সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮
Tuesday, 15 May, 2018 12:07:45 pm
No icon No icon No icon

১৪.৫.১৪ বাবার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে


১৪.৫.১৪ বাবার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে


প্রবীর বিকাশ সরকার: বাঙালি পরিবারে পিতাপুত্রের সম্পর্ক কী রকম সে বোধ করি না বললেও চলে। বাবার সঙ্গে  আমার বন্ধুর মতোই সম্পর্ক ছিল। যেমন আদর করেছে আবার শাসনও করেছে। স্বল্পভাষী  বাবাকে আমার দার্শনিক বলে মনে হত। বৃটিশ আমলের মাত্র মেট্রিক পাশ অথচ ইংরেজিতে ছিল তার তুখোড় দক্ষতা ও জ্ঞান। বাংলা তো ছিল জলভাত মাতৃভাষা বলে। অংকে ছিল জবর সচেতনতা। স্মৃতিশক্তি ছিল অসম্ভব প্রখর ৮৪ বছর বয়সেও যে বয়সে চলে গেল বাবা আমাদেরকে ছেড়ে।

বাবার উৎসাহে লেখক হয়েছি। বলেছিল, জাপান-ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা করো। বাবা ছিল আমার প্রতিটি প্রবন্ধের প্রথম পাঠক। ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দিয়েছে। বলেছে এই বইয়ে ওই বইয়ে তথ্যটা পাবে। রবীন্দ্রনাথের শাহজাহান কবিতাটি ছিল মুখস্থ। নজরুলের গান ছিল বড় প্রিয়। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতেন। রবীন্দ্রনাথকে বলতেন ত্রিকালদর্শী।

এহেন বাবাকে আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কাছাকাছি দেখেছি ২৫ বছর পর্যন্ত। তারপর তো প্রবাসী হয়ে গেলাম। ২০০৭ সাল থেকে মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে সেবা করার চেষ্টা করেছি সেই সুযোগটা করে দিয়েছে আমার জাপানি স্ত্রী।

বাবাকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন আমিও লিখেছি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অতলান্ত পিতৃস্মৃতি’ নামে এখন সাহিত্য কাগজ মাসিক ‘নতুনধারা’তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে মার্চ সংখ্যা থেকে। বাবার চোখ দিয়ে আমার জীবনের প্রথম ২৫টি বছর সময়কে দেখার চেষ্টা করেছি। আমার এমন কোনো কুকর্ম, সুকর্ম নেই বাবা জানত না। কুমিল্লা পুলিশ অফিসের জিআরও (জেনারেল রেকর্ডিং অফিসার) ছিল ৪০ বছরের অধিক সময় ছেলে কী করে জানবে না তা কি হয়! তাও ছোট্ট বাংলাদেশে! এমনকি আমার মেয়েঘটিত প্রেমপ্রীতির কথাও বাবা জানতো, শহরে ঘুরঘুর করা গোয়েন্দারা বাবাকে বলে দিত। একবার এক পুলিশের সঙ্গে শাসনগাছার ঝুপড়িতে বাংলা মদ খেয়েছিলাম, বেটা প্রতীজ্ঞা করেছিল বাবাকে বলবে না, কিন্তু পুলিশ বলে কথা, বলে দিয়েছে। বাবা খুব একটা রাগ করেনি, শুধু বলেছিল, এমন কিছু করো না যাতে পিসি সরকারকে (বাবার নাম) কেউ দুর্বল অভিভাবক ভাবে!

এক জীবনে বাবার সঙ্গে আমার কত না অম্লমধুর স্মৃতি! কত স্মৃতিই না মনে পড়ছে আজ। ১৯৮৪ সাল যে বছর আমি জাপানে চলে আসি, হঠাৎ করে এম এ পড়া ছেড়ে দিই। বাবা তখন চট্টগ্রাম পুলিশ কোর্টের অফিসার। থাকে পুলিশের ভাঙা পড়োপড়ো অন্ধকার ভুতুড়ে ফাঁড়িতে। একদিন সন্ধেবেলা অব্যক্ত এক মর্মবেদনায় ভুইল্যা টেনে মাতাল ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বাবার কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম, কারো প্রতি কোনো রাগ থেকে নয়, কারো প্রতি কোনো অভিযোগ থেকেও নয়, যেকোনো কারণেই হোক, বাবা আমি আর এই দেশে থাকতে চাই না। আমি এখানে থাকলে মরে যাব। আমি অন্য কোথাও, অন্যকোনো দেশে চলে যেতে চাই।

বাবা বারান্দায় চেয়ারে বসে আমার মুখোমুখি হয়ে আলোআঁধারিতে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকল আমার মুখের দিকে। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে ধীরে ধীরে আমার জন্ম থেকে তারুণ্য পর্যন্ত অনেক ঘটনার কথা বলল। যা অামি কিছু জানি এবং বাদবাকি জানি না। সেসব উপন্যাসে লিখেছি। বাবা জানত কেন আমি দেশ ছাড়তে চাই। শেষে বলল, ঠিক আছে বাবা। তোমার ইচ্ছে আমি পূরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করব। তুমি আমার বড় সন্তান। তোমার ওপর আমাদের অনেক আশা। এই দেশেরও আশা। তুমি জন্মলগ্ন থেকে বড় বেশি জেদী ছেলে। যা করতে চাও সেটাই করে ছাড়ো। আমি তোমার সব আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছি যথাসাধ্য এটাও করব। কিন্তু বাবা, কারো ওপর অভিমান করে যদি দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাও সেটা তোমার জন্য মঙ্গল হবে না।

বাবা যে ধারণা থেকে কথাটি বলেছিল সেটা সঠিক ছিল। কারো প্রতি আমার প্রচন্ড অভিমান ছিল এটা্ও সত্যি, আবার দেশের অরাজক পরিস্থিতিও আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছিল না।

১৪ মে, ২০১২ তারিখ বাবা দুপুর তিনটার সময় চলে গেল। যাওয়ার সপ্তাহখানেক আগে ডিসি অফিসে নিয়ে যাই পেনশন তোলার জন্য। শেষ পেনশন তুলেছিল নিজ হাতে। বাবাকে যারা বহু বছর ধরে দেখে আসছে সবাই কাঁদছিল। শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সারা জীবন বাবার কাছ থেকে উপকারই পেয়েছে, তারা ভাবতে পারছিল না তাদের ‘বাবু’ আর অফিসে আসবেন না! একজন তো ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখা মাবনজীবনের অপ্রতিরোধ্য ক্রান্তিকাল! একদিন আমার জীবনেও সেই সময়টা আসবে।
বাবা চলে গেলে পরে আমার জীবনের একটি অধ্যায়ের যবনিকা পড়ল। বাবার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK