সোমবার, ২১ মে ২০১৮
Monday, 14 May, 2018 01:01:32 am
No icon No icon No icon

ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে মা দিবসের মূল্যায়ন


ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে মা দিবসের মূল্যায়ন


আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ: পশ্চিমা বিশ্বের কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং তাদের কর্পোরেট ব্যবসা সবকিছুর সাথে মানুষের সকল পারিবারিক/সামাজিক/মানবিক সম্পর্ক, বন্ধন ও অনুভূতি গুলোকেও ব্যবসায়িক পণ্য ও অর্থ উপার্জনের পথ/বস্তু/হাতিয়ার বানিয়ে ছেড়েছে। পশ্চিমারা লাগামহীন স্বাধীন এবং ব্যক্তি/আত্নকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় জীবন অতিবাহিত করে যে, প্রাপ্ত বয়স্ক হবার সাথে সাথে তাদের সন্তানরা নিজেরাই অর্থ উপার্জন, খরচ ও ইচ্ছেমত জীবনযাপন করতে শুরু করে। ফলে মা/বাবা/পরিবারের সাথে সন্তানদের সম্পর্ক শীথিল এবং প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর পশ্চিমা জনসাধারণের এই পারিবারিক/সামাজিক/মানবিক সম্পর্ক/বন্ধনগুলোকে বছরের অন্তত এক একটি বিশেষ দিনে মনে করার জন্য, আপনজনদের সাথে সময় কাটানোর জন্য, অতীত স্মৃতি রোমান্থ করার জন্য, কৃতজ্ঞতা/ভালবাসার অনুভূতি জানানোর জন্য কর্পোরেট গোষ্ঠী/ব্যবসায়ীরা হলি ডে, ন্যাশনাল ডে, মে ডের মত ভেলেন্টাইন ডে, ফ্রেন্ডশীপ ডে, মাদারস ডে/ফাদারস ডে, চিল্ড্রেনস ডে, উইমেন্স ডের মত বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রীক আনুষ্ঠানকতার সূচনা করেছে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে একে মন্দের ভালো বলাও যায়। কারণ যারা সারা বছর নিজের প্রেমিকা/স্ত্রী, বাবা/মা, ভাই/বোন, বন্ধুদের সাথে একটু কথা বলার, সময় কাটানোর সময় পায় না/দিতে চায় না তারা অন্তত এইসব দিনে তাদের স্মরণ করার, তাদের প্রতি একটু যত্নশীল হবার, ভালবাসা প্রকাশের সময়, সুযোগটুকু পায়/নেয়/চেষ্টা করে। এও বা কম কিসে? মর্ডান সিভিলাইজেশান এবং ডিজিটান যুগ বলে কথা। সবকিছুকে অন্তত পণ্য ও ব্যবসা ভাবার মানসিকতা ও অতিরিক্ত উৎসাহ আদিখ্যেতা থেকে অন্তত আমাদের বেঁচে থাকা উচিত ভবিষ্যতে নিজেদের মঙ্গলের জন্যই। কারণ আমরা তো পশ্চিমা নই। আজ পশ্চিমারাও তাদের এই অতিরিক্ত/লাগামহীন ব্যক্তি স্বাধীনতা, অপব্যয়, স্বেচ্ছাচার, অসামাজিকতা, ভায়লেন্সে, অশ্লীতায় হাপিয়ে উঠেছে। এখন তারা আবার আমার সেই আদিম অনাবিল মানবিক স্নেহ-ভালবাসা, আবেগে ঘেরা ও বাধা পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধনকে পুনরুজ্জীবীত করতে চাইছে। সেসব কথা আমরা কয়জনই বা জানি। কারণ পশ্চিমাদের ভাল দিকগুলো দেখার, অনুভব, অনুকরণ করার মত শিক্ষা, রুচি, মানসিকতা, সময়, ইচ্ছাবোধ আমাদের মত অনুন্নত, অনগ্রসর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ লোকেরই নেই। তাই বলব পারিবারিক ও সামাজিক অনাবিল সম্পর্ক ও বন্ধনগুলোকে মনের প্রকৃত ভাললাগা, ভালবাসা, মানবিকতা দিয়েই অনুভব করার, প্রকাশ করার, ধরে রাখার চর্চা/চেষ্টা করুন। এটাই আমাদের আদিম মনুষ্যত্ববোধ, দেশজ সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে ধারন ও প্রতিফলিত করে। মা-বাবার স্নেহ-ভালবাসার কোনপ্রকার বিনিময় মূল্য/মানদন্ড হতে পারে না। এর ঋণও কোনদিন কোন কিছুর বিনিময়ে শোধ করা সম্ভবপর নয় সন্তানদের পক্ষে। এই বাস্তবতাকে সবার অনুধাবন করতে হবে। তবেই আমরা নিজের মনের ভেতর থেকে মা/বাবা/আপনজনদের স্নেহ-ভালবাসাকে অনুভব/উপলব্দি করতে পারব এবং তাদের প্রতিও অকৃতিম স্নেহ-ভালবাসা অনুভব, প্রকাশ করতে পারব। আজ মা দিবসে পৃথিবীর সকল মার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। মা দিবসে মাদের সাথে বাবাদের কথাও স্মরণ করতে চাই। তারা কি সন্তানদের মাদের চেয়ে কম ভালবাসে? কম যত্ন নেয়? কম ত্যাগ স্বীকার করে? মা/বাবারা যে মনের অকৃতিক স্নেহ-মায়া, ভালবাসা, যত্ন দিয়ে আপনারা নিজেদের সন্তানকে বড় করছেন তার কোন মূল্য হয় না/হতে পারে না। এই বাস্তব চিরন্তন সত্যটুকু সন্তানদের বোঝানোর দায়িত্ব মা/বাবাদের। সন্তানদের কেবল যত্ন করে, খাইয়ে, পড়িয়ে, তাদের শখ-ইচ্ছা পূরণ করে কেবল বড়, শিক্ষিত, সফল মানুষ করে তোলা নয় বরং তাদের ভাল মানুষ ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার উপর মা/বাবা তথা পরিবারের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। আর এই ক্ষেত্র/জায়গাটিতে মা/বাবা সফল হলেই তাদের সকল কষ্ট, পরিশ্রম, অর্থ ব্যয়, আত্নত্যাগ স্বীকার সফল হবে। তাহলে সন্তান বড়, শিক্ষিত, সফল হলেও সে মা/বাবার অনুগত/বাধ্য থাকবে। আপনাদের স্নেহ-ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। আপনার কষ্ট, পরিশ্রম, আত্নত্যাগকে সে অনুভব/উপলব্দি করতে সক্ষম হবে সন্তানরা নিজ শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, উপলব্দিবোধ থেকেই। আর তখন মা/বাবারা নিজেদের সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্ত হবে, গর্ববোধ করতে পারবে। মা/বাবারা যে তাদের জীবন, যৌবনের অধিকাংশ সময়, কষ্ট, শ্রম, মেধা, অর্থ খরচ করে সন্তানদের ভালভাবে মানুষ করার জন্য, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের সফল মানুষ হবার জন্য, মা/বাবাকে গর্বিত করার জন্য। সে কথা কি সবার মনে থাকে? মা/বাবা তাদের বৃদ্ধকালে, শেষ বয়সে সন্তানদের কাছে কি চায় তা কি সব সন্তান অনুভব করতে চায়?/ না পারে? অনেকেই পারে না/চায় না। অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিতেও কুন্ঠিত হয় না। আসলে মা/বাবারা তাদের সন্তানদের কাছে তেমন কিছুই চায় না। তারা যৌবনে সন্তানদের নিজেদের সুন্দর সময়, অর্জিত অর্থ, শ্রম দিয়ে, নিজের শখ-ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভালভাবে যত্ন করেছে। শিক্ষিত ও ভাল মানুষ করেছে। তাকে উন্নতি করার এবং সফল হবার পথ তৈরি করে দিয়েছে। সারা জীবন তারা কেবল সন্তানের সুস্থতা, মঙ্গল, উন্নতি, খ্যাতি চায়। সেজন্য সব সময় দোয়া করে। তারা চায় তাদের সন্তানরা সব সময় ভাল, হাসিখুশি, সুস্থ্য থাকুক। মা/বাবাকে স্নেহ-ভালবাসার বন্ধনে জড়িয়ে রাখুক, সম্মান-শ্রদ্ধা, যত্ন করুক, খেয়াল রাখুন, তাদের সাথে রাখুক। যেভাবে তারা শিশু/ছোট/কৌশরকালে সন্তানদের যত্ন, খেয়াল রেখেছে। স্নেহ ভালবাসা দিয়েছে। তাদের সব শখ, ইচ্ছা পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে নিজেদের সাধ্যের ভেতর। কখনোবা নিজদের আনন্দ-ইচ্ছাকে ত্যাগ করে। বৃদ্ধ জীবনের শেষ সময়টুকু তারা সন্তান ও পরিবারের মাঝেই কাটাতে চায় এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চায় নিরাপত্তা, আনন্দ ও স্বস্থির সাথে। মা দিবসে সন্তানদের মা/বাবাদের এই অনুভূতি, চাওয়া, আকাঙ্ক্ষা, অধিকারগুলোকে যদি আমরা উপলব্দি করতে, সম্মান দিতে চেষ্টা/চর্চা করি। করতে সক্ষম হই। তাহলেই মা/বাবার প্রতি হক আদায় হয়ে যাবে। তাই আদিখ্যেতা/লোক দেখানো নয় মার প্রতি প্রকৃত ভালবাসা, সম্মান দিতে, খেয়াল রাখতে, যত্ন নিতে এবং হক আদায় করার উপর সব সন্তানকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রত্যেক মাকে তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার সন্তানরা স্নেহ-মমতা, যত্ন, সম্মান-শ্রদ্ধা দিয়ে জড়িয়ে রাখুন। তবেই মাদের সকল কষ্ট-শ্রম-ত্যাগ সার্থক হবে। তাদের মন তুষ্ট হবে। মুখে অনাবিল আনন্দের রেশ থাকবে। মন থেকে সন্তানদের জন্য দোয়া আসবে। তবেই মা দিবসের প্রকৃত সার্থকতা সম্ভব হবে। মা দিবস একটি প্রতীকি মাত্র। মার প্রতি কি একদিন ভালবাসা দেখালে হবে? মাকে ভালবাসতে হবে প্রতিক্ষণ, প্রতিদিন, আমৃত্য। পৃথিবীর সব মার তাদের সন্তানকে নিয়ে তাদের সুন্দর, ভাল স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষাগুলো পূর্ণ হোক এই প্রত্যাশায় শেষ করছি। 

লেখক:আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ, সিনিয়র রিপোর্টার, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা।
যোগাযোগ করুন[email protected]

এই রকম আরও খবর




Editor: Habibur Rahman
Dhaka Office : 149/A Dit Extension Road, Dhaka-1000
Email: [email protected], Cell : 01733135505
[email protected] by BDTASK