বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Tuesday, 12 Jun, 2018 12:18:43 pm
No icon No icon No icon

সেই কাসিদার রাত


সেই কাসিদার রাত


শান্তা মারিয়া : ‘দিনদারো রোজা রাখো’ এই গানশুনে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। আমাদের টিনের গেটে ধাক্কার শব্দ। রাত দুটো আড়াইটে হবে অথবা তিনটা। ঘুম ঘুম চোখে দেখি বাবা, মা ও আমার ভাই খাবারের টেবিলে। সেহেরি খাচ্ছে। আমার ভীষণ ঘুম পায়। তাই আর ওঠা হয় না। সকালে ঘুম ভাঙে। দেখি বাড়িশুদ্ধু সবাই রোজা, আমি ছাড়া। তখন আমি কান্না জুড়ে দেই। আমাকে কেন ডাকা হয়নি। ওদের কি মজা, সারাদিন খেতে হবে না। কিন্তু মা বুঝিয়ে বলেন আমি ছোট তাই আমার জন্য দিনে তিনটা রোজা। আমার ভালো লাগে না। পুরনো ঢাকায় এখনও কাসিদার ঐতিহ্য আছে কিনা জানি না। তবে আমি যখন ছোট তখন কাসিদা ছাড়া রোজার রাত কল্পনাই করা যেত না। সারা মাস কাসিদা গাইতেন যারা ঈদের চাঁদ উঠলেই তারা এসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বখশিস নিয়ে যেতেন।
পুরনো ঢাকায় রোজা মানেই জমজমাট আয়োজন। বিকেল থেকেই ইফতারের বাজার বসে যেত রাস্তার উপরে। ছোলা, ঘুগনি, ডালের পিঁয়াজু, সবজির বড়া, বেগুনি, আলুনি, ফুলুরি, জিলাপি, বুন্দিয়া, আরও অনেক রকম ভাজাভুজি, লাড্ডু, কাবাব, শিক, জালিকাবাব, সুতাকাবাব, কি নেই। রাস্তার উপরে বিক্রি হতো বরফ। তুষ বা ভুষির মধ্যে রাখা বরফ ছাড়া সরবত হবে না। তখন এত ঘরে ঘরে ফ্রিজের চল ছিল না। আমাদের একটা ক্যালভিনেটর না কি যেন ফ্রিজ ছিল সাদা রঙের। সারা পাড়ার মেয়েরা সেই ফ্রিজে তাদের ডিব্বা দিয়ে যেত বরফ জমানোর জন্য। এমনিতেই ডিপফ্রিজটা ছোট। তারমধ্যে কি এত বাটি জায়গা হয়? ওরই মধ্যে নিকট প্রতিবেশিদের বরফের বাটি জায়গা করে নিত।
কেনা ইফতার মা পছন্দ করতেন না। বাড়িতে বানানো হতো বেগুনি ও পিঁয়াজু আর ছোলা, আলুর চপ। মুঠি কাবাবও বানানো হতো। আমাদের বাড়িতে হালিম খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। তবে অন্যান্য বাড়িতে দেখেছি ইফতারে হালিম। আমাদের বাড়িতে বরং বানানো হতো পুডিং। কারণ ওটা স্বাস্থ্যকর। ইফতারে দইয়ের সরবত বা লাচ্ছি বানানোরও রেওয়াজ ছিল, তবে সবদিন নয়। প্রতিদিন সরবত হবে লেবুর বা স্কোয়াশের। সরবত বানানোর দায়িত্ব ভাইয়ার। আমি তার অ্যাসিসটেন্ট। লেমন বা অরেঞ্জ স্কোয়াশের বোতল থেকে দুতিন চামচ মেশানো হবে সরবতে। চিনি চাখতে হবে আমাকে, যেহেতু অন্যরা সবাই রোজা।
চকবাজারে দাদার বাড়িতে যেদিন ইফতার খেতে হবে সেদিনের মজা অনেক বেশি। সপ্তাহে একদিন আমরা দাদার বাড়িতে আর একদিন নানার বাড়িতে ইফতার করতাম। দাদার বাড়িতে তো দাদা দাদী কেউ নেই।(আমার জন্মের আগেই তাদের মৃত্যু হয়।)তবে আছেন মেজচাচা ও লালচাচা। মেজচাচীর কোলে বসে ইফতার না খেতে পারেলে আমার বেড়ানোটাই মাটি। চাচাদের বাড়িতে ইফতারের আইটেম অনেক বেশি। লালচাচা আবার সব আইটেম একটা বিশাল বোলে নিয়ে মুড়ি দিয়ে মাখতেন। সেই মাখানো মুড়ির জন্য স্পেশাল মশলাও থাকতো। তার স্বাদই আলাদা। মেজচাচা তেলেভাজা কিছু সহজে খান না। তাই তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। চকের বিখ্যাত নূরানী লাচ্ছিও আসতো। বোম্বাই জিলাপি অথবা সরু জিলাপি। আর মৌসুমের ফল তো থাকবেই। 
বড় চাচার ১০ নম্বর নর্থব্রুক হল রোডের বাড়িতেও আমরা মাসে অন্তত একদিন ইফতার করতাম। সেজচাচার লালমাটিয়ার বাড়িতেও তেমনি। 
রোজার মাস জুড়ে কেনাকাটার মজা। ‘শপিং’ কথাটার চল ছিল না। বলা হতো মার্কেটিং। ঈদ মার্কেটিং মানেই বায়তুল মোকাররম বা নিউ মার্কেট। স্টেডিয়ামেও কয়েকটি শাড়ির দোকান ছিল। পিজি হাসপাতালের নিচে কয়েকটি দোকান ছিল সাত রং, সিলভানা, ইত্যাদি। গুলিস্তানে ছিল রাজ্জাকস, জিপিওর উল্টোদিকে গ্যানজেস। নিউ মার্কেটে করিমস নামের দোকানটির কথাও মনে আছে। শাড়ির জন্য ছিল খান ব্রাদার্স। পুরানা পল্টনে ভোগ ফ্যাশন। এলিফেন্ট রোডে জুতার দোকান ছিল রুপালি, দীপালি, মাসকো সুজ। ঈদের জুতা প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একবার ভাইয়া ও কুমারভাই(আমার খালাতো ভাই) একই রকম হিলওয়ালা স্যান্ডেল কিনলো। পুরাই মেয়েলী ডিজাইন। খালু বললেন ‘দেশে কতগুলো আহাম্মক আছে তা জরিপ করার জন্যই বাজারে ওই জুতা ছাড়া হয়েছে।’ তবে ভাইয়ার বেলবটম প্যান্ট, চওড়া বেল্ট, টাইট শার্ট ও সেই হিলওয়ালা স্যান্ডেলের কম্বিনেশন সত্যিই ছিল দেখার মতো। 
রোজার সময় সেগুনবাগিচায় নানার বাড়ির ইফতারও হতো জমজমাট। বাড়ির সবাই রোজা রাখলেও ছোটদের জন্য তা নিষেধ। দাদার বাড়ির চেয়ে নানার বাড়িতে এই নিষেধ বেশি কড়া। দাদার বাড়িতে আট দশ বছরের ছেলে মেয়েরা দিব্যি রোজা রাখতো। কিন্তু সেগুনবাগিচায় মামা রীতিমতো জোর করে ছোটদের রোজা ভাঙতে বাধ্য করতেন। মা-ও আমাকে কিছুতেই রোজা রাখতে দিতেন না। বলতেন ‘তোর স্টোরফুড নেই। তোর শরীর এমনিতেই দুর্বল’। 
এইসব কড়াকড়ির জেরে আমার আর ত্রিশ রোজা রাখার অভ্যাসটাই গড়ে উঠলো না। এখনও সর্বোচ্চ ছয়-সাতটিতেই আমার কৃতিত্ব সীমাবদ্ধ। যদিও বাড়ির অন্যরা আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে পুরো মাস রোজা রেখে চলেছে। 
সাতাশ রোজা বা শবে কদরের দিনটা ছিল স্পেশাল। এদিন প্রতিবেশিদের বাড়িতে আমরা ইফতার পাঠাতাম। যদিও এটা সারা রোজার মাসেই করা চলে। প্রতিবেশিরাও হয়তো পাঠাতো পনের, ষোলো রোজায়। কিন্তু আমি ও মা সবসময়েই সাতাশ রোজাতেই ইফতার পাঠাতে পছন্দ করতাম। প্রতিবেশিদের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হতো পিতলের বড় ট্রেতে কাঁচের বাটিতে অনেক রকম আইটেম সাজিয়ে। ফলের মধ্যে আঙুর ও বেদানা মাস্ট। কুরশিকটার কাজ করা লেসের ঢাকনি দিয়ে ঢেকে সেই ইফতার আমি নিয়ে যেতাম বিভিন্ন বাড়িতে( সঙ্গে কাজের লোক থাকতো অবশ্য)। 
শবে কদরে নামাজ পড়তে হবে অনেক রাত জেগে। কেন জানি না সেই রাতেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতো সন্ধ্যে থেকেই। বাবা বলতেন ২০ রোজার পর যে কোন বেজোড় রাত্রিই শবে কদর হতে পারে, তাই সবগুলো রাতেই নামাজ ও কোরান পড়া ভালো। তবে কে শোনে কার কথা। আমরা ধরে নিতাম ২৭ রোজাতেই শবে কদর। শবে কদরের পরই কেন জানি ঈদের আমেজ চলে আসতো আর ইফতারের মজাটা কমে যেত। 
আমার সেই বড়চাচা, মেজচাচা, সেজচাচা, লালচাচা কেউই আর বেঁচে নেই। তারা চলে গেছেন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন ছোটবেলার আনন্দগুলোকেও। 
এবছর বাবাকে ছাড়াই রোজার দিনগুলো কাটছে। টেবিলের চারপাশে চেয়ারগুলো আছে। বাবার চেয়ারটা শূন্য। সেদিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরে কান্নাটা গলার কাছে এসে জমাট বেঁধে থাকে। কেবলি মনে হয় ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে যদি ফিরে যেতে পারতাম। মোবাইলের অ্যালার্মের বদলে আবার যদি শোনা যেত সেই কাসিদা। শোনা যেত বাবার দরাজ গলায় ঘুম থেকে জাগার ডাক।

লেখক : শান্তা মারিয়া, কবি, সাংবাদিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK