মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮
Thursday, 14 Jun, 2018 12:22:31 am
No icon No icon No icon

বিশ্বের তিন প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম ইহুদী-খ্রীষ্টান-ইসলামের মধ্যকার তুলনামূলক ধর্মালোচনা


বিশ্বের তিন প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম ইহুদী-খ্রীষ্টান-ইসলামের মধ্যকার তুলনামূলক ধর্মালোচনা


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: ইহুদী ধর্মের আবির্ভাবের প্রায় আড়াই হাজার বছর পর এবং খ্রীষ্টান ধর্মের আবির্ভাবের ছয়শত বিশ বছর পরে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর জন্ম হয়েছে। তার মাধ্যমে বিশ্বে ইসলাম ধর্ম পরিপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রচারিত হয় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। তাই ইসলাম ধর্মে এবং মুসলমানরা ইহুদীদের টেম্পল অব সুলেমান/টেম্পল মাউন্টকে মসজিদুল আকসা কেন বলছে এটা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের কাছে এক বিরাট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা? এবং বিস্ময়! তারা বলছে, খ্রীষ্টের জন্মের হাজার বছর পূর্বে ৯৬১-৯২০বিসি/খ্রীষ্ট পূর্বাব্দতে ইহুদীদের নবী ও রাজা সলোমান কর্তৃক টেম্পল সুলেমান/টেম্পল মাউন্ট নির্মাণ করেছিলেন। তাহলে ইহুদী নবী ও রাজা সলোমান এবং ইহুদীরা কি টেম্পল সলোমানে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে খ্রী:পূ: ৬২০-তে মুসলমানদের জন্য মসজিদুল আকসা বানিয়ে রেখেছিল? তা না হলে মুসলমানরা ইহুদীদের টেম্পল অব সলোমানকে আল আকসা বলছে কেন? তাদের এই প্রশ্ন ও কৌতুহলের খুব সহজ উত্তর ইসলাম ধর্মের দর্শন এবং বিশ্বাসের ভেতরই খুজে পাওয়া যাবে। ইহুদীদের নবী মোসেহ/মুসা, খ্রীষ্টানদের যীশু খ্রীষ্ট/ঈশা, ইসলাম ও মুসলমানদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা:)। পবিত্র আল কুরআনের বর্ণনানুযায়ী ইব্রাহীমের সময়কাল থেকে মুহাম্মাদ (সা:)-এর সময়কাল পর্যন্ত সকল নবীই ইসলামের/মুসলমানদের নবী। তাই মুসা, ঈসা নবী, মহানবী এবং তাদের অনুসারী ইহুদী, খ্রীষ্টান, মুসলমানরা আহলে কিতাবী। ইহুদী এবং খ্রীষ্টানরা হচ্ছে মুসলমানদের কিতাবী ভাইবোন। তাই প্রকৃত ইহুদী এবং খ্রীষ্টানরা ইসলামের এবং মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য ইসলামে এই ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে মুসলমানদের আন্ত:বিবাহ অনুমোদন আছে। মুসলমান ছেলে/পুরুষরা ইহুদী এবং খ্রীষ্টান মেয়ে/নারীদের বিবাহ করতে পারবে। ইসলাম ধর্মে এবং মুসলমানরা তাদের ধর্মালয়/ইবাদতের নির্দিষ্ট স্থাপত্যের স্থানকে মসজিদ বলে থাকে। এজন্যই ইসলাম ধর্মের গ্রন্থে একেশ্বরবাদীদের এবাদতখানা টেম্পল সলোমান/টেম্পল মাউন্টকে মসজিদুল আকসা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মুসলমানরা এই স্থানটিকে মক্কার হারাম শরীফ, মদীনার মসজিদুল আকসা হিসাবে ইসলামের তৃতীয় পবিত্র গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ হিসাবেই মর্যাদা দিয়ে থাকে। দাউদ, মুসা এবং ঈসা নবীর জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন কিংবদন্তি থাকলেও মুহাম্মাদ(সা:)-এর মক্কা এবং মদীনায় তার কুরাইশ বংশধারা, তার বাবা-মার পরিচয়, তাদের পরিবারে ও ঘরে তার জন্ম, শৈশব-কৈশর-যৌবন-পৌড়-বৃদ্ধ কালের সকল পর্যায়ে তার ব্যক্তিগত জীবনধারা, ইসলাম প্রচার, মদীনায় মুসলিম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মক্কা বিজয়, মদীনা ও মক্কা শাসনকার্য, ওফাত (দেহত্যাগ), মদীনায় তাকে কবরস্ত করা সবই ঐতিহাসিকভাবে সত্য এবং প্রমাণভিত্তিক। মুসা ও ঈসা নবীর কোন সমাধিক্ষেত্র না থাকলেও মুহাম্মাদ(সা:)-এর রওজা/সমাধিক্ষেত্র মদীনার মসজিদে নববীতে আছে।

ইসলামীয় বিশ্বাসের মতে, হযরত ইব্রাহীম(আঃ) থেকে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ(সা:) পর্যন্ত সকল নবীই ইসলামের এবং মুসলমানদের নবী। কিন্তু প্রধান আসমানী কিতাবধারী নবীগণ রাসূল হিসাবে অধিক মর্যাদাপ্রাপ্ত/সম্পন্ন। দাউদ(আঃ) যাবুর, মুসা/মোসেহ তাওরাত/তোরাহ/ওল্ড টেস্টমেন/পুরাতন বাইবেল, ঈসা/যীশু খ্রীষ্ট ইঞ্জিল/নিউ টেস্টামেন/নতুন বাইবেল, হযরত মুহাম্মাদ(সাঃ) কুরআন শরীফ নামক আল্লাহর আসমানী কিতাবের বার্তাবাহক হিসাবে মানব জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছেন। ইব্রাহীম/আব্রাহাম এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস এবং তার ইবাদতের মাধ্যমে একত্ববাদের বিশ্বাসের ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় দাউদ, মুসা, ঈসা, মুহাম্মাদ(সাঃ)-কেও আল্লাহ তার একত্ববাদ প্রচারের জন্য আসমানী কিতাব দিয়ে মানবজাতির মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রেরণ করেছিল। কিন্তু দাউদ, মুসা ও ঈসা আল্লাহর মনোনিত ধর্ম ইসলামের একত্ববাদকে মানুষের মাঝে সঠিকভাবে প্রচার করলেও তাদের মৃত্যু/নিহত হবার পর তাদের অনুসারী ইহুদীরা তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ তোরাহ এবং খ্রীষ্টানরা তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বাইবেলকে বিশুদ্ধ ও অবিকৃত রাখেনি। বরং তাদের ধর্মযাজক রাব্বি এবং পাদ্রীরা নিজেদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারাকেও এই তোরাহ এবং বাইবেলে লিখে ঢুকিয়েছে। এই ধর্মগ্রন্থের বিকৃতি থেকে পবিত্র কুরআন ঐতিহাসিকভাবে রক্ষা পেয়েছে। অক্ষত আছে আদি অকৃতিম ও বিশুদ্ধ অবস্থায় দেড় হাজার বছর ধরে।

জেরুজালেমের রাজকীয় ইহুদী শাসকগোষ্ঠী লাখো জনতার সম্মুখে যীশু খ্রীষ্টকে ধর্মদ্রোহী হিসাবে দোষী সাবস্ত করে নির্মমভাবে নির্যাতন ও ক্রুস বিদ্ধ করে তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু খ্রীষ্টানরা ইহুদীদের নবী মোসেহকে শ্রদ্ধা করে এবং ইহুদীদের ওল্ড টেস্টামেন্টকে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসাবে গ্রহন করেছে নিজেদের নিউ টেস্টামেন্টের সাথে। ইহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় সম্প্রদায়ই ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সা:)-কে মিথ্যা নবী দাবীকারী বলে প্রত্যাখান করেছে। ইহুদীরা মোসেহকেই শেষবার্তা বাহক বলে বিশ্বাস করে। কঠোর একেশ্বরবাদী হওয়া সত্ত্বেও ইহুদীরা চিরকালই বিচ্ছিন্ন গ্রোত্র হিসাবেই আরব জাহানে এবং সারা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিচ্ছিন্নভাবে থেকেছে। তারা তাদের একেশ্বরবাদী ইহুদী ধর্ম বিশ্বাসকে আরবের পৌত্তলিক বিশ্বাসীদের মধ্যে বিস্তার ঘটাতে এবং তাদের মধ্যে পৌত্তলিকতার অবসান ঘটাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইহুদী ধর্ম জন্ম নেবার পর থেকে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ আড়াই হাজার বছর আরবের নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পৌত্তলিক এবং অগ্নি উপাসকই থেকে গিয়েছিল। এমন কি একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী এবং সর্বপ্রকার পৌত্তলিকতার বিরোধী ইহুদীরাও অনেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুশরিকদের পৌত্তলিকতার প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের একেশ্বরবাদী বিশ্বাস ভুলে বিভিন্ন মুশরিক ধর্মাচারে, দেবদেবীর পূজা-অর্চনায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।

একইভাবে ইসলামের আবির্ভাবের ৬২০ খ্রী:পূর্বে আরেক একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ধর্মমতও মানুষের মাঝে আল্লাহর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যুর পর খ্রীষ্টান ধর্মতাত্ত্বিকরা একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ধর্মকে নতুন এক পৌত্তলিক ধর্মে রূপান্তরিত/পরিণত করেছে। এজন্য এখন পর্যন্ত ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে একশ্বেরবাদী ধর্ম হিসাবে ইহুদী ও ইসলাম ধর্ম এবং তার অনুসারী ইহুদী ও মুসলমানদের মধ্যেই ধর্মাদর্শন এবং ধর্মাচারের মধ্যে অধিক সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। 
ফলে প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত ধর্মীয় দর্শন এবং ধর্মাচারের ক্ষেত্রে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ইহুদী ও মুসলমানরাই বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের অনুসারী আছে। আর এজন্য খ্রীষ্টানের চেয়ে ইহুদী ও মুসলমানদের মধ্যেই ধর্মীয় সাদৃশ্য অধিক বিদ্যমান ও দৃশ্যমান। যেমন: উভয় ধর্ম এবং তার অনুসারী সম্প্রদায়ের মধ্যে ১/কিবলা(প্রার্থনার জন্য প্রধান ধর্মালয়ের দিক)আছে। (ইহুদীদের জেরুজালেমের আল আকসার ওয়েস্ট ওয়াল আর মুসলমানদের মক্কার কাবা শরীফ)। ২/আযান ধবনি আছে(মুসলমানরা আল্লাহু আকবর আর ইহুদিরা সীমা ইসরাইল বলে তাদের অনুসারীদের ধর্মালয়ের দিকে এবং প্রার্থনা করার জন্য আহবান করে থাকে।) ৩/উভয়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে হালাল গৃহপালিত পশু কোরবানী করে/দিয়ে থাকে, ৪/ধর্মীয় বিধান আছে (ইহুদীদের হালাকা আর মুসলমানদের শরীয়া), ৫/হালাল-হারাম খাবারের ব্যাপার আছে, ৬/ছেলেদের ত্বকের ছেদন/সুন্নাতে খাতনা করানো হয়, ৭/ইহুদীরা তিন এবং মুসলমানরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং ছেলেরা মাথায় টুপি পড়ে)। ৮/দুই ধর্মেই শুয়র খাওয়া হারাম/নিষিদ্ধ। অপরদিকে দিকভ্রান্ত একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টানদের কোন কিবলা নেই, তাদের বড় অংশ ঈশ্বর-যীশু-মেরি এই ত্রিতত্ত্ববাদে বিশ্বাসী, তারা চার্চে যীশু খ্রীষ্ট ও তার মা মেরির কাল্পনিক মূর্তি/প্রতিমা স্থাপন করে থাকে। ছেলেরা সবাই তক ছেদন/সুন্নাতে খাতনা করে না, মাথায় টুপি পড়ে, খাবারে কোন হালাল-হারামের বাছাই নেই, শুয়রের মাংস তাদের প্রিয় খাবার।

তবে সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মুসলিম বিরোধীতার ক্ষেত্রে ইউরোপ-উত্তর আমেরিকার ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ। কারণ প্রথমত খ্রীষ্টানরা ইহুদীদের ধর্মাদর্শ ও জায়নিজম মতবাদ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। দ্বিতীয়ত ইহুদীদের অধিকাংশ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাস করায় তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতায় লালিত জনগোষ্ঠী।
তৃতীয়ত ইসলাম আবির্ভাবের প্রথম থেকেই ইহুদী-খ্রীষ্টানদের অভিন্ন শত্রু হচ্ছে মুসলমানরা। সম্প্রদায়গত এবং সাম্রাজ্যগত স্বার্থে ধর্মীয়, আর্থ-রাজনৈতিক কারণে এই উভয়ের কাছে মুসলমানরাই সবচেয়ে বড়, প্রধান এবং চিরন্তন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত এবং বিবেচিত হয়ে থাকে। এজন্য তারা উভয় উভয়ের সাথে হাত মিলিয়ে চলে এবং তাদের মধ্যে এক অটুট স্বাভাবিক ও কৌশলগত মিত্রতার বন্ধন গড়ে উঠেছে। 
চতুর্থত ইহুদী-খ্রীষ্টান রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পুজিপতিদের মূল ব্যবসাই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শোষন, লুন্ঠন, অস্ত্র, যুদ্ধ-সংঘাতের ব্যবসা। আর তারাই হচ্ছেই এই দুই সম্প্রদায়ের সমাজ, অর্থনীতি-রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রেস-ইলেক্ট্রিক মিডিয়া, গবেষনা, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাশক্তির মূল চালিকা শক্তি। 
পঞ্চমত বিশ্বের জায়নিস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের চার্চ অব দ্যা গড এভাঞ্জেলিকানদের অটুট মিত্রতার বন্ধন। আর জায়নিস্ট হচ্ছে ইহুদীদের মধ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠী। ফিলিস্তিন ইহুদীদের আদি বাসভূমি টেম্পল অব সলেমান/মাউন্ট টেম্পল হচ্ছে তাদের প্রধান আদি ধর্মালয়। বাইবেলে ঈশ্বর তাদের বার বার একটি ইহুদী ভূমি দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইসরাইলই হচ্ছে তাদের সেই বাইবেল বর্ণিত ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ইহুদী আবাসভূমি। যা ঈশ্বর তাদের নবী জেকোবকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জায়নিস্টইরা ইহুদীদের আদি জাতিগত/সম্প্রদাগত পরিচয় বনি ইসরাইল নাম থেকেই ইসরাইল নামটি গ্রহন করেছে। ফিলিস্তিনীদের ভূমি দখল করাকে ন্যায়/সঠিক যুক্তিসঙ্গত মনে করে। এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতের অনুসারী ইহুদীরাই হচ্ছে জায়নিস্ট। অপরদিকে আমেরিকার ইভালজেলিস্টরা হচ্ছে খ্রীষ্টানদের মধ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠী। তারা জায়নিস্টদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। তারা মূলত গোষ্ঠী স্বার্থে ইহুদীদের ধর্ম ও জায়নিজম দ্বারা প্রভাবিত এবং তাদের স্বার্থের পক্ষে কাজ করতে তৎপর। তাই তারা মনেপ্রাণে জায়নিজম এবং ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষাকে অন্ধভাবে সমর্থন করে থাকে। তারা মনে করে ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে শাসন করার শক্তি, ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জন করেছে। কারণ তারা ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে রক্ষা করছে। কিন্তু এত কিছুর পরও যীশু/ঈসার হত্যাকারী সম্প্রদায়ের মানুষ হিসাবে ধর্মপ্রাণ খ্রীষ্টানদের অনেকের কাছেই ইহুদীরা ঘৃনার পাত্র। ইউরোপের খ্রীষ্টানদের মধ্যে ইহুদী বিদ্বেষ আজও বিদ্যমান। ফলে ইউরোপ, আমেরিকা-কানাডাসহ সকল পশ্চিমা/অপশ্চিমা দেশেই অধিকাংশ ইহুদী নাগরিক নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে জীবনযাপন, চলাচল, চাকুরী, ব্যবসা করে থাকে।

যীশু খ্রীষ্ট তার খ্রীষ্ট ধর্মমত প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ববর্তী নবী মুসা এবং তার পরবর্তী নবী মুহাম্মাদ (সা:)-এর পর্যাপ্ত/নূন্যতম সময়/বয়স পাননি। খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারের একদম প্রথমদিকেই ইহুদীদের হাতে ধৃত ও নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছেন। তাই প্রথমত যীশু খ্রীষ্ট মুসার ইহুদী ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (সা:)-এর ইসলামের ন্যায় একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ধর্মমতকে একটি পরিকল্পিত অবকাঠামো/রূপ দেবার মত কোন পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগই পাননি। 
দ্বিতীয়ত খ্রীষ্টানরা মুসাকে এবং ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তোরাহ/ওল্ড টেস্টামেন্ট শ্রদ্ধা করে। খ্রীষ্টান ধর্মের প্রথম ২০০ বছর ইহুদী ও খ্রীষ্টান অনুসারীদের মধ্যে তেমন কোন সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল না। প্রথম ৭০ বছর খ্রীষ্টানরা ইহুদীদের সিনাগগেই প্রার্থনা করত। যার ফলে খ্রীষ্টানরা প্রথমদিক থেকেই ইহুদীদের তোরাহ/ওল্ড টেস্টামেন্ট দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এজন্য ইহুদীরা খ্রীষ্টানদের গোপন ধর্মের অনুসারী বলে সন্দেহ/ঘৃনা করত। 
তৃতীয়ত ইউরোপে রোমান সম্রাট খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহন করলে এবং রোমান সাম্রাজ্যের রাজধর্ম ঘোষনা করলে খ্রীষ্টান ধর্ম বিশ্বধর্মে পরিণত হবার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু ধর্মান্তরিত রোমান সম্রাটের পেপালদের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ করে, তাদের ধবংস, নির্মূল করে ইউরোপের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হলেও আরবের খ্রীষ্টান ধর্ম আরবের মানুষের মনকে জয় করতে পারেনি এবং আরব সমাজের মধ্যকার পৌত্তলিকতাবাদের অবসান ঘটাতে পারেনি। ধর্মান্তরিত রোমানদের মাধ্যমে প্রচারিত ক্যাথলিক মতবাদ এবং ধর্মান্তরিত গ্রীকদের অর্থডক্স মতবাদ প্রাচীন রোমান ও গ্রীক পেপালদের পৌত্তলিক মতবাদকেই ইউরোপের ও বিশ্বের খ্রীষ্টানদের খ্রীষ্টান ধর্মের ভেতর নতুনভাবে সংমিশ্রিত করে নিয়েছে মাত্র। ফলে খ্রীষ্টানরা তাদের নবী যীশু খ্রীষ্ট ও তার মা মেরির কাল্পনিক মূর্তি/প্রতিমা চার্চে স্থাপন করে এক ঈশ্বরের পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্যেও প্রার্থনা করে থাকে! একইভাবে তারা পেপালদের মৃত ব্যক্তি-পশুর আত্না ও প্রেতাত্নাদের পূজার হ্যালোইন উৎসবকে খ্রীষ্ট ধর্মের আচারের সাথে একাত্ন করে নিয়েছে!
এভাবে খ্রীষ্টান পাদ্রীরা প্রথমদিক থেকেই বিভ্রান্ত হয়ে একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ধর্মকে ইহুদীদের জায়নিস্ট মতবাদ দ্বারা এবং ইউরোপের পেপাগদের পেগানিজম দ্বারা ব্যাপকভাবে মিশ্রিত ও প্রভাবিত করে ফেলেছে। ফলে একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টান ধর্ম এখন তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে জিওনিজম/ইহুদীবাদ ও পেপানিজম/পৌত্তলিকতার এক সংমিশ্রিত রূপ/অবকাঠামো নিয়েছে। অথচ এই খ্রীষ্টান ধর্মেও একেশ্বরবাদী ইহুদী ও ইসলাম ধর্মের মত সর্বপ্রকার পৌত্তলিকতা ও প্রেতাত্নাদের পূজা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

যেখানে মুসা নবী, ঈসা নবী এবং তাদের অনুসারী ইহুদী, খ্রীষ্টানরা প্রকৃত একেশ্বরবাদকে মানব সমাজের সম্মুখে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে ইসলাম এবং মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদ(সা:) আর মুসলমানরা অত্যন্ত সফল। মুহাম্মাদ(সা:) অত্যন্ত আস্থা এবং বিচক্ষণতার সাথে তার অনুসারীদের এক আল্লাহর দাসত্বে বিশ্বাসী করতে সফল হয়েছেন। তিনি আল্লাহর ওহীকে সাহাবীদের দিয়ে পাহাড়ের গায়ে লিখিয়ে রেখে এবং মদীনা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামীয় মূল্যবোধকে একটি সুসংবদ্ধ শক্তিশালী কাঠামো দিতে সক্ষম হন। তিনি মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শে চলার নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন এবং নিজেকে মুসলমানদের কাছে আদর্শ অনুকরণীয় করে রেখে গিয়েছেন। তিনি মুসলমানদের ইসলামী আদর্শের ভেতর জীবন-সমাজ-রাষ্ট্র-বিশ্বকে পরিচালনার জন্য কুরআন, হাদীস অনুসরণের এবং তা থেকে সমস্যা সমাধান খোজার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। আর এর বাইরে নিত্যনতুন উদ্ভূত সমস্যা, চাহিদা সমাধানের জন্য ইজমা এবং কিয়াস ব্যবস্থার আলোকে সমাধান করার কথাও বলে গেছেন। এজন্যই ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বলা হয়। আর এর মধ্য দিয়ে ইসলাম একটি পরিপূর্ণ বাস্তব জীবন সম্মত, উদার, প্রগতিশীল, বৈজ্ঞানিক ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশ লাভ করতে পেরেছে/সক্ষম হয়েছে বিশ্ববাসীর কাছে।
মহানবীর মৃত্যুর পর এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের তৃতীয় খলিফা উসমান(রা:)-এর সময় খলিফার বাহিনী ভন্ড নবী মুসায়লামার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যেয়ে দশ হাজার কুরআনে হাফিজ শহীদ হলে সবাই কুরআনের বিশুদ্ধতা ও অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ফলে সুরা মজলিসের সিদ্ধান্তে কুরআনে হাফিজ সাহাবীদের দিয়ে পাথরের গায়ে লিপিবদ্ধ ওহীগুলো থেকে এবং কুরআনে হাফিজদের তেলাওয়াত শুনে অকৃতিম ও বিশুদ্ধভাবে কয়েকটি কুরআনের লিপিবদ্ধ কপি তৈরি ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করে। এতে কুরআন বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। এক্ষেত্রে বিশ্বের আর কোন ধর্মপ্রবর্তক, তার ধর্মগ্রন্থ এবং তার প্রচারিত ধর্মমত হযরত মুহাম্মাদ(সা:), আল কুরআন এবং ইসলামের মত এত বিশুদ্ধ, যৌক্তিক, বাস্ততসম্মত, পরিপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক নয়। মহানবীর ব্যক্তিগত কারিশমাটিক ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা, ইসলামের ক্ষমা, সাম্যবাদ, ন্যায়বিচার, অসাম্প্রদায়িকতা, যৌক্তিকতা, উদার মানবিক মূল্যবোধের উৎসকর্ষতা এবং ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের কারণে তার জীবনদশায় এবং তার মৃত্যুর পরবর্তী চার সুযোগ্য খলিফাদের(আবু বকর(রা:), ওমর(রা:), উসমান(রা):, আলী(রা:))-এর ২৩ বছরের খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়কালের মধ্যেই সারা আরব উপদ্বীপ, মধ্য এশিয়া, পারস্য, আসিরীয়, মাগরেব আরব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পৌত্তলিকতা, অগ্নিপূজার অবসান ঘটিয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করে ইসলাম বিশ্ব ধর্মে পরিণত হয়। সেই থেকে ইসলামের বিশ্ব বিজয়যাত্রা অব্যাহত আছে। 

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK