বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Friday, 15 Jun, 2018 08:22:58 pm
No icon No icon No icon

ঈদ কি সত্যিই আনন্দের?


ঈদ কি সত্যিই আনন্দের?


শান্তা মারিয়া : অন্যদিনগুলোতে তবু ভুলে থাকা যায়। কিন্তু উৎসবের দিনগুলোতে আরও বেশি করে যেন মনে পড়ে। এ বছর বাবার জন্য ঈদের নতুন কাপড় কেনা হয়নি। আর কোনওদিন কেনা হবে না। অথচ গত বছরও তিনি ছিলেন। একটি মানুষ ৯১ বছর পৃথিবীতে ছিলেন। তার সব চিহ্ন, স্মৃতি কি এত সহজে মুছে যায়, বা ভুলে থাকা যায়? মনে পড়ে ছোটবেলার ঈদের দিনগুলো।
ঈদ মানেই চকবাজারে ঈদের মেলা। ৭৯ বেগম বাজার আমার দাদার বাড়ি। ঠিক চকের মোড়টাতে। ঈদের দিনে যখনি আলী নেকির দেউরি পার হতাম মনটা আগাম খুশিতে নেচে উঠত। আভাস মিলত মেলার। বেগমবাজার থেকেই মেলার সোরগোল কানে আসতো। চকের মোড় থেকে শুরু করে উর্দুরোড অবধি ছড়িয়ে থাকতো মেলা। কত যে খেলনা। মাটির হাড়িপাতিল, পুতুল, কবুতর, হাতি-ঘোড়া। টিনের তলোয়ার, বাঁশি, কাগজের সাপ, মাটির হাড়ির সঙ্গে দুটো কাঠি লাগানো বাজনা, ঢোল, কাঠের পুতুল, ছোট্ট ছোট্ট চেয়ার টেবিল খাট। চিনির পুতুল, বাতাসা, মুরলি, কটকটি, বাদাম তক্তি, কুলফি, চটপটি দেদার। আর নাগর দোলা তো ছিলই। আমি মেলায় যেতাম বাবার সঙ্গে। ঈদের দিন সকালে বাবা দশ টাকা দিতেন মেলার জন্য। চকের বাড়িতে যাবার পর মেজচাচা-চাচী ও লালচাচা-চাচীকে সালাম করতাম। দুই চাচার কাছ থেকেই পাঁচ টাকা করে পেতাম। পুরো বিশটাকাই খরচ হয়ে যেত মেলায়। বরং খেলনা কেনার জন্য বাবা দরকার মতো আরও কিছু দিতেন। টিনের আর মাটির হাড়ি পাতিলের সেট প্রতি বছরই কেনা হতো। আরেকটা খেলনাও খুব কেনা হতো। বুড়ো-বুড়ি। সেই বুড়ো-বুড়ির মাথা নড়তো ঘাড়ের কাছে বসানো স্প্রিংয়ের কারণে। বাবা কোনদিন খেলনা কিনতে আমাকে মানা করেননি। কোনও নিষেধ ছিল না বলেই হয়তো নিজের মধ্যেই একটা সীমারেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। খুব বেশি টাকা আমি বা ভাইয়া কেউই কখনও খরচ করতাম না। 
চকবাজারের বাড়িতে ঈদের দিনটিতে যেন আত্মীয়দের মিলনমেলা। সবাই বেশি আসতেন মেজচাচীর ঘরে। মেজচাচী ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। যেমন স্নেহশীল তেমনি দরদী। গরীব আত্মীয় স্বজনের প্রতি তার সহানুভূতি ও উদারতার কোন তুলনা ছিল না। এখানেই দেখতাম মাস্তান চাচাকে। তিনি আমাদের আত্মীয় নন। পাড়ার দরবেশ ধরনের মানুষ। একটু ছিটগ্রস্ত। তবে ভালো মানুষ। দরিদ্র এই মাস্তানচাচা আপন আত্মীয়ের মতোই সমাদর পেতেন। ঈদের দিনে জর্দা সেমাই আর দুধ সেমাই এবং চটপটি থাকবেই। শেলীবু, মিলিবু, মুন্নুবু, রডিবু, রোকসানাবু, রহমতভাই, আনোয়ারভাই, মনোয়ারভাই, তরুণভাই, সাদেকভাই আর আবদুল্লাহ মিলে চাচাতো ভাইবোনদের জমজমাট আড্ডা। শুধু সবচেয়ে বড় আমানভাই বিদেশে থাকতেন বলে তার সঙ্গে দেখা হতো না। কাঁঠাল বাগান থেকে আসতেন মেজচাচীর ভাইবোনেরা। মন্টুমামা, সন্তুমামা, মিনিখালা, তাদের ছেলেমেয়েরা সবাই আমার বন্ধু। বিশেষ করে ডালিয়া। ছেলেমেয়েদের আনন্দ কলরবে বিশাল বাড়িটি সরগরম হয়ে উঠতো। সবার হাতেই বাঁশি আর ড্যাং ড্যাং খেলনা। আওয়াজে কান পাতা দায়। 
ঈদের দিনে বড়চাচা ও সেজচাচাকে সালাম করতে তাদের বাড়িতেও যাওয়া হতো বৈকি। 
আবার সেগুন বাগিচায় নানার বাড়িতেও ঈদের আনন্দ জমতো। বিশেষ করে নানী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন যেন আনন্দের হাট বসতো সে বাড়িতে। সুইটিখালার ছেলেমেয়েরা কান্তা আপা, শুভ্রা আপা, লোপা, উপলভাই, উজ্জ্বলভাই, কল্লোলভাই, কিশোর। অন্যদিকে সেজআপা, মেজআপা, লীথিবু, আপামনি, মামাতো ভাইবোনরা সবাই মিলে আড্ডার যেন শেষ নেই। কুমারভাই নানা রকম মজার জোকস বলে আসর মাতিয়ে রাখতেন। আমাদের বাড়িতে সবাই বেড়াতে আসতেন সাধারণত ঈদের পরদিন। 
ঈদ শুরু হতো চাঁন রাত থেকে। ইসলামপুর থেকে কেনা হতো আতর। মিশকাম্বার, গোলাপখাস, দরবারি মোগল ইত্যাদি। আমাদের বাড়ির একটি আতরদানিতে সেগুলো সাজিয়ে রাখা হতো বৈঠকখানায়। সঙ্গে তুলো থাকবে অবশ্যই। মেহেদি ছাড়া ঈদ ভাবাও যায় না। পাতা মেহেদি বেটে নকশা করে হাতে লাগানো হতো। সকালবেলা মা সেমাই রাঁধবেন নিজের হাতে। বাবা ও ভাইয়া ঈদের নামাজ পড়ে ফিরলে তারপর সেমাই খাওয়া হবে। ঈদের দিন গোসল করতে হবে ভোর সকালে। তারপর ঈদের ড্রেস পরে সেজেগুজে রেডি হতে হবে। রাতে আর কিছু দেখা হোক না হোক টিভিতে ঈদের নাটক এবং আনন্দমেলা মাস্ট। আমজাদ হোসেনের লেখা জব্বর আলির ঈদের নাটক ছিল সবচেয়ে মজাদার। 
ঈদ শপিংয়ে যেতাম আমরা চারজন একসঙ্গে। বাবা ও ভাইয়া সুইস ভয়েল বা অন্য কোন কাপড় দিয়ে শার্ট বানাতেন ক্যালকাটা টেইলারিং থেকে। রমনা ভবন থেকে প্যান্টপিস কেনা হতো। জর্জেট, শিফন, সিল্ক ছিল মায়ের পছন্দ। একবার কিনলেন পাকিজা শাড়ি, আরেকবার সিলসিলা শাড়ি। 
ছোটবেলায় শুনতাম ঈদ নাকি তিনদিন। তাই তিনদিনের জন্য তিন চারটি নতুন জামা না নিলে আমার মন ভরতো না। গতানুগতিক কাপড়চোপড় হলে চলবে না। বাবার একটু রাশিয়াপ্রীতি ছিল। সোভিয়েত নারী পত্রিকা থেকে ডিজাইন নিয়ে আমার জন্য স্কার্ট টপস বা বড় গাউন বানানো হতো। ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় অবশ্য সালোয়ার কামিজই চলতো। আমার পায়ের মাপ খুব ছোট। সিনড্রেলার জুতো কেনার মতো অসীম ধৈর্য নিয়ে ঢাকা শহরের প্রতিটি জুতার দোকানে আমাকে নিয়ে যেতেন বাবা। 
ঈদের জন্য বাবা আমার কাপড়টাই সবচেয়ে আগে কিনতেন। পরে আমিও ঈদ শপিংয়ে বাবার জন্যই প্রথম কিনতাম। প্রতিবছরই তিনি জিজ্ঞাসা করতেন ‘তোর শাড়ি কেনা হয়েছে? কেমন কিনলি একটু দেখি তো।’ সেই আয় খুকু আয় গানটির মতো। গত বছরও অসুস্থ অবস্থায় জিজ্ঞাসা করেছেন আমার শাড়ি কেনা হয়েছে কিনা। এ বছর আমি নিজের জন্য কিছুই কিনিনি। নিজের জন্য কিছুই কিনতে ইচ্ছা হলো না। কেবলি মনে পড়ছে বাবার কথা। চাচা, ফুপু, খালা, মামাসহ সব মৃত প্রিয়জনদের কথা। ঈদের খুশিটা যেন মিলিয়ে গিয়ে কান্নায় রূপ নিয়েছে। বাবাকে ছাড়া ঈদের দিনটায় কোন আনন্দ নেই।

লেখক : শান্তা মারিয়া, কবি, সাংবাদিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK