শুক্রবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৮
Saturday, 26 May, 2018 12:33:59 pm
No icon No icon No icon

ইরানের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, সৌদি নীতি এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব বলয়


ইরানের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, সৌদি নীতি এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব বলয়


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরাশক্তি বলা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় নাম ইসলামীক রিপাবলিক অব ইরান (ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান)। এই অঞ্চলের আদি নাম ছিল পারসিয়ান এম্পায়ার(পারস্য সাম্রাজ্য)। বর্তমানে ইরান একটি নির্বাচিত উদার/মধ্যপন্থী ইসলামী দলের সরকার নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক ইসলামী রাষ্ট্র। ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থার প্রতি/পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ ইরানী জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি/শেকড় আছে। তারা মনে করে ইসলামী/মুসলিম বিশ্বের সামনে এবং সারা বিশ্বের সামনেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান একটি উন্নত গণতান্ত্রিক ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল। যা ইরানকে ও ইরানীদের রাষ্ট্রীয় ও জাতিগতভাবে মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ইরানী জনগণ(প্রাপ্ত বয়স্ক নারী/পুরুষ নির্বিশেষে সবাই) নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর নির্বাচনে সরাসরি ব্যালট পেপার বাক্সে ভোটের মাধ্যমে ইরানী প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করে থাকে। তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবী চেতনা, ইসলামী শরীয়ার ভিত্তিতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সমন্বয় করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরিচালনা করে থাকেন। ইরানের ইসলামী সরকার আগ্রাসী মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, অবৈধ জবর দখলদারী রাষ্ট্রশক্তি ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী আরব রাজতন্ত্রী, একনায়কতন্ত্রী শাসকদের মার্কিণ-পশ্চিমাদের তাবেদার শক্তি, ইরান, মুসলিম বিশ্বের জন্য প্রধান শত্রু ও হুমকি মনে করে। ১৯৭৯ সালে ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবীরা তাদের আধ্যাত্নিক নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্ব এবং আহবানে মার্কিণ-সৌদির তাবেদার রেজা শাহ পাহলবীর স্বৈরাচারী শাহতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে বিপ্লবী ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এই সময় ইরানের ইসলামী বিপ্লবীরা তেহরানের মার্কিণ এম্বাসীতে হামলা চালায় এবং মার্কিণ কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের জিম্মি করে। খোমেনী প্রেসিডেন্ট হিসাবে ইরানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহণ করেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবীরা ছিল কট্টর ইসলামপন্থী, মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, ইহুদীবাদী ইসরাইল এবং স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র/একনায়কতন্ত্র বিরোধী। ফলে ইরানের বিপ্লবী ইসলামী সরকার আদর্শগতভাবে কার্যত মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, ইহুদী আধিপত্যবাদ এবং সৌদি আরবের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র/একনায়কতন্ত্র বিরোধী ছিল। এই সমস্ত কারণে ইরানের নতুন ইসলামী শাসকগোষ্ঠীর সাথে প্রথম থেকেই মার্কিণ পরাশক্তি, রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব, ইহুদীবাদী ইসরাইল এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আরব ও পশ্চিমা মিত্রদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন/খারাপ/বিরোধপূর্ণ হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিণ প্রশাসন, তাদের দোসর সৌদি রাজতন্ত্র এবং আগ্রাসী ইসরাইল ভীষন চিন্তিত, ভীত, ক্ষুদ্ধ হয়।

তাই তারা প্রথম থেকেই ইরানের বিপ্লবী ইসলামী সরকারকে অস্থিতিশীল, দুর্বল ও ধবংস করার গোপন পরিকল্পনা করে। তারই অংশ হিসাবে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর পরই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব ইরান এবং তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ইরানে অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে দেয়া এবং খোমেনীর সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলা। এরপর মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৯৮০ সালে খোমেনী বিরোধী বিভিন্ন পশ্চিমা ও আরব রাষ্ট্রদের নেপথ্য মদদেই ইরাকের সুন্নি সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন শাতিল আরব সাগরের জলসীমার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থল সীমান্তরেখার সীমানা নিয়ে প্রতিবেশী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু/ঘোষনা করে। শুরু হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সৌদি আরব এবং তার বিভিন্ন আরব সুন্নি রাজতান্ত্রিক/একনায়কতান্ত্রিক মিত্র রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের সাদ্দামের পেছনে সমবেত/একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সহযোগীতা করেছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাশক্তিগুলো সাদ্দামকে ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে, অস্ত্র, সমরাস্ত্র, ক্ষেপনাস্ত্র, সামরিক রশদ, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সর্বাত্নক সহায়তা করেছিল। তাদের সকলের অভিন্ন লক্ষ্য ছিল ইরাকের সামরিক শাসক সাদ্দামকে দিয়ে ইরানের খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইরানের বিপ্লবী ইসলামী সরকার, জনগণকে একটি সমুচিত শিক্ষা দেয়া, সর্বক্ষেত্রে তাদের দুর্বল/ধবংস করে দেয়া এবং সম্ভব হলে খোমেনী সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু ইরানের প্রেসিডেন্ট খোমেনী অত্যন্ত সাহস, বিচক্ষণতা, ধৈর্য্যের সাথে ইরাকের সাথে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধের বিরাট ধাক্কা-ক্ষতি, ইরাক-মার্কিণ-সৌদি এবং তাদের পশ্চিমা-আরব মিত্রদের অবিরাম আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, চাপ, হুমকিকে মোকাবেলা করে কেবল টিকেই থাকেনি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রভাবশালী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলেন আপ্রাণ ও আন্তরিক প্রয়াসে। খোমেনীর সরকার প্রথমেই ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে দীর্ঘস্থায়ী এবং স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বিপ্লবী রেভ্যুশনারী গার্ডস প্রতিষ্ঠা করে এবং একে সমর্থনের জন্য রেভ্যুশনারী গার্ডসের অধীনে স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে বাসিজ রেজিস্ট্যান্স মিলিশিয়া ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের ঢামাডোমের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইলের ইহুদীবাদী শাসকগোষ্ঠী লেবাননে আশ্রিত ইসরাইলে হামলাকারী উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনী গেরিলাদের উচ্ছেদ/নির্মূল করার অজুহাত তুলে ১৯৮২ সালে লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ লেবানন দখল করে নেয়। ইরান-ইরাকের দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধে উভয় রাষ্ট্রেরই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন অবকাঠামো, রাজনৈতিক, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি অনেকটাই দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। ইরান এ সময় ইরাককে মোকাবেলার করার পাশাপাশি লেবাননে ইসরাইলের আধিপত্য কমাতে এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যে লেবাননের ইসরাইল বিরোধী জাতীয়তাবাদী শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ে ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯০ সালে সিরিয়ান বাহিনী লেবাননের শাসক মিশেল আউনকে পরাস্ত করে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাবার পর আগ্রাসী প্রতিবেশী ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং লেবাননে স্থিতিশীলতা রক্ষার ইস্যু নিয়ে সিরিয়া-ইরান সরকারের মধ্যে, সিরিয়াপন্থী আমাল মিলিশিয়া ও সিরিয়ান মিত্রবাহিনীর সাথে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর পারস্পারিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে আপোষমূলক মিত্রতা গড়ে উঠেছিল। এ কারণে আমাল মিলিশিয়া ও সিরিয়ান মিত্রবাহিনী লেবাননে হিজবুল্লাহর আধিপত্যকে এবং হিজবুল্লাহ লেবাননে সিরিয়ান মিত্রবাহিনীর অবস্থানকে মেনে নিয়েছিল। একই সাথে আশির দশকের সময় থেকে ইরানের ইসলামী সরকার সকল বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র/শত্রুতা, কূটনৈতিক চাপ/হুমকি, সামরিক হামলা/আগ্রাসনের সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য ও মোকাবেলা করে নিজের অস্তিত্ত্ব ও বিপ্লবী আদর্শকে রক্ষা করতে/টিকিয়ে রাখতে পারমানবিক শক্তি অর্জন করার লক্ষ্যে গোপনে পারমানবিক কর্মসূচী প্রকল্প শুরু করে এবং চালিয়ে যায় অবিচলভাবে। ইরান নব্বই দশকের মাঝে থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বলিষ্ঠ প্রবক্তায় পরিণত হয়। তারা ইসরাইলকে জোরপূর্বক আরবভূমি দখলকারী অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্র বলে ঘোষনা করে। ২০০০ সালের পর থেকে ইরান, সিরিয়া, হিজবুল্লাহর গোপন সমর্থন, সহযোগীতায় ফিলিস্তিনের গাজা স্ট্রিপ ও পশ্চিম তীরে শেখ আহমাদ ইয়াসিনের কট্টর স্বাধীনতাকামী সুন্নি ইসলামী সংগঠন হামাস যথেষ্ঠ সামরিক শক্তি অর্জন করে। তারা হামাসকে গোপনে অর্থ, অস্ত্র, সমরাস্ত্র, গোলা, রশদ, প্রশিক্ষণ দিয়ে সর্বাত্নক সহায়তা করে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ইস্যুতে আপোসহীন মনোভাবের কারণে ফিলিস্তিনে হামাস দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে ইয়াসিন আরাফাতের প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশান(পিএলও)-র প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভূত হয়। ২০০৬ সালে হামাস ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হলে পিএলও/ফাতাহ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। এক বছরের মধ্যেই হামাসের জোট সরকারের পতন হয়। হামাস-ফাতাহর মধ্যে অবিরাম সংঘাত চলতে থাকে। ফাতাহ পশ্চিম তীর আর হামাস গাজা স্ট্রিপ শাসন করতে থাকে। ইরানের ইসলামী সরকার, সিরিয়ার বাশার সরকার, তাদের সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ, ফিলিস্তিনের গাজার হামাস গ্রুপের মধ্যকার এই আঞ্চলিক মিত্রতার প্রভাব বলয়, ইরাকে শিয়া রাজনৈতিক জোট এবং ইয়েমেনে হুতি আনসারুল্লাহ মিলিশিয়াদের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থান, ইরান ও তার আরব মিত্রদের পক্ষে রাশিয়ার সুস্পষ্ট ও সরাসরি রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ও যুদ্ধে অংশগ্রহন, তুরুস্ক ও কাতারের সাথে ইরানের নতুন মিত্রতার বন্ধন সৌদি আরব, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আরব ও পশ্চিমা মিত্রদের হতাশাগ্রস্থ, চিন্তিত, বিক্ষুদ্ধ করে তুলেছে।

২০০০ সালে ৯/১১-এ যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল, বিশ্বের ইহুদী লবি এবং পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মদদে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিবর্গ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে/ছদ্দাবরণে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের মার্কিণ/ সৌদি/ইসরাইলের আধিপত্য বিরোধী জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন দল/গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত সরকারদের ক্ষমতাচুত্য/ধবংস করার গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাস্টার প্লান নিয়ে মাঠে নামে। সৌদি আরব নিজের আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাগত স্বার্থে আফগানিস্তান/তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে বাধ্য হলেও ইরাকের সাদ্দাম সরকার, ইরানের ইসলামী সরকার, সিরিয়ার বাশার সরকার, লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ, গাজার হামাস গ্রুপ, লিবিয়ার গাদ্দাফী সরকার কমবেশি মার্কিণ, ইসরাইল, সৌদি, পশ্চিমাশক্তি বিরোধী ছিল বলে তাদের সাথে সৌদি আরব ঐসব রাষ্ট্র/অঞ্চলের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র, আগ্রাসন, শাসকগোষ্ঠীদের উচ্ছেদ/পতনে মার্কিণ-পশ্চিমাদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নেয়/সহযোগীর ভূমিকা পালন করে/করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার অবাধ্য মিত্র পাকিস্তান ও প্রবল শত্রু ইরান উভয়কে চাপে রেখে নিয়ন্ত্রণ করতে, ন্যাটোর সামরিক ঘাটি স্থাপনের লক্ষ্যে আফগানিস্তানের সৌদি-পাকিস্তান সমর্থিত মার্কিণ-পশ্চিমা-ইরান বিরোধী মোল্লা ওমরের তালেবান সরকারকে এবং প্রধানত ইরাকের তেল সম্পদ লুন্ঠন করার লক্ষ্যে ইরাকের ইরান-সৌদি-ইসরাইল-মার্কিণ বিরোধী সাদ্দাম হোসেনকে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের বলির পাঠা বানিয়েছিল। এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মার্কিণ-পশ্চিমাজোট প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের আরব মিত্ররা তাদের কূটনৈতিক/অর্থনৈতিক/সামরিক দিক থেকে সমর্থন দিয়েছিল। মার্কিণ-পশ্চিমা আগ্রাসনে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের এবং এরপর ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দামের সুন্নি বাথপার্টি সরকারের পতন হলে মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ইরাকে সাদ্দামের পতনের পরই সকল মার্কিণ-পশ্চিমা-ইসরাইলী প্রেস ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়া একযোগে তাদের পরবর্তী আগ্রাসনের টার্গেট করে ইরান ও সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদীদের মদদদাতা, আশ্রয়দাতা বলে ব্যাপক উস্কানীমূলক প্রচারণা ও প্রপাগান্ডা করতে শুরু করে। এ সময় তৎকালীন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানে আক্রমন নরকের দ্বার খুলে দিবে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব যেমন জনসমর্থিত ছিল এবং তেমনি ইরানের ইসলামী সরকারও ব্যাপক জনসমর্থিত ছিল। তাই পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ইরানের ইসলামী সরকারকে জনসমর্থনপুষ্ট মোল্লাতন্ত্র বলে অভিহিত করে। এদিকে মার্কিণ নেতৃত্বাধীন পশ্চিমারা আফগানিস্তানে তালেবান গেরিলাদের সাথে এবং ইরাকে বিদ্রোহী সুন্নি বাথপার্টি ও শিয়া মাহাদী আর্মির সাথে যুদ্ধে তাদের ব্যাপক গেরিলা হামলায় ব্যতিব্যস্ত, শংকিত, দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ তাদের বন্দুকের নল শক্তিশালী ইরান থেকে আকস্মিকভাবে 
মার্কিণ-ইসরাইল-সৌদি বিরোধী লিবিয়ার লিবিয়ার একনায়ক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফীর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। মার্কিণ, পশ্চিমা, ইসরাইলের মিডিয়াগুলো লিবিয়ার গোপন পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে নতুন করে গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগান্ডা শুরু করলে গাদ্দাফী মার্কিণ-পশ্চিমা আগ্রাসনের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে ২০০৩ সালে তিনি ইইউর সাথে আলোচনা ও চুক্তি করে লিবিয়ার পারমানবিক প্রকল্প বন্ধ ঘোষনা করে এবং সেগুলো পশ্চিমা পরিদর্শকদের কাছে উন্মুক্ত দেয়। তাদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে এবং তারা সেগুলো প্রক্রিয়া করণের মাধ্যমে ধবংস করার ব্যবস্থা করে। এরপর ২০০৪ সাল থেকে মার্কিণ-পশ্চিমা জোট লেবানন থেকে সিরিয়ান মিত্রবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য সিরিয়ার বাশার সরকারের উপর প্রবল কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে এবং সিরিয়ার উপর সামরিক হামলা চালাবার হুমকি দিতে শুরু করে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সিরিয়া/লেবাননে মার্কিণ-পশ্চিমা জোটের আগ্রাসনের আশংকা তীব্রতর হয়ে উঠলে সিরিয়ার বাশার সরকার বিচক্ষণতার সাথে ২০০৫ সালে লেবানন থেকে সিরিয়ান মিত্রবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। তাদের এই বিদায় লগ্নে মিত্র হিজবুল্লাহ বৈরুতে পাঁচ লাখ মানুষের বিশাল মহাসমাবেশ করে সিরিয়ান মিত্রবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় এবং লেবাননে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিমত্তা প্রকাশ করে। লেবানন থেকে সিরিয়ান বাহিনী প্রত্যাহারের পর ইরান ও সিরিয়ার শাসকগোষ্ঠী ভবিষ্যতে যেকোন বিদেশী হামলা/আগ্রাসন থেকে নিজেরা রক্ষা পেতে/নিজেদের রক্ষা করতে নিজেদের মধ্যে সামরিক সহযোগীতা/মিত্রতামূলক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। লেবাননে হিজবুল্লাহদের অবিরাম আক্রমনের মুখে ২০০০ সালে ইসরাইলী বাহিনী দক্ষিণ লেবানন ত্যাগ করে। ২০০৬ সালে ইসরাইল মার্কিণ প্রশাসনের সবুজ সংকেত পেয়ে হিজবুল্লাহ গ্রুপকে ধবংস করার মিশন নিয়ে ৬০ হাজার সৈন্য এবং ব্যাপক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সুসজ্জিত শক্তিশালী সামরিকবাহিনী নিয়ে দক্ষিণ লেবাননে সর্বাত্নক আক্রমন/আগ্রাসন শুরু করে। কিন্তু ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের পাল্টা তীব্র বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ/লড়াইয়ের ফলে আগ্রাসী ইসরাইলী সরকার এবং তার বাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ৪৩ দিনের ভেতর লেবানন থেকে পশ্চাৎপদ অপসারণ করতে বাধ্য হয়। হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যাদ হাসান নাসারুল্লাহ এবং হিজবুল্লাহ আরব/মুসলিম বিশ্বে বীরের মর্যাদা লাভ করে।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতনের পর উত্তরাঞ্চলীয় জোট ক্ষমতা লাভ করে। আর এতে ইরান সমর্থিত শিয়া হাজারা মিলিশিয়াদের প্রতিনিধিত্ব ছিল/আছে। ইরাকে সাদ্দামের সুন্নিপন্থী বাথ সরকারের পতনের পর সেখানে ক্ষমতাচ্যুত সুন্নি জেহাদীদের তীব্র গেরিলা হামলা ও অসন্তোষ হ্রাস করার লক্ষ্যে পশ্চিমাদের সমর্থনে কিছুদিন মার্কিণ-সৌদি অনুগত সুন্নি জনপ্রতিনিধিদের/গোষ্ঠীকে ইরাকের ক্ষমতায় বসিয়ে রাখা গেলেও ইরানের সমর্থন ও সহযোগীতায় ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের উত্থান হয়। যুদ্ধের ময়দান এবং রাজপথের রাজনীতির মাঠে উভয়ক্ষেত্রে শিয়ারাই জয়ী হয়। তাদের হাতেই ইরাকের ক্ষমতা চলে যায় এবং ইরাক ইস্যুতে শেষপর্যন্ত ইরানই লাভবান হয়েছে। আরব বসন্তকালে ২০১১ সালে লিবিয়ার গাদ্দাফী এবং তার সরকার মার্কিণ-পশ্চিমা-সৌদি অনুগত বিদ্রোহী মিলিশিয়াদের হাতে নিহত ও পতন হলে তাদের হাতে রাজধানী ত্রিপলীসহ লিবিয়ার মূল বৃহৎ অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে। বর্তমানে তারাই লিবিয়ার বৈধ প্রতিনিধি/সরকার হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে আন্তর্জাতিকভাবে। একইভাবে আরব বসন্তকে কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে মার্কিণ-সৌদি জোট সিরিয়ার মার্কিণ-ইসরাইল-সৌদি বিরোধী এবং ইরান-লেবাননের মিত্র সিরিয়ার বাশার আল আসাদের বাথ সরকারকে উচ্ছেদ করে সিরিয়ায় তাদের অনুগত তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। মার্কিণ-সৌদি অনুগত বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা সিরিয়ার বাশারকে উচ্ছেদ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, রাশিয়া বাশারের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়ায় সিরিয়ায় মার্কিণ-সৌদির পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ধবংস স্তুপে পরিণত হয়েছে সিরিয়া। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ার চলমান গৃহযুদ্ধে ইরানের রেভ্যুশনারী গার্ডস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, রাশিয়ার বিমানবাহিনীর সর্বাত্নক সহযোগীতায় বাশার সরকারের অস্তিত্ত্ব রক্ষা, ইরান-রাশিয়ার মার্কিণ বিরোধী অবস্থান এবং বাশারের পক্ষে রাশিয়ার অংশগ্রহনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক মিত্রতা স্থাপিত হয়।

ইরান-সিরিয়ার শিয়া সরকার এবং লেবাননের শিয়া হিযবুল্লাহ ফিলিস্তিনের সুন্নি হামাসকে অস্ত্র-গোলা-রশদ, উন্নত সামরিক ও গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে আরো শক্তিশালী করে তোলে। ফলে ২০০৮-৯, ২০১০, ২০১২ সালে ফিলিস্তিনের হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজায় হামাসকে ক্ষমতাচুত্য করতে ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় ব্যাপক বিমান-ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালালেও গাজার জনসমর্থিত হামাস শাসকগোষ্ঠী এবং মিলিশিয়ারা ইসরাইলী হামলা/আগ্রাসনকে প্রতিরোধ/মোকাবেলা করে টিকে যায়। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের সৌদি ও সুন্নিপন্থী মানসুর হাদির সরকারকে ক্ষমতাচুত্য করে শিয়া মাযহাবী হুতি আনসারুল্লাহ মিলিশিয়ারা ইয়েমেনের ক্ষমতা দখল করে এবং এই সময় থেকে তারা সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটের অবরোধ ও আগ্রাসনকে মোকাবেলা করছে। ইরাক ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরানের বিপ্লবী রেভ্যুলেশনারী গার্ডস আইএস, আল কায়দার মত উগ্র সুন্নিপন্থী জেহাদীদের উত্থানকে অনেকটাই ঠেকিয়ে দিয়েছে/দমন করেছে। ২০১৪ সালে তুরুস্কে তাইয়্যেপ এরদোগানের নেতৃত্বাধীন তুর্কী জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থী একেপি(জাস্টিস এন্ড ডেপলপমেন্ট পার্টি) সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে তুরুস্কের সাথে আদর্শগত, স্বার্থগত কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরবের ব্যাপক মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। তুরুস্কের বিরুদ্ধে ইইউ অবরোধ আরোপ করলে ইরান তুরুস্কের জন্য তার আকাশপথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ইইউর সাথে ব্যাপক কূটনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তুরুস্কের সাথে রাশিয়ারও ঘনিষ্ঠ মিত্রতা গড়ে উঠে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করায় এবং ইসরাইলকে অবৈধ দখলদার শক্তি বলায় এরদোগানের সাথে ইসরাইলের শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ২০১৬ সালে তুর্কি সেনাবাহিনীর একাংশ এরদোগানকে ক্ষমতাচুত্য করার লক্ষ্যে সেনা ক্যু করলেও তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে জনগণকে নিয়ে রাজপথে রাজনৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে এই সেনা ক্যুকে নস্যাৎ করে দেন। এরদোগান এবং একেপির ধারনা এই অপকর্মটি মার্কিণ মদদে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভিন্ন মতালম্বী তুর্কি নেতা গুলানের অনুসারীরা ঘটিয়েছে। ইরান-রাশিয়া এই সেনা ক্যুর তীব্র নিন্দা করে এরদোগানের পক্ষেই অবস্থান সুস্পষ্ট করে। ফলে বিভিন্ন ইস্যুতে তুরুস্ক ইরান ও রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ ও নমনীয় মনোভাব/নীতি অনুসরণ করছে। ২০১৭ সালে কাতারের সুলতান আল থানীর সাথে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীলতা, কাতারে তুরুস্কের সামরিক ঘাটি স্থাপন, কাতারভিত্তিক আল জাজিরার আরব জাতীয়তাবাদী এবং মার্কিণ-পশ্চিমা-ইসরাইল বিরোধী ভূমিকাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সৌদির সাথে কাতারের ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। এই সময় সৌদি তার ঘনিষ্ঠ সাত মিত্রকে নিয়ে কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, কাতারের বিরুদ্ধে স্থল-সমুদ্র-আকাশ পথে সর্বাত্নক অবরোধ আরোপ করে এবং তাদের দেয়া ১৩-দফা শর্ত মেনে নেবার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে কাতারের উপর। কাতারের এই দুঃসময়ে ইরান ও তুরুস্ক সঙ্গে সঙ্গে কাতারের পাশে এসে দাঁড়ায়। তার প্রতি সাহায্য, সহযোগীতা, মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ইরান তার সমুদ্র ও আকাশ পথ কাতারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। ইরান ও তুরুস্ক বিমানে করে খাদ্য, পানীয়, ঔষুধ, জ্বালানী, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে কাতারকে সর্বাত্নক সহায়তা করে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিরিয়া, ইরান, তুরুস্ক, কাতারের সাথে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সৌদি আরবের বিরোধের প্রেক্ষাপটে একদিকে রাশিয়া, তুরুস্ক, কাতারের সাথে ইরানের মিত্রতার বন্ধন গড়ে উঠেছে এবং অপরদিকে রাশিয়ার সাথে ইরান, সিরিয়া, তুরুস্কের ভূ-রাজনৈতিক মিত্রতা গড়ে উঠেছে।

ইরান মার্কিণ পরাশক্তি-পশ্চিমা জোটের দোসর ইসরাইল এবং তাদের মিত্র সৌদি আরব আর তার আরব মিত্রদের মার্কিণ-পশ্চিমা শক্তিদের অনুগত/পোষ্য তাবেদার/লাঠিয়াল শক্তি মনে করে। এজন্য ইরান সৌদির রাজপরিবার, মার্কিণ পরাশক্তি, ইহুদীবাদী ইসরাইলকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রবল অভিন্ন শত্রু/হুমকি এবং ইসলামী/মুসলিম বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে। ইরানের ইসলামী শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ত্ব বাঁচাতে ও ইরানকে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক/কূটনৈতিক চাপ, ইসরাইল/মার্কিণ পরাশক্তি/পশ্চিমা জোটের হুমকি/হামলা/আগ্রাসন, দখলদারিত্ব, শোষন, লুন্ঠন থেকে নিরাপদ থাকতে/রাখতে বিচক্ষণতা ও কৌশলের সাথে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থ-সামাজিক উন্নতি, সমৃদ্ধি সুনিশ্চিতকরণ, পর্যাপ্ত সামরিকশক্তি অর্জনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে ইরানপন্থী/সমর্থিত/মিত্রভাবাপন্ন এবং সৌদি/ইসরাইল/মার্কিণ/পশ্চিমা বিরোধী জাতীয়তাবাদী/ইসলামপন্থী শিয়া/সুন্নী মিলিশিয়া/রাজনৈতিক গোষ্ঠী/দলগুলোর বিপ্লব/আন্দোলন/ সরকারগুলোকে সমর্থন, সহযোগীতা করার মাধ্যমে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে এনে মধ্যএশিয়ার আফগানিস্তান থেকে উত্তর আফ্রিকার মিশর পর্যন্ত সুবিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে নিজের আদর্শগত ও কৌশলগত রাজনৈতিক/কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক মিত্রতা/ সহযোগীতা, রণকৌশলগত প্রভাব, শক্তি, নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে এবং এর মাধ্যমে সারা মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রথমত ইরানের শিয়া মতালম্বীদের বিপ্লবী ইসলামী শাসকগোষ্ঠী মাযহাবী কারণে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় জোটের মিত্র শিয়া হাজারা গ্রুপ, ইরাকের মুক্তাদা আল সদরের মাহদী আর্মি/আয়াতুল্লাহ আলী আল সিসতানীর শিয়াজোট, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি আনসারুল্লাহ, সিরিয়ার শিয়া আলাভী বংশোদ্ভূত বাশারের বাথ শাসকগোষ্ঠীর আন্দোলন/বিপ্লব/সরকারগুলোকে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে সমর্থন/সহযোগীতা করেছে/করে যাচ্ছে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, রণকৌশলগত দিক থেকে। দ্বিতীয়ত মিশরের ইসলামী ব্রাদারহুড, আলজেরিয়ার ইসলামী সালভেশন ফ্রন্ট, ফিলিস্তিনের গাজার হামাস, তুরুস্কের এরদোগানের একেপি প্রভৃতি সুন্নি দলগুলোর ইসলামী আন্দোলন/সরকার মূলত মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, ইহুদীবাদী ইসরাইল, সৌদি আধিপত্যবাদ বিরোধী বলে ইরানের ইসলামী সরকার তাদের প্রতি কমবেশি মিত্রভাবাপন্ন। এছাড়া সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল, পাকিস্তানের করাচি, ভারতের কাশ্মির, নাইজেরিয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের উপর রয়েছে ইরানের ইসলামী সরকারের নেপথ্য মাযহাবী প্রভাব।

বিশ্বের প্রধান মার্কিণ বিরোধী শক্তি রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিণ-সৌদি বিরোধী আঞ্চলিক শক্তি ইরান, সিরিয়া, তুরুস্কের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান, সিরিয়া, তুরুস্কের প্রধান আন্তর্জাতিক মিত্র হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন/মেদভেদ আসার পর থেকে তারা রাশিয়াকে পুনরায় বিশ্ব পরাশক্তিতে পরিণত করার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য তারা বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে সরাসরি মার্কিণ ও পশ্চিমা বিরোধী অবস্থান নিয়েছে/নিচ্ছে এবং এরফলে মার্কিণ ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক খুব শীতল/বিরোধপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিণ-সৌদি-ইসরাইল বিরোধী ইরানের ইসলামী সরকার-সিরিয়ার বাশারের বাথ সরকার-লেবাননের হিজবুল্লাহর সাথে কৌশলগত আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও সামরিক মিত্রতার বন্ধন গড়ে তুলেছে। এর বিপরীতে ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি ও কুর্দি গ্রুপ, লেবাননের সুন্নি ও খ্রীস্টান গ্রুপ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের পিএলও/ফাতাহ, ইয়েমেনের হাদী নিয়ন্ত্রিত সুন্নি গ্রুপের মাধ্যমে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেনের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রাখার চেষ্টা এবং রাশিয়া, ইরান, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ, হামাস, হুতি আনসারুল্লাহকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে সৌদি আরব, মার্কিণ, পশ্চিমা জোট, ইসরাইল, সৌদি জোট। প্রভৃতি আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক সমস্যা, সংঘাত, ইস্যুগুলোর ক্ষেত্রে সঠিক, বিচক্ষণ, দূরদর্শী, বলিষ্ঠ, সাহসী, কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ইরান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেকে অপ্রতিহতভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী/আধিপত্যবাদী আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রের ইস্যুতে ইরানকে অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসাবে গণ্য করে মার্কিণ-পশ্চিমা বিশ্লেষকরা। এদিকে লেবানন, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিনের গৃহযুদ্ধে লাখ লাখ উদ্বাস্তু/শরনার্থীদের আশ্রয় ও সহায়তা দান ইরানের জন্য শাপে বর হয়েছে। ইরান তাদের কোন নির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র/শরনার্থী শিবিরে আবদ্ধ না রেখে ইরানের যেকোন স্থানে যাতায়াত করার, ব্যবসা/চাকুরী করে হালালভাবে খেটে খাবার, জীবন, জীবীকা নির্বাহের, সংসার চালাবার সুযোগ দিয়েছে। ফলে তারা মিত্রভাবাপন্ন ইরানের প্রতি চির ঋণী হয়েছে, ইরানের বিপ্লবী ইসলামী চিন্তাচেতনার সাথে গভীরভাবে পরিচিত এবং অনুপ্রাণিত হবার পর্যাপ্ত সময়, সুযোগ পেয়েছে। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক সংলাপের সুদীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলে ২০১৫ সালে ১৪ জুলাই ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ছয়জাতির মধ্যে পরমানু সমঝোতা চুক্তি হয়। এতে ইরান তার পরমানু কার্যক্রম বন্ধ করে এবং আন্তর্জাতিক পরমানু শক্তি কমিশন ইরানের যেকোন পরমানু স্থাপনা যেকোন সময় পরিদর্শন করার ক্ষমতা লাভ করে। বিনিময়ে তারা ইরানের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ উঠিয়ে নেয় এবং ইরানের জব্দকৃত অর্থ-সম্পদ ফেরত দেয়া হয়।

সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, তাদের আরব ও পশ্চিমা মিত্ররা পরমানু সমঝোতা চুক্তি, ফিলিস্তিন/লেবানন ইস্যু, তুরুস্ক/কাতার সংকট, ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইরানের কূটনীতি ও রণকৌশলের কাছে মার খেয়ে/পরাস্ত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যাবার/ইরানকে জড়াবার হুমকি দিচ্ছে এবং তারা সেই পরিকল্পনাকে নিয়েই ধীর লয়ে এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এবং পারমানবিক শক্তি অর্জনের ভয়ে ইসরাইল ও সৌদি আরব আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার কথা বলছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালাবার হুমকি দিয়েছ। সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে, লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্নক অভিযানের মাধ্যমে যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে, তাতে সরাসরি ইরানকে যুদ্ধের ময়দানে টেনে নিয়ে আসতে চাইছে এবং ইরানে হামলার জন্য মার্কিণ প্রশাসনের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করছে। একইভাবে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান বিভিন্ন বার ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধার/মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ইরানের ভেতর নিয়ে যাবার হুমকি দিচ্ছেন। এর প্রতিউত্তরে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইসরাইল ইরানে হামলা চালালে ইরানও ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরাইলকে মাটির সাথে দেয়া হবে। আর সৌদি আরব কোন অজ্ঞতার পরিচয় দিলে মক্কা ও মদীনা ছাড়া সমগ্র সৌদি আরবকে ধবংস করে দেয়া হবে। একইভাবে ডোনাল্ট ট্রাম্প ২০১৬ সালে তার নির্বাচনী প্রচারণার সময়কালে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর থেকে ইরান-ছয়জাতির মধ্যকার চুক্তিকে ক্রটিপূর্ণ ও একপেশে এবং বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম চুক্তি বলে এটি বাতিল করার দাবী তুলেন। নয়তো এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নিবে। এরই প্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে গেলে ইরানও এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে। ইরান পুনরায় পারমানবিক কর্মসূচী শুরু করবে, অধিক হারে ইউরিনিয়াম উৎপাদন শুরু করবে এবং তাদের কাছে এরূপ আরো ভালো বিকল্প ব্যবস্থা আছে। তখন ইরান এই সমঝোতা চুক্তির শর্তসমূহ মেনে চলতে বাধ্য থাকবে না। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, বিশ্বশান্তির স্বার্থে এই পরমানু চুক্তি এবং এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখতেই হবে। ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মানীর নেতৃবৃন্দ ট্রাম্পকে পরমানু সমঝোতা চুক্তি থেকে সরে না আসার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। তারা সবাই বলেছে ইরান চুক্তির সব শর্ত মেনে চলছে। তারা সন্দেহজনক কিছুর সংবাদ জানতে/তৎপরতা দেখতে পায়নি। এদিকে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় মিত্রদের, বিশ্বের সবার অনুরোধ ও পরামর্শ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনকে অগ্রাহ্য করে গায়ের জোরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্র‍্যাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালের ৯মে ইরানের সাথে ছয়জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং ইরানের উপর পুনরায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ ঘোষনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তকে ইসরাইল ও সৌদি আরব স্বাগত জানায়।

মার্কিণ উপদেষ্টারা সৌদি আরবে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার পরামর্শ প্রায়ই দিয়ে থাকেন। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পরমানু সমঝোতা চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধার সম্ভাবনাও বেড়ে গেছে। এতে বিশ্বশান্তি ভীষনভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। একদিকে সিরিয়ায় ইসরাইল-ইরানের মধ্যে এবং ইয়েমেনে, ইরাক, লেবাননে সৌদি-ইরানের ছায়াযুদ্ধ/রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘতর হচ্ছে। অপরদিকে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার মধ্যে ছায়াযুদ্ধ তাদের মিত্র ইরান-ইসরাইলের মধ্যে সামরিক সংঘাতকে তীব্র করে তুলছে। এর পাশাপাশি মার্কিণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের ১২দফা শর্ত ইরানকে মেনে নিয়ে নতুন শান্তি চুক্তি করার পক্ষে আন্তর্জাতিক অভিমত গড়ে তোলার এবং ইরানের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘাতময় রক্তস্নাত বিস্ফোরক পরিস্থিতি এবং ইরান ও তার মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরবের ষড়যন্ত্র, আক্রমনাত্নক, আগ্রাসী কথাবার্তা, কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনী বলেছেন, "ইরান এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতর অবস্থান করছে।" তার এই বক্তব্যের মর্মার্থ হচ্ছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দেশে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সংঘাত/যুদ্ধময় রক্তক্ষয়ী ধবংসাত্নক বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে যেকোন সময় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকেও সরাসরি এই যুদ্ধের ময়দানে নামতে হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের যুদ্ধাভিযান ইরান, সৌদি আরবসহ সারা আরব উপদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চরম বিপদজনক/বিপর্যয়কর/ধবংসাত্নক/রক্তস্নাত পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। যে যুদ্ধের রক্তস্রোত ও আগুনের লেলিহান শিখা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্বকেও রক্তস্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, আগুনে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করবে। (ক)প্রথমত ইসরাইল যদি নিজে থেকে ইরান আক্রমন করে ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধায় অথবা ইসরাইলকে দিয়ে যদি ইরানের উপর আক্রমন করিয়ে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ বাধানো হয় তাহলে ইরান-সিরিয়ার মিত্র রাশিয়া ইরানের পক্ষ নিতে পারে এবং তখন বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও তার মিত্র ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে হবে। তার মানে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ বাধলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের পক্ষে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে আসতে/নামতে হবে। ন্যাটো জোট এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। (খ)দ্বিতীয়ত আর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলে পক্ষে অথবা নিজেই সরাসরি ইরান আক্রমন করলে তা সারা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক বিরূপ সহিংস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এবং তাদের মধ্যে খ্রীষ্টান বিরোধী সাম্প্রদায়িকতার প্রসার ঘটতে পারে। সারা বিশ্ব জুড়ে মুসলিম-খ্রীষ্টান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সংঘাত ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়তে পারে। (গ)তৃতীয়ত সারা বিশ্ব জুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র মার্কিণ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হবে। এটা সারা বিশ্বে ইসলামী জঙ্গীবাদ এবং ইসলামপন্থী আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী, ব্যাপক ও বিস্তৃত করবে। মার্কিণ নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, সামরিক ঘাটি, স্বার্থ ব্যাপকভাবে ইসলামী জঙ্গীদের আক্রমনের শিকার হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মার্কিণ ও সৌদি পন্থী দল/সরকারগুলো জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামপন্থীদের ব্যাপক গণআন্দোলন/সশ্রস্ত্র বিদ্রোহের মুখে পড়বে এবং ক্ষমতাচ্যুত হবে। (ঘ) চতুর্থত এই সংঘাত মুসলিম বিশ্বের মধ্যেও বিরাট ভাতৃঘাতী সংঘাতের সূচনা করতে পারে। চতুর্থত রণকৌশলী ইরান এই যুদ্ধকে সারা মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত করার কৌশল নিতে পারে। ইরান সরাসরি নিজে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, সিরিয়ার বাথ সরকার, ইয়েমেনের হুতি আনসারুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া ও সরকারকে দিয়ে সৌদি আরব ও ইসরাইলের উপর সর্বাত্নক হামলা করাতে পারে। সৌদির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে আরব আমিরাত, বাহরাইনের উপরও হামলা হতে পারে। সৌদি আরবের সমর্থনে/পক্ষে আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিশর, লিবিয়া, মৌরতানিয়া যুদ্ধে যোগ দিতে পারে। কাতার ও তুরুস্ক ইরানের পক্ষ এবং পাকিস্তান সৌদি আরবের পক্ষ নিতে পারে। সুযোগ বুঝে তুরুস্ক ফিলিস্তিনের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনাও করতে পারে। ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেন-লেবাননের সুন্নিগ্রুপগুলো এবং জঙ্গী সুন্নি সংগঠন আল কায়দা, আইএস সৌদির পক্ষেই অবস্থান নিবে। কুয়েত, ওমান, জর্দান, সূদান, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, মরক্কো নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারে। তার মানে ইসরাইল/সৌদি আরব/যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরান আক্রান্ত/আক্রমন হওয়া মানেই হচ্ছে প্রথমত মুসলিম বিশ্বের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সূচনা এবং দ্বিতীয়ত বিশ্ব জুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশনি সংকেত। যা সারা মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা বিশ্ব এবং সার্বিকভাবে বিশ্বের জন্যও মহা বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। 

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK