সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮
Saturday, 02 Jun, 2018 12:05:56 pm
No icon No icon No icon

ভালবাসার মঞ্চ সবার জন্য ভালবাসা


ভালবাসার মঞ্চ সবার জন্য ভালবাসা


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: ঢাকার বিখ্যাত নবার পরিবারের খাজাদের বংশধর সাইয়াদ খাজা ওমায়ের হাসান। তিনি এখন স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করেন। মূলত তারই মহতী উদ্যেগে নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে একটি অরাজনৈতিক এবং সামাজকল্যাণমূলক সংগঠন ভালবাসার মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি গ্রামীণ ব্যাংক/জাগো ফাইন্ডেশানের মত কোন এনজিও/চ্যারিটি ফাউন্ডেশান না। এর মূল লক্ষ্য মানুষের মাঝে ভালবাসা ছড়িয়ে দেয়া, সহমর্মিতা প্রচার, প্রসার, প্রতিষ্ঠা করা এবং এর মাধ্যমে সামাজিক সৌভাতৃত্বের বন্ধন সুদৃয় করা। কিন্তু তারপরও প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকে ভালবাসার মঞ্চ তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বিভিন্ন/বহুমুখী সামাজিক সেবামূলক কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে নিয়োজিত আছে। খাজা ওমায়ের সাহেব তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিউইয়র্কে তার প্রতিষ্ঠিত ভালবাসার মঞ্চ সংগঠনটির কার্যক্রম নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশেরও সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যেগ নিয়েছেন। সমাজের অনেক ধনী, সচ্ছল, গণ্যমান্য, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তরুন/নতুন প্রজন্মের অনেকেই এগিয়ে এসেছে তার এই মহতী কর্ম লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এবং সফল করার জন্য। তারা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্মিলিতভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ভালবাসার মঞ্চকে দেশের প্রান্তিক অসহায়, দরিদ্র জনগণের কাছে নিয়ে যাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করছে। এরফলে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় এবং জেলা শহরে এই সংগঠনের সামাজিক কার্যক্রম প্রতিনিয়ত বিস্তার লাভ করছে এবং একটি বৃহৎ মহীরূহে পরিণত হচ্ছে। এই সংগঠনটি বিভিন্ন জাতীয় দিবস যেমন, ২১শের ফেব্রুয়ারীর শহীদ দিবসে পথচারী ও দর্শনার্থীদের মাঝে তারা ফুল ও লিফলেট বিতরণ করে। বিভিন্ন স্থানে পথশিশুদের মধ্যে বিস্কুট/খাবার বিতরণের মত কর্মসূচী করে থাকে। সাতক্ষীরায় রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধের আহবান জানিয়ে ভালবাসার মঞ্চ র‍্যালী করেছে। চট্টগ্রামে দরিদ্রদের মধ্যে ভালবাসার মঞ্চ শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে। এই সংগঠন ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পরিষ্কার-পরিছন্নতা অভিযানের কর্মসূচীও পালন করে থাকে। তাদের এই সব সামাজিক সচেতনতামূলক এবং সেবামূলক কার্যক্রম সত্যিই প্রশংসাযোগ্য।

১৯১২ সাল থেকে ভালবাসার মঞ্চ প্রথমে ঢাকা স্টেডিয়াম এবং পরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রমজান মাসব্যাপী প্রতিদিন রোজাদারদের জন্য বিনামূল্যে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছে। তাদের শ্লোগান বিদায় আমিত্ব। অর্থাৎ নিজের আমিত্ব/নিজস্বতা/ অহংবোধকে জয় করে অন্য সবার জন্য, সবার সাথে, সবাই মিলে ভাল কিছু করার অঙ্গীকারই হচ্ছে ভালবাসার মঞ্চ। তাদের এমন একটি কার্যক্রম দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পুরান ঢাকার বংশাল থানাধীন কায়েৎটুলী এলাকার অগ্রগামী স্কুলের ভেতর শিক্ষার্থীদের খেলার উন্মুক্ত মাঠে ভালবাসার মঞ্চ রমজান মাসব্যাপী প্রতিদিন ইফতারের সময় রোজদারদের জন্য বিনামূল্যে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছে। সেখানে এলাকার বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, এলাকার কাউন্সিলর, গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সবাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সবার জন্য ইফতার আয়োজনের জন্য কাজ করে থাকে এবং ইফতারের সময় তারা একই খোলা ছাদের নিচে মাটিতে বসে এলাকার/বাইরের সাধারণ মানুষ, দরিদ্র মানুষ, রোজদারদের সাথে ইফতার করে থাকে। আমি সেখানে স্কুলের ভেতর গিয়ে শামীম রেজা ভাইয়ের সাথে সরাসরি কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। তাদের এবারের ইফতার কার্যক্রমের কথা প্রসঙ্গে ফারুক ভাইয়ের কাছ থেকে জানলাম, এবার ভালবাসার মঞ্চ ঢাকার নতুন-পুরান/উত্তর-দক্ষিণের প্রায় এগারটি স্থানে এই বিনামূল্যে ইফতার মাহফিলের কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদি কোন ব্যক্তি রোজার সময় খালি উন্মুক্ত জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তাহলে তারা রমজানের পুরো একমাস সেখানে বিনামূল্যে রোজাদারদের ইফতারীর ব্যবস্থা করে দিবে ভালবাসার মঞ্চের উদ্যেগে। সেখানে তখন তারা প্রায় কয়েকশত মানুষের ইফতারির আয়োজনের ব্যবস্থা করতে ভীষন ব্যস্ত ছিল। শামীম রেজা ভাই আমাকে তাদের সাথে ইফতার করার অনুরোধ জানালেও আমি তাদের সাথে ইফতার করতে পারিনি আমার শশুড়বাড়িতে ইফতারের দাওয়াত থাকার কারণে। আশা করি, একদিন তাদের সাথে আমিও শরীক হবো ভালবাসার মঞ্চের ইফতার মাহফিলে।

ভালবাসার মঞ্চের এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর প্রচারনা দেখে আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই যে, ভালবাসার মঞ্চ সমাজের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার এবং ভাল কাজের অনুপ্রেরণা দেয়ার ব্যাপারে সমাজ-রাষ্ট্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 
আমরা জানি, আমাদের সমাজে এবং আমাদেরই আশেপাশে অনেক ধনাঢ্য, প্রভাবশালী, সম্মানিত জনদরদী মানুষ আছেন। তারা যদি আলাদাভাবে বা কয়েকজন মিলে সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন এলাকার সামাজিক এবং সমাজসেবামূলক সংগঠনগুলোকে আর্থিক এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা দেন/দেবার একটু আন্তরিক চেষ্টা করেন তাহলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভেতর হতেই সাধারণ জনগণ ও দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে। অনেক ধনী/সচ্ছল ঘরের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ করতে উৎসাহীত হবে। অনেক বেকার যুবকের কর্ম সংস্থানের পথ খুলে যাবে। পথশুিশুরা/দরিদ্র ঘরের মেধাবী/লেখাপড়ায় উৎসাহী ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করার/চালিয়ে যাবার পৃষ্ঠপোষকতা, সাহস, উৎসাহ পাবে। এক সময় তারাও লেখাপড়া করে শিক্ষিত, বড় এবং প্রতিষ্ঠিত হয়ে মানুষ ও সমাজের সেবা, কল্যাণ, উন্নয়নে এগিয়ে আসবে। দরিদ্র, অসহায়, বেকারদের সহায়তা করবে। বিশেষ করে সমাজের ধনী-সচ্ছল শিক্ষিত, মেধাবী ছাত্রছাত্রী, তরুন-তরুনীরা যদি তাদের পড়ালেখা, পেশা-ব্যবসা-সংসার কাজের পাশাপাশি এসব সামাজিক সংগঠন এবং এদের সেবামূলক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত/সম্পৃক্ত হয়ে/থেকে যদি কিছুটা সময়, মেধা, শ্রম দেয়/দিতে পারে তাহলে এইসব সামাজিক সংগঠনগুলো এবং তাদের সমাজকল্যাণ, সেবামূলক কার্যক্রম আরো প্রাণবন্ত, শক্তিশালী, গতিশীল হবে সুনিশ্চিতভাবে। এতে একদিকে তাদের দ্বারা অনেক দু:স্থ, অসহায়, দরিদ্র মানুষের উপকার, কল্যাণ সাধিত হবে। অপরদিকে তারা নিজেদের আমিত্বের সাথে সমাজের সাধারণ, অসহায়, দরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষের ভাল, কল্যাণ, উন্নতির কথা চিন্তা এবং কাজ করার সুযোগ পাবে। যা দেশে সুনাগরিক জনগোষ্ঠী তৈরিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে। তাই সমাজের কল্যাণে, সমাজের সেবায়, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা উচিত এবং সমাজের জন্য কিছু ভাল কাজ করা উচিত।

ভালবাসার মঞ্চের মত আরো অনেক সমাজ সেবামূলক সংগঠনের সাদা মনের মানুষগুলো কারো কাছে কোন কিছুর প্রত্যাশা না করে মানুষ ও সমাজের জন্য বিভিন্নক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে নীরবে নিভৃত্বে একাগ্র চিত্তে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম এবং কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তারা যে সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসাবে কাজ করছেন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানুষের প্রতি দরদী ভাল মানুষ বানাবার কারখানা চালাচ্ছেন তা বোধ হয় তারা নিজেরাও জানেন না। ভালবাসার মঞ্চ সংগঠনটির সার্বিক কার্যক্রমে প্রবীন-নবীনের মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় এবং বন্ধন দেখা যায়। আমার সাথে ব্যক্তিগতভাবে মোহাম্মাদ সাজ্জাত হোসেন, শামীম রেজা ভাই, আলমগীর ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন বাওনিয়ান্স প্রগ্রামে দেখা-সাক্ষাত হয়েছে। আর ফেসবুকের মাধ্যমে সাইমন কনক ভাই, আব্দুল বারী ওপেল, মোহাম্মাদ জাহিদ জিতুকে খুব ভালভাবে চিনি। আমার জানা মতে, এটি ঢাকাইয়াদের প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক সংগঠন যা বাংলাদেশব্যাপী বিস্তার লাভ করছে। এই সংগঠনের সাথে যারা প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে জড়িত তাদের অনেকেই আবার বাওয়ানীয়ান্স এবং পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা। এটা আমাদের আহমেদ বাওয়ানী একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ এবং পুরান ঢাকার মানুষের জন্য নি:সন্দেহে অত্যন্ত আনন্দময় এবং বিরাট গর্বের ব্যাপার। একজন বাওয়ানীয়ান্স এবং পুরান ঢাকার মানুষ হিসাবে আমি নিজেও এর সমঅংশীদার। ভালবাসার মঞ্চ উত্তোরত্তর আরো বিকশিত এবং প্রতিষ্ঠিত হোক সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই শুভ কামনায় শেষ করছি।

লেখক: আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK