শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮
Tuesday, 10 Jul, 2018 11:52:52 am
No icon No icon No icon

গালি-সংস্কৃতি ও অশালীনতার প্রতিযোগিতা


গালি-সংস্কৃতি ও অশালীনতার প্রতিযোগিতা


শান্তা মারিয়া: কোটা আন্দোলন হোক কিংবা বিশ্বকাপ- বাঙালি জীবনে গালি ছাড়া কোন সার্থকতা নেই। যে কোন ইস্যু, যে কোন কারণ, যে কোন পরিস্থিতি হোক না কেন গালাগাল না করতে পারলে, অশ্লীল কথা না বলতে পারলে বাঙালি যেন তৃপ্তি পায় না, মনের ঝালও মেটাতে পারে না। আর অবধারিতভাবে সেই সব গালাগাল আবর্তিত হবে নারী ও যৌনতা নিয়ে।

কেউ কাউকে পছন্দ না করলেই হলো, শুরু হবে অশ্লীল গালাগালের বন্যা। বিরাগভাজন যদি নারী হয় তাহলে তার উদ্দেশ্যে যৌন আক্রমণমূলক কথাবার্তা, অশ্লীল গালি ছুঁড়ে দেওয়া হবেই। সেই নারীর বয়স যেমনি হোক, অবস্থান যাই হোক তিনি যে বায়োলজিক্যালভাবে নারী শুধু সে কারণেই তাকে অশ্লীলভাষায় আক্রমণ করতে এবং যৌন আক্রমণমূলক গালাগাল করতে কেউ থেমে থাকবে না। এমনকি সেই নারী মাতৃসমা হলেও। আবার বিরাগভাজন যদি পুরুষ হন তাহলে প্রথম যে গালিটি তার উদ্দেশ্যে বর্ষিত হবে সেটা নিশ্চিতভাবেই তার মাকে বা বোনকে কেন্দ্র করে। একজন পুরুষ যদি পিতৃসম বা তেমন শ্রদ্ধাভাজনও হয়ে থাকেন তাহলেও তাকে কেন্দ্র করে যৌনতা ও নারীঘটিত বিষয় নিয়ে কদর্য মন্তব্য চলবে।

‘কয়েক বছর আগে নারায়ণগঞ্জের এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের টেলিফোন সংলাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে এমন সব কদর্য গালাগাল ছিল যেটা কোন মানুষের শোনবারও উপযুক্ত নয়। এগুলো হলো বেসরকারি গালি। অন্যদিকে সরকারি গালিও রয়েছে। ‘সরকারি গালি’ শুনে ভাবতে পারেন সেটা আবার কি?’

কেন আমাদের এই মানসিকতা? এটা যে কত বিব্রতকর তা বোঝানোর জন্য কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। কিছুদিন আগে আমি, আমার পরিচিত এক ভদ্রমহিলা আমাদের কিশোর সন্তানদের নিয়ে এক জায়গায় যাচ্ছি। পথের মাঝখানে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে আছি। পাশে একটি সিএনজির সঙ্গে এক রিকশার ধাক্কা লেগেছে। ব্যস আর যায় কোথায়, রিকশা চালক ও সিএনজি চালকের মধ্যে শুরু হয়ে গেল অশ্লীল গালাগালের প্রতিযোগিতা। দুই চালকই তাদের পরষ্পরের মা বোনকে উদ্দেশ্য করে যথেচ্ছা গালাগাল চালাতে লাগলো। গাড়ির ভিতর আমরা দুই মা নিজেদের সন্তানদের সামনে চরম বিব্রতবোধ করে সেই মুহূর্তে বধিরের ভূমিকা পালন করছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছি প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে যে যত অশ্লীল গালি দিতে পারে সে তত বড় নেতা বলে নিজেকে জাহির করতে পারে। এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই নারীরাও। নিজে একজন নারী হলেও প্রতিপক্ষ নারীকে যখন তিনি আক্রমণ করেন তখনও নারীর প্রতি বিশেষভাবে ব্যবহৃত গালিগুলোই ছুঁড়ে দেন। তার ভাষার ভিতরেও উঁকি দেয় পুরুষতান্ত্রিক কদর্য মানসিকতা। সম্প্রতি নারীবাদী নামে পরিচিত একাধিক ব্যক্তির কদর্য পাল্টা গালি ছোঁড়াছুঁড়ি চোখে পড়ে নিজে লজ্জিত বোধ করেছি।

কাব্যচর্চায় জীবন অতিবাহিত করা একাধিক কবির পরষ্পরের উদ্দেশ্যে অশ্লীল গালাগালি দেখেও শংকিত হয়েছি। কারণ যারা ভাষার সবচেয়ে সুষমামণ্ডিত অংশ নিয়ে কাজ করেন তারা কেন এত কুবাক্য চালাচালি করবেন?

কয়েক বছর আগে নারায়ণগঞ্জের এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের টেলিফোন সংলাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে এমন সব কদর্য গালাগাল ছিল যেটা কোন মানুষের শোনবারও উপযুক্ত নয়। এগুলো হলো বেসরকারি গালি। অন্যদিকে সরকারি গালিও রয়েছে। ‘সরকারি গালি’ শুনে ভাবতে পারেন সেটা আবার কি?

সরকারি আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গালি শুনবার দুর্ভাগ্য যাদের হয়েছে তারা অবশ্য আমার কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারবেন। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে, থানায় নিতে পারে, রিমান্ডে নিতে পারে আরও অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু গালি দিতে পারে কি? সে অধিকার কি তাদের আছে? কিন্তু আইনগতভাবে অধিকার থাকুক আর না থাকুক তাদের মুখ যে কি পরিমাণ খারাপ এবং তারা যে কি পরিমাণে অশ্লীল গালাগাল করে সে কথা ভদ্রভাষায় প্রকাশের অনুপযোগী। বিশেষ করে যদি কোন নারী আসামী হিসেবে ধরা পড়ে বা কোন নারীকে যদি গ্রেপ্তার করা হয় তাহলে বাছা বাছা অশালীন গালিতে তাকে অভিষিক্ত করা একটা স্বাভাবিক রীতি।

এবার আসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসামাজিক ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের সম্পর্কে প্রায়ই এমন সব মন্তব্য ও জঘন্য কথাবার্তা নজরে আসে যে অবাক হয়ে ভাবি এরা কোন পরিবেশে বড় হওয়া মানুষ! এরা কি ভদ্র ভাষায় কথা বলাটাও শিখতে পারেনি? নারীকে যৌন ইঙ্গিত করে এমন সব অশ্লীল কথাবার্তা এরা বলে যে মনে হয় এরা কোনদিন কোন মায়ের গর্ভে জন্মও নেয়নি, কোন নারীর স্তন্য পান করে জীবন ধারণও করেনি।

অনলাইন পত্রিকায় কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জানি একেকটি নিউজের নিচে পাঠকদের কাছ থেকে কীসব জঘন্য গালাগাল ও মন্তব্য আসে। যদিও এডমিন যদি সক্রিয় হন তাহলে সেগুলো প্রকাশ্যে দেন না। মনে প্রশ্ন জাগে কেন এত গালাগাল ও অশ্লীল কথার ঝোঁক? এর পিছনের মানসিকতাই বা কি? এই বিকৃত মানসিকতার মানুষরাই ভিড়ের মধ্যে নারীকে যৌন নিগ্রহ করে, এরাই সুযোগ পেলে ধর্ষকের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করে। অনেকটা সেই লিটল রেড রাইডিং হুড রূপকথার ভদ্রবেশী শয়তান নেকড়ের মতো।

গালাগাল একটি জাতির নিন্মরুচিকেই প্রকাশ করে। একেবারে শিশুকাল থেকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুকে ভদ্রতা শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। শিশু যেন কোনভাবেই গালাগাল না দেয় বা না শেখে সেদিকে নজর দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো পরিবারের অভিভাবকরা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেরাই যখন ‘গালিভূতে’ আক্রান্ত তখন ভূত আর ছাড়বে কিভাবে?

লেখক: শান্তা মারিয়া, কবি ও সাংবাদিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK