মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
Thursday, 17 May, 2018 12:08:48 am
No icon No icon No icon

মায়ের গল্প


মায়ের গল্প


শান্তা মারিয়া : গল্পটা আমার মায়ের এবং কিছুটা আমার বাবারও বটে। কারণ ৫৭ বছর যে দুটি মানুষ পাশাপাশি ছিলেন তাদের একজনকে বাদ দিয়ে অন্য জনের গল্প বলা সম্ভব নয়। তো, আগে সেই মেয়েটির গল্প বলি যার জন্ম হয়েছিল ১৯৩৬ সালের ৩১ অগাস্ট। শৈশব কেটেছিল কলকাতায়। মেয়েটির নাম ফয়জুননেসা খাতুন। বাবা ছিলেন খান বাহাদুর আফাজউদ্দিন আহমেদ। ব্রিটিশ আবগারির প্রথম বাঙালি কমিশনার। জবরদস্ত আফিম কারবারী মীনা পেশোয়ারিকে আইনের আওতায় এনে পেয়েছিলেন খান বাহাদুর খেতাব। সেই ডাকসাঁইটে বাবার মেজাজ, অহংকার, সততা ও মেধা পুরোটাই পেয়েছিলেন ফয়জুননেসা। কলকাতার আহিরিপুকুর লেনে নিজেদের প্রাসাদোপম বাড়িতে শৈশব কাটানো মেয়েটি ১৯৪৭ সালে পরিবারের সঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হলেন ঢাকায়। কলকাতার সেই স্মৃতি এখনও ভোলেননি তিনি। কলকাতার বাড়িতে একবাক্স চীনা মাটির পুতুল ফেলে আসার দুঃখ ভুলতে পারেন না আজও। প্রায়ই বলেন, চিলেকোঠায় পুতুলের বাক্সটা লুকিয়ে রেখে এসেছি, কে যে পেল কে জানে। ভুলতে পারেন না শিশু বিদ্যাপীঠের বন্ধুদের কথা। দেশ-বিভাগকে সারা জীবন অভিশাপ দিয়ে যাওয়া মানুষ তিনি। 
মাঝে মাঝে রাগ করে বলি মা সারা জীবন কাটালে ঢাকায় অথচ এখনও কেন কলকাতার স্মৃতি ধরে রেখেছ? বলেই বুঝতে পারি, আহা সেটা যে তার সোনালি শৈশবের দিন, বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো সুখের দিন। ১৯৪৮ সালেই তার বাবার(আমার নানা) মৃত্যু হয়। শুনেছি তিনি নাকি ঢাকার জীবনটা মানিয়ে নিতে পারেননি। ভাবতেন কলকাতা ছেড়ে গ্রামে এসে থাকব কিভাবে। এই ভাবতে ভাবতেই উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য সমস্যা এবং মাত্র ৫০ বছর বয়সে এবং হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। তার আঠারো দিন পরেই তার আরেক মেয়ের মৃত্যু। বলতে গেলে আমার মায়ের বেড়ে ওঠার সময়টাতে বেশ টানা পড়েন চলে। ঢাকার কামরুন নেসা স্কুলে, ইডেন কলেজে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী আমার মা ছিলেন দারুণ ফ্যাশনেবল। কবিতা আবৃত্তি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সব কিছুতেই স্কুলের নামকরা। তার প্রাণের বন্ধু ছিলেন বিজ্ঞানী ফ্লোরা মজিদ। সেগুন বাগিচা পাড়ায় আমার নানীর বাড়ি। দীন মঞ্জিল নামের সেই বাড়িটিও বিশাল বড়।বিশাল বাগান ও লন। সেখানে বিকেল হলে ব্যাডমিন্টন খেলা। সেসময় সেগুন বাগিচা ছিল রীতিমতো অভিজাত এলাকা। সেজ খালার বন্ধু ছিলেন সনজীদা খাতুন। প্রায়ই দীন মঞ্জিলে ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্টান হতো। সেখানে কাজী সাহেব(কাজী মোতাহার হোসেন) ও তাঁর বিখ্যাত মেয়েরা, শিল্পী জাহেদুর রহিম ও সেগুন বাগিচা এলাকার অনেক নামী মানুষরাই আসতেন। এমনি একটি সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা আমার মায়ের বিয়ে হয় ১৯৬০ সালে কমরেড তকীয়ূল্লাহর সঙ্গে। বাবাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনি কমিউনিস্ট হয়ে সামন্ততান্ত্রিক একটি পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করলেন কেন? বাবা হেসেছিলেন। তারপর বললেন, তোমার মা আমাকে পছন্দ করেছিলেন কেন সেটা তাঁকেই জিজ্ঞাসা করো। আসল ঘটনা হলো, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন কলকাতায় আফাজউদ্দিন সাহেবের পরিচিত ও বন্ধু। পরে আমার বড় চাচা সফিউল্লাহ সাহেবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় খান বাহাদুরের জামাতা ডা. করিমের। ডা. করিম যুবলীগ করতেন। সেই সূত্রে বাবাকেও চিনতেন।

ডা. করিমই তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে কমরেডের বিয়ের ঘটকালি করেন। তবে আনুষ্ঠানিক কোন কনে দেখা হয়নি। স্রেফ কমরেডের সঙ্গে ফয়জুননেসার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তিন মাস আলাপ পরিচয়, ঘোরাঘুরি, এবং ‘কোর্টশিপের’ পর ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি বিয়ে। আমার মায়ের মধ্যে সাহেবিআনা ছিল পুরোমাত্রায়। সেই তিনি সংসার করতে এলেন পুরানো ঢাকায়। ড্রয়িং রুম তিনি গুছিয়ে সারতে পারতেন না সেখানে বাবার শ্রমিক বন্ধুরা, রিকশাওয়ালা বন্ধুরা, তরকারি বিক্রেতা বন্ধুরা এসে হাজির হতেন। সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে যেত বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। বাবার সঙ্গে শ্রমিক মিটিংএ যাবার সময় মা তৈরি হতেন জর্জেট শাড়ি পরে, সাজগোজ করে। আর বাবা বলতেন তোমাকে দেখতে খুবই চমৎকার লাগছে, গ্রেটা গার্বোর চেয়েও সুন্দর, কিন্তু একটু সাদাসিধেভাবে গেলে ভালো হয়। বাবা যখন জেলে গেলেন, তখন মা দেখা করতে যেতেন নিয়মিত। এবং জেল পুলিশদের ধমকের উপরে রাখতেন। এই দুই বিপরীত মেরুর মানুষ পরষ্পরকে ভালোবাসতেন নিঃসন্দেহে। ভালোবাসার পরিচয় পাই বাবার তোলা ছবি দেখে। কয়েকটি অ্যালবাম ভরিয়ে ফেলেছেন স্ত্রীর ছবি তুলে। মায়ের রান্নার প্রশংসা না করে কোনদিন খেতে বসেননি। শেষ বয়সেও সেবা করেছেন প্রচুর। বিয়ে বার্ষিকী ও জন্মদিনে উপহার দিতে কখনও ভুল করেননি। মা-ও তাকে ভালোবাসতেন নিজস্ব ধরনে। তার যত্ন নিতেন। সব বিপদ থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন। 
ছোটবেলায় দেখতাম, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে বাবার মতামত আমরা মেনে নিলেও সংসার চলে মায়ের মতেই।বাবা বলতেন ‘হার ম্যাজেস্টি’ অথবা ‘চন্দ্রবংশের রাজকন্যা’। মাকে ছাড়া তিনি কোথাও যেতেন না। বন্যার সময় নাকি রিলিফ দিতে গিয়েছিলেন তাকে নিয়েই। শ্বশুরের প্রিয় পুত্রবধূ ছিলেন তিনি। দাদা বলতেন, ‘মা, আমার ছেলেটাকে তুমিই সংসারে ধরে রাখতে পারবে’।
মা রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন। উত্তম কুমার, সৌমিত্র, সুচিত্রা সেন তার প্রিয়। আর হেমন্ত মুখার্জির গানের রেকর্ড না বাজিয়ে তিনি ঘুমাতে পারতেন না। আজও অসংখ্য কবিতা তাঁর মুখস্ত। বই পড়তেন প্রচুর। বিমল মিত্র, শংকর, সুনীল, শীর্ষেন্দু। সত্যজিৎ রায়ের ছবির ভক্ত ছিলেন। আর্ট একজিবিশন মিস করতেন না। আমার ও ভাইয়াকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। নিজে গাড়ি ড্রাইভ করতে পারতেন। ছোটবেলায় নাকি ময়দানে ঘোড়ায় চড়াও শিখেছিলেন। শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতেন। এক বছর আজিমপুর স্কুলে চাকরি করেছিলেন। বাবা তার চাকরি করাকে খুব উৎসাহ দিতেন। কিন্তু মা চাকরি ছেড়ে দেন রীতিমতো জোর করে। কারণ তার মতে ‘আয়ার কাছে মানুষ হলে ছেলে-মেয়ের উচ্চারণ নষ্ট হবে, ওরা খারাপ কথা শিখবে’। আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত মায়ের কাছে পড়েছি। মায়ের ছিল ‘চিন্তা রোগ’। বাবা বাড়ি ফিরতে একটু দেরি করলে তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। চেনা জানা কারও কাছে ফোন করতে বাকি রাখতেন না। ভাইয়া আর আমার বেলায়ও একই ব্যাপার। আমাদের স্কুলে দিয়ে ওখানেই ছুটি না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতেন। 
আবার দাপুটে ছিলেন খুব। আলুবাজার মহল্লার চেয়ারম্যান (পরে কমিশনার)কেও তার সামনে মাথা নিচু করে কথা বলতে হতো। সেই মেজাজি, দাপুটে মানুষটি আজ অসহায়। আমরা ধমক দিলে তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে বাবাকে খোঁজেন। বাবা যখন হাসপাতালে নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়ছেন তখন যদি মাকে বলতাম তার অসুখের কথা, মা বলতেন, হাসপাতালে কেন? ঠাণ্ডা লেগেছে? নিশ্চয়ই মিছিলে গিয়েছিল। আর এখন যখন মাঝে মাঝে বলেন ‘কমরেড তকীয়ূল্লাহ কোথায়? অথবা তকীয়ূল্লাহ সাহেব কই? কবে আসবেন?’ আমি বলি তিনি আসতে পারছেন না। মা আপন মনেই বলেন ‘আবার জেলে গেছে? এতবার বলেছি রাজনীতি ছাড়ো।কথা শুনবে না’

লেখক : শান্তা মারিয়া, কবি, সাংবাদিক।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK