না মিলান ।সে হো হো করে হেসে উঠলো। আচ্ছা তুমি এখন ও সেই প্রেমিক- ট্রেমিক নিয়ে ভাবছ? মিলানের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও বিস্তৃত হলো ।ও এক হাতে সোনিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে দু'তিনটা চুমু দিল ।বলল, জান সোনিয়া তোমাকে আজ খুব আকর্ষণীয়া লাগছে ।
---------- সূর্যটা এখন নেমে এসেছে ঢেউয়ের কাছাকাছি। উল্টাপাল্টা বাতাস এসে ঝাপটা দিচ্ছে ওদের শরীরে। হঠাৎ মিলান বলল, এই সোনিয়া দেখ , সূর্যটা ঢেউয়ের মাঝে কেমন লুকোচুরি খেলছে ।কি দারুণ লাগছে । সোনিয়া অন‍্যমনস্ক ভাবে বলল, হুম দারুণ। মনে হচ্ছে সাগরের বুকের ওই জল কোন নারী আর ঢেউ তুমি। তোমারা দু'জনেই সাগরের জলে জল কেলি করছ। কি বলো তুমি? মিলান একটু গম্ভীর হলো , কোন কথা বলল না সে । দৃষ্টিতে শুধু সমুদ্র ধরে রাখলো, সাগরের বুকে বাতাস  ঢেউ ভাঙ্গছে অবিরত।
----------- আজ কাল মিলানের অনেক কিছুই সোনিয়া বুঝতে পারে।আর এ নিয়ে প্রায় সে দু'একটা বেখেয়ালি কথা বলে বসে । মিলান সে সব কথা ধরেনা কখনো।সে মনে মনে ভাবে , সোনিয়া হুট করে তুমি আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য করলে । আমাকে চিনতে তোমার এখনো অনেক সময় লাগবে।
------------- পরদিন দিশা মিলানের ক্লিনিক থেকে সব তথ্য নিয়ে ওর এক ক্লাসমেট আবীরকে নিয়ে সোনা দ্বীপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। ওরা চট্টগ্রামের বিমানে এসেছে। উঠেছে সোনা দ্বীপের রেস্ট হাউসের মিলানদের পাশের রুমে। বিকালে আর বাইরে বের হলোনা দিশা। ওরা থাকে কাঁচপুর এলাকায়। অনেক ভেবে দিশা এ পথে পা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই দ্বিতীয় স্ত্রী সহ মিলানকে হাতে- নাতে ধরা।
----------- সন্ধ্যার আগেই মিলান রা রুমে ফিরেছে।দিশা পাশের রুমে অস্থির ভাবে হাঁটাহাঁটি করছিল।আর বিড়বিড় করছিল, আমি মেয়ে মানুষ সেই জন্য তোমার কাছে আমার কোন মূল্য নেই? আমি অসহায়---! আমি উপায় হীন ! তোমাকে বিয়ে করে আমার  দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। হঠাৎ দিশার রুমের দরজায় নক করে আবীর বলে,দিশা ,এই দিশা শুনছিস ? ওরা এসেছে ---। দিশার সঙ্গে ওর ফ্রেন্ড আবীরের খুব ভাল সম্পর্ক। বলা যায় অনেক টা ভাই-বোন সম্পর্ক ।দিশা দু'টো রুম বুকিং দিয়েছে। একটা নিজের,অন‍্যটা আবীরের। হঠাৎ দিশা রুম থেকে বের হয়ে সোজা মিলানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়।মিলান রা তখন এগিয়ে আসছে রুমের সামনে। হঠাৎ ভুত দেখার মতো চমকে উঠে মিলান। ও নিজেকে বিশ্বাস করতে পারে না ।সে ভাবে ,এ আমি কাকে দেখছি ? ঠিক দেখছি তো না ভুল?
এবার স্থির পলকে তাকাই মিলান । নিজেকে ততক্ষণে সে সামলে নিতে নিতে বলল, তুমি এখানে? মূহুর্তে ওর মনে হলো, মেরুদন্ড হীন ,আবেগ হীন এক মেয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, আক্রোশ নিয়ে ফেটে পড়ে মিলান দিশার ওপর । ------- কেন এসেছ ? জবাব দাও ....। কথা বলছ না কেন? তুমি পাথর নাকি? তোমার কি লজ্জা শরম নাই? আমার পিছে লাগতে তুমি সুদূর কক্সবাজার ছুটে এসেছ বয় ফ্রেন্ড নিয়ে? 
------------ বড় নির্বাক ম্লান মুখে চোখ তুলে তাকাল দিশা , চিৎকার করে উঠলো----- হ‍্যাঁ, এসেছি । আমার স্বামীর কতটা অধঃপতন হয়েছে সে আমি  স্ব-চোখে দেখতে এসেছি ।অন‍্যের মুখে ঝাল খেয়ে কি লাভ ? আচ্ছা তুমি কি মানুষ ?গর্জে উঠলো মিলান ।ফ‍্যাকাশে বিবর্ণ ঠোঁটের কোণ একটু কাঁপল দিশার ।না, আমি মানুষ নই। তোমাদের ভাষায় মেয়ে মানুষ ---- । 
মানুষ সে তো একচেটিয়া তোমরা । পুরুষ মানুষ।
অদ্ভুত যান্ত্রিকতায় এগিয়ে আসলো মিলান ------ 
ঠাস ..ঠাস করে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিল দিশার মুখে।
 

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK