রবিবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৮
Tuesday, 22 May, 2018 10:46:06 am
No icon No icon No icon

সৌদী আরবের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইরান নীতি এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব বলয়


সৌদী আরবের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইরান নীতি এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব বলয়


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আল মামলেকা আল আরাবিয়া আস সৌদিয়া(সৌদি আরব সাম্রাজ্য)। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল হেজাজ। সৌদি আরব ইসলাম ধর্ম এবং মুসলমানদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-পবিত্র জন্মভূমি। মক্কার বাইতুল হারাম শরীফ হচ্ছে ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রধান কেন্দ্রীয় তীর্থস্থান। আর দ্বিতীয় প্রধান পবিত্র স্থান হচ্ছে মদীনায় অবস্থিত ইসলাম এবং মুসলমানদের নবী/রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর পবিত্র রওজা মুবারক/মাজার। সৌদি আরবের রাষ্ট্রকাঠামো এবং সরকার ব্যবস্থাটি মূলত সামরিকশক্তি/বাহুবলে এবং রাজনৈতিক সমঝোতা/ চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। রাজতন্ত্র, ওহাবীজম, শরীয়ার ভিত্তিতে শাসিত ইসলামী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা/কাঠামো। কার্যত ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আল সৌদ এবং ওহাবীদের প্রধান আধ্যাত্নিক নেতা আব্দুল ওহাব চুক্তির মাধ্যমে রাজতন্ত্র, ওহাবী মতাদর্শ ও শরীয়া আইনের সমন্বয়ের ভিত্তিতে সৌদি আরবে ইসলামী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। আল সৌদ রাজপরিবার ওহাবী ওলামাদের নিয়ে গঠিত ওলামা পরিষদের সাথে ক্ষমতাকে ভাগাভাগি করেন। তাদের জাতীয় পরিষদের নাম রাখা হয় সূরা মজলিস। সৌদ-ওহাবের মধ্যকার চুক্তির ফলে প্রথমত আব্দুল ওহাব ও অন্যান্য ওহাবী নেতৃবৃন্দ আল সৌদের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রকে মেনে নেয়। দ্বিতীয়ত বিনিময়ে বাদশাহ আল সৌদ আব্দুল ওহাব ও তার পরিবারকে বংশানুক্রমিক সৌদি ওলামা পরিষদের প্রধান ধর্মীয় নেতা হিসাবে মেনে নেয়। তৃতীয়ত সৌদ-ওহাব সৌদি আরব এবং সৌদি রাজতন্ত্রকে শরীয়া আইন এবং ওহাবী মতাদর্শের ভিত্তিতে/আলোকে পরিচালিত করতে সম্মত হয় এবং গঠিত হয় সূরা কাউন্সিল। চতুর্থত এরফলে সৌদি আরবের সাধারণ রাজতন্ত্র ওলামা সমর্থনপুষ্ঠ ধর্মভিত্তিক ইসলামী রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আল সৌদের রাজপরিবার/তার বাদশাহরাই বংশানুক্রমিকভাবে সৌদি আরব শাসন করছে। রাজপরিবার এবং ওলামা পরিষদ মিলে যৌথ পরামর্শের আলোকে সূরা মজলিসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এভাবে তারা নিজেদের রাজতান্ত্রিক শাসন, ওহাবীদের ওহাবীজম ও শরীয়া আইনকে সমন্বয় করে এবং সূরা কাউন্সিলের মাধ্যমে সৌদি আরব শাসন করছে। রাজতন্ত্র, ওহাবীজম এবং শরীয়া আইন হচ্ছে সৌদী রাজপরিবার, তাদের সমর্থক/অনুগত রাজতান্ত্রিক প্রশাসন এবং ওহাবী ওলামা গোষ্ঠীর সৌদি আরব শাসন করার, তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার, ভোগ-দখল করার, ক্ষমতা ধরে রাখার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শগত ভিত্তি এবং হাতিয়ার।

অটোমান সাম্রাজ্যের উসমানীয়া খিলাফতের সুন্নী শাসকরা তাদের খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর নামাজে মুনাজাত, মিলাদ পড়ানো, ঈদে মিলাদুন্নাবী, শবে বরাত, শবে মেরাজ পালন শুরু করেন আনুষ্ঠানিকতা এবং জাকজমকের সাথে। তাদের শাসিত আরব উপদ্বীপের সব রাজ্য/প্রদেশ/অঞ্চলেও এগুলো অনুসরণ ও পালন করা হোত। কিন্তু বাদশাহ আল সৌদের শাসনামল থেকে সৌদি আরবে ওহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠার পর ওহাবীরা সৌদি আরবে পূর্ব প্রচলিত নামাজে মুনাজাত করা, রাসূল(সাঃ)-এর নামে মিলাদ পড়নো, ঈদে মিলাদুন্নাবী, শবে বরাত, শবে মেরাজ দিবস পালনকে বেদাত(অনৈসলামীক)বলে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন। আসলে সৌদি ওহাবীরা ছিল কট্টর ধর্মান্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী এবং তুর্কী বিরোধী। তাই তারা অটোমান তুর্কী শাসনামলে আরব উপদ্বীপে প্রচলিত প্রচলিত এইসব প্রাচীন সামাজিক ধর্মীয় প্রথাগুলোকে তাদের নতুন প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাজতান্ত্রিক সৌদি আরবের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে রাখতে দিতে প্রবলভাবেই অনিচ্ছুক ছিল। রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতাতেই সৌদি ওহাবী ওলামারা সারা বিশ্বে তাদের ওহাবীজম(ওহাবী মতাদর্শ)-কে ছড়িয়ে দিচ্ছে/রপ্তানী করছে। রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় সৌদি আরবের নিকটবর্তী আরব উপদ্বীপের এবং মাগরেব আরবের দেশগুলোতে ওহাবী মতবাদ ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। সৌদির রাজতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী ও ওলামাগোষ্ঠী ওহাবীজমের মাধ্যমে সারা বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র/অঞ্চলে সরকার, বিরোধী দল, সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া গোষ্ঠী সৃষ্টি, সমর্থন, সহযোগীতা করে মুসলিম বিশ্বের উপর সৌদি আরবের ব্যাপক ধর্মীয় আদর্শগত, কূটনৈতিক ও রণকৌশলগত প্রভাব বলয় সৃষ্টি, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব নিজেকে সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর প্রধান নেতৃত্ব দানকারী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে/দাবী করছে। এছাড়া ইরান বিরোধী আরব আমিরাত, বাহরাইন, জিবুতির রাজপরিবার গুলোর সাথে, লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনের সুন্নি গোষ্ঠী/সরকারদের সাথে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, পশ্চিম তীরের পিএলও/ফাতাহ, মিশর, লিবিয়া, সূদান, মৌরতানিয়া, নাইজারের সামরিক/মিলিশিয়া/রাজনৈতিক গোষ্ঠী/দল/সরকার গুলোকে নিয়ে সৌদি আরব তার আঞ্চলিক প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে। আর কুয়েত, ওমান, জর্দান, মরক্কো সতর্কতার সাথে সৌদি-ইরানের সংঘাত থেকে নিজেদের নিরাপদ দূরুত্বে রেখে সৌদি আরবের সাথে কৌশলগত মিত্রতা বজায় রেখে চলেছে। সৌদি আরব নিজেসহ তার ভূ-সংলগ্ন প্রতিবেশী, ঘনিষ্ঠ আরব রাজতান্ত্রিক মিত্ররাষ্ট্র আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমানের শাসকদের ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার ভীতকে সুদৃয় করার/রাখার লক্ষ্যে উপসাগরীয় ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট উপসাগরীয় সহযোগীতা পরিষদ(জিসিসি) গঠন করেছে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির উপরও সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে/সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মিশর, তিউনিশিয়া, তুরুস্ক, পাকিস্তান, সূদান, মৌরতানিয়ার সেনাবাহিনী/রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সৌদি শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও স্বার্থ রয়েছে। বিভিন্ন আরব সুন্নি রাজতন্ত্র, সামরিক/রাজনৈতিক দলের একনায়ক শাসক, সুন্নি মিলিশিয়া গ্রুপদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র এবং মদদদাতা হচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি আরব বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানীকারক দেশে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন জেহাদী জঙ্গী গ্রুপগুলোকে সমর্থন-সহায়তা দেয়ার জন্য, তাদের কাছে পাঠাবার জন্য সৌদি আরবকে প্রতি বছর এই বিপুল পরিমান অস্ত্র কিনতে ও আমদানী করতে হচ্ছে।

সৌদি শাসকগোষ্ঠীর ওহাবীজম/অভ্যন্তরীণনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি/মধ্যপ্রাচ্যনীতি সম্পূর্ণরূপেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং শিয়া মাযহাব বিরোধী। 
(ক)সৌদি আরব এবং ইরান দুটোই শরীয়া আইন শাসিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা হলেও সৌদি আরব ইরানকে প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র বলে মনে করে না। কারণ ওহাবীরা একমাত্র সুন্নি ছাড়া অন্য কোন মাযহাবের অনুসারী মুসলমানদের প্রকৃত মুসলমান বলে স্বীকার করে না এবং তারা শিয়াদের রাফেজী/ধর্মচুত্য, কাফের/বিধর্মী বলে মনে করে। একইভাবে ইরানীরা অনারব বলে সৌদি ওহাবীরা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্র বলেও স্বীকার করে না। যেমনটা পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো রাশিয়াকে সর্বদা ইউরোপ মহাদেশ বহির্ভূত রাষ্ট্র বলে মনে/মূল্যায়ন করে। 
(খ)ইরানের মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচারী আরব রাজতন্ত্র/একনায়কতন্ত্র বিরোধী বিপ্লবী ইসলামী আদর্শ এবং ইহুদী ইসরাইল বিরোধী অবস্থানের জন্য ইরানকে সৌদির রাজতন্ত্র/ওহাবীজম, মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা সভ্যতা, ইহুদীবাদী ইসরাইলের প্রতি প্রধান আদর্শগত, সামরিক, আঞ্চলিক হুমকি/প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গণ্য করা হয়। তাই ইসলামী ইরানের প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠাকে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলের শাসকগোষ্ঠী তাদের জাতীয়/আন্তর্জাতিক স্বার্থ আদায়/প্রতিষ্ঠা, স্থিতিশীলতা/নিরাপত্তা, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক, হুমকি হিসাবে গণ্য করে থাকে এবং ইরানের পতন/ধবংস কামনা করে।
(গ)ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং ইসলামী সরকার শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এবং বিভিন্ন মতাদর্শের ইসলামী দলের কাছে আইডল ইসলামীক স্টেট(আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা)হিসাবে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করেছে/করছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব কার্যত সারা বিশ্বের ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক/সশ্রস্ত্র ইসলামী আন্দোলন/বিপ্লবকে করেছে প্রবল বেগবান। তাই সারা বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের/অঞ্চলের ইসলামী আন্দোলন/বিপ্লবের মূল আদর্শিক কেন্দ্রস্থল হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। যা আরবের স্বেচ্ছাচারী রাজবংশদের রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ধর্মান্ধ ওহাবী ওলামাদের ওহাবীজম এবং পশ্চিমাদের পুজিবাদী, ভোগবাদী, নগ্ন পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সরাসরি প্রবল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদর্শিক সংকট/চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এজন্যই পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলন/বিপ্লবকে পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য প্রবল হুমকিস্বরূপ হিসাবে অভিহিত করেছে/বিবেচনা করে। এই আদর্শিক কারণেই সৌদির রাজতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী ইরানের বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক শিয়া মতালম্বী ইসলামী শাসকগোষ্ঠীকে সৌদি আরবের রাজপরিবার, তাদের রাজতন্ত্র, ওহাবীজম এবং সৌদির বিভিন্ন মিত্রভাবাপন্ন সুন্নি শাসকগোষ্ঠীদের প্রধান শত্রু ও হুমকি মনে করে।
(ঘ)সৌদির রাজপরিবার মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য বিস্তারকে পারসিকরণ ও শিয়াকরণের নামে কাল্পনিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং অব্যাহতভাবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে সৌদি রাজতন্ত্র অভ্যন্তরীণ/আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইরান বিরোধী জনসমর্থন এবং কূটনৈতিক প্রভাব বলয় গড়ে তোলার নীতি অনুসরণ করে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে ইরানের সমঝোতা হোক/টিকে থাকুক অথবা সুসম্পর্ক গড়ে উঠুক এটা সৌদি আরব কখনো চায় না। এর মাধ্যমে-১/সৌদির শাসকগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণক্ষেত্রে সৌদিদের সংহতিকে সুসংহত করে সকল রাজনৈতিক সমস্যা/বিরোধীতাকে মোকাবেলা ও দমন করতে চাইছে। ২/নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে/রাখতে চাইছে। ৩/আঞ্চলিক ক্ষেত্রে নিজেদের সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর অভিভাবক হিসাবে গুরুত্ব তুলে ধরতে চাইছে। ৪/আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসাবে নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে চাইছে। 
(ঙ)যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ঐতিহ্যগতভাবে সৌদি আরবের সবচেয়ে প্রাচীন ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং একইভাবে মার্কিণ পরাশক্তি, ইইউর মধ্যপ্রাচ্যনীতিতে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার হচ্ছে তাদের প্রধান বিশ্বস্ত আস্থাভাজন মিত্র। শত্রুর শত্রু বন্ধু এই স্বাভাবিক নীতিতে সম্প্রতি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমানের সময়কালে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ইস্যুতে সৌদি আরবের প্রতি ইসরাইল মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সৌদির পক্ষ থেকেও সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠাকে ঠেকাতে/নিয়ন্ত্রণ করতে অভিন্ন শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি-মার্কিণ-ইসরাইল ভূ-রাজনৈতিক এবং রণকৌশলগত কারণে কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তুলেছে এবং একজোট হয়েছে। সৌদি, মার্কিণ, ইসরাইল সবার সাথে ইরানের দা-কুড়াল সম্পর্ক এবং এই তিনপক্ষই ইরানের প্রতি প্রবল শত্রু ভাবাপন্ন। তারা মধ্যপ্রাচ্য/মুসলিম বিশ্বে ইরানের এবং তার মিত্রদের অব্যাহত প্রভাব/আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তাদের সবারই অভিন্ন লক্ষ্যঃ ১/ইরানকে কোনভাবেই পারমানবিক শক্তি অর্জন করতে না দেয়া। ২/মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতি মিত্রভাবাপন্নদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব/শক্তিকে যেকোনভাবেই হোক দুর্বল, নিয়ন্ত্রণ করা/নিয়ন্ত্রণে আনা। ৩/মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে শিয়া মতালম্বী জনগোষ্ঠী/রাজনৈতিক/মিলিশিয়াদের দল/গোষ্ঠীর প্রভাব হ্রাস/নিয়ন্ত্রণ করা। ৪/ ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নামানো। ৫/ইরানের বিপ্লবী ইসলামী সরকারকে উচ্ছেদ করা/তার পতন ঘটানো এবং ৬/মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব/আধিপত্যের চির অবসান ঘটানো।

এই সমস্ত কারণে ইসলামী ইরান মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদকে ইরানের প্রতি প্রধান হুমকি, ইসরাইলকে অবৈধ দখলদার ইহুদী রাষ্ট্র, সৌদি রাজতন্ত্রকে স্বৈরাচারী এবং ইসরাইলের ইহুদী শাসকগোষ্ঠী এবং সৌদি রাজ পরিবারকে মার্কিণ পরাশক্তির তাবেদার ও দোসর ভাবে। তাই ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সৌদি আরব তিনটিই প্রধান শত্রু ও হুমকি। সৌদি আরবকে শিয়া মাযহাব, ইরান এবং ইরানের মিত্রদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু, হুমকি হিসাবে গণ্য করে ইরান ও তার মিত্ররা। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের মিত্রদের রণকৌশলগত এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে/রেখে সৌদি আরব-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখাই ইরানের প্রধান লক্ষ্য। তাই সৌদি শাসকগোষ্ঠী, ওহাবী এবং তার মিত্রদের কাছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অব্যাহত আদর্শিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, রণকৌশলগত প্রভাব, শক্তি, মর্যাদা, গুরুত্ব বৃদ্ধি ও অর্জন আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠা এবং ইরান সমর্থিত/ইরানপন্থী, ইরানের ইসলামী বিপ্লব/সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন দেশের শিয়া/সুন্নী গোষ্ঠী/দল, সরকার, মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর ইসলামী/জাতীয়তাবাদী আন্দোলন/বিপ্লব/সরকারের প্রভাব/ক্ষমতা বৃদ্ধি/লাভ প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে মধ্যপ্রাচ্য, ইসলামী/মুসলিম বিশ্বে শিয়াদের শক্তিকেন্দ্র চিরশত্রু ইরানের আধিপত্য বিস্তার/প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মাত্র। এজন্যই ইরান সমর্থিত/ইরানপন্থী, ইরানের ইসলামী বিপ্লব/সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের মাহাদী আর্মি/শিয়াজোটের বিপ্লব/আন্দোলন/সরকার, সিরিয়ার বাশার আল আসাদের বার্থপার্টির শাসকগোষ্ঠী/বাশারপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুতি আনসারুল্লাহ গ্রুপের বিপ্লব/সরকারকে কখনো সমর্থন করেনি সুন্নী সৌদী আরব এবং তার মিত্ররা। একইভাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে/ইরানের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন বলে মিশরের মুসলিম ব্রাডারহুড, আলজেরিয়ার ইসলামীক সালভেশন ফ্রন্ট, গাজার ইসলামী আন্দোলন হামাস, তুরুস্কের একেপি(জাস্টিস এন্ড ডেবলপমেন্ট পার্টি)-র মত সুন্নী ইসলামী দল, তাদের গণতান্ত্রিক বিপ্লব/আন্দোলন/নির্বাচিত সরকারকেও সৌদি আরব ও তার মিত্ররা কখনো সমর্থন করেনি। তাদের সবার সাথে সৌদি এবং তার মিত্রদের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ/প্রত্যক্ষভাবে বিরোধ/সংঘাতপূর্ণ। এখানে উল্লেখ্য যে, মার্কিণ-পশ্চিমা আগ্রাসনে ২০০১ সালে আফগানিস্তানের সৌদি-পাকিস্তান সমর্থিত ও পশ্চিমা-ইরান বিরোধী তালেবান সরকার এবং ২০০৩ সালে সৌদি, মার্কিণী, ইসরাইল, পশ্চিমা, ইরান বিরোধী ইরাকের সাদ্দামের সুন্নি বাথ সরকারের পতনের পর কার্যত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। এই সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ইরানের অনুকূলে এবং সৌদি, মার্কিণী, ইসরাইল, পশ্চিমাদের প্রতিকূলে চলে যেতে থাকে। পশ্চিমাদের সমর্থনে কিছুদিন মার্কিণ-সৌদি অনুগত সুন্নিগোষ্ঠীকে ইরাকের ক্ষমতায় বসিয়ে রাখা গেলেও ইরানের সমর্থন ও সহযোগীতায় ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের সামরিক ও রাজনৈতিক উত্থানের ফলে শেষপর্যন্ত ইরানই লাভবান হয়েছে। ইরানের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সমর্থন/সহযোগীতায় সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে পর্যায়ক্রমে শিয়া মাযহাবীদের সামরিক/রাজনৈতিক গোষ্ঠীশক্তির উত্থান ঘটে। এছাড়া কিছু সুন্নি রাষ্ট্রের সাথেও ইরান কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তোলে।

আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিশিয়ায় তীব্র গণআন্দোলনের মুখে তিউনিশিয়ার স্বৈরশাসক বেন আলী সপরিবারে সৌদি আরবে পালিয়ে গেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীরা একত্রিত হয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশকে রাজনৈতিক অরাজকতা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। তারা ছয় মাসের মধ্যে তিউনিশিয়ায় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। নির্বাচনে মধ্য ইসলামপন্থী এনদাহা পার্টি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। তারা সাবেক একনায়ক বেন আলী সরকারের ব্যক্তিদের তাদের সরকার প্রশাসনের সাথে একাত্ন করে নেন। তারা পূর্বতন সরকারের ন্যায় সৌদি আরবের প্রতি মিত্রতানীতি বজায় রাখার নীতি গ্রহন করেন। এই আরব বসন্ত বিপ্লবের গণআন্দোলনের মুখে ২০১০ সালে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলের সবচেয়ে পুরানো, বিশ্বস্ত, শক্তিশালী মিত্র মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারকের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিলের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনে মুসরির নেতৃত্ত্বাধীন ইসলামী ব্রাদারহুড বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মুসরি প্রথম থেকেই একগুয়েমীর সাথে সাবেক সেনাপ্রধান ও একনায়ক হোসনী মোবারক, তার সহযোগীদের গ্রেফতার, কঠোর বিচার-শাস্তির ব্যবস্থা করেন এবং পার্লামেন্টে আইন পাশ করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে সীমীত করার উদ্যেগ নেন। ইরান, তুরুস্কের সাথে দ্রুত সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপ নেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এই সমস্ত কারণে মুশরি ও ব্রাদারহুড সরকারের প্রতি মিশরের সেনাবাহিনী, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরব আতংকিত এবং বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। এরফলে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে মুশরির ব্রাদারহুড সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর এবং আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সৌদিআরব, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতি চরম ঘটতে থাকে। এরই একপর্যায়ে বিদেশীশক্তির সবুজ সংকেত ও মদদে এক বছরের মধ্যেই সেনাপ্রধান আব্দেল সিসি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মুসরি ও তার ব্রাদারহুড সরকারকে ক্ষমতাচুত্য করে মিশরের ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং তিনি মুসরি ও ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেন। সামরিক জান্তা সিসি মুবারক সরকারের ন্যায় সৌদিআরব, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রতানীতি গ্রহন করে।

আরব বসন্তকালে ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক কর্নেল মুয়াম্মের গাদ্দাফীর বিরুদ্ধেও গণবিক্ষোভ শুরু হয় তার পদত্যাগের এবং গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার দাবীতে। গাদ্দাফী কঠোর হস্তে এই গণবিক্ষোভকে দমন করার চেষ্টা করলে গাদ্দাফী বিরোধী গণবিক্ষোভ খুব দ্রুত সর্বাত্নক সশ্রস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে সৌদি ও তার আরব মিত্ররা, যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটিশ-ফ্রান্স ন্যাটো জোট গাদ্দাফী বিরোধী বিদ্রোহীদের বিপুল পরিমান অর্থ-অস্ত্র-গোলা-রশদ, সহায়তা দেয়। তৃতীয় পর্যায়ে তারা গাদ্দাফী বিরোধী গ্রুপদের জোট ন্যাশনাল ট্রান্সিশনাল কাউন্সিল(এনটিসি) প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে এবং জাতিসংঘ এনটিসিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। চতুর্থ ও চূড়ান্ত পর্যায়ে মার্কিণ নৌবহর তাদের রণতরীগুলো থেকে, ব্রিটিশ-ফ্রান্স জোটের জঙ্গী-বোমারু বিমানবহর দিয়ে বিদ্রোহীদের সমর্থনে গাদ্দাফী বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক অবস্থানের উপর ব্যাপক বোমাবর্ষন শুরু করে, বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপলীতে অনুপ্রবেশ করে, পতন ঘটে গাদ্দাফী সরকারের এবং একপর্যায়ে তারা গাদ্দাফীকে ধরে নির্মমভাবে হত্যা করে বিদ্রোহের নয় মাসের মাথায়। সৌদিপন্থী মিলিশিয়াদের হাতে রাজধানী ত্রিপলীসহ লিবিয়ার মূল বৃহৎ অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে। বর্তমানে তারাই লিবিয়ার বৈধ প্রতিনিধি/সরকার হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে আন্তর্জাতিকভাবে। ২০১১ সালে লিবিয়ার মত একইভাবে সিরিয়াতেও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। প্রথমে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পদত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাশার বিরোধী গণআন্দোলন শুরু হয়। বাশার তা দমন করার চেষ্টা করলে ক্রমেই তা সহিংস বিক্ষোভে পরিণত হয়। একদল বাশার বিরোধী সুন্নি সেনা সিরিয়ার সেনাবাহিনী থেকে বেড়িয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি ফোর্স গঠনের ঘোষনা দিয়ে বাশার সরকারের বিরুদ্ধে সশ্রস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। মার্কিণ-ব্রিটিশ-ফ্রান্স জোট, সৌদি ও তার আরব মিত্ররা এই বিদ্রোহী সেনাদের অর্থ, অস্ত্র, গোলা, রশদের ব্যবস্থা করে দেয়। এরপর বাশার বিরোধী গ্রপগুলোকে দিয়ে পশ্চিমারা একটি জোট গঠন করে এবং তাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। একই সাথে বিদ্রোহীদের পক্ষে পশ্চিমারা সরাসরি সিরিয়ায় হামলা শুরু করে বাশারবাহিনীর অবস্থানের উপর এবং আগ্রাসনের পরিকল্পনাও করে। প্রথমদিকে সৌদি ও তার মিত্রদের সমর্থনে বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গী গ্রুপ বেশ সাফল্য অর্জন করে বাশার সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলে। তাদের সবার লক্ষ্য ইরান-হিজবুল্লাহ-হামাসের মিত্রশক্তি এবং ইসরাইল-মার্কিণ-সৌদি বিরোধী শক্তি সিরিয়ার বাশারের বাথ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিরিয়ায় তাদের তাবেদার জোটকে ক্ষমতায় বসানো। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং পরে রাশিয়া বাশারের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়ায় সিরিয়ার বাশার সাদ্দাম/গাদ্দাফীর মত পরিণতি থেকে সৌভাগ্যক্রমে রক্ষা পায়। ফলে সিরিয়াতে মার্কিণ-পশ্চিমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ধবংস স্তুপে পরিণত হয়েছে সিরিয়া।

২০১১ সালে আরব বসন্তকালে সৌদি আরবের শিয়া নেতা শেখ নিমর আল নিমর প্রকাশ্যে সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা শুরু করেন এবং নির্বাচন দেওয়ার দাবী তোলেন। ২০১২ সালে সরকার উৎখাতে মদদ দেবার অভিযোগে গ্রেফতার তাকে করা হয়, তার উপর মামলা দায়ের করা হয় এবং ২০১৪ সালে এক আদালত উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। পূর্বাঞ্চলের শিয়ারা সরকারের বৈষম্যের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করলে সৌদি সরকার তাদের উপরও সর্বাত্নক সামরিক হামলা চালিয়ে তাদের উচ্ছেদ ও ধবংস করে। ইরানের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও সৌদি শাসকগোষ্ঠী সৌদি শিয়াদের নেতা নিমর আল নিমরসহ অনেক শিয়া নেতাকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে শিরচ্ছেদ করে। এর প্রতিবাদে ২০১৬ সালের জানুয়ারীতে তেহরানে বিক্ষোভকারীরা সৌদি দূতাবাসের উপর হামলা চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে সৌদি আরব ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষনা দেয়। তার সাথে কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাত, সূদানও যোগ দেয়। আরব বসন্তকালে সৌদি আরব তার নেতৃত্বাধীন জিসিসির সামরিকজোট নিয়ে প্রতিবেশি ও মিত্র বাহরাইনের সুন্নি রাজতন্ত্রকে রক্ষা করতে বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া নাগরিকদের গণআন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তুরুস্কে তাইয়্যেপ এরদোগানের ইসলামপন্থী একেপি ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরুস্ককে সদস্য পদ দেবার ব্যাপারে টালবাহানা করা নিয়ে ইইউর সাথে তুরুস্কের ব্যাপক বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর তুরুস্ক সরাসরি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এই সময় থেকে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তুরুস্কের সাথে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরবের সাথে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অপরদিকে এই সময়কালে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তুরুস্কের মিত্রভাবাপন্ন সম্পর্ক গড়ে উঠে।

২০১৫ সালে ইয়েমেনের পলাতক সৌদিপন্থী সুন্নি একনায়ক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ সালেহর অনুসারী/উত্তরসূরী প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদীকে ক্ষমতাচ্যুত করে হুতি আনসারুল্লাহ ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিলে হাদী সৌদি আরবে আশ্রয় নেয়। এটাকে সৌদি আরব ইরানের ষড়যন্ত্র, শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার, উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদির আধিপত্যবাদ, নিরাপত্তার প্রতি প্রবল হুমকি হিসাবে মূল্যায়ন করে ইয়েমেনের ক্ষমতাসীন হুতি আনসারুল্লাহকে ক্ষমতাচুত্য করতে এবং সাবেক সুন্নি প্রেসিডেন্ট হাদীকে পুনরায় ইয়েমেনের ক্ষমতায় বসাতে মিত্রভাবাপন্ন কিছু সুন্নি আরব মুসলিম রাষ্ট্রকে নিয়ে ইয়েমেনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে স্থল-সামুদ্রিক-আকাশ পথে সর্বাত্নক পরিবহন ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে এবং ইসলামী সামরিক জোট গঠন করে ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ও হামলা চালাতে শুরু করে। হুতি আনসারুল্লাহর সরকার বাহিনীও পাল্টা প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসাবে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যা সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। তাদের ধারনা হুতিদের এই আকস্মিক সামরিক উত্থান ও ক্ষেপনাস্ত্র পাবার পেছনে রয়েছে ইরানের হাত। ইয়েমেনের যুদ্ধে প্রতিদিন সৌদি আরবকে কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এবং প্রতি মাসে যুদ্ধের বিপুল পরিমান খরচ মেটাতে গিয়ে সৌদি আরবকে বিদেশী ব্যাংক থেকে সুদে ঋণও নিতে হয়েছে। যা সৌদি সরকারের অর্থনীতি উপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একইভাবে সৌদি আরব প্রতিহিংসাবশত ২০১৭ সালে নিজের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি ও মিত্র রাজতান্ত্রিক কাতারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেবার অভিযোগ তুলে, আল জাজিরা টিভি চ্যানেলে বন্ধ করার জন্য, ইরানের সাথে সুসম্পর্ক রাখার জন্য, কাতারে তুরুস্কের সামরিক ঘাটি স্থাপন করার জন্য প্রভৃতি কারণে সৌদি আরব মিত্রভাবাপন্ন আট রাষ্ট্রকে নিয়ে কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কাতারের বিরুদ্ধে স্থল-সামুদ্রিক-আকাশ পথে সর্বাত্নক পরিবহন ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে। কাতারকে তারা তাদের ১৩ দফা শর্ত মেনে নেবার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। সঙ্গে সঙ্গে ইরান ও তুরুস্ক কাতারের পাশে এসে দাঁড়ায়। বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয়, ঔষধ, জ্বালানী ও দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে ইরান-তুরুস্কের ডজন ডজন বিমান কাতারের বিমান বন্দরে অবতরণ করতে থাকে। ইরান কাতারের জন্য তার সমুদ্রপথ ও আকাশপথ উন্মুক্ত করে দেয়। এরফলে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি জোটের অবরোধ অনেকাংশে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সৌদি আরবের সৃষ্ট ইয়েমেন যুদ্ধ এবং কাতার সংকট ইস্যুতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে উল্টো সৌদি জোটের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ভীষনভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে।

তাই সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, তাদের আরব ও পশ্চিমা মিত্ররা ফিলিস্তিন/লেবানন ইস্যু, তুরুস্ক/কাতার সংকট, ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইরানের কূটনীতি ও রণকৌশলের কাছে মার খেয়ে/পরাস্ত হয়ে বিস্মিত, হতাশাগ্রস্ত, বিক্ষুদ্ধ, মারমুখী হয়ে উঠছে। ইরানের পারমানবিক বোমা বানাবার ক্ষমতা/শক্তি অর্জনের ভয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের অপ্রতিরোধ্য গতিতে/ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র সবাই প্রবলভাবে চিন্তিত, সন্ত্রস্ত, বিক্ষুদ্ধ। তাই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ধৈর্য্য হারিয়ে আগেভাগে সরাসরি ইরানে হামলা করার হুমকি দিয়েছে। সেজন্য গোপনে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, পরিকল্পনা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করছে। এদিকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসীদের সহায়তা দেবার অপকর্মের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা না নিলে ইরানের সাথে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। এরপর সালমান আবার সরাসরি ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আমরা ইরানের ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যাব। এর প্রতিউত্তরে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সৌদি আরবকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, তারা এই ব্যাপারে অজ্ঞতার পরিচয় দেয় তাহলে মক্কা ও মদীনা ছাড়া সৌদি আরবের কোন কিছুই আর অবশিষ্ট রাখা হবে না। সব কিছু ধবংস করে দেয়া হবে। এদিকে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় মিত্রদের, বিশ্বের সবার অনুরোধ ও পরামর্শ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনকে গায়ের জোরে অগ্রাহ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্র‍্যাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালের ১২মে ইরানের সাথে ছয়জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং ইরানের উপর পুনরায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ ঘোষনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তকে ইসরাইল ও সৌদি আরব স্বাগত জানায়। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরাশক্তি। তাই ইরানের বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের যুদ্ধাভিযান ইরান, সৌদি আরবসহ সারা আরব উপদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্বের জন্য চরম বিপদজনক/বিপর্যয়কর/ধবংসাত্নক/রক্তস্নাত পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

এছাড়া সৌদী আরব ইরাকের গৃহযুদ্ধে সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের সমর্থক বার্থপার্টিকে সমর্থন/মদদ দিচ্ছে। সিরিয়ার আলাভীগোষ্ঠীর বাশার সরকারকে উৎখাতের জন্য সুন্নি জঙ্গীগ্রুপ জুবাতুন নুসরাকে সহায়তা করছে। লেবাননে হিজবুল্লাহদের চাপে রাখতে সেখানকার সুন্নি গ্রুপের নেতা সাদ হারিরিকে দিয়ে সংঘাতে মদদ দিচ্ছে। গাদ্দাফীর পতনের পর লিবিয়ার উপর সৌদি প্রভাব বজায় রাখতে লিবিয়ার সৌদি অনুগত/মদদপুষ্ট মিলিশিয়া সরকারকে ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা দিচ্ছে। ইরানের সুন্নি জঙ্গী গ্রুপ জুন্দুল্লাহকে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, ইসরাইলের মোসাদ এবং আফগানিস্তানের তালেবান, পাকিস্তান ও ভারতের কাশ্মিরের লস্কর-ই-তৈয়বা ও জয়সী মুহাম্মাদকে সৌদির ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান মদদ দিচ্ছে। সৌদির অন্যান্য আরব মিত্ররা ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়ায় আল কায়দা, আইএসের মত বিভিন্ন সুন্নি সন্ত্রাসী গ্রুপকে সমর্থন/মদদ দিচ্ছে। সোমালিয়ার আল শাবাব, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, তিউনিশিয়া, লিবিয়া, মালির আল কায়দা ইসলামী জঙ্গীদের পেছনে আছে তাদেরই নেপথ্য মদদ। সৌদি ও তার মিত্র দেশগুলোর ওহাবী ওলামারা তাদের উগ্র সুন্নি ওহাবী মতাদর্শকে সারা বিশ্বে রপ্তানী করছে/ছড়িয়ে দিচ্ছে। ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় চরমপন্থা, সহিংসতা, সংঘাত সৃষ্টি করছে। যা একদিন সৌদি আরবের জন্যও বুমেরাং/আত্নঘাতী হতে পারে পাকিস্তানের মত। প্রতিষ্ঠা লঘ্ন থেকেই পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী শাসকগোষ্ঠী রাজনীতি/শাসনক্ষেত্রে ধর্মকে অপব্যবহার করে, ধর্মান্ধতা ছড়িয়ে দিয়ে, ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষী রাজনীতিকে মদদ দিয়ে, আফগানিস্তানের পশতুন অঞ্চলে-ভারতের কাশ্মির-রাশিয়ার চেচেনিয়ায় তালেবান-কাশ্মিরী-চেচেন যোদ্ধাদের মাঝে জেহাদী চেতনা রপ্তানী করে এবং তাদের আশ্রয়, সমর্থন, অস্ত্র, সমরাস্ত্র, গোলাবারুদ, রশদ, প্রশিক্ষণ দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি এখন নিজেই ধর্মীয়/ইসলামী চরমপন্থী/জঙ্গী জেহাদীদের সহিংসতা, সন্ত্রাস/জেহাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে, রক্তাক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে পাকিস্তানের যুব-তরুন সমাজ এবং নাগরিকদের একাংশ এই ধরনের সহিংস জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সাথে প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে/বিপথগামী হয়ে পড়েছে। সাধারণ শান্তিকামী মানুষের জীবন, সম্ভ্রম, জীবীকা, সম্পদের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। খোদ পাকিস্তান সরকার প্রশাসন, সামরিক বাহিনী সর্বদা জঙ্গী হামলার আতংকে তটস্থ থাকছে। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আদর্শ, শাসনব্যবস্থা, উদার আধুনিক চিন্তাচেতনা, শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের শাসকগোষ্ঠীকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, সোমালিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রগুলোর উপর বিভিন্ন বিদেশী শক্তির আগ্রাসন এবং গৃহযুদ্ধের দুর্দশা, নির্মমতা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। সর্বপ্রকার আঞ্চলিক সংঘাত ও যুদ্ধ থেকে সৌদি আরবকে নিরাপদ দূরুত্বে রাখা উচিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, উন্নতির জন্য গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা উচিত।

অসীম সাহসী পৃথুলাকে বীরের মর্যাদা দেয়া হোক

লেখক: আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK