শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮
Saturday, 16 Jun, 2018 05:59:53 pm
No icon No icon No icon

ঈ-দিয়ে ঈদ অথবা ই-দিয়ে ইদ শব্দ লিখা নিয়ে বিতর্ক, দ্বিধা, দু:শ্চিন্তার প্রসঙ্গ


ঈ-দিয়ে ঈদ অথবা ই-দিয়ে ইদ শব্দ লিখা নিয়ে বিতর্ক, দ্বিধা, দু:শ্চিন্তার প্রসঙ্গ


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির ভাষা বিজ্ঞানী ও গবেষকরা 'ঈদ'-কে অসংগততর ও প্রচলিত আর 'ইদ'কে সংগততর ও অপ্রচলিত বানান বলে নির্ধারণ করেছে! বিগত ২০১৭ সালের রমজান মাসে প্রথমবার জনমনে চিন্তা, প্রশ্ন, বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তাহলে ঈদ বা ইদ কোনটা সঠিক? নাকি দুটাই? এই ব্যাপারে বাংলা একাডেমির গবেষনা, সংকলন এবং অভিধা, বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক মোবারক হোসেন বলেছেন, ১৯৯২ সালে দ্বিতীয় সংস্করণে প্রকাশিত ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমি: ব্যবহারিক বাংলা অভিধান', ১৯৯৪ সালে প্রথম প্রকাশিত জামিল চৌধুরী সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমি: বাংলা বানান-অভিধান'-এ সংগততর ও অপ্রচলিত বানান হিসাবে ইদ, ইদগা, ইদ মোবারক ব্যবহার করা হয়েছে। আবার ঈ অংশে প্রচলিত বানান হিসাবে লেখা হয়েছে ঈদ। একইভাবে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারীর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত জামিল চৌধুরী সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমি: আধুনিক বাংলা অভিধান'-এর ১৮১ পৃষ্ঠায় 'ইদ' শব্দটির ভুক্তিতে বলা হয়েছে, 'ইদ' ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচলিত বানান।

অভিধানে এমন সংস্করণ সাধারণ মানুষের নজরে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার। অনেকেই এজন্য বাংলা একাডেমিকে নিয়ে প্রবল ব্যঙবিদ্রুপ ও সমালোচনা শুরু করেন। আবার অনেকে গঠনমূলক সমালোচনাও করেছেন। এই ব্যাপারে যারা প্রথম দিক থেকেই অগ্রগন্য ছিলেন তাদের মধ্যে লেখক সাখাওয়াত টিপু তাদের অন্যতম। তিনি বলেন, ঈদ শব্দটি এসেছে মূলত আরবি ভাষা থেকে। আরবি বানান ও উচ্চারণ অনিযায়ী ইদ বানান তাই ভুল। মূলত ঈদ শব্দে ঈ ব্যবহার করেছিলেন বিদ্রোহী কবি এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউশনের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য বলেন, এটা ঠিক যে আরবি ভাষায় ঈদ শব্দটি "দীর্ঘ ই"-এর মতো উচ্চারিত হয়। বাংলায় যাঁরা ঈদ বানান লিখেছিলেন অতীতে, তাঁরা আরবি ভাষায় ঈদ শব্দের উচ্চারণে "দীর্ঘ ই" আছে বলেই সেটা করেছিলেন। কিন্তু আরবিতে কোন শব্দের কী উচ্চারণ বা বানান হয়, সেটা বাংলা বানান বা উচ্চারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে না ভাবলেও চলে। তবে ঈদ বানানটি ইতিমধ্যে আমাদের ভাষিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে বলে এই বানান ব্যবহার করলে কোনো ক্ষতি নেই। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, 'ঈদ' প্রচলিত বানান। আরবি ভাষায় 'ঈদ' শব্দটি 'দীর্ঘ ই' দিয়ে লেখা হয়। যাঁরা ঈদ বানান লিখেছিলেন অতীতে, তারা আরবি ভাষায় ঈদ শব্দের উচ্চারণে 'দীর্ঘ ই' আছে বলেই সেটা করেছিলেন। 'ঈ' দিয়ে ঈদ লিখলে আরবি উচ্চারণ এবং ব্যাকরণ অনুযায়ী ঠিক হয়। বাংলা ব্যাকারণ অনুযায়ী আধুনিক বাংলা বানান সংস্কারে 'ইদ' করা হয়েছে। তবে বহু মানুষ প্রচলিত বানানে লিখতে অভ্যস্ত। এটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তাই 'ঈদ' ও 'ইদ' দুই-ই চলবে। দুটিই ঠিক আছে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে আরো অধিকতর সঠিক, সহজতর ও আধুনিকরণ করার লক্ষ্যে বা নামে অনেক বাংলা ঐতিহ্যবাহী শব্দকেও বিকৃত এবং এই নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, বিভেদ, ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বাংলা ভাষাকে অধিকতর সহজবোধ্য এবং আধুনিকরণ করার অতি উৎসাহ এবং তার ধাক্কায় ঈ ঊ, ঋ, ণ, ষ বর্ণগুলোকেও এখন বিদেশি উচ্চারণের বর্ণ বলা ও চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটা আসলে বাঙালী মুসলমানদের নিজস্ব দেশজ ইসলামী ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধের প্রতি সূক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত। যা অত্যন্ত দুঃখজনক, দৃষ্টিকটু, বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সেই ঘটনার রেশ ধরেই বাংলা সাহিত্যের শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ-এর মত একটি সহজবোধ্য এবং সর্বজনগ্রাহ্য শব্দ লিখতে গিয়ে বা লেখা নিয়ে নিয়ে এই অদ্ভূত বিতর্ক ও দ্বিধার সৃষ্টি করা হয়েছে সম্প্রতি। আমাদের সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং বাঙালী মুসলমানদের শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্রুতিমধুর ঈদ শব্দটি নিয়ে কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি অযথাচিত ও পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও দ্বিধার সৃষ্টি করছে। ঐতিহ্যবাহী ঈদ-কে তারা এখন ইদ লিখছে। ফলে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, দ্বিধা ও বিতর্কের সৃষ্ট হয়েছে ঈদ? না ইদ? কোনটি সঠিক এবং সহজবোধ্য? নাকি দুটিই?

ঈ-দিয়ে ঈদ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা/কোরবানীর ঈদ, ঈদগা, ঈদ মোবারক, ঈদে মিলাদুন্নাবী এই শব্দগুলোর সাথে উক্ত ঈ-বর্ণটি শতাধিক বছর ধরে আমাদের দেশের এবং দুই বাংলার কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, গবেষকদের হাজার হাজার কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সংবাদপত্র/পত্রিকা, বই/গ্রন্থে বহুলভাবে প্রতিনিয়ত লিখিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তার আলোকে দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, প্রেস ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এই শব্দটির বহুল ব্যবহার হচ্ছে এবং আমরা সাধারণ জনগণ তা দেখে আসছি। ঈ-দিয়ে ঈদের স্থলে ই-দিয়ে ইদ লেখার আদিখ্যেতা/অতি উৎসাহে সহজবোধ্যতার চিন্তা, যুক্তি, দাবী তুলে শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ শব্দটি পরিত্যাগ বা বিলোপ করার এই অদ্ভূত চিন্তা, যুক্তি, দাবী, মানসিকতার সত্যিই কি কোন অনিবার্য প্রয়োজন আছে? আমাদের কাছে কি আমাদের পূর্বপুরুষদের এবং প্রাচীন গৌরবময় ঐতিহ্যের কোন ঐতিহাসিক সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক মূল্য এবং প্রয়োজন নেই? তাছাড়া এই ঈ-দিয়ে ঈদ শব্দটি তো কোন যুক্তাক্ষর বা দুর্বোধ্য অসুন্দর কোন বর্ণ বা শব্দ নয়। বরং চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী ঈদ শব্দটি লেখার/পড়ার সৌন্দর্য এবং এই শব্দের সাথে ঈদের আমেজ, আনন্দ অনুভূতির যে ব্যঞ্জনা তা নব আবিষ্কৃত ও ব্যবহার করা ইদ শব্দের মধ্যে নেই বা খুজে পাওয়া যাবে না সহসা। সময়, যুগ, প্রয়োজন বা চাহিদার সাথে সাথে পরিবর্তন, সংস্কার, বাতিলের দাবী আসবে এবং হবেও। কিন্তু কোন জাতীয় প্রয়োজন ব্যতিত দেশ, জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জাতীয় রুচিবোধের সাথে অতপ্রতোভাবে সম্পর্কিত কোন ব্যাপারের ক্ষুদ্রাংশও পরিবর্তন, সংস্কার বা বাতিলের দাবী উঠানো এবং তা করা কোন বুদ্ধিমানের বা দূরদর্শিতার কাজ নয় এবং হতে পারে না। এগুলো আসলে অতি আধুনিকতার বাংলিশ চিন্তা-ভাষার কুফলের প্রভাব, অযথা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করার ফন্দি বিশেষ, বিকৃত মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ এবং প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ বিরোধীতার নামান্তর। এই ব্যাপারে সর্বাগ্রে শিক্ষিত দেশপ্রেমিক সাধারণ জনসাধারণকে বলিষ্ঠ ও অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। এই অশুভ শক্তির অপতৎপরতাকে প্রতিরোধ করতে হবে নিজেদের দেশজ ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ রক্ষা করার আন্তরিকতা দিয়ে। চিরাচরিত নিয়মে ঈ-দিয়েই ঈদ হবে, থাকবে এবং তা টিকে থাকুক আমাদের সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য এবং মননশীলতার ভেতর/মাঝে। ঐতিহ্যকে রক্ষা করুন এবং সংরক্ষণ করতে সচেতন হোন। সব কিছুকে আধুনিকতার নামে এবং আধুনিকতার ভেতর মুছে ও হারিয়ে দিতে আমরা পারি না এবং করা উচিতও হবে না ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং নতুন প্রজন্মকে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে দেবার জাতীয় স্বার্থে। ঈদের আনন্দ, আমেজ, উল্লাসকে ঐতিহ্যবাহী ঈদ শব্দের মাঝে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে ধরে রাখার দায়িত্ব ও কর্তব্য আমার, আপনার, সকলের। সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক। 
লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা:
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK